বৈঠার তালে যমুনায় উচ্ছ্বাস

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

বৈঠার তালে যমুনায় উচ্ছ্বাস

জহুরুল ইসলাম, বেলকুচি (সিরাজগঞ্জ) ১০:০৫ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৯, ২০২০

print
বৈঠার তালে যমুনায় উচ্ছ্বাস

সিরাজগঞ্জের যমুনা তখন বৈঠার ছন্দে মাতোয়ারা। নদীবক্ষে তীরের বেগে চলছে সরু লম্বা নৌকা। তাতে সারি সারি বৈঠা তালে তালে বাইছেন তরুণ, যুবক মাঝি। ‘হেইয়া হো, হেইয়া রে’ বলে শক্তি জোগাচ্ছেন একযোগে। ঢাকঢোল আর জারি-সারি গানের কমতি ছিল না কোথাও। বেলকুচি উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের মেঘুল্লায় অর্ধশতাধিক নৌকার অংশগ্রহণে বাঙালি ঐতিহ্য ও প্রাচীন সাংস্কৃতিক অন্যতম অনুষঙ্গ নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা দেখতে ছুটে এসেছিলের দেশের বিভিন্ন স্থানের মানুষ।

তৈরি হয়েছিল এক মিলনমেলার। জেলা পরিষদের আয়োজনে গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হয় এই প্রতিযোগিতা, যার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ বিশ্বাস।

গত দুই সপ্তাহ ধরে ঘোষণা দিয়েই চলে প্রতিযোগিতার আয়োজন। করা হয় প্রচার-প্রচারণা। মঙ্গলবার সকালে নদী পাড়ে দেখা যায় বিভিন্ন সাজের নৌকা। পানশি, কোষা ও বৃহৎ আকারের খেলনা নৌকা চলে আসে বেলা ১টার মধ্যে। নৌকাবাইচ দেখতে মেঘুল্লায় যমুনার তীরের চার কিলোমিটারজুড়ে জমে ওঠে মানুষের ভিড়। জানা যায়, অর্ধ লক্ষাধিক মানুষের এ ভিড়ে অধিকাংশ এসেছেন টাঙ্গাইল, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর, সদর, চৌহালী, এনায়েতপুর, বেলকুচি এবং উল্লাপাড়া থেকে।

বেলা ২টায় শুরু হয় মূল প্রতিযোগিতা। ঘণ্টির ঝনঝনানি, ঢোল, বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে একটিকে পেরিয়ে যেতে চায় অন্যটি। নৌকায় নৌকায় রোল ওঠে- ‘জোরসে বল হেইও, আরো জোরে হেইও, বাইয়া যাও হেইও’। নদীর দুই তীর করতালি ও হর্ষধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে।

বেলকুচি পৌর এলাকার চালা গ্রাম থেকে আসা বিজয় বাংলা ৭১ নৌকার তত্ত্বাবধায়ক ও বেলকুচি উপজেলা পরিষদ ভাইস চেয়ারম্যান ইউসুফ আলী শেখ জানান, এ রকম স্বতঃস্ফূর্ত জনতার উৎসবমুখর আয়োজনে নৌকাবাইচ আগে কখনো দেখিনি। আমরা ছোটবেলায় দেখেছি, বন্যার সময় হলেই চারদিকে নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার ধুম পড়ত। কিন্তু এখন আর খুব একটা এ আয়োজন হয় না। লতিফ বিশ্বাস গ্রামীণ ঐতিহ্যকে লালন করে প্রতিবার নৌকাবাইচের আয়োজন করছেন। আমরা চাই নির্মল আনন্দের এ ধারা যেন অব্যাহত থাকে।

শাহজাদপুরের মামুন বিশ্বাস, বেলকুচির মেঘুল্লার কামাল আহমেদ, দৌলতপুর ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মাসুদ রানাসহ উপস্থিত আরও অনেকে জানান, আসলেই নৌকাবাইচের এই বিশাল আয়োজন আমাদের সবাইকে মুগ্ধ করেছে। সব ভেদাভেদ ভুলে অন্তত কয়েক ঘণ্টার জন্য সবাই আমরা এককাতারে মিশে ছিলাম। বাইরে থাকা গ্রামের নারী-পুরুষও নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে বাড়িতে আসেন। এ সময়টাতে গ্রামে মিলনমেলা তৈরি হয়, যেন ঈদের মতোই আরেক আনন্দ। দৌলতপুর ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেন জানান, ৩ দিন ধরে নৌকাবাইচের আনন্দ জড়িয়ে ছিল আমাদের এলাকার ৮-১০টি গ্রামে। পিঠা-পায়েসের উৎসব ছিল ঘরে ঘরে।

প্রতিযোগিতায় বিজয় বাংলা-৭১, স্বপ্ন তরী, আল্লারদান, প্রথম আলো, করতোয়াসহ বিজয়ী নৌকার মালিকদের হাতে উপহার তুলে দেওয়া হয়। জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আবদুল লতিফ বিশ্বাসের সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন উল্লাপাড়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম (শফি), বেলকুচি উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান ইউসুফ আলী শেখ, পৌর মেয়র বেগম আশানূর বিশ্বাস, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা, উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি একেএম ইউসুফজী খান, দৌলতপুর ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মাসুদ রানা প্রমুখ।

আয়োজন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ বিশ্বাস বলেন, নৌকাবাইচ বাংলাদেশের ইতিহাস ঐতিহ্যের প্রতীক। তিনি বলেন, আমরা নৌকাবাইচের আয়োজন করেছিলাম পাপাচারের বিরুদ্ধে। সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আমাদের মুগ্ধ করেছে। আগামীতেও বাল্যবিবাহ, সন্ত্রাস, জঙ্গিমুক্ত সোনার বাংলা গড়তে সবাইকে উৎসাহ জোগাতে এই আয়োজন অব্যাহত থাকবে।