বগুড়া অঞ্চলে চামড়া বাজারে ভয়াবহ ধস

ঢাকা, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১১ আশ্বিন ১৪২৭

বগুড়া অঞ্চলে চামড়া বাজারে ভয়াবহ ধস

টি.এম.মামুন, বগুড়া ১২:২৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১১, ২০২০

print
বগুড়া অঞ্চলে চামড়া বাজারে ভয়াবহ ধস

বছরের পর বছর ধরে ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে পাওনা বকেয়া না পাওয়াসহ প্রয়োজনীয় সরকারি সহযোগিতা না পাওয়ায় ঝিমিয়ে পড়েছে উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার শিল্প সমৃদ্ধ বগুড়া অঞ্চলের চামড়া ব্যবসা। স্থানীয় পরিবেশ অনুকূলে থাকা সত্ত্বেও কেবলমাত্র কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় ধস নেমে এসেছে এই ব্যবসায়। অথচ একযুগ আগেও রমরমা ছিল বগুড়ার চামড়া ব্যবসা। যেমন লাভবান ছিলেন ব্যবসায়ীরা, তেমনি এই খাত থেকে উল্লেখযোগ্য হারে রাজস্ব পেত সরকার। তাই দ্রুত জেলা পর্যায়ে প্রণোদনা দেওয়াসহ ট্যানারি স্থাপনের বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, ক্রমান্বয়ে বগুড়ায় পশুর চামড়ার বাজারে ধস নামছে। বেশ কয়েক বছর ধরে চামড়ার বাজার নিম্নমুখী হলেও এবার চামড়া কেনাবেচা হয়েছে পানির দরে। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা (ফড়িয়া) মাঠে নামলেও চামড়া কিনছেন অনেক হিসেব-নিকেশ করে। অনেক জায়গায় বাড়িতে চামড়া পড়ে থাকলেও কেউ কিনতে আসেনি। চামড়ার মূল্য এতটাই কম ছিল যে, অনেকে রাগে অভিমানে চামড়া ফেলে পর্যন্ত দিয়েছেন।

মূল্য কম হওয়ায় আশানুরূপ স্থানে দানও করতে পারেননি অনেকে। ব্যবসায়ীরা বলেন, কোরবানি উপলক্ষে গরুর চামড়া কেনা হয়েছে ২৫০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৫৫০ টাকায়। ছাগলের চামড়া কেনা হয়েছে ১০ থেকে সর্বোচ্চ ২৫ টাকায়। আর ভেড়ার চামড়া দেওয়া হয়েছে ছাগলের চামড়ার সঙ্গে ফ্রি। তবুও যেন লোকসান আতঙ্কে রয়েছেন তারা।

ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, বগুড়া একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্প নগরী। গোটা বাংলাদেশসহ এশিয়া অঞ্চলে বগুড়ার আলাদা পরিচিতি রয়েছে। এ জেলায় এমন অনেক ব্যবসায়ী রয়েছেন, যারা করদাতা হিসেবেও গোটা দেশে সুনাম কুড়িয়েছেন। অথচ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এখানকার চামড়া ব্যবসা। ব্যবসায়ীরা বলেন, বছরের পর বছর টাকা আটকে ট্যানারি মালিকরা বেকায়দায় ফেলেছেন বগুড়ার ব্যবসায়ীদের। ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে পাওনা টাকা চাইতে চাইতে হয়রান হয়ে পড়েছেন তারা।

বিপুল পরিমাণ টাকা পাওনা থাকা সত্ত্বেও এখনও বাঁকিতে ট্যানারিতে চামড়া দিতে হচ্ছে তাদেরকে। তাই বাধ্য হয়ে তারাও কমদামে চামড়া কিনছেন সাধারণ মানুষদের কাছ থেকে। চাহিদার তুলনায় জোগানের সীমাবদ্ধতা না থাকলেও করোনা সংশ্লিষ্ট কারণে এ বছর জেলার ১২ টি উপজেলায় কমপক্ষে ২৫ শতাংশ কোরবানি কম হয়েছে। সবমিলিয়ে হয়তো ৫০ থেকে ৬০ হাজার গরু এবং ৩৫ থেকে ৪০ হাজার ছাগল কোরবানি করা হয়েছে। চামড়ার মূল্য বাদ দিয়ে শুধুমাত্র একটি গরুর চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতেই লবণ ও শ্রমিকসহ দুই থেকে আড়াইশ’ টাকা খরচ পড়ে যায়। এত টাকা খরচ করে বছরের পর বছর ধরে ট্যানারি মালিকদের কাছে জিম্মি হয়ে থাকতে হচ্ছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের।

চামড়া ব্যবসায়ী এক নেতা বলেন, ‘যদি একটি চামড়ার দাম একশ টাকাও হয়, টাকা না থাকলে সেটিও তো কেনা সম্ভব নয়। আর আমার কাছে টাকা কম থাকলে সঙ্গত কারণে আমিও চাইব কম দামে চামড়া কিনতে। এভাবেই প্রত্যেকটা স্তরে ক্ষতি হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে এমনও চামড়া পাওয়া গেছে, লবণ খরচ করলেও সেটাতে লোকসান হবে ব্যবসায়ীর। যে কারণে ঐসব চামড়াগুলো টাকা দিয়ে কোনো ব্যবসায়ী কিনেন নি’।

বগুড়া চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন জানান, ‘নগদ টাকা ছাড়া কোন ব্যবসা হয় না। আমাদের ব্যবসায়ীদের হাতে কোনো টাকা নেই। বগুড়ায় সমিতির সঙ্গে জড়িত ৩৮৭ জন চামড়া ব্যবসায়ী। আমরা প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন ব্যবসায়ী রয়েছি, যারা ঢাকায় ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে ব্যবসা করে আসছি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, প্রায় ৩ বছর ধরে বগুড়ার কমপক্ষে ডজন খানেক ব্যবসায়ী রয়েছে, যারা ঢাকাস্থ ট্যানারি মালিকদের কাছে ৩০ থেকে ৩৫ কোটি টাকা বকেয়া পাওনা আছেন।

উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার শিল্প সমৃদ্ধ ঐতিহ্যবাহী এলাকা বগুড়া। এখানে ট্যানারি স্থাপন করলে যেমন উপকৃত হবে উত্তরাঞ্চলের ব্যবসায়ীরা, তেমনি উপকৃত হবে সরকারও। অথচ কি কারণে বগুড়ার মতো জেলায় আজও ট্যানারি স্থাপন হচ্ছে না, তা আমাদের ব্যবসায়ীদের কাছে বোধগম্য নয়’।

বগুড়া চেম্বার অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ও বহুবারের শ্রেষ্ঠ করদাতা মাসুদুর রহমান মিলন জানান, ‘চামড়া শিল্পের লোকসান পুষিয়ে নেওয়াসহ ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে এলাকাভিত্তিক চামড়া কারখানা স্থাপন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টিতে গুরুত্ব দিলে এ অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবে, অন্যথায় লোকসান ঠেকানো সম্ভব হবেনা’।