চলনবিলে ঢেউয়ের খেলা

ঢাকা, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১৩ আশ্বিন ১৪২৭

চলনবিলে ঢেউয়ের খেলা

আশরাফুল ইসলাম রনি, তাড়াশ, সিরাজগঞ্জ ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ০৮, ২০২০

print
চলনবিলে ঢেউয়ের খেলা

সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও নাটোর-এ তিনটি জেলার প্রায় নয়টি উপজেলায় বিস্তৃত চলনবিল। বর্ষাকালে যেদিকে চোখ যায় শুধুই জলরাশি। ঢেউয়ের খেলা। আবার শুষ্ক মৌসুমে দিগন্ত রেখায় সবুজের আলপনা। চলনবিল প্রাণ ফিরে পায় বর্ষাকালে। তাই ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য এ মৌসুমে চলনবিল হতে পারে উপযুক্ত গন্তব্য।

সিরাজগঞ্জের তাড়াশের আশপাশে রয়েছে অনেক নদ-নদী, খালবিল। এসবই বয়ে গেছে চলনবিলের ওপর দিয়ে। বর্ষায় থৈ থৈ চলনবিলে পালতোলা নৌকা চলেছে। অসাধারণ এক দৃশ্য। আকাশ কখনো মেঘলা কখনো সাদা রঙ ধারণ করে। আত্রাই, গুড় নদী, বরনাই নদী, বড়াল নদী, তুলসী নদী, চেচুয়া নদী, ভাদাই নদী, গুমানী নদী বয়ে গেছে চলনবিলের ওপর দিয়ে। দেশ-বিদেশে পরিচিত এ বিলকে পর্যটকদের জন্য মোটেল সুবিধাসহ কয়েকটি দর্শনীয় স্পটকে অবকাঠামো উন্নয়ন করলেই এটি দেশের অন্যতম পর্যটন এলাকায় পরিণত হবে বলে মনে করেন চলনবিলবাসী। 

এখানে পর্যটকদের আকর্ষণ করার মতো প্রাকৃতিক দৃশ্য ও বহু প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহাসিক স্থানও রয়েছে। যার মধ্যে তাড়াশে দর্শনীয় স্থানগুলোর অন্যতম আকর্ষণ হলো-রাধা গোবিন্দ মন্দির, শিব মন্দির, মথুরাদীঘি, বড় কুঞ্জবন, উলিপুরের দীঘি, শিশু পার্ক, বৌদ্ধ বিহার। এসব ঘুরে ঘুরে দেখতে খুব ভাল লাগবে। শরতের শেষদিকে শুরু হয় দুর্গাপুজা।

তাড়াশে বিখ্যাত কপ্লিশ্বের শিব মন্দির, দেবী মন্দির, বাসুদেব ও গোপীনাথ বিগ্রহের মন্দিরের এর কাহিনী। তাড়াশের রাজবংশের পুর্ব পুরুষ বলরাম প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি মন্দির, থানা রোডে কুঞ্জবন নামক সর্ববৃহৎ জলাশয় ও তাড়াশের রাজবাড়ীর ধ্বংসবশেষ প্রাচীন কীর্তি ও নির্দশন। তাড়াশে ভগ্নপ্রায় জোরবাঙালার গায়ে ১৬৬১ খ্রিস্টাব্দের খোদিত লিপি থেকে জানা যায়, এখানকার গোপীনাথ বিগ্রহের সেবায়েত ছিলেন নাগবংশীয় কায়স্থ।

এ তাড়াশের বিনোদ রায়, গোবিন্দজী, রশিক রায়, কপিলেশ্বর শিব প্রভৃতি যে কয়েকটি বিগ্রহের মন্দির রয়েছে-এর মধ্যে কপিলেশ্বর ও গোবিন্দ মন্দির অন্যতম। আর এসব দেখতে দেখতে এক নিমিষেই ফিরে যাবেন অতীত যুগে। দেশের উৎপাদিত মাছের অন্যতম প্রধান উৎস সিরাজগঞ্জের চলনবিলাঞ্চল। কিন্তু প্রতি বছর কমছে এ অঞ্চলে মাছের উৎপাদন, বিলুপ্ত হচ্ছে মাছের প্রজাতি। মাছে ভাতে বাঙালি বাংলার চিরায়ত প্রবাদ। কিন্তু মানুষের নানামুখী হস্তক্ষেপের কারণে ইদানীং কমতে শুরু করেছে মাছের উৎস।

একই সঙ্গে হুমকির মুখে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। চলনবিলের শুঁটকি মাছ স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। স্থানীয় বাজারে সৃষ্টি, শুঁটকি সংরক্ষণাগার তৈরি আর সেই সঙ্গে সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে আধুনিক পদ্ধতিতে এ শুঁটকি তৈরি করতে পারলে তা বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।

চলনবিল এলাকায় বসবাসরত প্রবীণ ব্যক্তি আব্দুল মজিদ জানান, বর্ষাকালে যেদিকে চোখ যায় শুধুই পানি আর পানি। চলনবিল জুড়ে শুরু হয় ঢেউয়ের খেলা। আবার শুষ্ক মৌসুমে মাঠভরা সবুুজ আর সবুজ। গোলাভরা ধান।

তিনি জানান, বর্তমানে দেশীয় প্রজাতির কিছু মাছ হারিয়ে যাচ্ছে। এগুলো চোখে পড়ছে না। তাড়াশ প্রেস ক্লাবের সভাপতি সনাতন দাশ বলেন, চলনবিলকে রক্ষার জন্য এবং ভেতরে প্রবাহমান ১০-১২টি নদ-নদীসমূহের সংস্কার ও গতিপথ বন্ধ করে অবৈধ দখলকারীদের উচ্ছেদ, পর্যটন করপোরেশনের আওতায় এনে পর্যটকদের প্রয়োজনীয় সুবিধা প্রদান করা জোর দাবি জানাচ্ছি।

তাড়াশ উপজেলার মাগুড়া বিনোদ ইউপির চেয়ারম্যান প্রভাষক এম আতিকুল ইসলাম বুলবুল জানান, চলনবিলের মধ্য দিয়ে এখন মহাসড়ক হওয়ায় নৌকা চলাচল অনেকটা কমে গিয়েছে। চলনবিলে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষণারত শিক্ষক গবেষকদের আসতে দেখলেও এর পরিবেশ ও ঐতিহ্য রক্ষার জন্য কাউকে আসতে দেখলাম না। তিনি আরো জানান, সরকার ইচ্ছা করলেই এটিকে পর্যটন উপযোগী করে দেশের ঐতিহ্যবাহী সম্পদকে রক্ষা করতে পারে।