ঈদ ঘিরেও ব্যস্ততা নেই সিরাজগঞ্জের তাঁতে

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২০ | ২২ শ্রাবণ ১৪২৭

ঈদ ঘিরেও ব্যস্ততা নেই সিরাজগঞ্জের তাঁতে

এইচ এম আলমগীর কবির, সিরাজগঞ্জ ৯:৪০ অপরাহ্ণ, জুলাই ০৯, ২০২০

print
ঈদ ঘিরেও ব্যস্ততা নেই সিরাজগঞ্জের তাঁতে

পবিত্র ঈদুল আযহা ঘিরে ব্যস্ততা নেই সিরাজগঞ্জের তাঁত পল্লীতে। কোভিড-১৯ করোনাভাইরাসের কারণে সিরাজগঞ্জের তাঁত শিল্পে ধস ও লোকসানের দিকে নূয়ে পড়ছে। গত বৈশাখ থেকে শুরু ঈদুল ফিতর পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের লোকসান গুনতে হয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। করোনার প্রভাবে জেলার প্রায় সব তাঁত কারখানা বন্ধ হয়ে পড়েছে।

আর বেকার হয়ে পড়েছেন এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রায় ৮ লাখ নারী-পুরুষ। ফলে তাঁত শিল্পের সঙ্গে জড়িত মালিক ও শ্রমিকরা পড়েছেন বিপাকে। এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে ব্যাংকের ঋনের সুদ মওকুপসহ প্রণোদনা ঘোষণার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন তাঁত মালিকরা। সরজমিন গিয়ে জানা যায়, জেলার শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া, সদর, কামারখন্দ, বেলকুচি, রায়গঞ্জ, চৌহালী, কাজিপুরে তাঁত কারখানার সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজারের অধিক।

এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত আছে ৮-৯ লাখ শ্রমিক, মালিক ও কর্মচারী। এখানকার উৎপাদিত শাড়ি, লুঙ্গী, গামছা দেশের বিভিন্ন হাট বাজারে বিক্রি হয়। বিশেষ করে উল্লাপাড়া, বেলকুচি, শাহজাদপুর, এনায়েতপুর, পাঁচলিয়া বাজারে সপ্তাহে দুই দিন বিশাল কাপড়ের হাট বসে। এসব হাটে লাখ লাখ টাকার কাপড় বিক্রি হয়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা আসেন এসব হাটে। এমনকি সিরাজগঞ্জের উৎপাদিত কাপড় দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা হচ্ছে। বৈশাখ থেকে শুরু করে দুটি ঈদ পর্যন্ত তাঁত শিল্পে ক্ষতি হয়েছে ৩০০ কোটি টাকা দাবি তাঁত মালিকদের।

প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ ও দুই ঈদকে সামনে রেখে তাঁত পল্লীতে শুরু হয় খটখট শব্দ ও তাঁত পণ্য উৎপাদনের আমেজ। কিন্তু করোনাভাইরাস নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে জেলার তাঁত শিল্পের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। শুধু পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে জেলায় প্রায় ১০০ কোটি টাকার তাঁতপণ্য উৎপাদিত হতো। কিন্তু এ বছর তাঁত কারখানা বন্ধ থাকায় উৎপাদনও বন্ধ থাকে। এ কারণে তাঁত মালিকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের তথ্য মতে, দেশের অন্যতম তাঁত অধ্যুষিত এলাকা সিরাজগঞ্জ জেলা। এ জেলায় তাঁত বস্ত্র উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত সুপরিচিত। সিরাজগঞ্জ জেলার সঙ্গে তাঁতের নাম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এ জেলায় তাঁত পরিবারের সংখ্যা ১৪ হাজার ৮৭০ এবং তাঁত সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজারের অধিক। প্রতি বছর এ জেলায় হস্তচালিত তাঁত থেকে প্রায় ২৩ কোটি মিটার বস্ত্র উৎপাদন হয়ে থাকে। এছাড়া এ শিল্পের সঙ্গে তিন লাখ লোকের কর্মসংস্থনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। জেলার কয়েকটি হাটে তাঁতীদের উৎপাদিত বস্ত্র বিক্রি হয়ে থাকে। যার মধ্যে সোহাগপুর হাট, এনায়েতপুর হাট, শাহজাদপুর হাট ও বেলকুচির হাট উল্লেখযোগ্য।

সদর উপজেলার তাঁত ব্যবসায়ী আব্দুল মজিদ বলেন, তাঁতের ব্যবসা নেই। ঈদুল আজহায় ব্যবসায়ীরা আশা করে থাকে ভালো ব্যবসা হবে। কিন্তু করোনাভাইরাস তাঁতীদের সেই স্বপ্ন শেষ করে দিয়েছে। শুধু ব্যবসায়ীরা না এর সঙ্গে শ্রমিক কর্মচারীরাও পড়েছেন বিপাকে। ব্যাংক ঋণ কীভাবে শোধ করব তা নিয়ে চিন্তাই আছি।

কামারখন্দ উপজেলার দোগাছী গ্রামের তাঁত ব্যবসায়ী মজিবর হোসেন বলেন, পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু করে ঈদুল আজহা পর্যন্ত তাঁতের ব্যবসা হয় জমজমাট। কিন্তু প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের কারণে বাংলা নববর্ষ ও ঈদে কোনো ব্যবসা করতে পারিনি। এ কারণে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তাঁত ব্যবসায়ীরা।

বেলকুচি উপজেলার তাঁত শ্রমিক মজনু মিয়া বলেন, ঈদকে সামনে রেখে এই উপজেলার তাঁত পল্লীতে খটখট শব্দে শূখরিত হয়ে থাকত। করোনার কারণে নিঃশব্দ হয়ে পড়েছে তাঁত পল্লী। আমরা ক্ষতির মুখে পড়েছি। প্রতি মাসে আমরা ৮-৯ হাজার টাকা ইনকাম করতাম সেই পথটি বন্ধ হয়ে পড়েছে। সব চেয়ে বড় কথা হলো আমরা কাজ করতে পারছি না। বেকার হয়ে পড়ে আছি। কেউ কোনো সহযোগিতা করছে না। তাই সরকারের কাছে অনুরোধ তাঁত শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের আর্থিক অনুদান দেবেন।

সিরাজগঞ্জ তাঁত মালিক সমিতির সভাপতি ও বাংলাদেশ হ্যান্ডলুম ও পাওয়ার লুম অনার্স অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক হাজী বদি-উজ্জামান বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে কিছু কারখানা খোলা হয়েছে। তবে রঙের দাম পর্যাপ্ত পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় আমরা হিমশিম খাচ্ছি। জেলায় তিন লাখ তাঁত রয়েছে (হ্যান্ডলুম ও পাওয়ার লুম)। এখানকার উৎপাদিত শাড়ি-লুঙ্গী, গামছা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা হয়।

জেলার এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত আছে ৮-৯ লাখ মালিক, শ্রমিক, কর্মচারী। করোনাভাইরাসের কারণে জেলার কিছু তাঁত কারখানা খুললেও বাকি সব বন্ধ রয়েছে। বেকার হয়ে পড়েছে লাখ লাখ শ্রমিক। বৈশাখ থেকে শুরু করে দুটি ঈদ পর্যন্ত তাঁত শিল্পে ক্ষতি হয়েছে ৩০০ কোটি টাকা। এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে ব্যাংকের ঋণের সুদ মওকুপসহ প্রণোদনা ঘোষণার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানান তিনি।

সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক ড. ফারুক আহম্মেদ বলেন, বর্তমান তাঁত শিল্পের অবস্থার বিষয়টি উল্লেখ করে বরাদ্দ চেয়ে মন্ত্রণালয়ে পত্র প্রেরণ করা হয়েছে। বরাদ্দ হাতে পেলেই তাঁত মালিকদের মাঝে বিতরণ করা হবে।