বগুড়ার সরকারি মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল সমস্যায় জর্জরিত

ঢাকা, বুধবার, ২০ নভেম্বর ২০১৯ | ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

বগুড়ার সরকারি মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল সমস্যায় জর্জরিত

টি এম মামুন, বগুড়া ১০:২১ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ০৬, ২০১৯

print
বগুড়ার সরকারি মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল সমস্যায় জর্জরিত

বগুড়া সরকারি মোহাম্মদ আলী হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও বর্তমানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জনবলসহ নানা সমস্যার কারণে সঠিক মানের সেবা বিঘ্নিত হচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও কর্মরত অধিকাংশ চিকিৎসকদের ইচ্ছে থাকলেও চাহিদা মতো সেবা বঞ্চিত হচ্ছেন আগত রোগীরা।

অভিযোগ রয়েছে, অবস্থানগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি এ হাসপাতালে চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব এবং জনবল সংকট ও রক্ষণাবেক্ষণসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত। এরপরও রয়েছে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের অনিয়ম দুর্নীতি। জরুরি বিভাগে ২৪ ঘণ্টা সেবা প্রদান করা এ হাসপাতালে সার্জারি, গাইনি, অর্থোপেডিক্স এবং শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি হয়ে প্রথম দিনেই বেড (বিছানা) পাওয়া বেশ কঠিন। কমপক্ষে ২ থেকে ৩ দিন বেলকনি বা ওয়ার্ডের মেঝেতে থেকে থাকার পর বেড নিতে হয় তাদের। এক্ষেত্রে বেড পাইয়ে দিতে কিছু কর্মচারীর সহায়তায় দালালদের কিছু নগদ টাকা দিতে হয় রোগীর লোকজনকে। তবে তূলনামূলকভাবে তা শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চেয়ে অনেকটাই কম।

সূত্র দাবি করে, শতবছর আগে তৎকালীন প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী নবাব মোহাম্মদ আলী এ হাসপাতালটি স্থাপন করেন। প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই হাসপাতালটি সেবা দানে ছিল অপ্রতিরোধ্য। এরপর থেকেই হাসপাতাল ঘিরে চলে রাজনীতিবিদের নানা প্রতিশ্রুতি। পরে ১৯৯৮ সালে মেডিকেল কলেজের টিচিং হাসপাতাল হিসেবে ২৫০ বেডে উন্নীত করা হয় এ হাসপাতালকে। কিন্তু ২৫০ বেডের হাসপাতাল হলেও বিভিন্নভাবে প্রতিদিন এখানে প্রায় ১ থেকে দেড় হাজার রোগীকে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করেন।

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. শফিক আমিন কাজল জানান, স্বাস্থ্য সেবার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নবাব মোহাম্মদ আলী ১৯৬৪ সালে বগুড়া শহরের মাঝামাঝি শেরপুর রোডের ঠনঠনিয়া এলাকায় এটি নির্মাণ করা করেন। ৫০০ শয্যার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থাকা সত্ত্বেও যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুকূলে থাকায় সরকারি মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের গুরুত্ব বা কার্যকারিতা কমেনি এতটুকু। বরং অনেক ক্ষেত্রেই রোগীরা এখানে ভর্তি হতেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন।

সূত্র জানায়, ৫ বছর আগে ২০১৪ সালের ৮ নভেম্বর তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের হাতে ১৬টি সমস্যা চিহ্নিত করে একটি চাহিদাপত্র তুলে দেন ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট এ হাসপাতালের তৎকালীন সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. শেখ মো. আরবাব হোসেন। একই সঙ্গে বিষয়টি অতি জরুরি বলেও উল্লেখ করেন কর্মরত তত্ত্বাবধায়ক।

তাৎক্ষণিকভাবে মন্ত্রীও তার বক্তব্যে সমস্যাগুলো সমাধানের আশ্বাস দেন। কিন্তু ৫ বছর অতিবাহিত হলেও আজও সে অবস্থা থেকে উন্নতি ঘটাতে পারেনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা অধিদফতর। গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ছাড়াই চলছে চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম। সে সময় চাহিদাপত্রে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে একটি অ্যাম্বুলেন্স, মাইক্রোবাস (তত্ত্বাবধায়কের জন্য), ফোর ডি আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন, ইসিজি মেশিন, এনেসথেসিয়া মেশিন, সিসিইউ চালুকরণ, সিনিয়র কনসালটেন্টের পদ সৃজন (ডিওলজি, প্যাথলজি, এনেসথেসিওলজি, অর্থপেডিক্স ও কার্ডিওলজি), সিনিয়র কনসালটেন্টের পদ সৃজন (চর্ম, যৌন, শিশু, রক্ত, পরিসঞ্চালন, ক্লিনিক্যাল প্যাথলজি), আর.এস. (গাইনী এবং নাক কান গলা), ২০ জন ইনডোর মেডিকেল অফিসার, ১ জন স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মকর্তা, ১ জন স্টোর অফিসার, ১ ডিকেল রেকর্ড কিপার, ৫ জন টিকিট বিক্রয়কারী ও ২ জন পরিসঞ্চালন সহকারী প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করা ছিল। অথচ ৫ বছর পেরিয়ে গেলেও একটি মাত্র এ্যামবুলেন্স ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায়নি এই হাসপাতালে।

হাসপাতালে কর্মরত এক চিকিৎসক জানান, বর্তমান সময় ও পরিবেশে ডিজিটাল এ-ক্সরে মেশিনের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। সঠিক ভাবে রোগ বা অসুস্থতার কারণ নির্ণয় করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে ডিজিটাল এক্সরে মেশিন সংযুক্ত করতে হবে। তাছাড়া বগুড়া শহরে মানসম্মত বেশ কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ডিজিটাল এক্সরে মেশিনের মাধ্যমে রোগ নির্ণয় বা পরীক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে। তাই সরকারি এ হাসপাতালটির সুনাম ধরে রাখতে এবং সরকারের ভাবমূর্তি ঠিক রাখতে দ্রুত এখানে ডিজিটাল এ-ক্সরে মেশিন সংযোজন করা প্রয়োজন।

হাসপাতালের অপর এক জেষ্ঠ্য চিকিৎসক জানান, হাসপাতালে আগত রোগীদের জন্য পৃথক অবকাঠামো নির্মান করে শিশু, নারী ও পুরুষের জন্য একাধিক টিকিট কাউন্টার প্রয়োজন। বর্তমানে রোগীদের জন্য হাসপাতালের মূল কক্ষে টিকিট কাউন্টার চালু থাকায় চিকিৎসা সেবা কার্যক্রমের বিঘ্ন ঘটছে। তাই যটতা দ্রুত সম্ভব, টিকিট কাউন্টার হাসপাতাল কক্ষের বাইরে টিকিট কাউন্টার করা চিকিৎসকরা রোগীদের সেবা কার্যক্রমে আরও বেশি সুবিধা পাবেন।

বগুড়া সরকারি মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের তত্ত্বধায়ক ডা. এ.টি.এম. নুরুজ্জামান সঞ্চয় জানান, ২০১৪ সালে দেওয়া সেই চাহিদা আজও পূরণ হয়নি। বরং তখনকার দেওয়া চাহিদার সঙ্গে বর্তমানে জরুরিভাবে একটি ডিজিটাল এ-ক্সরে মেশিন, টিকিট কাউন্টারসহ সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। রোগী সেবার প্রয়োজনে বা মনোন্নয়নে দ্রুত অর্থোসার্জারি ও কার্ডিওলজি বিভাগ খুলতে হবে।