আরেক ‘জাহালম’ বাবলু শেখ

ঢাকা, বুধবার, ২০ নভেম্বর ২০১৯ | ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

আরেক ‘জাহালম’ বাবলু শেখ

১৭ বছর পর মামলা থেকে অব্যাহতি

নাটোর প্রতিনিধি ১০:২১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৭, ২০১৯

print
আরেক ‘জাহালম’ বাবলু শেখ

এবার আরেক ‘জাহালম’ কাণ্ড ঘটেছে নাটোরে। বিনাদোষে মাসের পর মাস জেল খেটেছেন বাবলু শেখ (৫৫)। আদালতে ঘুরেছেন ১৭ বছর ধরে। ২০০১ সালে একটি মারামারির ঘটনায় শ্রী বাবু নামের এক আসামির পরিবর্তে মামলার এই ঘানি টানতে হয়েছে বাবলু শেখকে। শেষমেশ বৃহস্পতিবার (১৭ অক্টোবর) নাটোরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহম্মদ সাইফুল ইসলাম সিদ্দিক নির্দোষ বাবলু শেখকে মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে রায় ঘোষণা করেন।

আলোচিত এই মামলার রায়ে দুই তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা এবং তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এছাড়া মামলার মূল আসামি আঁচলকোটের দেবদাসের ছেলে শ্রী বাবুকে গ্রেফতার ও সিংড়া থানার বিরুদ্ধে পুনরায় সাজা পরোয়ানা দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সকালে বিচারক প্রকাশ্য আদালতে রায় পড়ে শোনান। এ সময় আদালতে ভুক্তভোগী বাবলু শেখ, তার স্ত্রী-সন্তানরা ছাড়াও উৎসুক এলাকাবাসী ও গণমাধ্যমের কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। ২০০২ সালে তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায় পুলিশ। সেই থেকে শুরু হয় নির্দোষ দিনমজুর বাবলু শেখের পরিবারের দুর্বিষহ জীবন।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বাবলু শেখের ঘটনাকে বহুল আলোচিত ‘জজ মিয়া’ ও ‘জাহালম’ কাণ্ডের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। আদালত দায়ী পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। রায় কার্যকর করে তা আদালতকে জানাতে বলা হয়েছে। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিচারক রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, বাবলু শেখ বহুল আলোচিত ‘জজ মিয়া’ ও ‘জাহালম’-এর প্রতিচ্ছবি। তিনি বংশ পরম্পরায় একজন মুসলমান হলেও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা শ্রী বাবু হিসেবে তাকে গ্রেফতার করে দায়িত্বে চরম অবহেলা করেছেন। গ্রেফতারের পর থানায় নিয়ে গেলে সদর থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসামিকে পরীক্ষা না করেই চালান বইয়ে স্বাক্ষর করে অন্যায় করেছেন। যদিও আদালতের নথিতে রহস্যজনকভাবে ওই চালানের কপি সংযুক্ত নেই। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট আদালতও কোনো পদক্ষেপ নেননি।

বিচারক মোহম্মদ সাইফুল ইসলাম সিদ্দিক বলেন, অভিযোগপত্র দেওয়ার সময় তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মোমিনুল ইসলাম ও এসআই হেলেনা পারভিন ভুল আসামি গ্রেফতারের বিষয়টি যাচাই-বাছাই করেননি। পরবর্তী সময়ে নিযুক্ত আইনজীবীরা বিষয়টি জানলেও সে ব্যাপারে আদালতে প্রতিকার চেয়ে তথ্য-প্রমাণসহ দরখাস্ত করেননি। তারা ভুল নামেই বাবলু শেখের জামিন করেছেন। শুনানির সময় আইনজীবীদের পক্ষ থেকে তথ্যপ্রমাণ দাখিল করার কথা বলা হলেও সে মর্মে কাগজপত্র নথিতে পাওয়া যায়নি। আদালত একটি আদেশে ভুল ব্যক্তিকে গ্রেফতারের বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দিলেও এসআই হেলেনা পারভিন তদন্ত প্রতিবেদন এখনো আদালতে জমা দেননি। আদালতও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি। বিচার চলাকালে আসামিকে পরীক্ষা না করে তড়িঘড়ি করে রায় দেওয়ার সমালোচনা করেন এই বিচারক।

পর্যালোচনা শেষে আদালত বাবলু শেখকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেন। ক্ষতিগ্রস্ত বাবলু শেখ ইচ্ছা করলে এই রায়ের কপি নিয়ে ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য উচ্চ আদালতেও যেতে পারেন বলে আদালত মন্তব্য করেন। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য রায়ের কপি নাটোরের পুলিশ সুপার (এসপি), ডিআইজি রাজশাহী রেঞ্জ ও আইজিপি বরাবর পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

রায় ঘোষণার পর বাবলু শেখ সাংবাদিকদের বলেন, আমি একজন দিনমজুর। অথচ আমাকে ভুলের খেসারত টানতে হয়েছে ১৮ বছর। কয়েক মাস এ মামলায় সাজাও খেটেছি। এ ধরনের ঘটনা যেন আর কারও জীবনে না হয়, সে ব্যাপারে সবাইকে সজাগ থাকতে বলেন তিনি।

মামলার বিবরণে জানা গেছে, ২০০১ সালের ১৫ এপ্রিল নাটোর সদর উপজেলার গাঙ্গইল গ্রামে একটি মারামারির ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনায় কাজী আবদুল মালেক বাদী হয়ে শ্রী বাবুসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। সেই মামলায় ৩ নম্বর আসামি ছিলেন শ্রী বাবু। তৎকালীন সদর থানার উপ-পরিদর্শক মমিনুল ইসলাম এবং হেলেনা পারভীন শ্রী বাবুকে অভিযুক্ত করে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। কিন্তু ২০০২ সালের ৭ নভেম্বর শ্রী বাবুর পরিবর্তে সিংড়া উপজেলার আঁচলকোট গ্রামের বাবলু শেখকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠায় পুলিশ। মামলাটি বিচারের জন্য আদালতে এলে যুক্তিতর্ক শেষে ২০১৬ সালের ২৩ জুন মুখ্য বিচারিক হাকিম মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী বাবুর বিরুদ্ধে দুই বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। ওই দিন কাঠগড়া থেকে বাবলু শেখকে কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে তিনি একই বছরের ১৬ আগস্ট আপিলের মাধ্যমে জামিনে বের হন। এ বিষয়ে নাটোর দায়রা আদালতে আপিল করা হলে নাটোরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ সাইফুর রহমান সিদ্দিকের আদালতে মামলাটি বিচারের জন্য পাঠানো হয়। মামলার সাক্ষ্য প্রমাণ গ্রহণ শেষে বিচারক আজ (বৃহস্পতিবার) বেলা ১১টার দিকে বাবলু শেখকে মামলা থেকে মুক্তির নির্দেশ দেন।

বাবলু শেখের বর্তমান আইনজীবী অ্যাডভোকেট শামীম উদ্দীন জানান, মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে যে আদেশ রায় এসেছে তাতে অবশেষে বাবলু শেখের ভোগান্তির অবসান ঘটল।

জেলা প্রশাসক মো. শাহরিয়াজ জানান, বাবলু শেখের পাশে দাঁড়াবে জেলা প্রশাসন। তাকে সহায়তা করা হবে। পুলিশ সুপার লিটন কুমার সাহা বলেন, রায়ের কপি পাওয়ার পর অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে।