সজলকে অব্যাহতি, ওসিকে শোকজ

ঢাকা, বুধবার, ১৯ জুন ২০১৯ | ৫ আষাঢ় ১৪২৬

রাজশাহীতে বিনাদোষে কারাভোগ

সজলকে অব্যাহতি, ওসিকে শোকজ

রাজশাহী ব্যুরো ১২:৪২ অপরাহ্ণ, জুন ১৩, ২০১৯

print
সজলকে অব্যাহতি, ওসিকে শোকজ

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় রাজশাহীতে ‘বড় ভাইয়ের বদলে’ গ্রেফতার ডাব বিক্রেতা সজল মিয়াকে (৩৪) অব্যাহতি দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে অন্যের বদলে সজলকে কেন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া আসামি হিসেবে গ্রেফতার করা হয়েছিল তার জবাব দিতে রাজশাহীর শাহমখদুম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এসএম মাসুদ পারভেজকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

বুধবার বেলা ৩টার দিকে রাজশাহীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের (প্রথম) বিচারক মো. মনসুর আলম এ আদেশ দেন। আদেশ অনুযায়ী, ওসি মাসুদ পারভেজকে সাত দিনের মধ্যে আদালতে সশরীরে হাজির হয়ে জবাব দিতে হবে।

জানা যায়, সজলের বাড়ি নগরীর ছোটবনগ্রাম পশ্চিমপাড়া। বাবার নাম তোফাজ উদ্দিন। সজলের বড় ভাইয়ের নাম সেলিম ওরফে ফজল। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের একটি মামলায় ২০০৯ সালে ফজলের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। রায় ঘোষণার আগে থেকেই তিনি পলাতক। গত ৩০ এপ্রিল শাহমখদুম থানা পুলিশ সজলকে গ্রেফতার করে। এরপর ফজল হিসেবে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। সজলকে যখন আদালতে আনা হয় তখন তার নাম ফজল বলেই পুলিশের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

দুজন সাক্ষী এ ব্যাপারে এফিডেভিট করে দেওয়ায় তাকে সেদিন কারাগারে পাঠানো হয়। কিন্তু গত ২৬ মে সজল আসামি নন দাবি করে আইনজীবীর মাধ্যমে নিজের মুক্তির জন্য আবেদন করেন। এরপর গত মঙ্গলবার শুনানির জন্য দিন ধার্য করা হয়। এ দিন আদালত না বসায় গতকাল শুনানি হয়। শুনানিতে প্রায় দেড় মাস কারাভোগের পর অব্যাহতি পান সজল। আদালতের আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০১ সালে আসামি ফজলের বয়স ছিল ২৭ বছর। বর্তমানে তার বয়স হবে ৪৫ বছর। কিন্তু সজলের জন্ম নিবন্ধন অনুযায়ী তার বর্তমান বয়স ৩৫ বছর। এ ছাড়া আসামি ফজল মামলার রায়ের আগে একবার গ্রেফতার হয়েছিলেন। তখন তার শারীরিক গঠন রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে সংরক্ষণ করা হয়। এখন আবার পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, গ্রেফতার সজলের সঙ্গে সে বর্ণনার উল্লেখযোগ্য তারতম্য রয়েছে। পুলিশ ভুল করে তাকে ফজল ভেবে গ্রেফতার করেছে। এদিন সজলের ছয় ভাই-বোন আদালতে এফিডেভিট করে জানান, দ-প্রাপ্ত আসামি ফজল দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ। তারা ফজলের কোনো খোঁজ জানেন না। তিনি বেঁচে আছেন কিনা তারা সেটিও জানেন না। আর ফজল হিসেবে যাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তিনি সবার ছোট ভাই সজল। এসব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই সজলকে দায় হতে অব্যাহতি দিয়েছেন আদালত।

তবে আদালতের আদেশের পর সজলকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আদালত থেকে আদেশের অনুলিপি সেখানে পাঠানো হবে। এরপর কারা কর্তৃপক্ষ যাচাই করে দেখবে তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা আছে কিনা। তা না থাকলে সজলকে মুক্তি দেওয়া হবে। এ দিন আদালত থেকে সজল হাসিমুখেই কারাগারে গেছেন। তবে পুলিশ তার সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীদের কথা বলতে দেয়নি।

অবশ্য আগের দিন শুনানির জন্য আদালতে আনা হলে হাজতে ঢোকানোর সময় সজল সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। ওই দিন তিনি বলেন, আমি কোনো দোষ করিনি। আমি আসামি না। তারপরও আমি কয়েদি। সজল বলেন, পুলিশ আমাকে বিনা দোষে জেলে পাঠিয়েছে। জেলে কয়েদি হিসেবে কাঠমিস্ত্রির কাজ করতে হয়। বিনা দোষে এসব সহ্য করতে হচ্ছে।

সজলের আইনজীবী মোহন কুমার সাহা বলেন, অপরাধী না হয়েও সজল কয়েদি হিসেবে সাজা ভোগ করেছেন। তার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে। ওসির শোকজের জবাব পাওয়ার পর আদালত এ ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত দেবেন, সেটির জন্য আমরা অপেক্ষা করব। তারপর প্রয়োজনে মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে আমরা ভুক্তভোগী সজলের জন্য ক্ষতিপূরণের দাবি করে আদালতে আবেদন করব।

এদিকে বিনা দোষে গ্রেফতার করায় শাহমখদুম থানার ওসি এসএম মাসুদ পারভেজের শাস্তি দাবি করেছেন সজলের ভাই মো. বাবু। তিনি বলেন, সজলকে গ্রেফতারের পর আমরা অনেক বুঝিয়েছি। ওসি কোনো কথা শোনেননি। ছেড়ে দেওয়ার আশ্বাসে আমাদের সন্ধ্যা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত বসিয়ে রেখেছিলেন থানায়। তারপর সকালে আসতে বলেন। আমরা আবার ভোর ৬টায় থানায় যাই। দুপুর পর্যন্ত বসিয়ে রেখে সজলকে আদালতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। দেড় মাস ধরে আমরা হয়রানি হলাম। তাই ওসির শাস্তি চাই।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোজাফফর হোসেন বলেন, নির্দোষ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানোর জন্য ওসির শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু এখানে দুজন সাক্ষী ওসিকে এফিডেভিট করে দিয়ে বলেছিলেন, এটাই আসামি। তাই ওসির জবাবের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তারপর আদালতই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেবেন।