শি-টু হি-টু

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮ | ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

শি-টু হি-টু

জেসমিন চৌধুরী ৯:১৫ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ০১, ২০১৮

print
শি-টু হি-টু

নিজের ওপর যৌন নির্যাতন বিষয়ে মুখ খুলেছেন বাংলাদেশের মেয়ে মিস আয়ারল্যান্ড মাকসুদা প্রিয়তি। যেমন তেমন মুখ খোলা নয়, একেবারে হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়েছেন। প্রথমে ফেসবুক স্ট্যাটাসে সংক্ষেপে লিখেছেন রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের হাতে যৌন হয়রানির কথা। তারপর আবার ফেসবুক লাইভে এসে বলেছেন তাকে ধর্ষণ করার চেষ্টা করেছিলেন প্রভাবশালী এ ব্যক্তি। ঘটনার বিষদ বর্ণনাও দিয়েছেন প্রিয়তি।

প্রিয়তির স্ট্যাটাস পড়ে এবং লাইভ দেখে আমি ভীষণ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলাম, কান্নায় ভেঙে পড়েছিলাম। গত বছর একজন ডাক্তারের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের একটা কোর্ট কেইসে দোভাষীর কাজ করতে গিয়ে ঠিক এভাবেই কান্নায় ভেঙে পড়েছিলাম আমি। সবাই ভেবেছিল নির্যাতিত মেয়েটার কষ্টে কাঁদছি। না, ওই মেয়েটার জন্য মোটেই কষ্ট হয়নি আমার। তার কেইসটা কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে, একটা সুবিচার পাওয়ার আশা আছে, তার জন্য আমি কাঁদব কেন? কাল রাতেও আমি প্রিয়তির জন্য নয়, বরং নিজের জন্যই কাঁদছিলাম। প্রিয়তির জন্য কোনো সমবেদনা নেই আমার কাছে, আছে শুধু ঈর্ষা। এ মেয়েটা যে সাহস সঞ্চয় করতে পেরেছে তা আমি করতে পারিনি বলে ওর প্রতি ঈর্ষা এবং নিজের প্রতি ঘৃণা থেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েছিলাম আমি।

প্রিয়তির মতো আমিও দেশের বাইরে থাকি। দেশের বাইরে থাকা মানে দেশের আইন আদালত এবং প্রভাবশালী গুণ্ডাপাণ্ডাদের ক্ষমতার আওতার বাইরে থাকা। এ সুবিধাটুকু আমি নিজেও ভোগ করি, দেশের বিভিন্ন ইস্যুতে নির্ভয়ে লেখালেখি করি। কিন্তু যৌন নির্যাতনের বেলায় এসে মানচিত্রের দূরত্বও আমাকে যথেষ্ট সাহস জোগাতে পারে না কারণ দেশের বাইরে থাকলেই পারিবারিক সম্পর্কের আওতার বাইরে যাওয়া যায় না।

আমি শৈশবে যাদের হাতে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলাম তাদের মধ্যে একজন ছিলেন আমার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। তার এ অসুস্থ মানসিকতার কথা অনেকেই জানতেন, কিন্তু পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এটা গোপন রাখার একটা প্রচেষ্টা দেখেছি সবসময়।

আমরা অনেক কিছু নিয়েই পরিবারের সদস্যদের সমালোচনা করে থাকি। কোন মানুষটা কৃপণ, কোন মানুষটা স্বার্থপর, কোন মানুষটার মধ্যে সামাজিক সৌজন্যের অভাব আছে, কোন মেয়েটা কারও সঙ্গে সুন্দর করে কথা বলে না, কোন মেয়েটা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছে, কোন মেয়েটা পরকীয়া করল-এগুলো রসিয়ে রসিয়ে আলাপ করার বিষয়। কিন্তু পরিবারের ভেতরে যখন একজন যৌন নির্যাতক থাকে তার কথা জেনেও সবাই না জানার ভান করে। তাকে নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা হয় না। সে হলো শাক দিয়ে যত্ন করে ঢেকে রাখার এক টুকরা আদরের পারিবারিক মাছ। সবার ওপরে একটা পরোক্ষ চাপ থাকে এগুলো গোপন রাখার। চাপটা কে দেয়? কেন দেয়? কীভাবে দেয়? এগুলো আমরা জানি না। আমরা শুধু চাপটা অনুভব করি। কোথাও দাওয়াত খেতে গিয়ে অথবা কোনো বিয়েবাড়িতে প্রায়ই দেখা হয়ে যেত সেই ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের সঙ্গে। আমি তার চোখে চোখ রেখে ঘৃণাটুকু স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দিতাম, তিনিও তাড়াহুড়ো করে আমার দৃষ্টি সীমানার বাইরে সরে যেতেন। যখন প্রশ্ন তুলেছি, ‘কেন একে দাওয়াত দেওয়া হয়? কেন এ লোককে সবাই মিলে বর্জন করছি না? তখন আমাকে বলা হয়েছে ‘এগুলো বাদ দাও। ও হজ করে এসেছে, একজন হাজির কথা এসব বলতে নেই।’

কাজেই বিদেশের নিরাপত্তায় বসে মুখ খুলতে পারলেও আমি প্রিয়তির মতো হাটে হাঁড়ি ভাঙতে পারি না। নিজের জন্য সহানুভূতি, ঘৃণা আর রাগ মিশ্রিত একটা অনুভূতি আমাকে এতটা বিবশ করে রাখে যে আমি প্রিয়তিকে সেল্যুট দিতেও ভুলে যাই। এ গেল আমার নিজের কথা। পরিচয় দিতে না পারলেও আমি তো তবু ঘটনাগুলোর কথা বলি, লিখি। কিন্তু যেসব মানুষদের জিহ্বায় এবং ঠোঁটে চিরদিনের জন্য সুপারগ্লু লাগিয়ে রাখা হয়েছে, যারা নির্যাতকের পরিচয় দেওয়া তো দূরের কথা, ঘটনাগুলোর কথাও খোলাখুলি বলতে পারে না, আমি তাদের জন্যও কাঁদি। সম্প্রতি ফেসবুক ইনবক্সে পাওয়া দুটো গল্পের কথা বলতে চাই।

একটা মেয়ে লিখেছে নিজের আপন ছোট মামার হাতে ১০ বছর বয়সে যৌন নির্যাতনের কথা। তার মা এটা জেনেও চেপে গেছেন, তাকেও চেপে যেতে বাধ্য করেছেন। মেয়েটা তার মাকে ভীষণ ভালোবাসে কিন্তু নিজের ভাইয়ের এ কদর্য কীর্তিকে তার ক্ষমা করে দেওয়াটা সে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারছে না। এ ঘটনার পর যখন তার মা তাকে গোসল করিয়ে দিতেন তার ভয় হতো হয়তো ছোট মামাই মায়ের মুখোশ পরে তার কাপড় খুলছে, তার গায়ে হাত দিচ্ছে। হঠাৎ মুখোশ খুলে যাবে আর ছোট মামার চেহারা বেরিয়ে আসবে। বাবা যখন আদর করতেন তখনো সে ভয়ে কুঁকড়ে যেত এ ভেবে যে হয়তো বাবাও তার সঙ্গে ছোট মামার মতো আচরণ করবেন।

একটাবার ভেবে দেখুন এ মেয়েটার কথা। মাত্র ১০ বছর বয়স, তার শৈশবের সব আনন্দ, নির্ভরতা, চাঞ্চল্য কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। তার যৌন নির্যাতন হয়তো ঘটেছে একবার কিন্তু মানসিক নির্যাতন চলবে সারা জীবন ধরে। মায়ের আপন ভাইয়ের সঙ্গে ঘুরে ফিরে তার দেখা হতেই থাকবে। তাকে সামাজিক সৌজন্য রক্ষা করে চলতে হবে এ লোকের সঙ্গে। এ মনস্তাত্ত্বিক পীড়ার মাত্রাটা কল্পনা করতে পারেন?

এখানেই শেষ নয়। মেয়েটা এখন নিজে মা হয়েছে, তার ছোট ভাইটা যখন তার মেয়েদের আদর করে মেয়েটা তা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারে না। সে ভাবে হয়তো তার ভাইও তার মেয়েদের সঙ্গে একই আচরণ করবে যেমনটা তার ছোট মামা তার সঙ্গে করেছিল। ভাইয়ের প্রতি এ অনাস্থাও মেয়েটাকে কষ্ট দেয়, প্রচ- অপরাধবোধে ভোগে মেয়েটা। এ মেয়েটার হাজার পরতের কষ্ট পিয়াজকেও হার মানায়।

আরেকটা অপরিচিত ভাই লিখেছে বড় ভাইয়ের বন্ধুর হাতে নির্যাতিত হওয়ার কথা। ছেলেটা আমাকে খুব বেশি বিবরণ দেয়নি। হয়ত ভেবেছে সবকিছু খুলে বললে আমি ধরে নেব বিকৃত আনন্দ পাওয়ার জন্য সে বানিয়ে বানিয়ে এসব বলছে। ছেলেদের তো এসব কথাও ভাবতে হয়। যৌন নির্যাতনের কথা খুব প্রিয় একটা বন্ধুকেও খুলে বলা যায় না। মেয়েদের বললে ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা থেকে যায়। তার বড় ভাইয়ের বন্ধু জোর করে তাকে দিয়ে কিছু ঘৃণ্য কাজ করাতেন, তারপর চকলেট দিয়ে বলতেন কাউকে না বলতে। ভয়ে নয়, লজ্জায় সংকোচে ছেলেটা কখনো কাউকে কিছু বলতে পারেনি। আজো সেই লোকের সঙ্গে তার দেখা হয়, মনের ভেতর কষ্ট আর অপমানের ঝড় বয়ে যায়, তবু তাকে চুপ থাকতে হয়।

আমার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছিল। আমি এদের দুজনের একজনকেও চিনি না, কখনো দেখিনি, তবু এদের জন্য কষ্টে আমার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরেছে। কেন একটা মানুষকে এত কষ্ট পেতে হবে? কেন? উত্তরটা সহজ-আমরা এমন এক সমাজে জন্ম নিয়েছি যেখানে আমাদের কষ্টের চেয়ে, আমাদের আত্মার অবমাননার চেয়ে একজন নির্যাতকের সামাজিক মর্যাদার মূল্য অনেক বেশি।

তবে একটু আশার কথা হচ্ছে আমাদের গুরুজনরা আমাদের চুপ থাকতে শিখিয়েছিলেন কিন্তু আমাদের সন্তানরা আমাদের মুখ খুলতে উৎসাহ দিচ্ছে। তার মানে ধীর লয়ে হলেও সময় পাল্টাচ্ছে। আমার ছেলে আমাকে বলেছে, ‘মা তোমাকে যথেষ্ট রাগান্বিত মনে হয় না আমার কাছে। আমি অবাক হয়ে ভাবি তুমি কেন রাগে ফুঁসে উঠছ না? কেন তুমি আরও অনেক রেগে গিয়ে এ সমাজকে, এ ব্যবস্থাকে পুরোপুরি বর্জন করতে পারো না? কেন তুমি সেজেগুজে দাওয়াত খেতে যাও, হাসিমুখে কথা বলো, সেসব মানুষদের সঙ্গে যারা তোমাকে নীরব থাকতে বাধ্য করেছে? এরা সবাই মিলেই তো সমাজ, তাই না? সব নাম বলে দাও। যদি সবাই তোমাকে ছেড়ে যায়, আমরা আছি এবং থাকব।’

একটা ছোট ঘটনা দিয়ে শেষ করি। একবার আমার এক পুরুষবন্ধু আমার মেয়েকে কোলে নিতে চেয়েছিলেন। ওর বয়স তখন পাঁচ হবে। মেয়ে বলেছিল, ‘আমি মা ছাড়া কারও কোলে বসি না’। উনি অবাক হয়ে বলেছিলেন, ‘মেয়েকে এ কেমন ট্রেনিং দিয়েছেন?’

যে পৃথিবীতে নিজের ছোট মামা কাপড় খুলে যৌন নির্যাতন করতে পারে, সেই পৃথিবীতে শিশুদের ঠিক এরকম ট্রেনিং-ই দিতে হবে। আর মা’দের বলছি, যদি ছেলেমেয়েদের আগলে রাখতে না পারেন, যদি তাদের যৌন নির্যাতককেই আগলে রাখেন, তার সামাজিক মর্যাদা বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তাহলে এ জীবন রেখে লাভ কী? বাংলাদেশে অনেক বড় বড় নদী আছে। তার একটায় ঝাঁপ দিন। হয় মরুন, অথবা পাপ ধুয়ে কিছুটা মানুষ হয়ে তীরে ফিরে আসুন।

জেসমিন চৌধুরী : কলাম লেখক ও অনুবাদক।
jcs_chy@yahoo.com