দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮ | ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ

ওসমান গনি ৯:১৩ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ০১, ২০১৮

print
দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের কিছু পরে হেনরি কিসিঞ্জার একবার বলেছিলেন বাংলাদেশ হলো ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’। যাই দাও না কেন ঝুড়ির তলা না থাকার কারণে সেখানে কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। বর্তমান বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ তো তলাবিহীন ঝুড়ি নয়-ই, উল্টো দক্ষিণ এশিয়ায় উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্ব এখন অবাক বিস্ময়ে চেয়ে থাকে বাংলাদেশের দিকে।

বিগত ১০ বছরে বাংলাদেশ উন্নয়নে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। এই লেখায় সেই বড় বড় সাফল্যের একটা ছোট-খাটো পোস্টমর্টেম করছি। বিশ্বব্যাংক ও এডিবির সাহায্য ছাড়া সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ। দৃশ্যমান হয়েছে স্বপ্নের পদ্মা সেতু। শুরুতে সবাই বলাবলি করেছিল নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতু তৈরি সম্ভব হবে না। কিন্তু সম্ভাবনার বাংলাদেশে এখন প্রায় সবকিছু সম্ভব। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকলে আগামী বছরের মধ্যে পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হবে। উন্নয়নে বাংলাদেশের মাইলফলক হবে পদ্মা সেতু। পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হলে দৌলতদিয়ায় তৈরি হবে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু। এ ছাড়া কয়েকদিন আগে উদ্বোধন হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট।

এত বড় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, চীন, জাপানসহ বিশ্বের আর কোথাও নেই এটা ভাবতেই গর্বে মাথা উঁচু হয়ে যায়। ৩০০ কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার কাজও শুরু হয়েছে।

কয়েক মাস আগে বাংলাদেশ মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ পাঠিয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ কখনো ভাবেনি বাংলাদেশ মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠাতে পারবে। অন্য দেশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মহাকাশে আমরাও আমাদের অস্তিত্ব জানান দিয়েছি, এটা ভাবলেই ভালো লাগে। জ্যাম কমানোর জন্য বিশ্বের বড় বড় শহরের মতো ঢাকা শহরের বুকেও তৈরি হচ্ছে মেট্রোরেল। বাংলাদেশ দুটি সাবমেরিন কিনেছে কিছু দিন আগে। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তিতে আমরা পেয়েছি প্রায় আরেকটি বাংলাদেশের সমান সমুদ্রসীমা। তা ছাড়া শতবর্ষী ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় সমুদ্র সম্পদ আহরণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এখন সাবমেরিন দুটি সগৌরবে ঘুরে বেড়ায় বঙ্গোপসাগরে অতল জলে। বাংলাদেশের অর্জন সমুদ্রের অতল জল থেকে মহাকাশের ঊধ্বর্সীমা পর্যন্ত। এসব দূরদর্শীর পরিকল্পনা এগিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশকে।

ছিটমহল সমস্যা ছিল বাংলাদেশের গলার কাঁটা। গত তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে হাজার হাজার মানুষ ছিটমহলে নিষ্পেষিত হয়ে আসছিল। সেসব মানুষের সবকিছুই ছিল কিন্তু বাস্তবে কিছুই ছিল না। মুখ থুবড়ে পড়ে ছিল মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি। ছিটমহলবাসীর একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন মলিন হতে শুরু করেছিল। কিন্তু এখন ছিটমহল সমস্যার সমাধান হয়েছে। মানুষের মুখে হাসি ফুটেছে। বাংলাদেশের মানচিত্র নতুন করে তৈরি হচ্ছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ চলমান। যেখান থেকে ২০২৪ সাল থেকে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে। রাশিয়ার সহায়তায় রূপপুরে আরও ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রাথমিক কাজ শেষ হওয়ার পথে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব রোধে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে যার মধ্যে ১৭টি সোলার পার্ক, ২টি উইন্ড পাওয়ার প্লান্ট। বতর্মানে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ৫১৮ মেগাওয়াট, সোলার হোম সিস্টেম ২১৮.৪৮ মেগাওয়াট, বায়ুচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র ২.৯০ মেগাওয়াট। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব রোধে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের রোল মডেল। বিদ্যুৎ গ্রাহকসংখ্যা ১ কোটি ৮ লাখ থেকে ২ কোটি ৯৯ লাখ হয়েছে। এখন দেশের ৯০ শতাংশ জনগোষ্ঠী বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে। সবমিলিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৪ হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট থেকে বেড়ে ১৮ হাজার ৭৫৩ মেগাওয়াট হয়েছে।

গ্যাস উত্তোলন বৃদ্ধি পেয়েছে। সদ্য আবিষ্কৃত ভোলা গ্যাস ক্ষেত্রসহ দেশের মোট গ্যাসক্ষেত্রের সংখ্যা ২৭টি। যার মধ্যে থেকে ২০টি থেকে গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। বর্তমানে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ক্ষমতা ২ হাজার ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট।

দেশে মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি ও অ্যাভিয়েশন ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। যা বাংলাদেশের জন্য একটি সুদূরপ্রসারী ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় দুটি। মেডিকেল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। নতুন করে আর কয়েকটি সরকারি মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা হয়েছে। দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। দিন দিন জাতীয় প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পাচ্ছে। সবকিছু স্বপ্নের মতো হয়। সেই বাংলাদেশ, এই বাংলাদেশ। সবকিছু পিছিয়ে উন্নয়নের মহাসড়কে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের সবার প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশ। নিজস্ব অর্থায়নে স্বপ্নের পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, মেট্রোরেল, রামপাল বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, পায়রা সমুদ্রবন্দর, মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ও দোহাজারী-কক্সবাজার-গুনদুম রেললাইনের মতো মেগা প্রকল্পসহ বিশাল উন্নয়ন কর্মকা- বাস্তবায়ন করছে সরকার। রাজধানীর দৃশ্যপট বদলে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে গ্রাম। বিশ্বসভায় বাংলাদেশ এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক মহলে গুরুত্ব বেড়েছে বাংলাদেশের। সম্প্রতি বছরগুলোতে অভিবাসন, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য, সামুদ্রিক অর্থনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ জোরালো। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় শেখ হাসিনার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য তাকে মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক খালিজ টাইমস, ‘নিউ স্টার অব দ্য ইস্ট’ বা আগের নতুন তারকা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

ভারত ও মিয়ানমারের বিপক্ষে সমুদ্র বিজয়, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার, পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বে দ্বিতীয় হওয়া, জাতির জনকের ৭ মার্চের ভাষণের বিশ্ব স্বীকৃতি, উদ্যোক্তাশূন্য বাংলাদেশে এখন লাখো উদ্যোক্তা তৈরি হওয়াসহ সামগ্রিক আমদানি ও রপ্তানিতে দেশ এগিয়ে চলছে।

এক সময়কার আমদানিনির্ভর বাংলাদেশ এখন আমদানির বিকল্প পণ্যের শিল্পকারখানা গড়ে তুলেছে। খাদ্য উৎপাদনে বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলোর কাতারে দেশের নাম লিখিয়েছেন আমাদের দেশের কৃষকরা। সবকিছুকে পিছিয়ে উঠে রোহিঙ্গা সংকট, যা একটি বৈশ্বিক রূপ নিয়ে বাংলাদেশকে এক অভাবনীয় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সীমান্ত খুলে দিয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার মাধ্যমে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছে বাংলাদেশ, মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত দেখিয়েছে।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে থাকলেও রাজনীতিতে বিরাজ করছে অস্বস্তি। এ অস্বস্তির বাতাবরণ দূর না করায় সরকারই সমালোচনার মুখোমুখি হচ্ছে। চতুর্থ বছরে সরকারকে মোকাবেলা করতে না হলেও বেশ কিছু ঘটনা ও পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারকে বেগ পেতে হয়েছে। নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে না পারায় সমালোচনার শিকার হতে হয়।

চতুর্থ বছর সরকারের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ছিল রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলা করা। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এ বিষয়েও সফলতা দেখায় সরকার। প্রাথমিকভাবে আশ্রয় ও খাদ্যের ব্যবস্থা হলেও তাদের ফেরত পাঠানোর চ্যালেঞ্জ এখনো সরকার কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তবে শুরু থেকে সরকার রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করে। শেখ হাসিনার কূটনৈতিক সাফল্যে রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রায় পুরো বিশ্ব আজ বাংলাদেশের পক্ষে।

ওসমান গনি : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
ganipress@yahoo.com