অতঃপর জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮ | ২৯ কার্তিক ১৪২৫

অতঃপর জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল

কবীর চৌধুরী তন্ময় ৯:৩০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৩০, ২০১৮

print
অতঃপর জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল

বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী ও ধর্মভিত্তিক দল জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন হাইকোর্ট অবৈধ ঘোষণা করে নির্বাচনের ‘অযোগ্য’ ঘোষণা করার পাঁচ বছর পর নিবন্ধন বাতিলের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে নির্বাচন কমিশন। এ খবর জামায়াত-শিবিরের জন্য কষ্টের এবং হতাশার। কারণ, দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী আর দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লা মার্কা নিয়ে বাংলাদেশে কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না।

অন্যদিকে, জামায়াত-শিবির বিরোধী মহল এটাকে ইতিবাচক হিসেবে মনে করলেও আমি দেখছি একটু অন্যভাবে। কারণ, জামায়াতে ইসলামী দল হিসেবে শুধু নির্বাচনের অযোগ্যই নয় কিংবা দলের নিবন্ধন বাতিলই নয়, দল হিসেবে নিষিদ্ধ হয়েও বারবার ফিরে এসেছে নিজেদের আপন নামে। জন্মলগ্ন থেকে বারবার নিষিদ্ধের সেই ‘লাল ক্রস’ থেকে তারা উঠে এসেছে এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের রাজনীতি ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সমানভাবে আজও করে যাচ্ছে। জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করেই আমাদের কাজ শেষ বলে মনে করলে হবে না। আমি আগেও বলেছি, ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে তিনবার নিষিদ্ধ হয় জামায়াত। এর মধ্যে ১৯৫৯ ও ১৯৬৪ সালে তৎকালীন পাকিস্তানে এবং ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান প্রতিষ্ঠার পর অন্য সব ধর্মভিত্তিক দলের সঙ্গে জামায়াতও নিষিদ্ধ হয়। আর বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার পরে মেজর জিয়াউর রহমানের সরকারের সময় সাত বছর পর ১৯৭৯ সালের ২৫ মে আবার প্রকাশ্য রাজনীতি করার সুযোগ পায় জামায়াত। তাই বলছি, সামনেও যে আবার ফিরে আসবে না-এমন গ্যারান্টি বা নিশ্চিত মনে করে বসে থাকলেও চলবে না।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে জামায়াতকে নিবন্ধন দেওয়ার সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই রিটের জারি করা রুলের ওপর শুনানি শেষে হাইকোর্ট ২০১৩ সালের ১ আগস্ট জামায়াতের নিবন্ধন ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে। আর তখন থেকেই জামায়াতে ইসলামী ভিন্ন নামে নিজেদের সংগঠিত করতে থাকে। তখন বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) নাম দিয়ে পুরনো বোতলে নতুন লেবেল লাগানোর মতোই তারা তাদের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড  ভেতরে ভেতরে অব্যাহত রেখেছিল। শুধু তাই নয়, জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ হতে পারে-এমন আশঙ্কা থেকে তখন ‘বিডিপি’ নামের নিজেদের কীভাবে সংঘটিত করতে হবে তার একটি রূপরেখাও তৈরি করেছে। আবার সিনিয়র নেতাদের নেতৃত্বে ‘জামায়াতে ইসলামী’কে তাদের ফাদার সংগঠন হিসেবেও রাখার পরিকল্পনা গ্রহণ করে।
আরেকটা ব্যাপার, আপনি আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপির রাজনীতিতে পাবেন না যা জামায়াত-শিবির করে থাকে। তারা দলের প্রতি আদর্শিক বা অনুগত মনস্তাত্ত্বিক মনোভাব প্রভাবিত করতে মাসিক চাঁদা, চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে বেতন বা লাভের ১০% থেকে ১৫% দলীয় ফান্ডের নামে বায়তুল মাল সংগ্রহ করে থাকে। আমি মনে করি, শেখ হাসিনার একক চেষ্টায় আজ জামায়াতে ইসলামীর মতোন ভণ্ড ও সন্ত্রাসী সংগঠনের নিবন্ধন বাতিল হয়েছে, প্রজ্ঞাপনও প্রকাশিত হয়েছে। আর এতেই আমাদের আনন্দে আত্মহারা হলে চলবে না। বাকি কাজটুকু আমাদেরই করতে হবে। স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে জামায়াতের ধর্ম ব্যবসা এবং সন্ত্রাসী সব কর্মকাণ্ডসহ চিরতরে ধ্বংস করতে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। চারপাশ থেকে জামায়াতকে চেপে ধরতে হবে।
জামায়াত নিষিদ্ধে আইন প্রণয়ন ছাড়াও সরকার চাইলে নির্বাহী আদেশেই জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে পারে। কারণ, ট্রাইব্যুনালের একাধিক রায়ে জামায়াতকে ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘যুদ্ধাপরাধী সংগঠন’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তাই সরকার সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এখন চাইলেই জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে পারবে।
আমি মনে করি, সরকার চাইলে যে কোনো সময় জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করতে পারবে। কিন্তু দলীয় ব্যক্তিদের কী করবে? তারা বিভিন্ন দলে প্রবেশ করবে। আর যেহেতু বিএনপির আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং দলীয় জোটে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়ও অধিষ্ঠিত হয়েছে, তাদের প্রথম পছন্দও বিএনপি হতে পারে। যদিও বিএনপি-জামায়াত একই মায়ের দুটি সন্তান বলে নিজেরাও স্বীকার করে। আবার নতুন নামেও আসতে পারে। প্রকাশ্যে একটা আর গোপনে আরেকটা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারবে।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ইতোমধ্যেই প্রকাশিত বা সমালোচিত হয়েছে, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন জামায়াতের পক্ষে তথাকথিত ঐক্যফ্রন্টে প্রতিনিধিত্ব করছে। সে কবে, কখন ছাত্রশিবিরের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে নিজের আনুগত্য প্রকাশ করেছে-এটিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী নিবন্ধন ছাড়াও যে ভেতরে ভেতরে নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে-এটিও এখন আর গোপন নয়।
দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারলেও বিভিন্ন দলে ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত করে ওই দলের প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে পারবে বা এ ধরনের পরিকল্পনা নিয়েই এগুচ্ছে। জামায়াত-শিবির কতটা ভণ্ড এবং ধর্ম ব্যবসায়ী-এটা অতি গভীরে প্রবেশ না করলে বুঝে ওঠা কঠিন। দলীয়ভাবে নির্বাচনের অযোগ্য করা হলেও তাদের ধর্ম ব্যবসা ধ্বংস করতে হলে সমাজের তৃণমূল থেকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মহান মুক্তিযুদ্ধে তাদের সব অপকর্ম বারবার তুলে ধরার মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করে গড়ে তোলাই হবে জামায়াত-শিবির ধ্বংসের মূল পরিকল্পনা।

কবীর চৌধুরী তন্ময় : প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফোরাম (বোয়াফ)
kabir_tanmoy@yahoo.com