স্বপ্ন কারিগর কাজী আনোয়ার হোসেন

ঢাকা, রবিবার, ২২ মে ২০২২ | ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

স্বপ্ন কারিগর কাজী আনোয়ার হোসেন

অমল সাহা
🕐 ৪:৩১ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৫, ২০২২

স্বপ্ন কারিগর কাজী আনোয়ার হোসেন

কাজী আনোয়ার হোসেন। এক বহুবিধ গুণান্বিত কর্মবীরের নাম। নিজে লিখেছেন, অনুবাদ করেছেন, অন্যদের দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছেন, সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্যবসাসফল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেছেন এবং লেখকদের পেশাদারিত্বের জায়গায়ও ভূমিকা রেখেছেন। গান তার পরিবারেই ছিল। প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে চলচ্চিত্রেও গান গেয়েছেন। ছিলেন বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী। যে স্বল্পতম কয়েকজন লেখক নিজের নামকে দেশের মধ্যে ‘হাউজ হোল্ড’ করতে পেরেছেন তার মধ্যে মাসুদ রানা ও কুয়াশার স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেন একজন। বাংলাদেশে সাধারণ শিক্ষিতজনের মধ্যে এমন কোনো মানুষকে পাওয়া যাবে না যারা তাদের কিশোর বা যুবক বয়সে কুয়াশা সিরিজ বা মাসুদ রানা পড়েনি। মাসুদ রানা সিরিজের সঙ্গে নিজের নামটাও সমার্থক করে নিয়েছিলেন।

তিনি বাংলাদেশে এক নতুনধারার লেখার প্রবর্তন করেছিলেন। সেটি স্পাই থ্রিলারের ধারা। গোয়েন্দা গল্প যে আগে লেখা হয়নি তা নয়। কিন্তু সেসব ছিল সাহিত্য-ঘেঁষা এবং বেশির ভাগই সামাজিক প্রেক্ষাপটের নিরিখে। ভাষাশৈলীও ছিল খানিকটা নরমসরম। কিন্তু কাজী আনোয়ার হোসেন যে ভাষা এবং গল্পের প্রেক্ষাপট গ্রহণ করলেন তা ছিল সাহিত্য ভাষার গীতিময়তা থেকে বহু দূরের এবং গল্পের পটভূমি ছড়িয়ে পড়েছিল পৃথিবীজুড়ে। তার গল্পের সুপার হিরো মাসুদ রানা বিচরণ করত ওয়াশিংটন থেকে মিসর, ঢাকা থেকে রাওয়ালপিন্ডি, আবার কখনোবা মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমি থেকে মরিশাসের সাগর তীরে। এজন্য প্রশংসা যেমন জুটেছে তেমনি নিন্দামন্দও কম সইতে হয়নি। কারণ বাস্তবতার কারণে একজন স্পাইয়ের জীবনে নারীর সঙ্গ অনিবার্যভাবে এসে যায়। সেসব বর্ণনা আমাদের মতো রক্ষণশীল সমাজের হজম করা শক্ত ছিল বৈকি।

কাজী আনোয়ার হোসেন আরেকদিক থেকে বিরলতম সৌভাগ্যের অধিকারী। জন্মেছিলেন এক আলোকবর্তিকাবাহী পরিবারে। যার মধ্যমণি ছিলেন তার পিতা একাধারে বিখ্যাত খেলোয়াড়, শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক সর্বোপরি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের তরুণকালের বন্ধু। ড. কাজী মোতাহার হোসেন। উল্লেখ্য, ড. কাজী মোতাহার হেসেন অল ইন্ডিয়া দাবা প্রতিযোগিতায় সাতবারের চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। এছাড়াও কাজী আনোয়ার হোসেনের ভাইবোনদের অন্যতম ছিলেন প্রয়াত বড় ভাই কাজি মাহবুব হোসেন, যোবায়দা মির্জা, ছোটবোন ফাহমিদা খাতুন, মাহমুদা খাতুন। এহেন পরিবারে স্বাভাবিকভাবেই একটা উদারনৈতিক আবহাওয়া বিরাজ করত। সেখানে কাজী আনোয়ার হোসেন ‘হয়ে’ ওঠাটাই ছিল স্বাভাবিক। তিনি জ্ঞানবলয়ে প্রবেশ করেছিলেন। তবে এখানে একটা ব্যতিক্রমী বিষয় ছিল নিজের মতো করে পথ খুঁজছিলেন। জ্ঞানতাপস পিতার কল্যাণে ও প্রশ্রয়ে অতি সহজেই সে পথে পা দিতে পারলেন। ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করে সহজেই চাকরি পেতে পারতেন। সেপথে না গিয়ে হাঁটলেন নিজের পথে। দারুণভাবে সফলতার শীর্ষেও আরোহণ করেছিলেন। তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। অন্যের অধীনে চাকরি করবেন না, প্রতিজ্ঞা ছিল।

দরকার হলে চায়ের দোকান দেবেন। তিনি তাই করেছিলেন। সেগুনবাগিচার বাড়ির এক কোণে ‘বৈশাখী’ নামের একটি চায়ের দোকান খুলে ফেললেন। বাবা মোতাহার হোসেন এসব দেখে একদিন বললেন, আগে তো তুমি গল্প লিখতে, রহস্য গল্প, সেটাই করো না কেন। রহস্য গল্প লেখা শুরু করো। এরপর লিখতে শুরু করলেন। যশস্বী পিতা বললেন, নিজেই প্রকাশনী খুলে নিজের লেখা প্রকাশ করো। ব্যস, শুরু করলেন নিজের প্রকাশনীর ব্যবসা। নাম দিলেন ‘সেবা’। মানে সেগুনবাগিচা’র সংক্ষিপ্ত রূপ। পরে এর অর্থ পাল্টে ফেললেন, সেবা মানে সহায়তা প্রদান। আরও অদ্ভুত, সে প্রকাশনা থেকে ছাপলেন নিজের লেখা বই। আজও এটি রেকর্ড। কোনো প্রকাশক নিজের লেখা বই ছাপানোর জন্য প্রকাশনী খুলেছেন এমনটা আজ পর্যন্ত কেউ করেনি। প্রকাশনীর লেখক চারজন। এরমধ্যে নিজেই তিনজনের ছদ্মনামে; আরেকজন নিয়োগকৃত লেখক। সেই থেকে আজ অব্ধি সেবা চলছে তার নিজের মতো করে। শুধু স্পাই থ্রিলার প্রকাশ করেননি; সেবা থেকে বিশ্বসাহিত্যের বইও অনুবাদ করে মানুষের পাঠস্পৃহা মিটিয়েছেন। প্রকাশ করেছেন ছোটদের, বড়দের জন্য জনপ্রিয় মাসিক ম্যাগাজিন। সবখানেই ছিলেন সফলতার শীর্ষে। দেশের সাহিত্যবোদ্ধাদের একটা সহজাত প্রবণতা হচ্ছে দারিদ্র্য, প্রেম এবং মৃত্যু-দুঃখ ছাড়া আর কোনো প্রকার ধারার লেখাকে মূল্যায়ন করতে চান না। গরিব দেশের জন্য এটাই স্বাভাবিক।

এর ফল হচ্ছে লেখকরা এ ফর্মের বাইরে গিয়ে লেখেনও না। আবার পাঠকরাও এর বাইরে গিয়ে পড়তে অভ্যস্তও হয় না। যেজন্য আমাদের কাছে ফ্রানৎস কাফকা একমাত্র বিশেষ পাঠক শ্রেণির কাছে গ্রহণীয় হন, বাকি পাঠকরা হন অধোবদন। আবার আছে ‘শিকড়ের লেখা’ ছাপ্পা দেওয়া যেখানে গ্রামীণ জীবন বর্ণিত হয়, ওইরকম না লিখলে লেখক আদরণীয় হন না। আবার পুরস্কারের বিবেচনায়ও এ কথা খাটে। যদিও বর্তমানের প্রায় সকল পুরস্কারই শুধু লেখার প্রসাদগুণে পুরস্কৃত হয় না। লেখা ছাড়াও বিভিন্ন গুণের প্রয়োজন হয় যেমন সান্নিধ্য-গুণ, অর্থ-গুণ, রাজনীতি-গুণ, সিন্ডিকেট-গুণ, প্রতিষ্ঠান-গুণ, সর্বোপরি পদপদবি-গুণ ইত্যাদি। এ কারণেই এদেশের কোনো স্পাই থ্রিলার লেখক কিংবা গোয়েন্দা কাহিনির লেখক এখানে পুরস্কৃত হবেন না। কাজী আনোয়ার হোসেন অন্তর্মুখী স্বভাবের জন্য তেমন কারও সঙ্গে মিশতেনও না। এটা তার স্বভাবের অন্তর্গত ছিল ছাত্রজীবন থেকেই। শোনা যায়, তিনি বই লেখার সময় কয়েকদিন নিজের কক্ষের বাইরেও বের হতেন না। কাজী আনোয়ার হোসেন এ দেশে আন্তর্জাতিক স্পাই থ্রিলারের নতুন ধারার প্রবর্তক হিসেবে এবং পাঠক সৃষ্টিতে ও প্রকাশনা শিল্পে অবদানের জন্য অন্তত একটা আজীবন সম্মাননা পেতে পারতেন। কিন্তু পাননি। শুধু কাহিনিকার হিসেবে বাচসাস চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন। তবে তিনি নিজ জায়গায় সৎ ছিলেন। বইয়ের ক্রেডিট লাইনে নির্দ্বিধায় স্বীকার করে নিতেন ‘বিদেশি কাহিনি ছায়া অবলম্বনে’। আন্তর্জাতিক স্পাই থ্রিলারের ভাষাও যে আলাদা রকমের হয় তা তিনি জানতেন না। পরে ইয়ান ফ্লেমিংয়ের বন্ড সিরিজের বই পড়ে সেই ভাষার গতিপ্রকৃতি জানতে পারেন। তাও অবলীলায় স্বীকার করেছেন। পরে সে ভাষা তিনি বাংলা থ্রিলার সাহিত্যে অভিযোজিত করেছেন। অনেকেই করেন না।

দুর্ধর্ষ দেশীয় স্পাই এজেন্ট ‘মাসুদ রানা’ সৃষ্টি করলেন। মাসুদ রানার বয়স বাড়ে না; সব সময় যৌবনে অবস্থান করে। পকেটভর্তি টাকা। যেখানে ইচ্ছা সেখানে যেতে পারে। রমণীমোহন। অস্ত্র চালনায় পারদর্শী। সর্বপ্রকার যান চালনায় দক্ষ। প্রশাসনিক ক্ষমতা হাতের মুঠোয়। ঝাঁ চকচকে বুদ্ধিবৃত্তি। মানুষ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে যা স্বপ্ন দেখে সবই মাসুদ রানার মধ্যে ঠেসে দেওয়া হয়েছে। যা মানুষের চিরকালীন চাওয়া। তাই মাসুদ রানা হয়ে উঠেছে নির্বিশেষে সব কিশোর যুবকদের স্বপ্নের নায়ক। সবাই মাসুদ রানা হতে চায়। কমপক্ষে মাসুদ রানা যা করে তাতে সঙ্গে থাকতে চায়। আর থাকতে গেলে মাসুদ রানা পড়তে হবে। তাই কিনতে না পারলে ভাড়া নিয়ে হলেও মাসুদ রানা পড়তে হয়। পাঠক গ্রোগ্রাসে গিলতে থাকে সেবার বই। এতে খারাপ কিছু দেখি না মোটেই। নিজেও রানার পাঠক ছিলাম কিশোর-যুবক বয়সে। শুধু মনে হতো আমিও যদি হতে পারতাম মাসুদ রানা! এখানেই মাসুদ রানার জনপ্রিয়তার কারণ। সাধারণ মানুষ যেমন করে বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রে খলনায়ককে শাস্তি দেওয়ার জন্য সর্বশক্তিমান একজন নায়ককেই খুঁজে বেড়ায়। মাসুদ রানা হলো সেরকমই সর্ববিশারদ নায়ক। উন্নাসিক বুদ্ধিবেত্তাগণ ‘সেবা’র বই পড়াকে অন্যচোখে দেখতে চান। কিন্তু যে পাঠক বুঁদ হয়ে বই পড়ে, সে তো নেশা করছে না।

হয়তো ভবিষ্যতের ক্লাসিক্যাল সাহিত্যের পাঠকে পরিণত হবে। আর যার বই পড়ার অভ্যাসই গড়ে উঠল না সে ভবিষ্যতেও ভালো পাঠক হবে না। আর আমরা কী করে কারও পাঠ্যরুচির ওপর জোর করতে পারি? অন্তত তা যদি না হয় অন্যের দুর্গতির কারণ।

একই কথা খাটে ‘তিন গোয়েন্দা’ সিরিজের বেলায়ও। কিশোর মনের অনুসন্ধিৎসা ও অভিযানমনস্কতার সম্মিলনে সিরিজটির কাহিনি আবর্তিত হয়েছে। এরপর সেবার আছে পিশাচ কাহিনির সিরিজ। ভয় পেতে কে না ভালোবাসে? সে ভয় যদি হয় বিপদমুক্ত! ঘরে বসে লেপের তলায় শুয়ে নিছক বইয়ের পিশাচরা চারদিকে জ্যান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায় তাহলে তো তার মজাই আলাদা। এজন্যই কাজী আনোয়ার হোসেনকে আমরা বলতে পারি ‘গ্রেট এন্টারটেইনার’। তিনি স্বপ্নের নায়ক সৃষ্টি করেছেন, আমাদের কিশোরকালকে রঙিন করে তুলেছেন, ভালো লাগার ভয় পাইয়েছেন সর্বোপরি যারা লেখালেখি করতে চেয়েছেন তাদের জায়গা করে দিয়েছেন। অনেক লেখকের প্রথম লেখা ছাপা হয়েছে তার সম্পাদিত ‘রহস্যপত্রিকা’য়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আরেকটি বিষয় তিনি সততার সঙ্গে করে গেছেন, পত্রিকার লেখকদের সম্মানী দিয়ে গিয়েছেন প্রথম থেকেই। আজ থেকে তিরিশ বছর আগে একটি ছোট্ট লেখার সম্মানী বাবদ পঁচিশ টাকা প্রাপ্তির পোস্টকার্ড এসে পৌঁছেছিল আমার কাছে। বিস্মিত হয়েছিলাম।

তিনি এ নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন কিন্তু তার সৃষ্ট চরিত্রগুলো পাঠকদের মনে আরও বহু বছর অবিনশ্বর হয়ে বেঁচে থাকবে। আমাদের স্বপ্নের নায়কের স্রষ্টাকে ভালোবাসায় স্মরণ করি।

অমল সাহা : কবি, কথাসাহিত্যিক ও রম্য লেখক

 
Electronic Paper