স্মরণে নারায়ণ দেবনাথ

ঢাকা, রবিবার, ২২ মে ২০২২ | ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

স্মরণে নারায়ণ দেবনাথ

প্রশান্ত ভৌমিক
🕐 ৪:২৯ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৫, ২০২২

স্মরণে নারায়ণ দেবনাথ

নোয়াখালীর এক প্রত্যন্ত গ্রামে আমার গ্রামের বাড়ি। কাছাকাছি যে বাজার, সেই চৌমুহনীতে তেমন কোনো বই পাওয়া যেত না। আর চিরকালীন ‘আউট বই’ পড়ার কাঙাল আমি এক অদ্ভুত শূন্যতায় ভুগতাম। বই পড়ার তীব্র তৃষ্ণা বুকে, কিন্তু বই নেই। যে দু-একটি বই পাওয়া যায়, সেটা দিয়ে তৃপ্তি মেটে না।

চতুর্থ শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা শেষে ঢাকা গিয়েছিলাম। মৌচাক মার্কেটের এক দোকানে দেখলাম কিছু ছবির বই। সেখানেই প্রথম পরিচয় ঘটে চাচা চৌধুরী আর পিঙ্কির সঙ্গে। আমি তো দেখে অবাক। এরকম ছবি আঁকা বইও পাওয়া যায়! এমন তো কোনোদিন চোখেই দেখিনি।

জানতামও না এগুলোকে কমিকস বলে। এরপর নোয়াখালী ফিরে হাপিত্যেশ করি। স্কুলে দেখতে পাই মীনার কার্টুনের বই রয়েছে। কিন্তু সেসব সাধারণ ছাত্রদের জন্য নয়। স্যাররা যক্ষের ধনের মতো সেসব আগলে বসে থাকতেন। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার পর ভারত থেকে আমার এক দাদা এলেন বাংলাদেশে। তিনি ‘আমেরিকায় টিনটিন’ নামে একটি বড় আকারের কমিকস আনলেন উপহার হিসেবে। সে এক নতুন জগত আমার জন্য। তারপরও দীর্ঘ বিরতি।

ধীরে ধীরে নোয়াখালীতে দু-একটা চাচা চৌধুরী পাওয়া গেলেও সেসব মোটেই যথেষ্ট নয়। অষ্টম শ্রেণিতে যখন উঠলাম, আমরা গ্রামের বাড়ি থেকে থাকতে এলাম চৌমুহনী নামক মফস্বল শহরে। বিভিন্ন বইয়ের দোকান ঘুরতে ঘুরতে পেলাম বাঁটুল দি গ্রেট আর নন্টে-ফন্টের সন্ধান। চাচা চৌধুরী কিংবা টিনটিন পড়লেও সেসব ছিল অন্য ভাষা থেকে অনুবাদ। ফলে কিছুটা দূরত্ব তো ছিলই। কিন্তু নন্টে-ফন্টে কিংবা বাঁটুল দি গ্রেট দেখলাম একেবারেই শতভাগ বাংলা কমিকস। লেখকের নামটাও বাঙালি- নারায়ণ দেবনাথ। যিনি এত এত কমিকস এঁকেছেন, নিশ্চয়ই অনেক বয়সী, এসব ভাবতাম। একসময় বাঁটুল দি গ্রেট সমগ্র, নন্টে-ফন্টে সমগ্র, হাঁদা-ভোঁদা সমগ্র সব সংগ্রহ করি। পড়ে ফেলি। আর আফসোস করি, যদি এই লেখক শিল্পীকে একবার দেখতে পেতাম। ২০১৯-এ কলকাতা যাওয়ার পর সেই সুযোগ এলো।

‘সাক্ষাতে যত কথা’ বইয়ের জন্য দুই বাংলার সাহিত্যিকদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলাম। তখনো জানতাম না নারায়ণ দেবনাথ জীবিত। ‘বইয়ের দেশ’ ত্রৈমাসিকে নারায়ণ দেবনাথের সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল ২০১৮ সালের শেষদিকে। তখন অনেক কিছুই জানতে পারলাম। এরপর থেকে লক্ষ্য নির্দিষ্ট করলাম নারায়ণ দেবনাথের সাক্ষাৎকার নিতে হবে। নিতে তো হবে, কিন্তু উপায় তো দেখি না! তার কাছ অব্ধি পৌঁছাব কীভাবে? গেলেই যে সাক্ষাৎকার দেবেন, নিশ্চয়তাই-বা কোথায়?

২০১৯ সালে পরিচিত হলাম জাহিরুল হাসানের ‘সাহিত্যের ইয়ারবুক’-এর সঙ্গে। নতুন এক বিশ্ব খুলল সামনে। এতে অনেক লেখকের নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর দেওয়া থাকে। যোগাযোগ একেবারে হাতের নাগালে। সেখানে নারায়ণ দেবনাথের ফোন নম্বর পেলাম। সঙ্গে সঙ্গেই কল করলাম। ধরলেন স্বয়ং নারায়ণ দেবনাথ। কিছুটা সংকোচ নিয়ে পরিচয় দিলাম। ওপাশ থেকে জবাব এলো- ‘যা বলার জোরে বলুন। আমি কানে ঠিকমতো শুনতে পাই না।’ বেশ জোরেই বললাম, দেখা করতে চাই, সাক্ষাৎকার নিতে চাই। সানন্দে রাজি হলেন। জানালেন, চাইলে সেদিন বিকেলেই যেতে পারি। এ সুযোগ কি হেলায় হারানো যায়! ঠিকানা লিখে নিলাম।

দুপুরেই বেরিয়ে পড়লাম। সমস্যা দেখা দিল, হাওড়ায় যে অঞ্চলে তিনি থাকেন, সেদিকটা একেবারেই অচেনা। আমার সর্বোচ্চ দৌড় হাওড়া স্টেশন অব্ধি। এর ওপারে কোনোদিন যাইনি। নানা লোককে জিজ্ঞেস করে কখনো বাসে, কখনো অটোয়, কখনো হেঁটে একসময় নিজেকে আবিষ্কার করলাম হাওড়ার শিবপুরে। গুগল ম্যাপ জানাচ্ছিল কাক্সিক্ষত বাড়ির আশপাশেই আছি। চিনি না বলে কষ্ট হচ্ছিল। আর তখনো পাড়ার দোকানগুলো দুপুরের ভাতঘুম কাটিয়ে খোলেনি। নারায়ণ দেবনাথের বাড়ির নম্বরে কল করতেই ধরলেন এক ভদ্রমহিলা। পরিচয় দিলে জানালেন, তিনি নারায়ণ বাবুর বউমা। বাড়ির লোকেশনও জানিয়ে দিলেন। অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, দশ মিনিট সেই বাড়ির সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। চিনি না বলে এ অবস্থা। দরজায় নক করতেই ভদ্রমহিলা ঘরে বসালেন। বাড়ির ভেতরে ভয়াল দর্শন দুটি কুকুর দেখে যারপরনাই ভয় পেলাম।

কুকুর পেরিয়ে বসতে দিলেন একটি ঘরে। আঁকার সরঞ্জাম, বইপত্র, পুরস্কারে ভর্তি ঘরটি দেখে বুঝলাম এটি নারায়ণ দেবনাথের কাজের ঘর। অপেক্ষা করতে করতে অপরাধী বোধ হচ্ছিল। হয়তো প্রৌঢ় সাহিত্যিকের বিশ্রামের সময়ে এসে পড়েছি! কিন্তু মোবাইল ফোনের ঘড়ি বলছে তিনি আমাকে যে সময়ে আসতে বলেছেন, সেই সময়েই এসেছি। বসে বসে নানারকম মেডেল-ক্রেস্ট দেখতে লাগলাম। একসময় নারায়ণ দেবনাথ এলেন। সৌম্য-শান্ত চেহারা, কথা বলেন নরম সুরে। মনে হাজারও প্রশ্ন জমা, কৌতূহলে ফাটছি। কিন্তু সাক্ষাৎকার পর্ব তেমন জমল না। ভদ্রলোক কানে খুব একটা শোনেন না। প্রশ্ন আমি লিখে দিতে চাইলেও তিনি আপত্তি জানালেন। বরং নিজের খেয়ালখুশি মতো কথা বলতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছিলেন। মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলাম কথা। বলেছিলেন নানা পুরস্কারের কথা, চরিত্রের কথা। প্রায় একঘণ্টা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনলাম। একসময় অটোগ্রাফের খাতা বাড়িয়ে দিলাম। বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে সেই খাতায় বাঁটুলকে আঁকলেন।

আমি পেলাম চিরজীবন সংগ্রহে রাখার মতো এক সম্পদ। সাক্ষাৎকার শেষে বাংলাদেশ সম্পর্কে, বাংলাদেশের কমিকস সম্পর্কে নানা কিছু জানতে চাইলেন। জানতে চাইলেন, বাংলাদেশে তার কমিকস লোকে পড়ে কিনা! আমি পড়লাম মুশকিলে! নারায়ণ দেবনাথ আমাকে প্রশ্ন করছেন লোকে তার কমিকস পড়ে কিনা! এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আমি কে! তাছাড়া কথা বলতে আরও কিছু অসুবিধা হচ্ছিল। কারণ স্বাভাবিক মাত্রায় কথা বললে তিনি শুনতে পাচ্ছেন না। আর মাত্রা বাড়াতে গেলে আমার কথা হয়ে যায় চিৎকার। তারপরও বেশ কিছুক্ষণ কথা বলতে হলো। নারায়ণ বাবুর কৌতূহল মেটাচ্ছিলাম আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে। প্রফুল্ল রায়ের লেখার কথা বারবার বলছিলেন। প্রফুল্ল রায়ের একটি বই ‘কেয়া পাতার নৌকা’ হাতে নিয়ে দেখালেন, বইটি পড়ছেন এখন। বেশ কিছুক্ষণ কথা বললাম।

এবার বিদায়ের পালা। সমস্যা যেটা দেখা দিল, ভয়াল দর্শন দুটো কুকুর ভেতরে ঢোকার সময়ে যেখানে ছিল এখন সেখান থেকে জায়গা পরিবর্তন করেছে। ফলে, আমার বের হওয়ার দরজা আর কুকুরের মাঝখানে দূরত্ব খুবই কম। চিন্তায় পড়লাম, এই ফাঁক দিয়ে বেরোব কীভাবে! নারায়ণ বাবুর বউমাকেও দেখতে পাচ্ছি না যে সাহায্য চাইব। অশীতিপর নারায়ণ বাবুর কাছেও তো এই ব্যাপারে সাহায্য চাইতে পারি না। ফলে, তার কাজের ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তিনি নিজের চেয়ারে বসে ব্যাপারটি লক্ষ করলেন। তারপর ধীরে ধীরে উঠে এলেন চেয়ার ছেড়ে। আমি ভয় পাচ্ছি। এখন যদি একা বেরোতে বলেন, সমস্যায় পড়ে যাব। কিন্তু না, তিনি এসে আমার হাত ধরলেন। বললেন, ‘এসো’।

আমাকে হাত ধরে সদর দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। ভয়াল দর্শন কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করছিল। কিন্তু আমার হাত তো ধরে ছিলেন মহা পরাক্রমশালী বাঁটুল দি গ্রেট! ফলে আমার আর ভয় কীসের? সদর দরজা পার করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘সামনে একটু এগোলেই অটো স্ট্যান্ড। হাওড়া স্টেশনে যাওয়ার অটো পেয়ে যাবে।’

আমি যেন ভাসতে ভাসতে বের হলাম। হাতের কব্জির দিকে তাকিয়ে দেখলাম। সত্যিই কি এখানে নারায়ণ দেবনাথের হাতের স্পর্শ ছিল! অবিশ্বাস্য মনে হয় এখন।

নারায়ণ দেবনাথ চলে গেছেন এটা যেমন ঠিক, তেমনি আমাদের মনে চিরস্থায়ীভাবে আসন গেড়েছেন এটাও ধ্রুব সত্যি।

প্রশান্ত ভৌমিক : কথাসাহিত্যিক ও সমালোচক

 
Electronic Paper