বিজয় ৫০ : প্রাসঙ্গিক ভাবনা

ঢাকা, রবিবার, ২২ মে ২০২২ | ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

বিজয় ৫০ : প্রাসঙ্গিক ভাবনা

প্রসাদ ফণী (রতন)
🕐 ৪:১৬ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৫, ২০২২

বিজয় ৫০ : প্রাসঙ্গিক ভাবনা

দেখতে দেখতে ৫০ বছর হয়ে গেল বাংলাদেশের বয়স। বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী পালন হলো। ৫০ বছর কম একটা সময় নয়। এই পঞ্চাশ বছরের মধ্যে প্রায় সতের বছর কেটেছে সামরিক শাসনে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে। বহুত উত্থানপতন, ঘাতপ্রতিঘাত, ক্যু-পাল্টা ক্যু, হত্যা গুম খুন, অগ্নিসংযোগ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন, মন্দির প্যাগোডা গির্জা ভাঙচুর, অগ্নি সংযোগ, ভোট কেলেঙ্কারি ইত্যাদি বিভিন্ন রকম ক্ষতিকর সংঘাত পেরিয়ে এলো বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী। বঙ্গবন্ধু কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলেন? তার আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ এখনো অনেক দূরে। বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন সমাবেশে যে কথাগুলো বলেছিলেন সেই রেকর্ডগুলো বাজানো হয় না। বিভিন্ন দিনযাপন বা উৎসবে নিজের দলের নেতাকর্মীদের এবং দেশের কর্মকর্তা কর্মচারীদের সম্বন্ধে যা বলেছিলেন সেই কথাগুলো আর শোনানো হয় না এই প্রজন্মকে। শুধু চামচাগিরি করে টু-পাইস কামাই করার জন্য মুজিব সৈনিক নাম দিয়ে গোটা দেশ দাপিয়ে বেড়ায় একদল নকল মুজিব সেনা। তাদের না আছে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, না আছে দেশপ্রেম। বঙ্গবন্ধু যে চাটার দলের কথা বলেছিলেন সেই চাটার দল সংক্রমিত হয়ে শিকড় থেকে শিখর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। লুটপাট করার জন্য দলবাজি টেন্ডারবাজি করতে গিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি খুনোখুনি করতে পিছপা হয় না।

প্রধানমন্ত্রীর কথা না মেনে একই আসনে একাধিক নিজ দলীয় প্রার্থী নির্বাচন করছে আর প্রায় জায়গায় হেরে যাচ্ছে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে হত্যা খুন মারামারি ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটছে। প্রধানমন্ত্রীকে বলতে শুনেছি তার ছাত্র কর্মীদের বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী এবং রোজনামচা পড়তে। কিন্তু কে শোনে সে কথা। তাই এই সমস্ত কারণে সরকারের দৃশ্যমান উন্নয়নে সূর্য গ্রহণের রাহুগ্রাস পড়েছে।

যে আশা আকাক্সক্ষা নিয়ে জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে মুক্তিকামী বাঙালি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল- তার আকাক্সক্ষা কতটা পূরণ হয়েছে! জয় বাংলা স্লোগান এখনো জাতীয় স্লোগান না হয়ে দলীয় স্লোগান হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় পাকিস্তানি আদলে জিন্দাবাদ স্লোগান। তুমি কে আমি কে বাঙালি বাঙালির পরিবর্তে পরিচয় হচ্ছে ধর্মের ভিত্তিতে। কে মুসলিম, কে হিন্দু বা বৌদ্ধ, খ্রিস্টান। যে স্পিরিট ছিল অসাম্প্রদায়িকতার সেটা প্রায় শূন্যের কোঠায় এসেছে। কারণ অসাম্প্রদায়িকতার যে চেতনা বা শিকড় ধর্মনিরপেক্ষতা তা আজ বিলুপ্ত হয়ে গেছে- পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্য দিয়ে।

পরস্পর অবিশ্বাস অসহিষ্ণুতার কারণে গণতন্ত্র আজ ক্ষয়িষ্ণু হতে চলেছে। গণতন্ত্রের নামে টাকার খেলা, কব্জির জোর এমন সব ভেল্কিবাজির খেলা চলছে। সমাজতন্ত্র তো বহুত দূর। এক শ্রেণির হাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট করে, ঘুষ-দুর্নীতি করে অবৈধ লক্ষ-কোটি কালো টাকার সম্পদের মালিক সেজে আছে, অপরদিকে বিশাল জনগোষ্ঠী ন্যায্য শ্রমের মূল্য পাচ্ছে না। কাজ পাচ্ছে না। লাগামছাড়া মূল্য বৃদ্ধির কারণে মানুষ আজ দিশাহারা। প্রবৃদ্ধির হার, বিদেশি মুদ্রার মজুদ ইত্যাদি অর্থনীতির কট্টর শব্দ চয়ন করে ভাষণ দেওয়া হয়। দেখানো হয় আমাদের দেশের অর্থনীতির স্বাস্থ্য খুব ভালো। একজন মানুষের দেহের সর্বাঙ্গের রক্ত মুখমণ্ডলে জমা হলে যেমন সেই মানুষকে সুস্থ মানুষ বলা যায় না। তেমনই মুষ্টিমেয় লোকের হাতে লক্ষ কোটি টাকা থাকলে সেই দেশের অর্থনীতির স্বাস্থ্য ভালো বলা চলে না।

অর্থনীতি এখন চলে গেছে কালো টাকার মালিকদের হাতে। আস্তে আস্তে পার্লামেন্টের আসনগুলো ওইসব ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদদের হাত থেকে গিলে ফেলছে। সুতরাং বঙ্গবন্ধুকন্যা চেষ্টা করলেও অর্থনীতির সুষম বণ্টন করতে পারবেন না ওইসব রাহুগ্রাসী কালো টাকার মালিকদের কারণে। যে কারণে বাঁধভাঙা সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদীয় আসন পাওয়ার পরও বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা সংবিধানের ভূলুণ্ঠিত চার স্তম্ভ মেরামত করতে পারেনি আজও। বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে মনে হচ্ছে পাকিস্তানি প্রেতাত্মা এই সরকারের মধ্যে ঘাপটি মেরে আছে কিনা।

এই প্রসঙ্গে রূপক এক ফোনালাপের কথা মনে হচ্ছে। ‘অস্তিত্ব নামে জনৈক ব্যক্তি নিঠুর কুমার নিয়তি নামে এক ব্যক্তির কাছে জানতে চাইলেন তাদের অফিসের সত্য, বিবেক, মানবিকতা, মূল্যবোধ, বিশ্বাস- এরা কেমন আছে। উত্তরে অস্তিত্ব জানাল এরা অনেক আগে অর্থাৎ পঁচাত্তরের পনের আগস্টের পর জায়গা ছেড়ে চলে গেছে। আবার প্রশ্ন- সততা লজ্জা নম্রতা মর্যাদা এরা? উত্তরে- এরা হঠাৎ করে মুখ লুকিয়ে এসে বন্ধ ঘর খুলে আবার তালা লাগিয়ে চলে যায়। সুখ শান্তি হাসি খুশি মাঝে-মধ্যে অনুরোধে ঢেঁকি গেলার মতো একুশে ফেব্রুয়ারি এসে গান গেয়েই চলে যায়। প্রশ্ন- তাহলে অফিস চালায় কে কে? উত্তর- এই তাণ্ডব পাণ্ডব হিংসা বিদ্বেষ চোর বাটপাড় এরাই অফিস চালাচ্ছে। এর মধ্যে চোখ কান বন্ধ করে দিনযাপন করছি।’

তবে এত কিছু ব্যর্থতার মধ্যেও কিছুটা স্বস্তির জায়গাও আছে। ভয়ঙ্করী কোভিড নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় এই সরকারের দৃশ্যমান কার্যকরী পদক্ষেপ চোখে পড়ার মতো। যেখানে ভারত পাকিস্তান মিয়ানমার এরকম অনেক দেশের তুলনায় যেখানে দুই ডোজ টিকা দিতে পারেনি, সেখানে বাংলাদেশ বুস্টার দেওয়া শুরু করেছে। গণস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশ এগিয়ে আছে। শিক্ষা বছর শেষে শিক্ষার্থীদের হাতে বই দেওয়া। কৃষি ক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধি। ভাতের অভাবে হাপিত্যেশ করে কেউ একটা মারা যাচ্ছে বলে শোনা যায় না। যোগাযোগ ক্ষেত্রে পূর্বের তুলনায় কিছু উন্নতি হওয়ায় গ্রামীণ জনপদের কিছুটা কাজের সুবিধা পেয়েছে। ভৌত অবকাঠামো কিছুটা বাড়ছে অস্বীকার করা যাবে না। তবে এরই সঙ্গে সমান্তরালভাবে বাড়ছে ঘুষ, দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদের পাহাড়। বালিশকাণ্ডের মতো দু’একটা ঘটনা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। যদিও দুর্নীতির ঘোড়দৌড়ের লাগামকে টেনে ধরতে পারলে উন্নয়নের অবকাঠামো দৃশ্যমান হবে। দেশটা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে পরিচিত হতো। তা না হলে উন্নয়নশীল দেশের মুখরোচক কথামালা কথার কথা হয়েই থেকে যাবে!

প্রসাদ ফণী (রতন) : অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, মান্দা, নওগাঁ

 
Electronic Paper