প্রসঙ্গ : প্রাথমিক শিক্ষাবোর্ড প্রতিষ্ঠা

ঢাকা, সোমবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২২ | ১১ মাঘ ১৪২৮

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

প্রসঙ্গ : প্রাথমিক শিক্ষাবোর্ড প্রতিষ্ঠা

লিটন দাশ গুপ্ত
🕐 ১:১৪ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ০১, ২০২১

প্রসঙ্গ : প্রাথমিক শিক্ষাবোর্ড প্রতিষ্ঠা

আগামী ২০২৩ সাল থেকে আমাদের দেশে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার। সেই শিক্ষাক্রমের সামগ্রিক বিষয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো সমগ্র শিক্ষাক্রমকে একেবারে ঢেলে সাজিয়ে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে, নতুন শিক্ষাজগতে প্রবেশ করতে যাচ্ছে শিক্ষার্থী ও শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলেই। ইতোপূর্বেকার সময়ে গঠিত বিভিন্ন শিক্ষা কমিশনে নানান পরিবর্তনের কথা থাকলেও ওই সকল শিক্ষা কমিশনের প্রদত্ত প্রস্তাব হয় আলোর মুখ দেখেনি, নয় আলো ছায়ায় আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছিল। সেই হিসাবে মাঝে মধ্যে কিছুটা পরিবর্তন এলেও আমার জানা মতে এই ধরনের ব্যাপক পরিবর্তন আর হয়নি। যদিও ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনে ব্যাপক পরিবর্তনের আভাস ছিল, কিন্তু বেশিরভাগ বাস্তবায়িত হয়নি।

এদিকে ২০২৩ সাল থেকে বাস্তবায়িত হতে যাওয়া নতুন শিক্ষাক্রমে সর্বসাধারণ কর্তৃক প্রশংসিত পরিবর্তন সমূহের মধ্যে রয়েছে দশম শ্রেণি পর্যন্ত একমুখী শিক্ষাক্রম অর্থাৎ বিজ্ঞান মানবিক বাণিজ্য বিভাগ দশম শ্রেণি পর্যন্ত আর থাকছে না। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে পঞ্চম শ্রেণির পর পিএসসি বা পিইসি পরীক্ষা থাকছে না। থাকছে না নিম্নমাধ্যমিক স্তর শেষে অষ্টম শ্রেণির পর জেএসসি পরীক্ষা। এসব পরীক্ষা বাদ দিয়ে দশম শ্রেণির পর শিক্ষার্থীরা প্রথম পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে। এছাড়া থাকছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাপ্তাহিক দুইদিন ছুটি, বিষয় ও বিষয়বস্তু একেবারে কমিয়ে এনে যুগোপযোগী পরিবর্তন ইত্যাদি। সেই হিসাবে এখানে দেখা যাচ্ছে, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা ’২৩ সাল থেকে আর অনুষ্ঠিত হবে না। আর তা যদি হয়, অর্থাৎ পরীক্ষা যদি না-ই থাকে, তাহলে প্রাথমিক শিক্ষাবোর্ড গঠনের প্রয়োজনীয়তাই বা কি? আমরা জানি, শিক্ষা বোর্ডের কাজ হচ্ছে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, উত্তরপত্র বণ্টন ও মূল্যায়ন, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ, যথাসময়ে ফলাফল ঘোষণা, টেবুলেশন শিট ট্রান্সক্রিপ্ট সার্টিফিকেট প্রস্তুতকরণ, পরীক্ষা সম্পর্কিত যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ইত্যাদি কাজসমূহ শিক্ষাবোর্ড কর্তৃক করা হয়ে থাকে। কিন্তু কথা হচ্ছে, যেখানে প্রাথমিকে সমাপনীসহ বেশিরভাগ শ্রেণিতে পরীক্ষায় থাকছে না, সেখানে ‘প্রাথমিক শিক্ষাবোর্ড’ গঠনের প্রয়োজনীয়তাই বা কি! এই বিষয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এবং প্রশ্ন দেখা দেওয়াটাই স্বাভাবিক। ইতোমধ্যে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খসড়া আইন প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে জনমত জানার জন্যে ওয়েবসাইটে খসড়া আইন প্রকাশ করে সবার পরামর্শ প্রদানের ব্যাপারে উন্মুক্ত করা হয়েছে। যদিও আমি আমার এই লেখার সারসংক্ষেপ ইতোমধ্যে প্রদত্ত ওয়েবসাইটে প্রেরণ করেছি, তারপরেও সবারর সঙ্গে আমার মতামত শেয়ার করার অভিপ্রায়ে আজকের এই লেখা উপস্থাপন করছি। প্রাথমিক শিক্ষাবোর্ড গঠনের ব্যাপারে বলা হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা মানোন্নয়নের কথা; কিন্তু যেখানে অধিদফতর আছে, আলাদা মন্ত্রণালয় রয়েছে, আছে ছোটবড় হাজার হাজার কর্মকর্তা, জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড ইত্যাদি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান, সেখানে মানোন্নয়নে প্রাথমিক শিক্ষাবোর্ড গঠন যৌক্তিকতা রয়েছে বলে মনে হয় না।

এবার আসি প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা প্রসঙ্গে। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা হচ্ছে, প্রাথমিক স্তর শেষে শিক্ষার্থীদের একটি প্রান্তিক বা চূড়ান্ত মূল্যায়ন। অধিকাংশ মানুষ, বিশেষ করে সচেতন অভিভাবক এই পরীক্ষার বিরুদ্ধে কথা বা সমালোচনা করলেও আমি কিন্তু পরীক্ষা বাতিলের বিপক্ষে নই। ইতোপূর্বে এ নিয়ে বেশ কিছু পত্রিকায় লিখেছি। অনেকের যুক্তি বিশ্বের কোথাও শিশুদের জন্যে এই ধরনের পাবলিক পরীক্ষার প্রচলন নেই। আমার কথা হচ্ছে, বিশ্বে কোন দেশে আছে কি নেই সেটা দেখার বিষয় নয়। এই পরীক্ষা শিক্ষার সার্বিক মান উন্নয়নে কি ভূমিকা রাখতে পেরেছে সেটাই বিবেচ্য বিষয়। তাছাড়া কোথাও নেই, তাই আমাদের দেশে থাকতে পারবে না এটা মেনে নেওয়া যায় না। কারণ আমাদের দেশে যা প্রচলন আছে, অন্যদেশ তা আমাদের দেশ থেকে দৃষ্টান্ত হিসাবে গ্রহণ করুক, অনুভব করুক প্রাথমিক স্তর শেষে একটি পাবলিক পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা। উল্লেখ্য বিশ্বের কোথাও প্রাথমিক স্তর শেষে পাবলিক পরীক্ষার প্রচলন নেই বলা হলেও, আমার জানা মতে ফিলিপাইনে এই ধরনের পরীক্ষার প্রচলন বহু আগে থেকে রয়েছে। এখানে দেখা যায়, পূর্বে এই ‘প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা’কে পাবলিক পরীক্ষা হিসাবে অবহিত করা হলেও এখন আমি লিখতে গিয়ে পাবলিক পরীক্ষা বলা উচিত বা ভুল হবে কিনা জানি না! কারণ শুরুতেই এটাকে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে প্রথম পাবলিক পরীক্ষা হিসাবে প্রচার করা হয়েছিল। কিন্তু এখন এই পরীক্ষার বিরুদ্ধে অধিকাংশ মানুষের অবস্থানের কারণে বা বিশেষজ্ঞদের সমালোচনার কারণে বলা হচ্ছে এসএসসি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীর প্রথম পাবলিক পরীক্ষা। অন্যদিকে দেশব্যাপী জাতীয়ভাবে একই প্রশ্নপত্রের আলোকে বা পাবলিক পরীক্ষার আদলে পরীক্ষা গ্রহণ করা সত্ত্বেও কেন পাবলিক পরীক্ষা বলা হবে না, তাও বুঝে উঠতে পারছি না।

যাই হোক, এখন পিএসসি পরীক্ষাকে পাবলিক পরীক্ষা বলা হোক বা না হোক, কিংবা পিইসি বা পিএসসি পরীক্ষা থাকুক কিংবা না থাকুক বিষয় সেটা নয়; বিষয় হচ্ছে ‘প্রাথমিক শিক্ষাবোর্ড’ গঠনের প্রয়োজনীয়তা। তবে প্রাথমিক শিক্ষায় যদি চলমান এই সমাপনী পরীক্ষা অব্যাহত থাকে, তাহলে অবশ্যই প্রাথমিক শিক্ষাবোর্ডের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। আগেই বলেছি পরীক্ষা সম্পর্কিত যাবতীয় কার্যসম্পাদনে শিক্ষাবোর্ডের বিকল্প নাই। এখন কথা হচ্ছে ’২৩ সাল থেকে শিক্ষা জীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে দশম শ্রেণির পর। থাকছে না পিএসসি জেএসসি পরীক্ষা। এছাড়া তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষাই থাকছে না। চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে পরীক্ষার বিষয় ও সময় কমিয়ে এনে, নতুন শিক্ষাক্রমে নতুন ধারায় মূল্যায়ন ও পরীক্ষা গ্রহণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যা বিদ্যালয়ের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় মূল্যায়ন কার্যক্রম সম্পন্ন হবে।

লিটন দাশ গুপ্ত : শিক্ষক ও সাহিত্যিক

 
Electronic Paper