আয় ও সম্পদ সুষম বণ্টনই মূল চ্যালেঞ্জ

ঢাকা, বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮ | ৪ পৌষ ১৪২৫

আয় ও সম্পদ সুষম বণ্টনই মূল চ্যালেঞ্জ

উমর ফারুক ৯:২৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৯, ২০১৮

print
আয় ও সম্পদ সুষম বণ্টনই মূল চ্যালেঞ্জ

সুষম-উন্নয়নই প্রকৃত উন্নয়ন। বৈষম্যমূলক উন্নয়ন টেকসই অগ্রযাত্রার সুস্পষ্ট প্রতিপক্ষ। আমাদের সুষম উন্নয়ন আজ ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। অতএব প্রকারান্তরে বলা যায়, আমাদের উন্নয়নই আজ প্রশ্নবিদ্ধ। আমরা আজ উন্নয়নের মহাসড়কে হাঁটছি। এটা যেমন সত্য তেমন আনন্দেরও। কিন্তু বর্তমানে আমরা খানিকটা উন্মাদের মতো, কেবল উন্নয়ন ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার পেছনে ছুটছি। প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাকে দুই অঙ্কে উন্নীতকরণই যেন আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যে, ইতোমধ্যে আমাদের অর্জন ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু শুধু জিডিপি কখনই বৈষম্যহীন, টেকসই অর্থনীতি গড়তে পারে না, বরং অর্থনীতিকে আরও ভারসাম্যহীন করে তোলে। সম্পদ ও আয় সুষমভাবে বণ্টিত হলে একটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি কেবল সঠিকপথে এগিয়ে চলতে পারে। অন্যদিকে, অসমভাবে বণ্টিত উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে ভয়ঙ্কর, অত্যন্ত ভয়ঙ্কর।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল বৈষম্যহীন অর্থনীতি। কিন্তু আজ আমরা হাঁটছি উল্টোপথে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০১৬ (প্রকাশ অক্টোবর ২০১৭)-এর ফলাফল বলছে, আজকের বাংলাদেশ ১০ শতাংশ মানুষের হাতে ৩৮.১৬ শতাংশ আয়। এবং এই বৈষম্য প্রতিদিন বাড়েই চলেছে। ছয় বছর আগে, ১০ শতাংশ মানুষের হাতে ছিল ৩৫.৮৪ শতাংশ আয়। অন্যদিকে বর্তমানে ১ শতাংশ উপার্জন করেন ১০ শতাংশ মানুষ। কিন্তু কয়েক বছর আগের চিত্রটি এমন ছিল না। তখন সমপরিমাণ মানুষের হাতে ছিল অন্তত ২ শতাংশ আয়। অপর প্রান্তে, প্রতিবেদন অনুযায়ী, দারিদ্র্য কমার গতিও ক্রমাগত কমে আসছে।

২০০০ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত ১.৭৮ শতাংশ হারে আমাদের দারিদ্র্য কমেছে। কিন্তু ২০০৬ সাল থেকে ২০১০ পর্যন্ত বাংলাদেশে দারিদ্র্য কমার হার কমে হয়েছে ১.৭। আর পরের ছয় বছর তা আরও কমে নেমে এসেছে ১.২ শতাংশে। ফলে, পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যই বলছে, আমাদের অর্থনৈতিক বৈষম্য ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। অন্যদিকে, দারিদ্র্য হ্রাসের হারও ক্রমাগত কমে আসছে। যদিও বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে সেকথা অস্বীকার করা হয়েছে। বলা হয়েছে, দেশে দারিদ্র্য বৈষম্য বাড়ছে না, বরং কমছে।

একই জরিপ-প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৪ কোটি মানুষ আজও দরিদ্র এবং ২ কোটিরও বেশি মানুষ হতদরিদ্র। শতকরা হিসাবে তা যথাক্রমে ২৪.৩ শতাংশ ও ১২.৯ শতাংশ। আর সবচেয়ে বেশি গরিব মানুষের বাস রংপুর বিভাগে। অন্যদিকে, দারিদ্র্য হার সবচেয়ে বেশি এরকম ১০টি জেলার মধ্যে রংপুর বিভাগেই ৫টি। কুড়িগ্রাম, রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা ও লালমনিরহাট, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ ও মাগুরা বর্তমানে দেশের সবচেয়ে দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকা। প্রতিবেদনের তথ্য থেকে জানা যায়, আমাদের সম্পদ ও সুযোগ অসমভাবে বণ্টিত। ফলে আমাদের দারিদ্র্যও ব্যাপক অসমভাবে বণ্টিত। যদি আমরা জেলা হিসেবে বিবেচনা করি তাহলে, কুড়িগ্রাম দেশের সবচেয়ে দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চল। এখানকার ৭০.৮ ভাগ মানুষ দারিদ্র্য। কোথাও কোথাও এ হার ৭৭ শতাংশ, তবে ৬৪ শতাংশের নিচে কোথাও নয়। অন্যদিকে দেশে সবচেয়ে কম দারিদ্র্য নারায়ণগঞ্জে। শতকরা হারে যার পরিমাণ ২.৬। স্থানভেদে এর পরিমাণ ৪ থেকে ৬ শতাংশ। ঢাকা জেলায় দারিদ্র্য হার ১০ শতাংশ, চট্টগ্রামে ১৩.৭ শতাংশ। অতএব বলা যায়, দেশে অঞ্চলভেদে দারিদ্র্য হারের পার্থক্য ৭১ থেকে ২.৫। পার্থক্যটা খুবই অস্বাভাবিক ও হতাশাজনক। এটা কোনো সুস্থ অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। এটা কোনো টেকসই অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। এখন প্রশ্ন হলো, কেন এ বৈষম্য? বৈষম্যের নেপথ্যটা কী? এর উত্তর খুঁজতে, আমাদের জানতে হবে, কি আছে অপেক্ষাকৃত কম দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকায়? অথবা কি নেই অধিকতর দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকায়? এই উন্নয়ন বৈষম্যর আদিকথা কী? উত্তরণের পথই বা কী? মনে রাখতে হবে, যদি আমরা বৈষম্য থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে না পাই তবে সে অর্থনীতিকে শক্তিশালী ও টেকসই বলা যাবে না।

২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার সময়, অর্থমন্ত্রী এই দারিদ্র্য ও অসমতার অস্তিত্বকে স্বীকার করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, দারিদ্র্য ও অসমতা হ্রাসের ক্ষেত্রে আমরা কর কাঠামো সংস্কার, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্রঋণ ও দক্ষতামূলক প্রশিক্ষণ, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে আয় হস্তান্তর ইত্যাদি কৌশল প্রয়োগ করে আসছি। সামনের দিনগুলোতে দারিদ্র্য ও অসমতা হ্রাসের দিকে বিশেষ লক্ষ্য থাকবে বলেও তিনি তার বক্তৃতায় উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু যেহেতু চলমান দারিদ্র্য বৈষম্য হ্রাসকরণ প্রক্রিয়া পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে সেহেতু চলমান কর্মপরিকল্পনা পরিবর্তনও আবশ্যক। কিন্তু কীভাবে ও কোন প্রক্রিয়ায় দারিদ্র্য বৈষম্য হ্রাস করা হবে তা তিনি তার পরিকল্পনায় সুনির্দিষ্ট করেননি। ফলে আপাতদৃষ্টিতে, অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাসের ব্যাপারে আমরা কোনো আশার আলো দেখতে পাচ্ছি না। অধিকন্তু প্রতিদিন কোনো এক অজানা কারণে ধনী-দরিদ্র্যের বৈষম্য বাড়ছে। উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের প্রভেদটাও বাড়ছে।

এখন প্রশ্ন হলো, কীভাবে দারিদ্র্য বৈষম্য দূর করা যায়? কীভাবে উন্নয়নবঞ্চিত অঞ্চলকে উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করা যায়। আমাদের উন্নয়নবঞ্চিত অঞ্চলগুলো মূলত কৃষিপ্রধান। যেহেতু বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে, বন্যা ও খরা ফসলকে বিনষ্ট করছে। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করতে সবার আগে কৃষিকে ব্যাপকভাবে বীমার আওতায় আনতে হবে। কৃষিপণ্যের যথাযথ মূল্য নিশ্চিতকরণ করতে হবে। কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণের জন্য আলাদা কমিশন থাকতে পারে। কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে সমবায় প্রথা জোরদার করতে হবে। কৃষক যেন সরাসরি ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছে দিতে পারে সে অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। অন্যদিকে, দেশের উন্নত অঞ্চলগুলো কমবেশি শিল্পে এগিয়ে। ফলে দারিদ্র্যপ্রবণ অঞ্চলে ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ ঘটাতে হবে। এ জন্য বেসরকারি খাতকে নানাভাবে উৎসাহিত করতে হবে। সঞ্চয় প্রবণতা বৃদ্ধির জন্য সুদের হার, মূল্যস্ফীতি ও করহার কমাতে হবে। এসব উন্নয়নবঞ্চিত অঞ্চলে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে এসব অঞ্চলে কর-অবকাশ সুবিধা চালু করা যেতে পারে। বর্তমান বাজেটে বিশেষ থোক বরাদ্দের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে সংকট মোকাবেলার ব্যবস্থা থাকাও অতীব জরুরি। আমরা কোনো অবস্থাতেই উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে অধিকারগত পার্থক্য সৃষ্টি করতে পারি না। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের উন্নয়নপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এমন কোনো কার্যক্রম সম্পূর্ণ পরিহার্য। মুদ্রাস্ফীতি কমলে সঞ্চয়প্রবণতা বাড়বে। ফলে আঞ্চলিক বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাহীন করতে মূল্যস্ফীতি কমাতে হবে। তা না হলে, বাধাগ্রস্ত হবে বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথ।

গণমানুষের প্রতি সরকারের দায় অনেকটা বেশি। যা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। বৈষম্য হ্রাসকরণে সরকারের ভূমিকা আরও অনেক বেশি ইতিবাচক হওয়া উচিত। এবার সময় এসেছে উন্নয়নবঞ্চিত মানুষের প্রতি দায় মেটানোর। সামাজিক নিরাপত্তা ও উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে সেই দায় মেটানো সম্ভব। বঞ্চিত এলাকার মানুষের প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে হবে সরকারকে। তাদের মুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় স্থায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

২০২৪ সালে আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবেশ করব উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে। অভিনন্দন বাংলাদেশ। তবে, প্রাপ্তির কিছু যন্ত্রণা আছে। সে যন্ত্রণা বেশ আনন্দময়। ২০২৭ সালের পর আমাদের রপ্তানি আয় ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। বৈদেশিক ঋণ ও বিনিয়োগ প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে। অতিরিক্ত প্রায় ১.৫ শতাংশ হারে সুদ গুনতে হতে পারে আমাদের। ফলে এই আনন্দ মুহূর্তে, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায়, আমাদের দারিদ্র্য বৈষম্য আরও ব্যাপক বাড়তে পারে। ফলে আজই আমাদের শক্তিশালী প্রস্তুতি আবশ্যক। দারিদ্র্য বৈষম্য বিমোচনে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে আজ এবং এখনই। শুধু প্রবৃদ্ধি ও সূচক উন্নয়নের পেছনে না ছুটে সমতার পেছনে ছুটতে হবে। প্রয়োজনে সংবিধানের আলোকে, পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ বরাদ্দের ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের লড়াইটা হোক বৈষম্যহীনতার বিরুদ্ধে। বৈষম্যহীন অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে, জিডিপির পেছনে না ছুটে সম্পদ ও আয় সুষম বণ্টনের পেছনে ছুটতে হবে। সুষম উন্নয়নের জন্য মহাকর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে; এবং তা এখন থেকেই। মনে রাখতে হবে, আমাদের অর্থনীতির মূল চ্যালেঞ্জ হলো সম্পদ ও আয় সুষম বণ্টন, অন্য কিছু নয়।

উমর ফারুক : শিক্ষক, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
ই-মেইল : faruque1712@gmail.com