প্রাণের শহর চৌমুহনীর এ কোন চেহারা!

ঢাকা, সোমবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২১ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

প্রাণের শহর চৌমুহনীর এ কোন চেহারা!

অপর্ণা দত্তগুপ্ত
🕐 ১:০৬ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৯, ২০২১

প্রাণের শহর চৌমুহনীর এ কোন চেহারা!

কী দিয়ে শুরু করব? গত কয়েক দিন থেকে মানসিকভাবে খুবই বিধ্বস্ত। তারপরও কলম নিয়ে বসেছি অনেকটা দায়বদ্ধতার জন্য। নিজেকে কিছুটা ভালো রাখার জন্য। আমাকে ভালো থাকতে হবে। বেঁচে থাকতে হবে। কেননা এত সহজেই হার মানা যাবে না।

যখন দেখি আমার মতন অনেকেই আমার চৌমুহনী শহর বিপর্যস্ত হওয়ার ফলে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হলেও আক্রান্ত চৌমুহনী শহরের মানুষগুলোর পাশে আছেন; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা টেলিভিশনে টকশোতে এসে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন তাদের দেখে সাহস পাচ্ছি। চৌমুহনী শহরে আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা, লেখাপড়া, চাকরি- সব।

একসময় চাকরি নিয়ে ঢাকায় আসা। চৌমুহনীর প্রতিটি অলিগলি আমার চেনা। রাম ঠাকুরের আশ্রম আমার শৈশব, কৈশোর এবং যৌবনের অনেক স্মৃতি। রাম ঠাকুরের আশ্রম আমার পরিবারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রতি বছর বৈশাখ মাসে অক্ষয় তৃতীয়াতে খুব বড় উৎসব হয়। দেশ-বিদেশের অনেক সনাতন ধর্মাবলম্বী এখানেই আসেন। নোয়াখালী জেলার অন্য ধর্মাবলম্বীরা এই আশ্রমের ইতিহাস জানেন।

আমার বিশ্বাস, চৌমুহনী শহরে আক্রান্ত মন্দিরগুলো স্থানীয়রা কেউ ক্ষতি করেনি। ’৭১ সালে যে মন্দির ভাঙতে কেউ সাহস পায়নি, সে মন্দির মুজিববর্ষ অর্থাৎ স্বাধীনতার ৫০ বছরে আক্রান্ত হয়েছে। চৌমুহনী শহরে যে দোকানগুলো লুট হয়েছে এগুলো অনেক পুরনো, আমার জন্মেরও আগে। ভারতের বাবরি মসজিদ আক্রান্ত হওয়ার পর দেশে অনেক মন্দির আক্রান্ত হয়েছে কিন্তু চৌমুহনী শহরের কোনো মন্দির বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হয়নি।

কিন্তু এবার কেন? নোয়াখালী জেলা একসময় বিরোধী দলের ঘাঁটি ছিল কিন্তু বর্তমানে সংসদ সদস্য সব সরকারি দলের। তাহলে এত সন্ত্রাসী কেন এ জেলায়? ১৯৭১ সালে তো এত সন্ত্রাসী বাড়িঘর লুট করতে আসেনি। অথচ হাজার হাজার দানব এবার এসেছে মন্দির ভাঙতে, দোকান লুট করতে। একটা দলের এতজন সংসদ সদস্য থেকে কী লাভ হলো?

চৌমুহনীতে ১৯৭১ এর পূর্বে এবং স্বাধীনতার পরও অনেক বছর মাত্র একটা পূজা হতো। আশির দশক থেকে আস্তে আস্তে পূজার সংখ্যা বাড়তে থাকে। কোনোদিন কোনো মণ্ডপে সিসিটিভি রাখার প্রয়োজন হয়নি। আজকে কেন মনে হয়েছে সিসিটিভি প্রয়োজন? সমাজ সামনের দিকে এগিয়ে যায়, সমাজ কখনো পেছনে ফিরে যায় না। অতীতে চৌমুহনী শহরে সম্প্রীতির বন্ধন ছিল, এখনো আছে। প্রকাশনার যাত্রা শুরু হয় চৌমুহনীতে, অনেক নামীদামি ব্যবসায়ী এই চৌমুহনী শহরের। দেশের অর্থনীতিতে এদের ভূমিকা অনেক। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে একজন নাগরিকের যেমন অন্যতম প্রধান কর্তব্য আয়কর দেওয়া তেমনি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিককে নিরাপত্তা দেওয়া। কিন্তু আমরা কি সেটা পাচ্ছি?

কিছুদিন আগে প্রতিবেশী দেশে নাগরিকত্ব আইন নিয়ে যে তাণ্ডব হয়েছে সেখানে সরকারের কাজের বিরুদ্ধে বিরোধী দল যেভাবে সোচ্চার হলো এবং অনেক রাষ্ট্রীয় পদক পাওয়া ব্যক্তি পদক বর্জন করেছেন যা প্রশংসনীয়। আর আমাদের বিরোধী দলের ভূমিকা হতাশাজনক যা আমরা দেখছি। আমরা যারা সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু সাধারণ নাগরিক তারা এর মধ্যেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছি সরকারি বা বিরোধী দলের ভূমিকা দেখে। শারদীয় দুর্গোৎসবের যে সমস্ত শহর দানবরূপী মানুষ দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে তাদের (শহরবাসীকে) রক্ষা করতে সরকারি ও বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা সময়মতো এগিয়ে এলে আজ এই ভয়াবহ অবস্থা হতো না। তবে এগিয়ে এসেছে সাধারণ মানুষ, যাদের কোনো স্বার্থ নেই।

লেখাটি শেষ করছি কুসুমকুমারী দাশের ‘আদর্শ ছেলে’ কবিতার কয়েকটি লাইন দিয়ে-

আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?
মুখে হাসি বুকে বল, তেজে ভরা মন
‘মানুষ হইতে হবে’- এই তার পণ...।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক ও কলাম লেখক।

aparnadattagupta30@gmail.com

 
Electronic Paper