করোনা সংকট : শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষক

ঢাকা, সোমবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২১ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

করোনা সংকট : শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষক

বাসুদেব খাস্তগীর
🕐 ১২:১৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৯, ২০২১

করোনা সংকট : শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষক

প্রায় দেড় বছর পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলেছে। ধীরে ধীরে শিক্ষাব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়ে যাবে এ প্রত্যাশা সকলের। কিন্তু এ দেড় বছরে শিক্ষাব্যবস্থার যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল তা পুষিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে নানা চিন্তাভাবনা চলমান আছে। শিক্ষাব্যবস্থা যে এভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হবে কেউ কল্পনা করেনি।

পৃথিবীর প্রত্যেকটা দেশের শিক্ষাব্যবস্থাসহ এমন কোনো সেক্টর নেই, যার ওপর করেনার নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। তবে উন্নত দেশগুলো তাদের প্রযুক্তিগত সুবিধার কারণে শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষতিকে নানাভাবে পুষিয়ে নিয়েছে। আমাদের মতো দেশে তা পারা যায়নি নানা সীমাবদ্ধতার কারণে। পৃথিবীর প্রায় সকল দেশে শিক্ষাব্যবস্থা স্থবির থাকলেও ইউনিসেফের এক পরিসংখ্যানগত তথ্যে
জানা যায়, গত বছরের মার্চ থেকে এ বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত একনাগাড়ে এতদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল এ রকম দেশ পৃথিবীতে মাত্র ১৩টি। এ ১৩টির মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার আমাদের দেশও আছে।

এসব দেশে এত দীর্ঘ সময় প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ১৬ কোটি ৮০ লক্ষ শিক্ষার্থী। আমাদের দেশের প্রায় ৩ কোটি ৭০ লক্ষ শিক্ষার্থী। শিক্ষাব্যবস্থার এ বিপর্যয়ে সবচাইতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের ওপর। তারা এখন অনেকটা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তাদের প্রস্তুতি আশা-ভরসা ও জীবনের স্বপ্নগুলো যেন এক অনিশ্চয়তার দোলাচলে দোল খাচ্ছে। এক ধরনের হতাশায় নিমজ্জিত তারা। তাদের এ হতাশার সঙ্গে উদ্বিগ্ন অভিভাবক এবং শিক্ষকমণ্ডলীও।

দেশের সার্বিক এ পরিস্থিতিতে পালিত গত ৫ অক্টোবর পালিত হলো বিশ্ব শিক্ষক দিবস। করোনার এ সময়ে তাই সঙ্গত কারণে এবারের অর্থাৎ ২০২১ সালের প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ‘শিক্ষকই শিক্ষা পুনরুদ্ধারের কেন্দ্রবিন্দুতে’। অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে সমসাময়িক বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে যে বিষয়টার কথা বলা হয়েছে তা সময়ের প্রেক্ষিতে অনেক আলোচনার দাবি রাখে। শিক্ষাব্যবস্থার এ ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। আসলে শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালিত হয় নানামুখী পক্ষের সমন্বয় কার্যক্রমের মাধ্যমে।

এখানে শিক্ষকের পাশাপাশি আছে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষা সংশ্লিষ্ট নানা প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ। এটি একটি বহুমুখী কার্যক্রম। কারও একক প্রচেষ্টায় এ সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। শিক্ষকরা সবসময়ই নানাপক্ষের মধ্যে শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতেই থাকেন। তবে বর্তমান সময়ে বলা হচ্ছে, শিক্ষা ক্ষেত্রে যে আমরা পিছিয়ে আছি তা থেকে উত্তরণের জন্য শিক্ষকরাই হচ্ছেন আশা-ভরসার সর্বশেষ স্থল।

উন্নত দেশগুলোর উত্তরণের সঙ্গে আমাদের দেশের তুলনা করা যাবে না। আমরা আমাদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সকলেই ওয়াকিবহাল। শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘অনির্দিষ্টকাল তো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে চলা সম্ভব নয়। তাই সর্বস্তরের সব শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের টিকাদান নিশ্চিত করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যত দ্রুত সম্ভব খুলে দিতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে ক্লাস রুম এডুকেশনের কোনো বিকল্প হয় না। শিক্ষার বড় অংশ হলো তার ব্যবহারিক ও প্রায়োগিক দিকগুলো। অনলাইনের মাধ্যমে থিওরিটিক্যাল টপিক পড়ানো সম্ভব হলেও জ্ঞানের সব দিক তার অধীনে আসে না। আর মাথায় রাখতে হবে আমাদের দেশে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী সমাজের সুবিধাবঞ্চিত অংশ। তাদের কাছে তো কোনো ডিজিটাল ডিভাইস নেই।’

তার এ কথার মধ্য দিয়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি সামগ্রিক চিত্র ফুটে উঠেছে। সমস্ত শিক্ষার্থীদের টিকা দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পরিকল্পনা থাকলে বাস্তবতা বিবেচনায় তা করা যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ও খুলে যাচ্ছে। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের যে কথা বলা হয়েছে তা চরম বাস্তবতা। যে বিষয়টা তিনি বলেছেন ক্লাস রুম এডুকেশনের কোনো বিকল্প হয় না। এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথন।

শিক্ষকের সঙ্গে শিক্ষার্থীর পাঠদানের যে সরাসরি সম্পর্ক তার যে কোনো বিকল্প নেই, করোনাকালীন বাস্তবতা তা আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে। এখানে শিক্ষাদানে শিক্ষকের গুরুত্ব স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। বতর্মান পিছিয়ে পড়া শিক্ষা ব্যবস্থাকে টেনে তুলে ধরতে হলে শিক্ষকই হচ্ছেন ঠিকই সবার কেন্দ্রবিন্দুতে। শিক্ষকের এ কার্য এত সহজ ও মসৃণ নয়। এই দেড় বছরের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য সামনের কাতারের সৈনিক হচ্ছেন শিক্ষকরা। এজন্য প্রয়োজন একটি সুন্দর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা।

ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত তিন শিক্ষা বর্ষের দুই শিক্ষাবর্ষের অর্থাৎ ২০২১ ও ২০২২ সালের সিলেবাস সংকুচিত করা হয়েছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় আমলাতান্ত্রিকতা অনেক সময় নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। জোর করে চাপিয়ে দেওয়া কোনো কিছুতে বাস্তবে কিছু অর্জিত হয় না। অনলাইন শিক্ষার নামে করোনাকালে যা করা হয়েছে তার সুবিধাভোগী নিতান্তই নগণ্য। এখন সরাসরি ক্লাসে ফিরে গিয়ে শিক্ষকদের আবার নতুন করে সব শুরু করতে হয়েছে। করোনা সংক্রমণ ধীরে ধীরে কমছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার প্রাথমিক এ পর্যায়ে আমাদের ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার প্রাথমিক এ পর্যায়কে অন্য সময়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকার সময়ের সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করা ঠিক হবে না। ক্ষতি যা হওয়ার হয়েছে। ধীরে ধীরে তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে হবে। শিক্ষকদের ওপর জোর করে চাপিয়ে দিয়ে তা করার চেষ্টা হবে ভুল। ওষুধ যেমন নির্দিষ্ট মাত্রার বেশি দেওয়া যায় না, পড়াশোনার ব্যাপারটাও সেরকম। দেড় বছরে ক্ষতি সহজেই স্বল্প সময়ে পুষিয়ে দেওয়া যায় না। শিক্ষার্থীদের মেধা-মনন বুঝে তা করতে হবে। শিক্ষকরাই হচ্ছেন চালিকাশক্তি বা ত্রাণকর্তা। এখানে তাদের দায়িত্বও অনেক। সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে তারা নিশ্চয়ই এই সময়ে সামনের কাতারে। করোনা পরবর্তী এসময়ে শিক্ষার্থীদের পূর্ণোদ্যমে ক্লাসে ফেরানো একটি চ্যালেঞ্জও বটে।

শিক্ষকরা কীভাবে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরাবেন, তাদের দীর্ঘদিনের ঘাটতি নিরসনে শিক্ষকের ভূমিকাই বা কী হতে পারে তার জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিমালা। সত্য যে, শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও দক্ষতাজনিত ক্ষতি পুষিয়ে নিতে শিক্ষকদের ভূমিকার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। শিক্ষার্থীদের ওপর শিক্ষকের প্রভাব সর্বজনস্বীকৃত। শিক্ষার্থীদের তাদের স্বাভাবিক পাঠক্রমে ফিরিয়ে আনতে কাউন্সিলিং করতে পারেন শিক্ষকরা। আমাদের দেশে করোনা বা কোভিড নিয়ে অনেক কুসংস্কার রয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ হার বেশি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এর প্রভাব পড়তে পারে, বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত প্রত্যন্ত অঞ্চলে। কোভিড সম্পর্কে অনেকের ধারণা মিথ্যা ও ভুলে ভরা। এ ধারণা থেকে বের করে আনাও সচেতন জনগোষ্ঠী হিসেবে শিক্ষকদেরই দায়িত্ব। সঠিক তথ্য জানানোর জন্য ও কুসংস্কারমুক্ত করার জন্য শিক্ষকদের কাজ করা দরকার।

দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে না আসার কারণে শিক্ষার্থীরা প্রাত্যহিক যে জীবনযাপন করত সেখানে ছন্দপতন ঘটেছে। এই শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ালেখায় ফিরিয়ে আনতে হবে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকের সুসম্পর্কই তাদের আবার ছন্দে ফেরাতে পারে। শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে রয়েছে অনেকদিন। ফলে অনুমান করা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ আর ক্লাসে ফেরার সম্ভাবনা কম।

বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বলছে, এই করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ফলে শিশুশ্রম বৃদ্ধি পেয়েছে, বাল্যবিবাহের হার বৃদ্ধি পেয়েছে, ঝরে পড়ার হার বেড়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক শিক্ষার্থীর পরিবারে জীবনযাপন পদ্ধতিতেও নানা ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। এই পরিবর্তন অনেকটা অর্থনৈতিক। যার কারণে এ পরিবারের সন্তানরা আর শিক্ষাব্যবস্থায় না-ও ফিরতে পারে। এমন সব শিক্ষার্থীকে ক্লাসে ফেরানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। সুবিধাবঞ্চিত প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনার জন্য কী কী করা যেতে পারে তার জন্য প্রয়োজন সামগ্রিক পরিকল্পনা। শিক্ষকরা হতে পারেন সে পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ।

আমাদের দেশে দ্রুতগতির ইন্টারনেটের সুবিধা না থাকা, ইন্টারনেট ডাটার উচ্চমূল্য, স্মার্ট ডিভাইস না থাকার অসুবিধা প্রভৃতি ইস্যুতে সারাদেশে হয়তো অনলাইন ক্লাস সমানভাবে কার্যকর হতে পারেনি। তবে এ অনলাইন প্লাটফর্ম ব্যবহার করে ক্লাস করার যে দিক, তার অবশ্যই একটি ইতিবাচক দিক আছে। সেটা হচ্ছে এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন। এ অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে শিক্ষার ক্ষতি লাঘব করার ব্যবস্থা কীভাবে করা যায় সে চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রও প্রসারিত করা যেতে পারে। নতুন পরিস্থিতিতে শিক্ষা কার্যক্রম চালানোর জন্য শিক্ষকদেরও নতুন নতুন দক্ষতার প্রয়োজন হতে পারে। শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ফেরানো, মানসিক সহায়তা প্রদান সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে কার্যকর উপায়ে পড়ানো- বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে অনলাইনে শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণ কোর্সের ব্যবস্থা করা গেলে সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থাই উপকৃত হবে।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্লাস করার নিয়ম, কীভাবে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা যায়, মাস্ক পরার সঠিক নিয়ম প্রভৃতি বিষয়ে সঠিক ধারণা দেওয়ার জন্য শিক্ষকরা পদক্ষেপ নিতে পারেন। পাঠে মনোযোগ ফিরিয়ে আনা ও পাঠদানকে আনন্দদায়ক করতে শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার করতে পারেন। করোনাকালে শিক্ষকরা এসব বিষয়ে অনেকটা ধারণা লাভ করেছেন। তাদের আগের অনাগ্রহের জায়গাটা এখন আর সে পর্যায়ে নেই। আইসিটি ব্যবহারের জড়তা কেটে তারা অনেকটাই এখন প্রযুক্তিনির্ভর।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের জন্য করোনার এ সময়ে একটি পরিবেশ সৃষ্টি দরকার। যে পরিবেশ হবে আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ। শিক্ষাব্যবস্থায় এই যে আমরা নানাপক্ষের কথা বলছি প্রকৃতপক্ষে এখানে শিক্ষকের চেয়ে উত্তম অন্য কিছুই হতে পারে না। শিক্ষক হচ্ছেন জাতি গড়ার সুনিপুণ কারিগর।

শিক্ষকদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে আমেরিকার বিখ্যাত ইতিহাসবিদ হেনরি এডামস বলেছিলেন, ‘একজন শিক্ষক সামগ্রিকভাবে প্রভাব ফেলে, কেউ বলতে পারে না তার প্রভাব কোথায় গিয়ে শেষ হয়।’ সেজন্য সমাজে প্রভাব বিস্তারকারী শক্তিশালী একটি উপাদান হচ্ছে শিক্ষক সমাজ। শিক্ষকই তার প্রভাব ও মেধা খাটিয়ে শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া থেকে জাতিকে পুনরুদ্ধার করতে পারেন। জাতির এ ক্রান্তিকালে শিক্ষকের বিকল্প নেই। তাকে প্রয়োজনে আরও বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। তার জন্য প্রয়োজন একটি রোডম্যাপ। শিক্ষকদের এ কর্মযজ্ঞে পরামর্শ নেওয়া যায় শিক্ষক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে। কিন্তু এদেশের বাস্তবতা হচ্ছে যাদের দিয়ে কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয় তাদের সঙ্গে পরামর্শের গরজ কেউ অনুভব করেন না।

এ দেশে অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাপনার উদাহরণ খুব কম। চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা থেকে ক্ষোভের জন্ম হয়। যেখানে ক্ষোভ থাকে, সেখানে আন্তরিকতা থাকে না। আন্তরিকতা না থাকলে সেখানে পড়াশোনার পরিবেশ সৃষ্টি হয় না। আমাদের মোট শিক্ষাব্যবস্থার নব্বই ভাগের বেশি বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থা। এ সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় নানামুখী প্রভাব বলয়ে। এক এক প্রতিষ্ঠানে এক এক ধরনের পরিবেশ। সরকার শতভাগ বেতন ভাতা দিলেও সেখানে সরকারের সরাসরি প্রভাব নেই। রাজনৈতিক নানা মেরুকরণের প্রভাবে অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাদানের চেয়ে শিক্ষকদের চাপে রাখার কৌশলে মগ্ন থাকেন অনেকেই। সময় এসেছে এগুলো থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষার একটি সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করার।

আমরা জানি, শিক্ষকতা শুধু চাকরি হিসেবে বিবেচ্য নয়। শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে দেওয়ার মতো মানসিকতা এবং দক্ষতা দুটোর সমন্বয় শিক্ষকের মধ্যে থাকা উচিত। কর্তব্যনিষ্ঠা, পরিশ্রম, দায়বদ্ধতা, দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলাবোধ থেকেই শিক্ষার্থীদের প্রেরণার উৎস হিসেবে বিবেচিত হন শিক্ষক। দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা, মানবিকতাবোধ, দেশপ্রেম সবকিছু শিক্ষাদান করাই শিক্ষকের কর্তব্য। শিক্ষার্থীদের কাছে একজন শিক্ষক হবেন পথপ্রদর্শক। বিপর্যস্ত শিক্ষা পুনরুদ্ধারে শিক্ষককে হতে হবে বুদ্ধিদীপ্ত, আন্তরিক, গবেষণাকর্মী ও সর্বোপরি একজন পথপ্রদর্শক। কিন্তু বাস্তবতায় এটিও আমাদের ভাবতে হবে করোনা শিক্ষাব্যবস্থায় যে সংকট সৃষ্টি করেছে তার প্রভাবে অনেক শিক্ষকের জীবনও আজ বিপর্যস্ত।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী ছাড়া অন্য সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রকৃতপক্ষে নানা সংকটে। কিন্ডারগার্টেন, জাতীয়করণ না হওয়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা, নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অস্থায়ী ও খণ্ডকালীন হিসেবে কর্মরত অনেক শিক্ষক ও কর্মচারী দুর্বিষহ দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের বেতন-ভাতা দিয়ে চলে।

গ্রামাঞ্চলে অধিকাংশ অভিভাবকেরই এখন বেতন দেওয়ার সামর্থ্য কমে গেছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা অনেকদিন ধরে বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত। এমনিতেই তারা স্বল্প বেতন পেতেন, সেই বেতন বন্ধ হওয়ায় এবং বাড়তি কাজ করে যে অর্থ আয় করতেন সে সবও বন্ধ হওয়ায় তারা এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অনেকেই জীবিকা পরিবর্তন করছেন বাধ্য হয়ে। বেঁচে থাকার জন্য শিক্ষকদের দুর্দশার যে চিত্র উঠে এসেছে তা বর্ণনাতীত।

শিক্ষক সমাজের অনেকে পেটের দায়ে কৃষিকাজ করছেন, ভ্যান চালাচ্ছেন, ইজিবাইক চালাচ্ছেন, ফল ও সবজি বিক্রি করছেন, রাজমিস্ত্রির কাজ করছেন। অথচ আমরাই এদের জাতি গঠনের কারিগর বলি। শহর ছেড়ে অনেকে চলে গেছেন গ্রামে।
শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেছেন, ‘করোনাকালে বাধ্য হয়েই আমাদের অনেক কিছু করতে হয়েছে। এর কোনো বিকল্প ছিল না। এখন এই ক্ষতিপূরণ এবং এটা থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে হবে।’

১৯৬৬ সালে ইউনেসকো আয়োজিত শিক্ষকের মর্যাদা ও অধিকারবিষয়ক সম্মেলনে সমাজের প্রতি শিক্ষকদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাদের বেতন, পদোন্নতি, চাকরির নিরাপত্তাসহ সব সুযোগ-সুবিধা স্বাভাবিক সময়ের মতো যে কোনো দুর্যোগেও নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। অথচ করোনাকালীন এ দুর্যোগে অনেক শিক্ষককে এ নিশ্চয়তার আওতায় আনা যায়নি এবং তারা অন্তরালেই রয়ে গেলেন। যে করোনা সমস্ত শিক্ষককে পথে বসিয়েছে, শিক্ষকদের নিয়ে শিক্ষা পুনরুদ্ধারের কথা বলার এ সময়ে তাদের কথাও আমাদের ভাবতে হবে। শিক্ষার সামগ্রিক ভাবনার সঙ্গে শিক্ষা জাতীয়করণের দাবি বাস্তবায়িত হলে শিক্ষা পুনরুদ্ধারের ভাবনাও গতিশীল হবে। কারণ শিক্ষা ও শিক্ষক শিক্ষাব্যবস্থারই এপিঠ-ওপিঠ। একটিকে ছাড়া অন্যটি অর্থহীন।

লেখক : প্রাবন্ধিক, সহকারী অধ্যাপক, বি এম সি ডিগ্রি কলেজ, চট্টগ্রাম।

 
Electronic Paper