বিস্মৃতপ্রায় কবি গোপেন্দ্রনাথ সরকার

ঢাকা, বুধবার, ২০ অক্টোবর ২০২১ | ৪ কার্তিক ১৪২৮

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

বিস্মৃতপ্রায় কবি গোপেন্দ্রনাথ সরকার

এনাম রাজু
🕐 ২:২০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২১

বিস্মৃতপ্রায় কবি গোপেন্দ্রনাথ সরকার

কবিতাই বাঙালি জাতির মননশীল চিন্তা, চেতনা ও ভাব প্রকাশের প্রধান ও প্রথম ফসল। কবিতার মধ্য দিয়েই এ জাতি রুখে দিতে শিখেছে অন্যায়, অত্যাচার ও শাসকগোষ্ঠীর শোষণ। কবিতার মাধ্যমেই প্রকাশ করতে পেরেছে মানবতা, প্রেম, বিরহ-বিচ্ছেদ, মিলনের সুখ। তাই হয়তো কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ বলেছেন- ‘কবিতা আমাদের সবচেয়ে প্রাণবন্ত, সবচেয়ে গতিশীল, সবচেয়ে উৎকৃষ্ট শিল্প মাধ্যম।’

একজন কবির জন্য খাতা কলমের তেমন প্রয়োজন নাও হতে পারে। তবে তার লেখাকে লিপিবদ্ধ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, গবেষকের দায়িত্ব। যদিও এখন সময়টা ভিন্ন। কারণ আপনি মানবেন কিনা বাংলা সাহিত্য ভাণ্ডারকে সবচেয়ে সমৃদ্ধ করেছেন লালন। তিনি যা রচনা করেছেন তা লিপিবদ্ধ করার তেমন প্রয়োজন ছিল না তার। কিন্তু সময়ের প্রয়োজনে তা লিপিবদ্ধ হয়েছে বলেই আজও লালন বেঁচে আছে মানুষের হৃদয়ে। কিন্তু যেই লিপিবদ্ধ করুক না কেন সেটা সঠিক সময়ে না হলে তার গুরুত্ব কমে যায়। এমনকি সময়ের পরিবর্তনে কখনো কখনো লিপিবদ্ধ হলেও সেসব লেখার প্রয়োজনীয়তা হারিয়ে যায় কালের গর্তে।

কবির প্রধান ও প্রয়োজনীয় বিষয় হলো-শব্দের মায়াজাল। তাই বলা যায় শব্দই কবির গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। তাই শব্দের মালা গাঁথার সময় কবিকে এতটাই সতর্কতার পথে হাঁটতে হবে যেভাবে গোপন প্রেমিক সাক্ষাৎ করে প্রিয়ার সঙ্গে। এজন্য কবিকে রপ্ত করতে হয় শব্দের গাঁথুনি, সেই গাঁথুনি যত নিখুঁত ততই শ্রুতিমধুর হয়ে ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বময়। আর খাতা বা বই হলো পাঠকের জন্য। ‘কবিকে পাঠ করতে চাইলে পাঠক হয়তো বই খুঁজবে, কিন্তু কবির জন্য ততটা গুরুত্ব আনে না।’ কবিতা শান্তির কথা বলে। এই শান্তির পথ খুবই ধীর গতিতে প্রোথিত হয় সমাজে। কবিতা যেহেতু কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, তাই তার ভালোর পথটি সমাজে আজীবন বিস্তার করে রাখে। এজন্য সমাজে যখন অশান্তি, মানুষের দামে মানুষ বিক্রি হয়, প্রকৃতি পরীক্ষা নেয় প্রাণের, সমুদ্রের বুকে ডুবে যায় হাজারো সমাজপতি। তখনো কবি কোনো গাছতলায় বা যাত্রীবাহী গাড়িতে বসে তার প্রেমিকার অবয়ব তুলে ধরেন। আর এজন্য সমাজও কবিকে তিরস্কৃত করতে পারে। ছুড়ে ফেলতে পারে কথার ডাস্টবিনে। কিন্তু তাতে কবির কিছুই আসে না। কেননা পৃথিবীতে আজন্ম কবিরা জাগতিক সুখকে দূরে ঠেলে দিয়েছে।

কথা হলো একজন কবির জন্য বই প্রকাশ করা বা তার লেখাগুলো লিপিবদ্ধ করা কতটা জরুরি। নিঃসন্দেহে এটা একজন কবির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কেননা একজন লেখক প্রথমত বেঁচে থাকেন তার লেখা পাঠকের মনে যতদিন চর্চা হয়। দ্বিতীয়ত সময়ের কারণে কখনো কখনো কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে পারে লেখক। সেকেলে থেকে তার লেখার ধরন, ভাষার ব্যবহার, হারিয়ে ফেলতে পারে স্রোতের টানে তার লেখার গ্রহণযোগ্যতা। কিন্তু এসব বিচারের জন্যও প্রয়োজন কবির লিপিবদ্ধ লেখা। এর প্রয়োজনীয়তা খুব অল্প করেই বলতে পারি- চর্যাপদের উদাহরণ টেনে। যদি চর্যাপদগুলো লিখিতরূপে সংরক্ষিত না থাকত তাহলে বাংলা সাহিত্য পেত না সাহিত্যের আদিরূপ। যদি লালনকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কাজ না করতেন তাহলে কালের গহ্বরে হয়তো হারিয়ে যেত তার কালজয়ী অনেক গীতিকবিতা। এজন্যই খুব প্রয়োজন একজন লেখকের জন্য লিপিবদ্ধ আকারে লেখাগুলো রাখা। কিন্তু লেখকই যে লিপিবদ্ধ লেখার প্রতি যতœশীল হবেন তা নয়। আবার অনেক লেখক আছেন যারা জীবদ্দশায় সাহিত্যচর্চার মধ্যে সময় কাটিয়েছেন। সমকালীন সব পত্রপত্রিকায় দাপটের সঙ্গে লিখে গিয়েছেন। কিন্তু প্রকাশিত হয়নি কোনো বই। এমন লেখকদের সংখ্যাও কম নয়। এমন লেখকদের জীবদ্দশায় বই আকারে লেখাগুলো প্রকাশ না হলেও পরবর্তীকালে কোনো মহৎ সাহিত্যিক, গবেষক এগিয়ে এসেছিলেন। অনেক শ্রমের বিনিময়ে প্রকাশ করতে হয়েছে বই। সেক্ষেত্রে লেখকের সব লেখাই যে পাওয়া গেছে বা প্রকাশ করতে পেরেছে এমন কথা কেউ স্বীকার করেননি। বই বা লিপিবদ্ধ আকারে জীবদ্দশায় নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ পেয়েও যারা নানা প্রতিবন্ধকতায় শেষ পর্যন্ত বই প্রকাশ করেননি। তাদের মধ্যে বাংলা সাহিত্যে অন্যতম একজন প্রাজ্ঞ, রুচিশীল লেখক, মননশীল শব্দকারিগর গোপেন্দ্রনাথ সরকার। নিভৃতচারী এই সাহিত্যিকের বাড়ি কুষ্টিয়া জেলায়। গোপেন্দ্রনাথ সরকার মূলত কবি। বহুমাত্রিক লেখক হিসেবেও তার অবদান স্বীকার করেই নিতে হবে। কবিতার পাশাপাশি গল্প ও প্রবন্ধ লিখেছেন। তিনি একাধারে প্রবাসী, ভারতবর্ষ, বসুমতী, সাধক, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্যপত্রিকাসহ সেই সময়ের সকল পত্রিকায় লেখালেখি করতেন। নিভৃতচারী এই লেখক চাইলে আজ বাংলা সাহিত্যের ভা-ারকে সমৃদ্ধ করতে পারতেন।

লেখক ও গবেষক মাসুদ রহমান উদ্যোগী হয়ে তুলে এনেছেন বিস্মৃতপ্রায় এই লেখকের সাহিত্যকীর্তি। সেটা তার মৃত্যুরও চার দশকের পর। না, গোপেন্দ্রনাথ সরকারের লেখা কোনো গ্রন্থই বাংলা সাহিত্য পায়নি। এর নানাবিধ কারণ থাকতে পারে। সেদিকে না যাওয়াই শ্রেয় এই সংক্ষিপ্ত পরিসরের লেখায়।

গোপেন্দ্রনাথ সরকারের কবিতায় একই সঙ্গে পাওয়া যায় প্রকৃতি, প্রেম, দেশমাতৃকার প্রতি বিনম্র ভালোবাসা, মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতার জয়গান। গল্প ও প্রবন্ধ লিখলেও কবিতাতেই তার হাত যে শক্ত ও পোক্ত তা কবিতা পড়লেই বুঝতে দেরি হবে না। ছন্দবদ্ধ কবিতাগুলো শুরু থেকে শেষপর্যন্ত পড়লেই একটা গল্প, একটা জীবন, একটা সমগ্র পৃথিবী সম্পর্কে প্রোথিত চিত্র পাওয়া যাবে।
কবি একাধারে প্রেমিক, প্রভুভক্ত, অমায়িক ছিলেন। কবিতার মাধ্যমে স্রষ্টাকে পাওয়ার আকুতি জানিয়েছেন প্রার্থনায়। তিনি লিখেছেন-
ওহে ভবধব, বসে আছি তব
পূজা আয়োজন করিয়া,
উদয় হও যে হৃদয় মাঝারে
হৃদয়ের তমঃ নাশিয়া...।
(কবিতা : পূজা)
কবি প্রভুর ভালোবাসা পেতে যে আকুতির কথা জানিয়েছেন তা বর্তমানে এসেও অনেক খ্যাতিমান কবির কবিতায় পাওয়া যায়। তবে তার সেই চাওয়া ও সেই চাওয়াকে পূর্ণতা দিতে যে আরাধনার কথা প্রকাশ করেছেন সেটাও সেই সময়ের জন্য ছিল বিস্ময়ের। যদিও কবির প্রকাশিত কবিতাটির বহু বছর আগেও অনেক গীতিকবি আরাধনায় শব্দচয়ন ও গীতের উপাদান একই বলা যায়। কিন্তু কবি সেই সব প্রচলিত বিষয়গুলোকে কবিতায় ফুটিয়ে তুলেছেন নিখুঁতভাবে। যেমন-
তোমারে পূজিতে নাহি চাই ফুল
হৃদে চাই চিৎ-শকতি,
না চাই তুলসী, না চাহি চন্দন
চাহি প্রাণ ঢালা ভকতি...
কবিতা : পূজা। দৈনিক সুলভ সমাচার (নবপর্যায়); ১২ আশ্বিন, ১৩১৮।
স্রষ্টার প্রতি আবেদন-নিবেদন করে তিনি কয়েকটি কবিতা লিখেছেন। উল্লেখযোগ্য কবিতা- হৃদয়-দেবতা, প্রার্থনা ইত্যাদি। কবি মানেই যেন আবেগপ্রবণ। তাই হয়তো কবির সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক, হৃদয়ের আকুলতা, ব্যর্থতা, গ্লানি একাকার হয়ে রয়। পৃথিবীর সৃষ্টিলগ্ন থেকেই যেন কবি প্রেমিক পুরুষও বটে। তাই তো সেই সময়েও কবি গোপেন্দ্রনাথের কবিতায় বিরহের সুর, প্রেমিকাকে হারানো ব্যথা, একাকিত্বের যন্ত্রণা, প্রেমিকাকে কাছে পাওয়ার আকুতি সহপাঠীকে, স্বজনকে জানাতে ভুল করেনি। কবির ‘বিরহ’ শিরোনামের একটি কবিতায় সেই আবহ দারুণভাবে উঠে এসেছে। কবিতাটি পড়লেই পাঠক বুঝতে পারবেন-
এমন হবে তখন কেন
বুঝিনি বল সই?
হৃদয় ভরা কতই কথা
আজকে কারে কই?
গোপেন্দ্রনাথ সমকালীন সময়ে লিখেছেন- কাব্যচর্চার চিত্র। যে চিত্র বর্তমানেও ছবির মতো ঝকঝকে। কবিতা নিয়ে সব যুগেই যে একটা বাণিজ্য হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। তা তার কবিতায় স্পষ্ট। একটা শ্রেণি নিজের সুনাম অর্জনের জন্য শব্দের জোড়াতালি দিয়ে নিজেকে জাতে তোলে। আরেক শ্রেণি কবি ও কবিতা নিয়ে বরাবরই বাণিজ্য করেছেন খুব গোপনে, খুব প্রকাশ্যেও। সেই যুগেও ছিল, এখনো স্পষ্ট। সেই সময়েও ছিল আমলা, ধনিক শ্রেণি, অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী এই দলের, এখনো। অবশ্য বর্তমানে নারীরাই এই দলের অন্যতম কারিগর, ক্রেতা, গ্রহীতা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রবাসী নারী। সুন্দরী হলে তো সব পথই খোলা আনন্দ মাঠ। বর্তমান ও অতীত একই সূত্রে গেঁথেছেন কবি গোপেন্দ্রনাথ সরকার। যা সেই যুগ ধরে বর্তমানের সিঁড়ি বেয়ে যেন ভবিষ্যতকে ইশারা করছে। কবির এই ভবিষ্যৎ চিন্তাই একজন সফল কবি হিসেবে তাকে পাঠে রাখা দরকার। কবিতা ‘আমার স্বপ্ন’ পড়লে অন্তত তাই মনে হয়-
ভেবে ভেবে করলুম ঠিক, হতেই হবে কবি
ছোটখাটো নয়, একবারে কবির সেরা রবি।
কবি হলেই অল্পদিনে সুনাম নেওয়া সোজা
লেখা? যা হোক, মিল থাকা চাই, না যাক মানে বোঝা...।
কবির ‘আমার স্বপ্ন’ কবিতায় যে অভিযোগ করেছেন। সেই অভিযোগ সময়ের ঘড়িতে আজও ঢং ঢং করে। এখনো কবিতায় শব্দের মালা গাথার বদলে শব্দের জঞ্জাল দেখা যায়। কোনো কোনো কবিতায় অন্ত্যমিলের ছড়াছড়ি থাকলেও অর্থ বোঝা কঠিন। আবার কোনো কোনো কবিতা গদ্য কবিতার নাম করে প্রবন্ধ হয়ে যায় বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়।
কবি মহাদেব সাহা বলেছেন- ‘কাগজ আবিষ্কারের পূর্বে মানুষ প্রেমের কবিতা লিখে রেখেছে আকাশে। সেই ভালোবাসার কবিতা এই বৃষ্টি, এই ভরা বর্ষা।’ বর্ষা নিয়ে এমন সুন্দর সুন্দর শব্দের গাঁথুনি প্রায় সকল কবিদের কবিতায় উপস্থিত। গোপেন্দ্রনাথ সরকারও বর্ষাকে ভালোবেসে কবিতায় বর্ষার ছবি, বর্ষাকালীন প্রেমের আকুতি প্রকাশ করেছেন অনেক কবিতায়। বাদল-বেলা, বর্ষা, বর্ষা-নিশীথে কবিতায় বর্ষার চিত্র পাওয়া যায়। শরতের ছবিও কবিতায় তুলে এনেছেন তুলির এক আঁচড়ে।
নারী সব সময়ই অবহেলিত। অথচ এই নারীই পৃথিবীর প্রথম সৌন্দর্য, প্রথম প্রণয়। ‘জরু’ শিরোনামের কবিতায় নারীর সেই অত্যাচারিত হওয়া চিত্র প্রবলভাবে চিত্রায়িত। তিনি বলেছেনÑ
তোমার পরে এ অত্যাচার
যেন তুমি হালের গরু,
কারণ তুমি জেতে নারী...
কারণ তুমি নেহাত জরু।
গোপেন্দ্রনাথ সরকারের কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য- কবিতায় তুলে এনেছেন সমাজ বাস্তবতা। সমাজের সকল বিষয়কে কবিতার অনুষঙ্গ করেছেন সহজ শব্দের গাঁথুনিতে। কবিতায় এনেছেন মানুষের কথা, কল্পকাহিনি, মানুষের অন্ধকার ও আলোর দিক, প্রেম-বিরহ ইত্যাদি। কবি গোপেন্দ্রনাথের অনেক কবিতাই দর্শন হয়ে থাকবে। তার ভবিষ্যৎ চিন্তা কবিতার মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছিলেন। যা এত বছর পর ঠিকই বাস্তবতার রূপ নিয়েছে। এটাই কবির বড় সফলতা। তিনি এজন্য যখন কবি তখন দার্শনিকও। যিনি কবিতায় বড় হতে চেয়েছেন ঠিকই কিন্তু প্রচারবিমুখ ছিলেন। তাই হয়তো তার লেখা কবিতাগুলো জীবদ্দশায় বই হিসেবে দেখে যেতে পারেননি।

গোপেন্দ্রনাথ ছিলেন সমাজসচেতন বহুমাত্রিক লেখক। কবিতার অনুষঙ্গই মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য। তবে কবিতায় ইতিহাসকে ধারণ করাটাও ছিল তার মধ্যে একটা বড় গুণ। কবি গোপেন্দ্রনাথ সেজন্যই হয়তো মাতৃভাষার ওপর, একুশের ওপর কবিতা লিখেছেন। একুশের পঙ্ক্তিমালা শিরোনামে কবিতায় তুলে এনেছেন সেই সময়ের মাতৃভাষার প্রতি বাঙালির চিত্র। কবিতাটি কিছু অংশ-
ওরা চলে গেছে হাসিমুখে নির্বিকার লিখে গেছে:
লালে-লাল অক্ষয় অক্ষরে মাতৃমন্ত্রে প্রাণের বন্দনা
এই ‘একুশের’ সেই শুভ্র ললাটে;
অনির্বাণ জ¦ল-জ¦ল দীপশিখা যেন...।
‘গোপেন্দ্রনাথ সরকারের রচনা সংগ্রহ’ বইটি সুউজ্জ্বল মননের অধিকারী গবেষক ও লেখক মাসুদ রহমানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। যে বই থেকে তথ্য-উপাত্ত নিয়েই উপর্যুক্ত লেখাটি। বইটিতে মোট কবিতা ৪৬টি। উদ্ধৃত কবিতাগুলো মাসুদ রহমানের সম্পাদিত বইটি থেকেই নেওয়া। কবিতা ছাড়াও বইটিতে দুটি গল্পও লিপিবদ্ধ হয়েছে।
‘বাল্যসঙ্গিনী’ গল্পটিতে গল্পকারের গল্প বলা বা স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে ছোটবেলার খেলার সাথীর জীবনের করুণ পরিণতি। দেখানো হয়েছে মানুষের যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায় তখনও স্রষ্টার প্রতি প্রবল বিশ্বাস নিয়ে নিজের আগামীর হিসাব করা। গল্পের নায়িকা প্রধান চরিত্র রামদাসী। তার বাবা রামদয়াল। রামদাসীর বাবা গল্পকথকের বাসায় কাজ করত। তবে গল্পকারের বয়স বাড়ার পূর্বেই রামদয়াল কাজ থেকে অবসর নিয়ে একটি ছোট দোকান দেয়। সেই দোকান দিয়েই তাদের সংসার চলত। প্রায়ই গল্পকারের রামদয়ালের বাসায় যাওয়া হতো। রামদয়াল যেমন প্রভুভক্ত তেমনই নিষ্ঠ ও সরল। হঠাৎ গল্পকারের আত্মীয়ের বিয়ের দাওয়াতে কয়েকদিনের জন্য গ্রামের বাইরে যেতে হয়। কিন্তু ফিরে এসে জানতে পারে তার খেলার সঙ্গীর বিয়ে হয়েছে। সেই খেলার সঙ্গীর সঙ্গে দেখা করার আর্জি পায়। দেখাও হয়। কিন্তু কয়েক বছর পর মন্দিরে গিয়ে এক ভিখারিনীর সঙ্গে দেখা হয়। গল্পকার তাকে চিনতে পারে। সেই তার বাল্যসঙ্গী রামদাসী। তার এই পরিণতির কথা জানতে চাইলে রামদাসী জানায় তার স্বামী ছিল নেশাগ্রস্ত। নেশার কারণে সহায় সম্পত্তি শেষ করেছে। অন্যদিকে ঋণগ্রস্তও হয়েছে এবং একদিন তার স্বামী তাকে ছেড়ে পালিয়ে যায়। আর ফিরে আসেনি।

গল্পকারের ভাষ্যমতে- মাতৃদেবী তাহাকে সঙ্গে করিয়া আনিতে চাহিলেন, আমিও অনেক বলিলাম, কিন্তু সে আসিতে স্বীকৃতা হইল না। বলিল- ‘শুনিতে পাই বিশ্বনাথ, বিশ্বেরই নাথ, অতএব তিনি আমারও নাথ, তিনিই আমাকে রক্ষা করিবেন। আর মা অন্নপূর্ণার দুয়ারে আসিয়া অন্নাভাবে মারা পড়িব কি!’

দ্বিতীয় গল্পটির নাম- ‘গোলাপ কুঁড়ি’। রূপকথার গল্পটিতে নিঃসন্তান রাজা-রাণী চরিত্র চিত্রণ, দৈবক্রমে সন্তান লাভ এবং সন্তান হওয়ার আনন্দে রাজ্যে বসবাস করা তেরজন পরীকে ভোজনের নিমন্ত্রণের গল্প। রাজা-রাণী সন্তান হওয়ার আনন্দকে সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করতে চায়। তার রাজ্যে বসবাস করত তেরজন পরী তাদের নিমন্ত্রণ করার চিন্তা থাকলেও সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় সোনার থালায়। পরীর সংখ্যা তেরজন হলেও সোনার থালা থাকে রাজার বারটা। বারটা থালা হওয়ার কারণে রাজা-রাণী বারজনকেই নিমন্ত্রণ জানায়। খুব আনন্দমুখর পরিবেশে খাওয়া-দাওয়া শুরু হয়। এবং এক এক করে এগারজন পরী রাজার কন্যাকে বর দেয়। কিন্তু যে পরীকে দাওয়াত করা হয়নি আচমকা সে এসে উপস্থিত। শুধু কি উপস্থিত? বরং রাজার কন্যাকে অভিশাপ দিয়ে যায়। পরী বলে- ‘তোমার মেয়ে পনের বছর বয়সের সময় একটা চরকায় হাত দেবে আর অমনি পড়ে মরে যাবে।’ রাজা-রাণী ভয়ে কেঁদে ফেলে। কিন্তু তের নম্বর পরী যে রাজার কন্যাকে এখনো বর দেয়নি। সে রাজাকে আশ্বস্ত করে যে তার কিছু হবে না। সে তাকে বর দেবে। পরী বলে- ‘তোমরা কেঁদো না, আমি বর দিচ্ছি তোমার মেয়ে মরবে না; কিন্তু অমনি করে চরকা ছুঁয়ে সে ঘুমিয়ে পড়বে আর সেই ঘুম একশ’ বছর পরে ভাঙবে। আর এই রাজ্যে যারা আছে মেয়ের সঙ্গে সঙ্গে সব্বাই ওই একশ’ বছর ধরে ঘুমোবে। একশ’ বছর পরে তোমরা আবার রাজত্ব করতে পারবে।’

পরীর বর অনুযায়ী পনের বছরের দিনই চরকায় হাত দিলে যে যেই অবস্থায় থাকে সেভাবেই ঘুমিয়ে পড়ে। একশ’ বছর পর কোনো রাজপুত্র তাকে ছুঁয়ে দিলেই সবাই আগের মতো ঠিক হয়ে যায়। রাজপুত্রের সঙ্গে রাজকন্যার বিয়ে হয়।

‘গোপেন্দ্রনাথ সরকার রচনা সংগ্রহ’ বইটিতে মোট পাঁচটি গদ্য লিপিবদ্ধ হয়েছে। এই অধ্যায়ে চমৎকার মাথা, তোষলা ও তুষু পূজা, নদীয়া জেলায় গার্শিব্রত, জীবন স্মৃতির কয়েক পাতা, কাজী ভাইকে যেরূপ দেখেছি ইত্যাদি শিরোনামে গদ্য রয়েছে। চমৎকার মাথা শিরোনামের গদ্যটিতে দেখানো হয়েছে আর্কিমিডিসের পাণ্ডিত্য। সেই সঙ্গে বর্ণনা করা হয়েছে তার জীবনযাপনের সামান্য চিত্র। সেই সময়ের সম্পদশালী ঘরের সন্তান হওয়ার পরেও নিজেকে জানতে মানুষের উপকারে নিজের মেধাকে কাজে লাগাতে তার পরিশ্রমের মূল্যায়ন। সম্পদশালী হলেই যে মানুষ হওয়া যায় সেটা কিন্তু নয়। বরং মানুষের মঙ্গলের জন্য যারা কাজ করে তারাই বেঁচে থাকে মানুষের মাঝে। সেই কথাটি বারবার বোঝানো হয়েছে। তিনি বুঝিয়েছেন আর্কিমিডিস শত শত বছর পূর্বে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও এখনো মানুষ তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। এই শ্রদ্ধা ও স্মরণ রাখার মূল কারণই হলো ভালো পথে থাকা আলোর পথে থাকা। গদ্যটিতে ভালো মানুষের গুরুত্বের পাশাপাশি একটি গল্পও বলা হয়েছে। গল্পটি চমৎকার ও শিক্ষণীয়।
‘কাহারও মহত্ত্বের কথা বা গুণ বর্ণনা করা নিন্দনীয় নহে। কোনো মানুষের গুণ ব্যাখ্যা করা মানে সেই দৈহিক মানুষটাকে নয় বরং তার মহত্ত্বকে, তার গুণরাশিকে লোকচক্ষুতে তুলিয়া ধরা। আমার মনে হয়, এ কাজ করা লোকশিক্ষার অঙ্গীভূত। অন্যদিকে মানুষে মানুষে যাহারা ভেদাভেদ সৃষ্টি করে, তাহারা হীন ব্যক্তি, সমাজকে তাহারা কলঙ্কিত করে, সমাজ হইতে তাহাদের বহিষ্কার বাঞ্ছনীয়। গুণবশে এই মানুষই হাকিম হইয়া এই মানুষেরই বিচার করে।’ কথাগুলো লিখেছেন ড. কাজী মোতাহার হোসেন, এর সম্পর্কে লিখতে গিয়ে। কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন সেই সময়ের সবচেয়ে নমস্য ব্যক্তি। যার কুষ্টিয়ায় আসার কথা শুনে গোপেন্দ্রনাথ সরকার মনে মনে ভেবেছেন দেখা করতে যাবেন। তার সঙ্গে কুশল বিনিময় হলে নিজেকে ধন্য মনে হবে। কিন্তু একদিন হঠাৎ করেই যখন কাজী মোতাহার হোসেন নিজেই তার বাড়িতে তাকে দেখতে গেল তখন তিনি বিস্মিত হলেন। কেননা তিনি তার লেখা পড়ে তার সম্পর্কে অন্যান্য শিক্ষকের কাছে শুনে মনের মধ্যে একটা ছবি এঁকেছিলেন। সেই মানুষটি আজ নিজেই তার ঘরে উপস্থিত। শুধু তাই নয়, তার বিছানায়ও বসলেন, কথা হলো অনেক বিষয়ে। গোপেন্দ্রনাথ সরকার স্মৃতিমূলক এই গদ্যে স্মৃতিচারণের সঙ্গে সঙ্গেই বুঝিয়েছেন, মানুষের মহত্ত্বকে। যারা ধর্মের ঊর্ধ্বে গিয়ে শুধু মানুকেই বিবেচনা করতে শিখেছে। কাজী মোতাহার হোসেনের কাছে সব মানুষই সমান। যা তিনি তার সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় জেনেছেন। তাই তার মানবতার চরণমূলে শির আপনা থেকেই অবনমিত হয়।

গোপেন্দ্রনাথ সরকারকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে পরিচিত করার জন্য তার ‘রচনা সংগ্রহ’ বইটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে বিশ্বাস করি। কিন্তু কবির রচনাকে মূল্যায়ন করতে, আলোচনা, সমালোচনা করতে নতুন প্রজন্মের কাছে বইটি পৌঁছানো খুবই দরকার। এক্ষেত্রে সম্পাদক ও প্রকাশককে অবশ্যই উদ্যোগ নিতে হবে। কেননা সময়ের পরিক্রমায় সাহিত্যের ভাব, ভাষার মধ্যে নতুনত্ব এসেছে। কবি গোপেন্দ্রনাথ সরকার সেই নতুন প্রজন্মের কাছে অপাঠ্য রয়ে গেছে। তাই বইটির বহুল প্রচার ও প্রসার প্রয়োজন।বইটির প্রকাশক ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ। প্রকাশে যারা জড়িত সকলেই প্রশংসার দাবিদার। বিশেষ করে সম্পাদনার মতো মহৎ দায়িত্ব পালন করা মাসুদ রহমান। যিনি বইয়ের নিবেদনে লিখেছেন- ‘বলতে দ্বিধা নেই, এই গ্রন্থের প্রায় সমুদয় লেখা-প্রমাণাদি মিলন সরকারেরই অর্থ-শ্রম-সময় ব্যয় করে সংগৃহীত। বর্তমান সম্পাদকের সংগ্রহ নেহাত ন্যূন’। এই সময়ে যখন আমরা অন্যের সম্পদ দখলে নিয়ে নিজের বলে প্রচার করতে পছন্দ করি। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে সম্পাদক কবিপুত্র মিলন সরকারের কর্ম মূল্যায়ন করেও নিজে প্রশংসা পাওয়ার দাবি রেখেছেন। তাই কবিপুত্র মিলন সরকার, সম্পাদক মাসুদ রহমান ও প্রকাশক সকলের অর্থ, সময় ও শ্রমের পূর্ণতা আসুক বইটির প্রচারে সফলতার মধ্য দিয়ে।

এনাম রাজু : লেখক, লিটলম্যাগ সম্পাদক
enamraju1@gmail.com

 
Electronic Paper