জিয়াউর রহমানের লাশ বিতর্ক কতটা জরুরি

ঢাকা, বুধবার, ২০ অক্টোবর ২০২১ | ৪ কার্তিক ১৪২৮

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

জিয়াউর রহমানের লাশ বিতর্ক কতটা জরুরি

টুটুল রহমান
🕐 ১২:১৫ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২১

জিয়াউর রহমানের লাশ বিতর্ক কতটা জরুরি

স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে জাতি যখন সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছে, মহামারী যখন আমাদের বিপর্যস্ত করে তুলেছে, মানবপ্রজাতি টিকে থাকার লড়াইয়ে পুরো বিশ্বকে একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে ঠিক তখনই আমরা এমন কিছু বিষয়ের অবতারণা করছি যা আমাদের সামনের দিকে নয়, পেছনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জাতির ঐক্যসূত্র ছিঁড়ে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হচ্ছে আবারও।

টিভি-টকশো, পত্রিকার পাতায় নানান কিছু নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা, তর্ক-বিতর্ক হতে পারে। তা নিয়ে কতক্ষণ আর গভীরভাবে ভাবা যায়! আজকাল ভাবেনও না অনেকেই। টিভি টকশোর পাত্র-পাত্রী, বিষয়ের আনাড়িপনা ও অকার্যকারিতার কারণে এটা এখন বিরক্তি আর তিক্ততার জন্ম দিয়েছে বলে আমার ধারণা। দু’একটি ছাড়া দর্শক অন্যগুলোতে খুব বেশি মনোযোগ দেয় না। বিশেষ করে করোনা মহামারীর কারণে পেটের ধান্ধায় বেশিরভাগ মানুষের নাভিশ্বাস অবস্থা। রাত জেগে প্রয়োজনীয় বিষয়ে দুটো মানুষের বাদানুবাদ দেখার মানসিকতা কি আর তাদের আছে? রাজনৈতিক টকশোর বাজার এখন ভীষণভাবে মন্দা। স্বাস্থ্য খাত, পরীমনির রিমান্ড বিতর্ক নিয়ে কিছু একটা করলে চ্যানেলে মানুষ কিছু সময় স্থির থাকে। কিন্তু জাতীয় সংসদে যখন একটি বিষয় আলোচনা হয়, সংসদ সদস্যরা তো বটেই প্রধানমন্ত্রী যখন সেই বিষয়ে কথা বলেন তখন সেই বিষয়টির গুরুত্ব আছে বৈকি।

সম্প্রতি চন্দ্রিমা উদ্যানে বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি, যিনি বিএনপি নামের একটি বৃহৎ দলের প্রতিষ্ঠাতা, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ওপর ভিত্তি করে যার রাজনীতে উত্থান, মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক দলিলে যিনি বীরউত্তম খেতাবে ভূষিত। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময়ে সামরিক সম্পৃক্ততা জানান দিতে যিনি স্বাধীনতার ঘোষণাটি পাঠ করেছেন। রাষ্ট্রপরিচালনা করতে গিয়ে যিনি নির্মমভাবে খুন হয়েছেন-তার লাশ আছে কি নেই সেটা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। যদি আপনি নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখেন তাহলে বলবেন, মৃত জিয়াকে জীবিত করার কেন এই বিতর্ক? এই সময়ে? জানি না কে এই বিতর্কের সূত্রপাত করেছেন সাম্প্রতিক সময়ে, তবে তার উদ্দেশ্য কিন্তু মৃত জিয়াকে জীবিত করে তার জনপ্রিয়তাকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেওয়া। বাংলাদেশে বিএনপি নামের একটি দল আছে, তার প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান যে কত শক্তিশালী, যে তার লাশ নিয়েও আওয়ামী লীগের মতো ঐতিহ্যবাহী দলের আজ কথা বলতে হচ্ছে। যিনি এই বিতর্ক তুলেছেন, আমি মনে করি জিয়ার প্রতি তার মমত্ব আছে। জিয়াকে তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন।

মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক দলিলে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা লেখা আছে। আবার ‘৭৫ পরবর্তী বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার আইন করে বন্ধ করে দেওয়া, খুনিদের বিদেশে পুনর্বাসন করা, স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনীতির সুযোগ কেবল নয়, তাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসানো-এসবও কালো অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে লেখা রয়েছে। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করা, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ নিষিদ্ধ করা, তার নাম বাদ দিয়ে দলের নিবন্ধন করার শর্তারোপ করা, হ্যাঁ/ না ভোটের মতো একটি হাস্যকর গণতান্ত্রিক পন্থার উদ্ভাবন করাসহ নানা বিষয়ে জিয়াউর রহমানের মুক্তিযোদ্ধা চরিত্রের বাইরে রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের যে চরিত্র সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। আমার মনে হয় বিএনপিও করে না। কিন্তু তার জন্য ইতিহাস তো নির্মমভাবে জিয়াউর রহমানের জায়গা নির্ধারণ করে রেখেছে। তাকেও খুন হতে হয়েছে। তার পরিবার কি সঠিক বিচার পেয়েছে বলে মনে হয়? এই হত্যাকা- কাজে লাগিয়ে জেনারেল এরশাদ কি তার পথের কাঁটাগুলোকে একে একে সরিয়ে দেননি? একেবারে বিনা বিচারে পাকিস্তান প্রত্যাগত জেনারেল এরশাদ মুক্তিযোদ্ধাদের ফাঁসিতে ঝুলিেেয় হত্যা করেননি? জেনারেল মঞ্জুরের নির্মম হত্যাকা-টির বিচারটাও তো আজ পর্যন্ত হলো না। যেখানে জিয়া হত্যার মূল রহস্যটি লুকিয়ে আছে। কে লাভবান হয়েছে তা স্পষ্ট করা যেত। আওয়ামী লীগের তো সেই সুযোগটি ছিল। কিন্তু তারা সেটা না করে জিয়ার লাশের পেছনে ছুটে বেড়াচ্ছে। জিয়াউর রহমানের যে রাজনৈতিক চিন্তা, স্বাধীনতা পরবর্তী আওয়ামী লীগের এমপি, মন্ত্রী, চেলা চামুণ্ডাদের দুর্নীতি, অনিয়ম, কালোবাজারি, গুম-খুন, রক্তাক্ত নভেম্বরের কারণে তার প্রতি সামরিক ও বেসামরিক মানুষের অন্ধ সমর্থন কি জিয়াউর রহমানের লাশের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল? আজ আপনারা স্বীকার করেন, স্বাধীনতা পরবর্তী আওয়ামী লীগের খাই খাই চরিত্র, কিছু মানুষের সম্পদ আহরণের প্রতিযোগিতা, মহান স্বাধীনতার যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেওয়া অনেক বীর সেনানীকে অবহেলা করা, ভারতীয় আগ্রাসনের নগ্ন চিত্র যেমন জাসদ নামের একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম দিয়েছিল, পরবর্তীকালে ঘটেছিল ৩ নভেম্বর, ৭ নভেম্বর। সেই ৭ নভেম্বরের চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে জিয়াউর রহমান ক্ষমতা নিয়েছিলেন। কর্নেল তাহেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিলেন বিনা বিচারে। ইতিহাস তো জিয়াকে এসবের জন্য, ২ অক্টোবরের অভ্যুত্থানের দায়ে নিরীহ নিরপরাধ সৈনিক-অফিসারদের ফাঁসির নামে হত্যা করার জন্য কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়টি, কর্নেল তাহেরের ফাঁসির বিষয়টি আদালত মীমাংসা করে দিয়েছেন।

কিন্তু গত ৪০ বছর ধরে এই সমস্ত আলোচনা, ইতিহাস বিকৃতি, একে অন্যকে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র কি আমাদের এগিয়ে দিচ্ছে? যে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ রুদ্ধ ছিল, তার নাম উচ্চারণে দ্বিধা ছিল সেই হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে। আজ বঙ্গবন্ধুর নাম শুধু দেশে কেন সারা বিশ্বের অবহেলিত-নিপীড়িত মানুষের নেতা হিসেবে উচ্চারিত হচ্ছে। বাংলাদেশ গত ১২ বছরে যে অর্থনৈতিক অগ্রগতি দেখিয়েছে, দারিদ্র্য বিমোচনে যে কারিশমা দেখিয়েছে, চোখ ধাঁধানো অবকাঠামো উন্নয়ন দেখিয়েছে তা অবিশ্বাস্য। তবে ধীরে ধীরে সুশাসনের গিঁটটা যে হালকা হয়েছে, কিছু মানুষের অনিয়ম দুর্নীতি খালেদার আমলকেও ছাড়িয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেটা খেয়াল করেছেন বলেই শুদ্ধি অভিযানে নেমেছেন। সুশাসন বাস্তবায়নে দিনরাত পরিশ্রম করেছেন। শেখ হাসিনার এই উদ্যোগকেই তাহলে নব্য আওয়ামী লীগার, বঙ্গবন্ধুর হত্যার ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত মোশতাক মার্কা আওয়ামী লীগাররা কি ভয় পাচ্ছেন? তাদের কি ধরা পড়ার সময় হয়ে এসেছে? এ কারণে জিয়ার লাশ নিয়ে এই বিতর্ক!

জিয়াউর রহমান একটি রাজনৈতিক চিন্তার উত্থানের নাম। এটা আপনি চাইলেই মুছতে পারবেন না। যেমন বিএনপি-জামায়াত পারেনি বঙ্গবন্ধুকে মুছতে। আবার জিয়াউর রহমানও জীবিত থাকতে শেখ মুজিবুর রহমানের মতো মহান রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নিজেকে জাহির করেননি। তাদের দুজনকে একই কাতারবদ্ধ করেছেন দুই দলের অতি উৎসাহী কিছু মানুষ। এখন যেমন মৃত জিয়াকে জীবন্ত করে কিছু আওয়ামী লীগার নিজের পিঠ বাঁচাতে চাইছেন। আবার বিএনপির অনেকেই জিয়াউর রহমানকে বঙ্গবন্ধুর উপরে স্থান দিতে গিয়ে তাকে মেরে ফেলেছেন। এই বড়-ছোট’র খেলায় সুবিধাবাদীরা জিতলেও বারবার দেশের মানুষ হেরে যাচ্ছে। বঞ্চিত হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বিতর্কের অবসান করে দেন বারবার। তাকেই সেই দায়িত্ব নিতে হয়। লাশ বিতর্কও তিনি শেষ করে দিয়েছেন সংসদে। ওটা লাশ না লাশের বাক্স সেটা তিনি তার অভিজ্ঞতায় তুলে ধরেছেন। আবার যারা বিএনপিকে ভালোবাসেন ওই বাক্সের ভিতর লাশ না থাকলেও তারা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন ওখানেই চিরশান্তিতে ঘুমিয়ে আছেন প্রেসিডেন্ট জিয়া। তাই সেখানেই তাদের শ্রদ্ধা নিবেদন- অশ্রু বিসর্জন। মানুষের এই অনুভূতিকে যারা ছোট করে দেখেন তাদেরও মানুষ বড় করে দেখবে না এটাই স্বাভাবিক।

৪০ বছরের আগের ঘটনা নিয়ে বিতর্ক করে না করে দেশটাকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব সবার। কারণ এটা রাজনৈতিক বিতর্ক। একে অন্যকে ঘায়েল করে ফায়দা নেওয়ার বিতর্ক। যার অবসান কোনোকালেই পৃথিবীতে হয়নি। হিটলার মরেছে কি আত্মহত্যা করেছে এ নিয়ে আজও বিতর্ক হয়। বিতর্ক হয় লাদেনের লাশ নিয়ে। কিন্তু লাভ হয় কাদের? যারা এই বিতর্ক কৌশলে তোলেন তাদের।

এদেশের সাধারণ মানুষ এখন উন্নয়নের পাশাপাশি সুশাসন চায়। জিয়ার লাশের পেছনে ছুটিয়ে তাদের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানোর চেষ্টা যারা করছেন তাদের চালাকিও তারা বোঝেÑ এই কথা মনে রাখতে হবে। ৪০ বছর পরে জিয়ার লাশ আছে কি নেই সেটা খুব একটা জরুরি নয় বলে মনে করেন দেশের মানুষ।

টুটুল রহমান : সাংবাদিক
tutulrahman219@gmail.com

 
Electronic Paper