থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নম্বর

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর ২০২১ | ৪ কার্তিক ১৪২৮

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

জীবন সংসার

থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নম্বর

কাজী খাদিজা আক্তার
🕐 ১২:৫০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২১

থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নম্বর

সালটা ১৯৯৩, আব্বা তখন সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ থানা থেকে ট্রান্সফার হলেন পুলিশের এসবি (স্পেশাল ব্রাঞ্চ)-তে, ঢাকায়। পড়াশোনার সুবিধার জন্য আব্বা আমাদের আত্মীয়স্বজন এবং কাছের মানুষদের মাঝে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শিফট করলেন। আমরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আর আব্বা ঢাকায়। তখন আমাদের চার ভাইবোনকে নিয়ে আম্মা একাই সংসারের সকল দায়িত্ব পালন করতে শুরু করলেন। সেসময় আমাদের খুব কাছের মানুষদের কাছে পাইনি। প্রত্যেকের জীবনে কঠিন বাস্তবতা জীবনের প্রকৃত গুরু হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যায় আর সেই শিক্ষা কেউ কখনো ভোলে না। তবে, নতুন জায়গায় আমাদের একজন অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন আব্বার চাচাত ভাই বাবুল কাকা। ভাড়া বাসার খরচ থেকে রেহাই পেতে আম্মা তখন নিজের জায়গায় একটি নিজেদের বাড়ি তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিলেন। আমাদের একটি নিজেদের বাড়ি হয়েছিল আম্মার অক্লান্ত পরিশ্রমে এবং আম্মাকে সকল ব্যাপারে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন বাবুল কাকা। কারণ বাবুল কাকা ছিলেন তখন প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার। আমাদের একটি স্বপ্ন পূরণের অংশীদার হলেন ‘তিনি’। হি ইজ আওয়ার ফ্যামিলি ফ্রেন্ড।

২০১৭ সাল, ফেসবুকে কিছু লেখালেখি করি নিজের মতো করে। ছাত্রজীবনেও এই অভ্যাসটি ছিল, তাই ফেসবুকে এর মতো সহজ একটি মাধ্যম পেয়ে ঘুমন্ত অভ্যাসটি আবার জেগে উঠল। একদিন হঠাৎ দেখি আমার মেসেঞ্জারে একটি লিংক এলো। শুভাকাক্সক্ষী রায়হান উল্লাহর আইডি থেকে। ‘বাংলা ভাষার প্রকৃত রাষ্ট্রায়ন হোক’ শিরোনামের লিংকটিতে স্পর্শ করতেই, আমার ফেসবুকে দেওয়া একটি লেখা দেখতে পেলাম ভধসড়ঁংহবংি২৪.পড়স নামক একটি অনলাইন পত্রিকায়। রায়হান উল্লাহ তখন এই পত্রিকার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। বুঝলাম তিনিই আমার লেখাটি এখানে প্রকাশ করেছেন। পুলকিত হলাম এবং তাকে ধন্যবাদ জানালাম।

এরপর তিনি একে একে ‘দিস ইজ হুমায়ূন’স ক্যারেকটার’, ‘একটি ফুলও যেন না ফোটে সু চির খোঁপা সাজাবে বলে’, ‘প্রসঙ্গ কাসেম বিন আবুবাকার’, ‘সাহিত্যে নোবেল ও পুরস্কার বিতর্ক’ ইত্যাদি শিরোনামে। আরও অনেকগুলো লেখা নিজের ইচ্ছেতেই প্রকাশ করেন। আমি ভীষণ কৃতজ্ঞ বোধ করলাম। কিছুদিন পর সাংবাদিক ও কবি রায়হান উল্লাহ খোলা কাগজ নামে অন্য একটি পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হলেন। সেখানেও তিনি ‘সমকামিতা বৃত্তান্ত’, ‘লাশকাটা ঘরের বাসিন্দা’, ‘বিশুদ্ধ শহরে নিষিদ্ধ পল্লী’ শিরোনামে এবং ধর্ষণ, আত্মহত্যা ইত্যাদি বিষয়ে আমার বিভিন্ন লেখা প্রকাশ করেছেন। শুধু তাই নয়, নিজ দায়িত্বে পত্রিকাগুলো আমার নিকট পাঠিয়েছেন। অবাক হতাম তার বন্ধুসুলভ আচরণ দেখে। আমি যাই লিখি না কেন, লেখাগুলোকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে তার অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। হি স্প্রেডস মাই রাইটিং, আই এম গ্রেটফুল টু হিম। বর্ষার প্রথম দিনে শিমুল ভাই তার প্রেমিকাকে সাতটি কদমফুল দিয়ে বলেছিল, ‘রোববার তোমাদের বাসায় যামু, সব বলমু তোমার বাবা-মাকে, দেখি কেমনে কী হয়, আর না মানলে কতক্ষণ চিল্লামু, তার পরেরটা পরে দেখা যাইব।’ রুপা আপু তার চোখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়েছিল। সেদিন শিমুল ভাইয়ের চোখে রুপা আপু তার স্বপ্নগুলোকে গভীরে তলিয়ে যেতে দেখেছিল। পরেরদিন শিমুল ভাইয়ের ভীষণ জ্বর হলো। রুপা আপু ক্যাম্পাসের একটি দোকান থেকে কল দিল। ওপাশ থেকে ল্যান্ডফোনে ফোন রিসিভ করলেন শিমুল ভাইয়ের মা। তার দুদিন পর রুপা আপুর বিয়ে হলো এক আমেরিকা প্রবাসী, বাবা-মায়ের যোগ্য ছেলের সঙ্গে। এই ‘তিনি’ হয়ে গেলেন ‘তুমি’ আর শিমুল ভাই হয়ে গেলেন ‘সে’। বিকজ হি ইজ আ কমন ম্যান।

একদিন তাড়াহুড়ো করে বাসে উঠতে গিয়ে প্রায় পড়েই যাচ্ছিলাম, জামাটাও গেল ছিঁড়ে। মনে মনে এত বিরক্ত হলাম। নিজেকে বোকা ও অসহায় মনে হচ্ছিল। এতটা তাড়াহুড়া না করলেও পারতাম। খানিক পরেই দেখলাম বাসের দু’পাশের সিটের মাঝের স্ট্যান্ডিংয়ের জায়গায় একজন লোক সাহায্য চাইছেন। লোকটার দুটো পা-ই নেই। এদিকে কন্ডাকটর চিল্লাচ্ছে ‘গাড়ি ছাইরা দিব বেটা তাড়াতাড়ি নাম’। দুটো পা-বিহীন লোকটা কীভাবে চোখের পলকে ম্যাজিকের মতো বাস থেকে নেমে গেল। অবাক হলাম। সেদিন নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে হলো আর তার জন্য খুব মন খারাপও হলো। এরপর থেকে কখনো নিজেকে অসুখী, অভাগা মনে হলে ‘তার’ কথা মনে পড়ে যায়। বাস্তবে হয়তো এমন উদাহরণ অনেক আছে, বাট হি ইজ দ্য রিয়েল ম্যাজিশিয়ান অব মাই লাইফ।

জীবনটা পপকর্নের মতো সাদা হলে মন্দ হতো না, কারণ সেই জীবনের প্রতি তেমন আকর্ষণ থাকত না। কিন্তু মুশকিল হলো জীবনটা হাওয়াই মিঠাইর মতো রঙিন আর বড্ড ক্ষণস্থায়ী। এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের পরতে পরতে ছড়িয়ে থাকে আলো-আঁধারের খেলা, আর সেই খেলায় থাকি আমি, তুমি আর সে।

কাজী খাদিজা আক্তার : প্রভাষক (ইংরেজি), সরাইল সরকারি কলেজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

 
Electronic Paper