তথাকথিত সৌন্দর্যবোধ ধারণা!

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

তথাকথিত সৌন্দর্যবোধ ধারণা!

চিররঞ্জন সরকার ৯:৪৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১২, ২০১৮

print
তথাকথিত সৌন্দর্যবোধ ধারণা!

H2O-এর অর্থ কী? সেভেন বা এইটের পদার্থবিদ্যার ক্লাসে এই প্রশ্ন অত্যন্ত চেনা। কিন্তু এই প্রশ্নই বাংলাদেশের মিস ওয়ার্ল্ড ২০১৮-র এক প্রতিযোগীকে লজ্জায় ফেলে দিয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে, মিস ওয়ার্ল্ডের মতো জাতীয় ইভেন্টে যোগ দেওয়া প্রতিযোগীরা কি তবে একেবারেই অর্বাচীন? সাধারণ জ্ঞানের ন্যূনতম পর্যায়ের মধ্যেও নেই? বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক ঠাট্টা-মশকরা হয়েছে। প্রতিযোগিতা চলাকালে বিচারকদের প্রশ্নোত্তর পর্বের এই ভিডিও মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
ভিডিওটিতে দেখা যায়, একজন প্রতিযোগীকে বিচারক পানির রাসায়নিক নাম হিসেবে ঐ২ঙ কি জিজ্ঞেস করছেন। কিন্তু প্রশ্ন শুনে কিছুই বুঝতে পারেননি প্রতিযোগী। তিনি দ্বিতীয়বার প্রশ্নটা জানতে চান। বুঝিয়ে বলার পরেও প্রতিযোগী উত্তর দেন, ওই ঐ২ঙ আসলে ধানমন্ডির একটি রেস্তোরাঁর নাম! হ্যাঁ, ঢাকার ধানমন্ডিতে ওই নামের একটি রেস্তোরাঁ আছে বটে!
উল্লিখিত ঘটনাটি আপাত হাসির খোরাক হলেও এর অনেক তাৎপর্যও রয়েছে। আমরা যেন এখন এক ধরনের ‘মেধাহীন সৌন্দর্য-জগতে’ বিচরণ করছি। আমরা এখন ভীষণ রকম ‘সৌন্দর্য’ প্রিয় হয়ে উঠেছি! এই ‘সৌন্দর্যের’ মাপকাঠি আমরাই তৈরি করে নিয়েছি। চুল হবে রেশমি, বাতাসে ঢেউ খেলবে, উড়ে উড়ে মুখের কিছুটা অংশ ঢেকে দেবে। আর ‘রূপসীকন্যা’ একটু পর পর হাত দিয়ে তা সরিয়ে দেবে! আঁকাবাঁকা উচু-নীচু নয়, গ্রিক দেবী আফ্রোদিতির দাঁতের মতো ঝকঝকে সুন্দর।
চোখ হবে হরিণীর চোখের মতো টানা টানা; সেখানে ময়ূরের পেখমের আভাস থাকবে, থাকবে রংধনুর উঁকিঝুঁকি, থাকবে কালো মণির টলমল জলের প্রতিবিম্ব। চোখের দিকে তাকালে যেন কেউ অথৈ সমুদ্রে হারিয়ে যায়!
নাক হবে সুচালো, বাঁশির মতো। ভ্রূ অবশ্যই টানা টানা এবং সুন্দর করে নিকানো। গালে যদি টোল ফেলানো যায় তো খুবই ভালো! গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে যেভাবে আলোছায়া মাখামাখি করে তেমনি শেড ফেলতে পারলে সৌন্দর্যের ষোলো কলা যেন পূর্ণ হয়। ঠোঁট হতে হবে অতি অবশ্যই গাঢ়, কামরাঙা কিংবা পাকা মরিচের মতো। ত্বক হবে দুধে-আলতায়। এর নাম দেওয়া হয়েছে হ্যান্ডসাম। কিউট। প্রিটি। বিউটি। এর জন্য আছে পার্লার। বিউটি হোম। কনসালটেশন সেন্টার। হরেক ব্যবস্থা।
এলোমেলো উসকো-খুশকো চুল, প্রসাধনহীন ব্রন-ঘামাচির দাগওয়ালা মুখ, সাধারণ খসখসে অথবা তেলানো ত্বক-এসব এখন আর চলে না। সবার চাহিদা এবং নজর পরিপাটি, ঘষেমেজে রং মেখে যে চাকচিক্যময় সাজ দেওয়া হয়-সেটাতেই!
নারীর সৌন্দর্য নিয়ে কবি-শিল্পী যতই উচ্ছ্বসিত হন, তা বর্তমানে বাজার অর্থনীতি বা পণ্যে পরিণত হয়েছে। গাত্রবর্ণ, চোখ-মুখের গড়ন, দেহসৌষ্ঠব প্রভৃতি সম্পর্কে কিছু প্রচলিত ধারণা থেকেই সৌন্দর্যের ধারণা প্রস্তুত হয়ে থাকে। যা প্রায় সম্পূর্ণই দৈহিক। বিশেষত মেয়েদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিত্ব, চারিত্রিক বা মানসিক গুণ দিয়ে সৌন্দর্য সচরাচর বিবেচিত হয় না। তাই প্রায় জন্ম থেকেই কিছু মেয়ে ‘অসুন্দর’ হিসেবে নির্দিষ্ট হয়ে যায়, তাদের ‘সুন্দর’ হয়ে উঠবার কোনো পথ থাকে না। ফর্সা হওয়ার ক্রিমের বিপুল বিক্রয় মেয়েদের সেই হতাশার প্রকাশ।
পাত্রকে অধিক পণ বস্তুত ‘স্বল্পমূল্যের পণ্য’-এর জন্য বাড়তি ভর্তুকি। এই সনাতন বিবেচনায় সৌন্দর্যের বিপরীতে সক্ষমতা। তা প্রতিটি মানুষকে অর্জন করতে হয়। তা সাধনায় নারী-পুরুষ, রোগা-মোটা, গৌর-কৃষ্ণ সবাই সমান। কিন্তু বুদ্ধিমতী, উপার্জনক্ষম মেয়েরাও ‘প্রকৃত সুন্দরী’ না হলে বিবাহের বাজারে ‘নিষ্প্রয়োজন’ হয়ে যায়। এই বিচারে নারীর সৌন্দর্য পুরুষতন্ত্রের হাতে এক শক্তিশালী অস্ত্র, যা অনায়াসে যে কোনো নারীর অমর্যাদা করতে পারে। কেবল ভারতবর্ষেই নয়, পাশ্চাত্যের বহু নারী সৌন্দর্যের সংজ্ঞা মানতে গিয়ে অতি-কৃশ, অতি-দুর্বল হচ্ছেন!
বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য নেটওয়ার্ক বিস্তারকারী মাল্টিলেভেল ব্যবসায়ী কোম্পানিগুলোর ব্যবসার সংজ্ঞায় যোগ হয়েছে নতুন আরেকটি উপাদান। অর্থনীতির সংজ্ঞায় ব্যবসা ও কোম্পানির জন্য চারটি উপাদান জরুরি। শ্রম, পুঁজি, মালিক ও ভূমি। সংজ্ঞাবিদদের অলক্ষ্যে ঢুকে পড়েছে আরেকটি বস্তু-নারী। নতুন সংযোজিত এই বস্তুটাই হয়েছে ব্যবসার প্রধান উপাদান। এ কারণে বিশ্বব্যাপী ব্যবসায়ী কোম্পানিগুলো কোনো দেশে ব্যবসা বিস্তৃত করার পর পরই হাত দিচ্ছে ওই দেশের ‘নারী সম্পদের’ ওপর। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।
ইউনিলিভার কোম্পানিটির ব্যবসা সারা বিশ্বজুড়ে। এ দেশে প্রথম তারাই সুন্দরী প্রতিযোগিতার নামে নারীদের ব্যবহারিক পণ্যে পরিণত করে। সুন্দরী প্রতিযোগিতা যে নিছক ব্যবসা এবং উদ্যোক্তারা তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ হাসিলের জন্যই এই কাজটি করে থাকে তা সবাই জানে এবং বোঝে। তারপরও যুগের হাওয়ায় গা-ভাসিয়ে সবাই এটাকেই বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিয়েছে। দিন দিন এই ‘বিউটি কনটেস্ট’ যেন অনিবার্য হয়ে উঠছে।
সৌন্দর্য এবং সুন্দর একটি স্পর্শকাতর বিষয়। মানুষ সুন্দরের পূজারি। খুব কম লোকই পাওয়া যাবে, যিনি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন, সৌন্দর্য ও সুন্দর তাকে আকৃষ্ট করে না। আর যদি তা হয় নারীর সৌন্দর্য তবে অবশ্যই সেটি আরও কাক্সিক্ষত বস্তু হয়ে দাঁড়ায়। যদিও এই মনোভাব প্রকৃতি-বিরুদ্ধ। কারণ, প্রাকৃতিক নিয়মে আমরা নানাজন নানা গড়নের, আকৃতির হয়ে থাকি। মানুষের চেহারা বা আকৃতি তার নিজের তৈরি করা নয়। এটা পুরোটাই প্রাকৃতিক। এ জন্য ব্যক্তি মোটেও দায়ী নয়। সে জন্য কাউকে খারাপ চেহারার বলে ভর্ৎসনা করা, হিংসা করা বা গালি দেওয়া মস্ত বড় অন্যায়। তেমনিভাবে আরও বড় অন্যায় মানুষের মাঝে সুন্দরকে খুঁজে বের করা এবং তাদের নির্দিষ্ট করে পুরস্কৃত করা, কারণ এতে অসুন্দর মানুষরা মনে গভীর কষ্ট পেতে পারে। সেই সঙ্গে এটি মানবতার চরম লঙ্ঘনও বটে। কারণ, মানবতার দায়িত্ব ও কর্তব্যের একটা নির্দিষ্ট সীমারেখা আছে। সৌন্দর্য খোঁজা, সৌন্দর্যের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া মানবতার কোনো মাপকাঠিতেই পড়ে না। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, মানবতার চরম লঙ্ঘন হওয়া সত্ত্বেও সুন্দরের পূজা থেমে নেই। তাই তো বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে সুন্দরী প্রতিযোগিতা। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন নামে সুন্দরী প্রতিযোগিতা হয়ে থাকে।
কিন্তু আমাদের এই ‘দর্শনধারী’ মূল্যবোধ এক সর্বনাশের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা এখন সবাই সবকিছু চাই তাজা, ঝকঝকে, দাগহীন, সুদৃশ্য মোড়কে প্যাঁচানো। পাবলিক আকাক্সক্ষা এবং চাহিদা বুঝে বিক্রেতারাও এখন সব পণ্যকে চাকচিক্যময়, সুদর্শন, আকর্ষণীয় বর্ণে তৈরি এবং বিপণন করছে। বাজারে এখন দাগওয়ালা, বাঁকা-ত্যাড়া, আংশিক পোকায় খাওয়া কোনো কিছু পাওয়া যায় না। সেটা কী কৃষিজাত পণ্য, কী মিলকারখানায় উৎপাদিত পণ্য।
সবকিছুকে সুদর্শন, চকচকে, টাটকা পচনরহিত করতে বা বানাতে গিয়ে ব্যবসায়ী এবং উৎপাদকরা ইচ্ছেমতো বিষাক্ত রাসায়নিক, রং ইত্যাদি ব্যবহার করছে। হ্যাঁ এভাবেই প্রসারিত হচ্ছে ফরমালিন, কার্বাইড, ডিডিডি ইত্যাদির ব্যবহার!
আমাদের বিউটির সংজ্ঞা এবং বিউটিফিকেশনের মডেল বদলাতে হবে। প্রকৃতির সৃষ্টি যদি একটু দাগওয়ালা, একটু পোকায় খাওয়া, একটু নেতানোও হয়-তবু তা গ্রহণ করার মানসিকতা সৃষ্টি করতে হবে। প্রিজারভেটিভ হতে হবে প্রাকৃতিক, ক্ষতির ঝুঁকিমুক্ত।
সবচেয়ে বড় কথা, বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, অন্তরের সৌন্দর্য বা গুণের পূজারি হতে হবে। তাহলে কালো, মুখে দাগওয়ালা, তথাকথিত অসুন্দরী মেয়ের কান্না যেমন ঘুচবে, অনেক সামাজিক অনাচার থেকেও আমরা মুক্ত হতে পারব! মানবতা সত্যি বিজয়ী হবে!

চিররঞ্জন সরকার : লেখক, কলামিস্ট।
chiroranjan@gmail.com