ব্যবসায় নৈতিকতা মেনে চলি?

ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

ব্যবসায় নৈতিকতা মেনে চলি?

রিয়াজুল হক ৯:৪২ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১০, ২০১৮

print
ব্যবসায় নৈতিকতা মেনে চলি?

মাছ বাজারে ঢুকলাম মাছ কেনার জন্য। সঙ্গে আমার ছোট ভাই জহির। একটু বড় সাইজের গলদা কিনব। পাঁচটায় এক কেজি হবে। দর দাম ঠিক করার পর দোকানদার ১০টা গলদা চিংড়ি একটা পলিথিনের ব্যাগে ভরে ডিজিটাল ওয়েটিং স্কেলের ওপর রাখল। ওজন ২২৩০ গ্রাম। ছোট ভাইটা দোকানদারকে বলল, আপনি পলিথিন ব্যাগ থেকে মাছগুলো বের করে ওয়েটিং স্কেলে রাখেন।

দোকানদার গাইগুই শুরু করল। যাই হোক, বাধ্য হয়ে মাছ বিক্রেতা অনেকটা বাধ্য হয়ে মাছগুলো পলিথিন থেকে বের করে ডিজিটাল স্কেলে রাখল। এবার দেখা গেল, সেই ১০টা মাছের ওজন ২১২০ গ্রাম। অর্থাৎ ২২০ গ্রাম কম। মূল বিষয় হলো, পলিথিনের ব্যাগে আগে থেকেই কিছুটা পানি রেখে দেওয়া ছিল। মানুষ ঠকানোর এমন ভাবনা হয়তো শুধু আমাদের মাথা থেকেই বের হয়ে থাকে।
কোনো কর্মকাণ্ড যদি অবৈধ হয়, তবে তা ব্যবসায়ের মধ্যেই পড়ে না। অর্থাৎ ব্যবসায় হতে হলে নৈতিকতা অত্যন্ত জরুরি। ব্যবসায়ের প্রতিটি কাজ আইন অনুযায়ী করতে হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় উৎপাদনকারী হতে ভোক্তার নিকট পণ্যদ্রব্য পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি কাজ আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে বা সব ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন নাও থাকতে পারে। এসব ক্ষেত্রে যতদূর সম্ভব আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে এমনভাবে ব্যবসায়িক কার্যাবলী সম্পাদন করতে হবে যাতে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ যেমন ভোক্তা, বিক্রয় প্রতিনিধি, প্রতিযোগী কেউই যেন প্রতারিত না হয়। আর এ কাজগুলোকেই বলা হয় ব্যবসায়ের নৈতিকতা।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ব্যবসায়ে নৈতিকতা আমরা কতটুকু মেনে চলি? তথ্যমতে, মিনারেল ওয়াটারের নামে কীভাবে বুড়িগঙ্গার নদীর পানি আর টিউবওয়েলের পানি বিভিন্ন লোগো সমৃদ্ধ বোতলে ভর্তি করে, মিনারেল ওয়াটারের নামে বিক্রি হচ্ছে। চকবাজারে গড়ে উঠেছে নকল প্রসাধনীর কারখানা। এসব কিছুই আবার বিভিন্ন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভোক্তাদের কাছে বিক্রি হচ্ছে। আবার নামিদামি ব্র্যান্ডের পণ্যের মধ্যেও ভেজাল দেখা যাচ্ছে। পণ্যের মোড়কের ওপর যেসব উপাদানের নাম ও পরিমাণ দেওয়া থাকে, সেখানেও তারতম্য দেখা যাচ্ছে। এসব কিনে প্রতারিত হচ্ছে সাধারণ ভোক্তা।
গত রোজায় আমার ব্যক্তিগত একটি অভিজ্ঞতার কথা বলছি। ছোট ভাইয়ের জন্য ১৮০০ টাকার একটা শার্ট কিনলাম। পেমেন্ট করলাম বিকাশ অ্যাপের মাধ্যমে। ২০ শতাংশ ক্যাশ ব্যাকের কথা বলা আছে। অর্থাৎ ৩৬০ টাকা ক্যাশ ব্যাক পাবার কথা। অথচ ১৪.৮০ টাকা ফেরত এসেছে। শোরুমের ম্যানেজারকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলাম। বললেন, মাঝেমধ্যে এরকম হচ্ছে। যদি এগুলো ইচ্ছা করে করা হয়, তবে সেটা তো এক ধরনের প্রতারণা। এ ধরনের সংখ্যা তাহলে কত? অনেক কোম্পানি আগে থেকেই কাস্টমারদের সঙ্গে বিভিন্নভাবে চালাকি করছে। আর বিকাশের রমরমা ব্যবসার মুহূর্তে তারাও কি চালাকি শুরু করেছে? অর্থাৎ শুধু যে পণ্যদ্রব্য ক্রয় করে ক্রেতা প্রতারিত হচ্ছে, তা নয়। সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানও বিভিন্নভাবে নৈতিকতা বাদ দিয়ে তাদের সেবা বাজারজাত করছে। সেখানেও একইভাবে ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছে।
আমাদের দেশের মোবাইল অপারেটররা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সেবা প্রদানের নাম করে গ্রাহককে না জানিয়ে সার্ভিস চার্জ কেটে রাখছে। অথচ গ্রাহক কখনো সেই সার্ভিস চালুই করেনি। আমরা যারা মোবাইল ব্যবহার করি, মোবাইল রিচার্জ (সেটা ১০০ কিংবা ২০০ টাকা) করার পর সব সময় ব্যালেন্স খেয়াল করা হয় না। কারণ প্রায় প্রতিদিনই মোবাইল রিচার্জ করা লাগে। আর এ সুযোগটাই কাজে লাগাচ্ছে মোবাইল অপারেটররা। যদি কাস্টমার কেয়ারে টাকা কেটে রাখার ব্যাপারে ফোন করে অভিযোগ জানানো হয়, তবে সেখান থেকে বলা হয়, ‘আপনার অমুক সার্ভিস চালু ছিল, সে কারণে টাকা কেটে রাখা হয়েছে’। কি আজব কথা তাদের! এ সার্ভিস চালু করল কে? সোশ্যাল মিডিয়ায় উল্লিখিত একজনের এরকম একটি লেখা তুলে ধরছি, তাদের কোনো সার্ভিস আমি কখনো অ্যাকটিভেট করিনি। কিন্তু তারা ইন্টারনেট প্যাকেজের সঙ্গে বিভিন্ন অ্যাডের নামে অনবরত টাকা কেটে নিয়েছে। প্রতিবার কেটে নিয়ে মেসেজে বলেছে, আপনারা এ সার্ভিস না চাইলে **** নাম্বারে ডায়াল করে ডিঅ্যাক্টিভেট করে দিন। আপনারা আগে টাকা কেটে ডিঅ্যাক্টিভেট করতে বলছেন কেন? আপনারা কি গ্রাহকের বা আমার অনুমতি নিয়েছেন? এভাবে আগে টাকা কেটে নিতে পারেন আপনারা? সদুত্তর দিতে পারেনি মোবাইল অপারেটর। নিয়ম তো আপনাদের অফার দেখে গ্রাহক অফার আগে অ্যাক্টিভেট করবে তারপর আপনারা চার্জ করা শুরু করবেন। এখানে আগে কেটে তারপর ডিঅ্যাক্টিভেট করতে বলছেন কেন? ইন্টারনেট প্যাকেজ নেবার আগে বা পরে এসব চার্জ কাটা হবে তা কি আমাদের জানিয়েছিলেন? আমার মতো এরকম মেসেজ অনেকেই দেখবে না বা ইগ্নোর করবে। তাহলে তো আপনারা অনবরত কাটতেই থাকবেন। যেমন আমার কেটে রেখেছেন। আপনারা তো গ্রাহকের দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছেন।
ভোক্তা অধিকার আইন, ২০০৯ এর প্রথম অধ্যায় অনুযায়ী ‘ভোক্তা অধিকারবিরোধী কার্য’ অর্থ-(ক) কোন আইন বা বিধির অধীন নির্ধারিত মূল্য অপেক্ষা অধিক মূল্যে কোনো পণ্য, ওষুধ বা সেবা বিক্রয় করা বা করিতে প্রস্তাব করা; (খ) জ্ঞাতসারে ভেজালমিশ্রিত পণ্য বা ওষুধ বিক্রয় করা বা করিতে প্রস্তাব করা; (গ) মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিকারক কোনো দ্রব্য, কোনো খাদ্যপণ্যের সহিত যাহার মিশ্রণ কোনো আইন বা বিধির অধীন নিষিদ্ধ করা হইয়াছে, ওই রূপ দ্রব্যমিশ্রিত কোনো পণ্য বিক্রয় করা বা করিতে প্রস্তাব করা; (ঘ) কোনো পণ্য বা সেবা বিক্রয়ের উদ্দেশে অসত্য বা মিথ্যা বিজ্ঞাপন দ্বারা ক্রেতা সাধারণকে প্রতারিত করা; (ঙ) প্রদত্ত মূল্যের বিনিময়ে প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে বিক্রয় বা সরবরাহ না করা; (চ) কোনো পণ্য সরবরাহ বা বিক্রয়ের সময়ে ভোক্তাকে প্রতিশ্রুত ওজন অপেক্ষা কম ওজনের পণ্য বিক্রয় বা সরবরাহ করা; (ছ) কোনো পণ্য বিক্রয় বা সরবরাহের উদ্দেশে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ওজন পরিমাপের কার্যে ব্যবহৃত বাটখারা বা ওজন পরিমাপক যন্ত্র প্রকৃত ওজন অপেক্ষা অতিরিক্ত ওজন প্রদর্শনকারী হওয়া; (জ) কোনো পণ্য বিক্রয় বা সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুত পরিমাপ অপেক্ষা কম পরিমাপের পণ্য বিক্রয় বা সরবরাহ করা; (ঝ) কোনো পণ্য বিক্রয় বা সরবরাহের উদ্দেশে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে দৈর্ঘ্য পরিমাপের কার্যে ব্যবহৃত পরিমাপক ফিতা বা অন্য কিছু প্রকৃত দৈর্ঘ্য অপেক্ষা অধিক দৈর্ঘ্য প্রদর্শনকারী হওয়া; (ঞ) কোনো নকল পণ্য বা ওষুধ প্রস্তুত বা উ?ৎপাদন করা; (ট) মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বা ওষধ বিক্রয় করা বা করিতে প্রস্তাব করা; বা (ঠ) সেবা গ্রহীতার জীবন বা নিরাপত্তা বিপন্ন হইতে পারে এমন কোনো কার্য করা, যাহা কোনো আইন বা বিধির অধীন নিষিদ্ধ করা হইয়াছে।
আমাদের ভোক্তাদের তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। ভোক্তা অধিকার আইনে অভিযোগ উদ্ভবের ৩০ (ত্রিশ) দিনের মধ্যে ভোক্তা অধিকারবিরোধী কার্য সম্পর্কে মহাপরিচালক কিংবা অধিদপ্তরের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নিকট অভিযোগের বিষয়ে বলা হয়েছে। ভোক্তা অধিকার আইনের সপ্তম অধ্যায়ে অভিযোগ এবং জরিমানার টাকায় অভিযোগকারীর অংশের কথাও উল্লেখ রয়েছে (১) যে কোনো ব্যক্তি, যিনি, সাধারণভাবে একজন ভোক্তা বা ভোক্তা হইতে পারেন, এ অধ্যাদেশের অধীন ভোক্তা অধিকারবিরোধী কার্য সম্পর্কে মহাপরিচালক বা এতদুদ্দেশে মহাপরিচালকের নিকট হইতে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে অবহিত করিয়া লিখিত অভিযোগ করিতে পারিবেন।
(২) কর্তৃপক্ষ, উপ-ধারা (১) এর অধীন লিখিত অভিযোগ প্রাপ্তির পর, অনতিবিলম্বে অভিযোগটি অনুসন্ধান বা তদন্ত করিবেন। (৩) তদন্ত অভিযোগটি সঠিক প্রমাণিত হইলে মহাপরিচালক বা তাহার নিকট হইতে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দোষী ব্যক্তিকে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় জরিমানা আরোপ করিতে পারিবেন। (৪) উপ-ধারা (৩) এর অধীন আরোপিত জরিমানার অর্থ আদায় হইয়া থাকিলে ওই আদায়কৃত অর্থের ২৫ শতাংশ তাৎক্ষণিকভাবে উপ-ধারা (১)-এ উল্লিখিত অভিযোগকারীকে প্রদান করিতে হইবে : তবে শর্ত থাকে যে, অভিযোগকারী অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী হইয়া থাকিলে, তিনি এ উপ-ধারায় উল্লিখিত আদায়কৃত অর্থের ২৫ শতাংশ প্রাপ্য হইবেন না।
(৫) এ ধারার অধীন আদালতে বা বিশেষ ট্রাইব্যুনালে নিয়মিত ফৌজদারি মামলা করা হইলে এবং নিয়মিত মামলায় অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করিয়া জরিমানা করা হইলে এবং ওই জরিমানার অর্থ আদায় করা হইলে, উহার ২৫ শতাংশ অর্থ উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত অভিযোগকারীকে প্রদান করিতে হইবে তবে শর্ত থাকে যে, অভিযোগকারী অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী হইয়া থাকিলে, তিনি এ উপ-ধারায় উল্লিখিত আদায়কৃত অর্থের ২৫ শতাংশ প্রাপ্য হইবেন না। (৬) যে কোনো ব্যক্তি এ ধারার উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, কোনো পণ্যের নকল বা ভেজালের বিষয়টি ব্যক্তিগত উদ্যোগে কোনো সরকারি বা বেসরকারি সংস্থা বা গবেষণাগারে পরীক্ষা করাইয়া ফলাফলসহ অভিযোগ দায়ের করিতে পারিবেন।
ব্যবসায় নৈতিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবস্থাপকের উচিত সামাজিক দায়িত্বপূর্ণ এবং নৈতিক আচরণের একটি দার্শনিক ভিত্তি তৈরির আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়া। চূড়ান্ত ভোক্তা যেন কোনোভাবেই ক্ষতির সম্মুখীন না হয়, সে দিকটি অবশ্যই বিবেচনায় আনতে হবে। উৎপাদক বা সেবা সরবরাহকারী যেন অধিক মুনাফার আশায় অবৈধ পন্থা গ্রহণ না করে, সেজন্য অভিযোগকারীদেরও আইনের মাধ্যমে পুরস্কৃত করা হচ্ছে। এটা অবশ্যই ভালো দিক। তবে ভালো কিছু পেতে হলে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে।

রিয়াজুল হক : উপ-পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।
riazul.haque02@gmail.com