সামাজিক সম্পর্ক : সম্বোধনের ভেদরেখা

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ এপ্রিল ২০২১ | ৭ বৈশাখ ১৪২৮

সামাজিক সম্পর্ক : সম্বোধনের ভেদরেখা

সাহিদা সাম্য লীনা ১২:২২ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ০৮, ২০২১

print
সামাজিক সম্পর্ক : সম্বোধনের ভেদরেখা

কী আছে তুমি ডাকের মধ্যে! ফেসবুকে অনেকে দেখি তাকে তুমি বলার অনুরোধ করে আর বলে সে অনেক ছোট আমার চাইতে! ভালো কথা ছোট তো হবেই। কেউ না কেউ বড় এবং ছোট থাকবে। তাই বলে অচেনা অজানা আবার পরিচিতদের মধ্যে এমন কেউ আছে শব্দটি শোনার জন্য মরিয়া! একবার কহিতে গিয়াছিলাম এক জুনিয়রকে তুমি, কিছু সময় পর আমিও তার কাছে তুমি হয়ে যাই! এই যে জুনিয়রের কাছে এভাবে তুমি! যে বলেছিল আপনি অনেক সিনিয়র! আমাকে তুমি বলবেন! আশ্চর্য আমি সিনিয়রও অবশেষে তুমি হয়ে যাই! কিছু সময় পর! তাহলে তার উদ্দেশ্য খারাপ ছিল বোঝা যায়। সিনিয়র বলে পটানো, এরপর প্রেম।

একজন তো আমার পায়ের ধুলো নিচ্ছিল, ইনিয়ে বিনিয়ে শ্রদ্ধায় কাতর করে দিল। আমিও এই অদ্ভুত আচরণে ফেঁসে গেলাম। তখন ২০১৩ সাল। বয়স এখন থেকে তো আরও কম। ওই লোকের এত ইজ্জতে নিজেকে মুরব্বির সম্মান পেয়ে আমি আত্মহারা হয়ে গেলাম। এত ঢিলা আমি হুঁশ ফেরে যখন দেখি লোকটা প্রেম ভালোবাসার নোংরা ইঙ্গিতে ম্যাসেঞ্জার ভরিয়ে ফেলে! হোঁচট খেয়ে সতর্ক হয়ে গেলাম।

তুমি ও তুই এই শব্দ দুটি সাধারণত আপনজনদের মধ্যে ব্যবহৃত হয়। ভাইবোন, সহপাঠীকে তুই বলা যায়। তা একসময় গ-ি ছাড়িয়ে রক্তের বন্ধন ছাড়াও বলা যায়। সময়, স্থান, সম্পর্ক এবং ক্ষেত্র বিশেষে। ভাবিকে, বোনকে, খালাকে এবং মাকে তুমি বলা যায়। অপর মানুষকেও সেম। তবে সেটি যদি গ্রহণীয় হয় অপরের কাছে।

আমরা নারীরা সময়, বয়স এবং ক্ষেত্র বিশেষে এক নারী আরেক নারীকে তুমি বলি যদি তাদের সম্মতি থাকে। কিন্তু প্রতিবেশী আমার বয়সী কোনো নারী আর পুরুষকে তুমি বলতে পারি না। আমার চেয়ে অনেক ছোট নারীকে সময় বিশেষে তুমি বলি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে আমার দু’বছরের ছোট তার স্বামীকে বলতে পারছি না তুমি। তিনি হয়তো একজন ইঞ্জিনিয়ার বা একজন শিক্ষক।

এভাবে তাকে তুমি বলাটা কেমন যেন বিশ্রী শোনায়, না! অথচ থাকে শুধু পাশাপাশি। দেখা হলেই তুমি তুমি বলাটা অশোভন নয় কি? আমার সাহেবের কলিগ যিনি আমার শিক্ষক এবং শিক্ষক সমতুল্য অনেকে আছেন যারা আমাকে আপনি শব্দটি বলেন। ওই সময়, স্থান, সম্পর্ক এবং ক্ষেত্র বিশেষের খাতিরে। কেননা আমি তাদের সহকর্মীর স্ত্রী সে কারণে! একজন ত্রিশোর্ধ্ব ব্যক্তি (আবার অনেক সময় বিবাহিত ও দু-এক সন্তানের পিতাও তারা) যখন আমাকে বলে তাকে তুমি বলতে ব্যাপারটা কেমন অস্বস্তিকর ও হাস্যকর তা বলে বোঝাতে পারব না। আত্মীয়তার সূত্র হলে সেখানে এমনটি হয়তো হতো না। আদতে বলতে চাচ্ছি বিশেষ সময় ও ক্ষেত্র বিশেষে এই তুমিটা বলা যায়। এক থেকে বিশ বছরের যে কাউকে; এর মধ্যে বয়স হলে স্বস্তিতে তুমি বলা যায়। আমি জানি না আমার এমন ভাবনাটা ভুল কিনা!

একজন পুলিশ অফিসার, একজন স্কুলের শিক্ষক, একজন ব্যাংকার, একজন ম্যাজিস্ট্রেট এবং আরও পেশার কিছু ব্যক্তিকে এই ত্রিশ বা বত্রিশের বয়সের কাউকে যদি তুমি তুমি বলি ব্যাপারটা কি কেউ ভালোভাবে নেবে? আমরা তো হরহামেশা এমনদের কাছে যাই কাজে। পাবলিক দেখছে আমি তার কাছে কাজে গিয়েছি এমতাবস্থায় তাকে বলছি তুমি! বয়সটা এবং সময়টা, পরিবেশ একটা বিশেষ সম্পর্ক যখন সৃষ্টি হবে তখন এই তুমি শব্দটি প্রযোজ্য হবে। একবার জাস্ট পরিচিত একজনকে তার এমন অনুরোধে আমার সাহেব মহাশয়ের সামনে তুমি বলি। কিন্তু সাহেব ব্যাপারটিতে অবাক হয়েছেন। পরে বলেছেনও যে এত বড় লোকটাকে আমি কেন তুমি বলছি। খুব অস্বস্তি বোধ করেছি তখন। সংসারে অশান্তি সৃষ্টি হয় এতে। যখন তখন যে কাউকে তুমি বলা যায় না। সহকর্মী বয়সে ছোট তাই বলে কি তাকে তুমি করে বলে কোথাও?

তবে আমার ছোট ভাই কয়েকজনকে যারা নিয়মিত দেখা হয় তাদের তুমি বলি। তাদের তুমি বলতে খুব ভালো লাগে। তাদের আচরণও আমার প্রতি অত্যন্ত সুন্দর। ওই যে ক্ষেত্র বিশেষের কারণে। ত্রিশোর্ধ্ব ব্যক্তিদের তুমি বলার জন্য যদি তিনি মায়ের বয়সী হন সেটা আরেক বিষয়। আসলে তুমি বলারও একটা সময় আসে। সেটার অপেক্ষা করতে হয়। ফেসবুকে বড় বোন হতে পারে, তাই বলে এভাবে আপনাকে তুমি বলতেই হবে? বড় মানেই তুমি বলা জায়েজ নয়। যাকে কখনো দেখেনি! এইরকম তুমি শোনার জন্য আবদার করা দুই তিন বাচ্চাদের পিতাকেও ব্লক ও আনফ্রেন্ড করেছি কয়েকবার। এভাবে কাউকে অস্বস্তিতে ফেলা কোনো রুচিশীল মানুষের কাজ নয়?।

সাহিদা সাম্য লীনা : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক