মানুষ নিজেই কেন মৃত্যুঘণ্টা বাজায়

ঢাকা, রবিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২১ | ৫ বৈশাখ ১৪২৮

মানুষ নিজেই কেন মৃত্যুঘণ্টা বাজায়

রহিম ইবনে বাহাজ ৮:০৭ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ০৭, ২০২১

print
মানুষ নিজেই কেন মৃত্যুঘণ্টা বাজায়

জীবনটা নিজের হলেও এ জীবন নষ্ট করার অধিকার কারও নেই। আত্মহত্যা নীতির চোখে অন্যায় আইনের চোখে অপরাধ। আত্মহত্যা ব্যক্তি পরিবার, গোষ্ঠী তথা সমাজে বিশৃঙ্খলা এনে দেয় অমিয় বাণীটি সুনীল কুমার নাগ। আচ্ছা, আত্মহত্যাই কি সব সমাধান হতে পারে, মানুষ কেন আত্মহত্যা করে? এর কারণ কি? মানুষ নিজেই কেন মৃত্যুর ঘণ্টা বাজায়। স্টেকহোল্ডার (মিডিয়া) কনসালটেশন ওয়ার্কশপ শীর্ষক এক কর্মশালায় ইয়াসিন চৌধুরী বলেন, যে বিষয়টা সামনে আসে গণমাধ্যম সে বিষয়টাকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তখন অন্য বিষয় পিছনে পড়ে যায়। ‘আমাদের পারসেপশন ছিল যে কোভিডের সময় কোভিডেই বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে, অন্যান্য রোগে কম মারা যাচ্ছে। কিন্তু পরে আমাদের ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে’। সমীক্ষার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আমাদের চলমান যে সার্ভেগুলো আছে, সেগুলো থেকে তথ্য নিয়ে দেখলাম যে, আসলে আমাদের পারসেপশন সঠিক না’। আগের অর্থবছরের ১০ মাস এবং এ অর্থবছরের ১০ মাসের তথ্য নিয়ে এই পর্যালোচনা করা হয়েছে জানিয়ে সচিব ইয়াসিন চৌধুরী বলেন, ‘স্টাডিতে দেখা গেছে, যখন দেশে করোনাভাইরাসে ৫ হাজার দুইশর মতো লোক মারা গেছে, তখন আত্মহত্যায় প্রায় ১১ হাজার মানুষ মারা গেছে’। মহামারীর এই সময়ে দেশে শুধু হার্ট অ্যাটাক, হার্ট-ফেইলিওর ও হৃদরোগে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যুর তথ্য পাওয়ার কথা তিনি তুলে ধরেন। সচিব বলেন, ‘ওই সময়ে করোনায় যত মানুষ মারা গেছে, তার চেয়ে আত্মহত্যায় বেশি মারা গেছে। অথচ আমরা শুধু করোনার পিছনেই দৌড়েছি। কিন্তু আমাদের অন্যান্য বিষয়েও যে ইন্টারফেয়ার করা দরকার, করোনার জন্য হয়তো গুলোতে গুরুত্ব দিচ্ছি না’। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী প্রতিবছর বিশে^ আট লাখ আত্মহত্যা করেন। মৃত্যুর হার প্রতি লাখে ১৬ জন।

জন্মের পর থেকে, পাঠ্যবইয়ে, মানুষের মুখে মুখে শুনে আসছি, একটি বাক্য ‘আত্মহত্যা মহাপাপ’। কিন্তু শুধুমাত্র পাপ বলে আখ্যায়িত করে মানুষ কি পাপ করছে না। যেমন, পবিত্র কুরআন শরীফে আছে, জীব হত্যা মহাপাপ, বিনা কারণে একটি পিঁপড়াও হত্যা করা যাবে না। আমরা এখনো ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে পারিনি, অথচ টিভি চ্যানেলে, মিডিয়া বা মঞ্চের ভাসনে জোরালো আওয়াজ শুনতে পাই শত ভাগ ক্ষুধামুক্ত না। এখনো দারিদ্র্যের কষাঘাত, অভাবের তাড়নায় স্বামী অন্যত্র বিয়ে করায় ঘরে স্ত্রী সন্তান রেখে পালিয়ে যায়। তখন কীটনাশক, বিষ বা বিভিন্ন উপায়ে সন্তানসহ আত্মহত্যার পথটি বেছে নেয়। পরীক্ষায় জিপিএ ফাইভ পায়নি, পিতা/মাতা/বড় ভাই বকাবকি করেছে, ছেলে বা মেয়ে আত্মহত্যা করে। প্রেমের প্রস্তাবে রাজি হয়নি, আত্মহত্যা করে। বেসরকারি এনজিও বা সমাজের দাদন, ব্যবসা হতে সুদের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে তাদের চাপে খিটখিটে মেজাজ হয়ে অতিষ্ঠ মাত্রা যখন চরমভাবে হতাশার সিন্ধুতে ডুবতে ডুবতে জীবনের সমাধানের সহজ পথ খুঁজে পায় আত্মহত্যা। আত্মহত্যা, মানুষ জীবনটাকে এত তুচ্ছতম মনে করে কেন, আত্মহত্যাই কি সব সমাধান?।

অনেকে বলে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া, ধৈর্য্যহারা হয়ে আত্মহত্যা করে, আত্মহত্যা নতুন কোনো শব্দ নয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী চলে আসছে, বিভিন্ন সংগঠন, এনজিও প্রতিনিধিরা আত্মহত্যা নিয়ে জরিপ চালিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বছরে এত লোক আত্মহত্যা করছে, তার কারণগুলোও উল্লেখ করছে। আত্মহত্যা কোনো সমাধান হতে পারে না, সমস্যা তো থাকতেই পারে, জীবন মানেই যন্ত্রণা, হাসি-কান্না, অভাব, কোটি কোটি অর্থ আছে তার কোনো কিছুর অভাব নেই তার আবার কিসের জন্য দুঃখ হয়, ওই কোটি টাকা ওয়ালা, গৃহে বাহিরে, অফিসে, সব জায়গায় ঝামেলা অন্তহীন। তার আরও অর্থ চাই, মানুষের চাহিদার শেষ নেই, গত একবছরে বাংলাদেশে মহামারী পরিস্থিতিতে যতলোক মৃত্যুবরণ করেছে, সেই তুলনামূলক আত্মহত্যার অংকটা দীর্ঘ, স্বাভাবিক মৃত্যুর চেয়ে যদি অপমৃত্যুর সংখ্যাটা বেশি হয়, বিষয়টা শুধু দুঃখজনক, আফসোস, একথা বলে পুবের বাতাসে উঠিয়ে চলবে না, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, বেসরকারি এনজিও প্রতিনিধিরা জোরালো ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রায় দুই মাস আগে মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলায় দুই টাকা দামের শ্যাম্পুর জন্য দুই কিশোরী বোন ঝগড়া করে, ছোট বোন আত্মহত্যা করে। দৈনিক পত্রিকায় আত্মহত্যার সংবাদ প্রচার করছে, আত্মহত্যা হতে মানুষ কিভাবে নিজেকে দৃঢ় মনোবল, সাহসী হয়ে নিজেকে বাঁচার সিঁড়ি বেয়ে উপরে যাবে, কোনো ধর্মেই আত্মহত্যা করা যাবে লেখা নেই। পবিত্র কুরআন, বাইবেল, গীতা, কোথাও লেখা নেই, তবুও অপমৃত্যু ঠেকানো যাচ্ছে না, প্রত্যেক পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সমস্ত কিছু আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করে, সৎ সাহস দিয়ে ভূমিকা পালন করবে, ব্যবসায়িক লোকসানের ঝুঁকির মধ্যে, বিরাট লোকসান হয়েছে, সমস্ত কিছু শেষ তবুও আত্মহত্যার চেষ্টা করা যাবে না, পাশের মানুষগুলো সৎ সাহস না দিয়ে হতাশার বারোমসলার গল্প বলে লোকটাকে মানসিক আঘাতে আরও নিচে নামানোর প্রক্রিয়া শুরু করে, তাহলে লোকটার দুই নয়নে তন্তনা নেই, পরিবারের অশান্তি, সবমিলিয়ে অসম্পূর্ণ জীবন অবসান চায়, কাছের মানুষগুলোকে বলব, হার জিত, জয় পরাজয়, থাকবেই নীতিগত কিছু আলোচনা করুন।

যুবকরা আবেগের মোহনায় পড়ে আত্মহত্যা করে যেমন বন্ধুর ফোন বন্ধ, যোগাযোগ হচ্ছে না, আপনি ধরে নিলেন হায় হায় সে মনে হয় অন্য আরেকজনের সঙ্গে ঘুরতে গেছে, এসমস্ত চিন্তা মগজ হতে বের করে আপনি আপনার মতো চলুন, যাক না সে তো আপনার সত্য বন্ধু হলে আসবে, না আসলেও জীবনটা এত সহজে শেষ করতে পারেন না। এখানে পরিবারে কলঙ্কের কালি সমাজে আপনার পরিবার মাথা নিচু করবে চলবে, কেউ সহজে আত্মীয়তা করতে আসবে না, সারাটি জনমের জন্য কলুষিত করবেন না। যে আপনাকে সৃষ্টি করেছেন সে কাল হলেই না ডাক দিলেই চলে যাবেন কোনোভাবেই, কোনো অবস্থাতেই আত্মহত্যা ঠিক না, এই লেখা লিখছি আর ভাবছি পাঁচজন মানুষ এই লেখা পড়ে, কাছের বা দূরের স্বজনদের সচেতনতা সেøাগান দেয়, আত্মহত্যা কোনো সমাধান হতে পারে না, পড়লেন স্বয়ং সচেতন হলেন তবুও অপমৃত্যু ঠেকাতে আমি সফল হয়ে নিজের আত্মাকে সান্ত¡Íনা দিতে পেরেছি, অনুভব হবে, প্রত্যেকটা মানুষের নিজের বিবেক বলে কিছু থাকে, বিবেকবান নিমিষেই হঠকারী সিদ্ধান্তটি নিতে পারে না, বিবেক অবশ্যই বাঁধা দেবে, জীবন চলার পথে কোনো সমস্যা চিরস্থায়ী নয়, সমাধানের সড়কে হাঁটার প্রস্তুতি নিন, জীবনকে জটিল করে দেখবেন না, আপনি হয়তো হতাশায় ভুগছেন, জীবনধর্মীয় বই পড়ুন, বা আপনার ধর্মের বই পড়ুন, না হয় ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ুন। দেখবেন জানবেন বুঝতে পারবেন জগৎময় কত মোহনীয় ভরা, বাঁচার নতুন স্বপ্ন দেখবেন।

রহিম ইবনে বাহাজ : কবি ও কলাম লেখক