নারী দিবস ও আমাদের অবদমিত নারী

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ এপ্রিল ২০২১ | ৭ বৈশাখ ১৪২৮

নারী দিবস ও আমাদের অবদমিত নারী

হাসনা হেনা ১২:২২ অপরাহ্ণ, মার্চ ০৮, ২০২১

print
নারী দিবস ও আমাদের অবদমিত নারী

পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী। পুরুষের প্রতিটি সৃষ্টিকর্মের মধ্যে রয়েছে নারীর অবদান। নারীর অবদানের কথা পুরুষ কখনো অস্বীকার করতে পারবে? অথচ যুগ যুগ ধরে নারীর এ অবদানকে অবদমিত করে রাখা হয়েছে। আমাদের সমাজে উচ্চশিক্ষিত, স্বল্পশিক্ষিত সব নারীই কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার। একসময় পিতা কিংবা ভাইয়ের ভয়ে জড়োসড়ো নারীটি অনেক স্বপ্ন নিয়ে স্বামীর ঘরে আসে। সেখানে এসেও দাসত্ব স্বীকার না করলে সে সমাজের চোখে হয়ে ওঠে সমালোচনার পাত্রী। নারী-পুরুষের বৈষম্য পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকেই চলে আসছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বৃত্ত ভেঙে নারীরা সমানতালে এগিয়ে যাচ্ছে। বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও এখনো দেশের অধিকাংশ নারী নিজের ঘরেই অবহেলিত। 

কোথাও কোথাও সমতার ছিটেফোঁটাও দেখতে পাওয়া যায় না। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের দেশে নারীদের অবস্থান এখনো সেই প্রাচীন সমাজ ব্যবস্থাতেই আটকে আছে। কর্মজীবী পুরুষদের থেকে নারীরা প্রায় দ্বিগুণ কাজ করে থাকেন। কর্মজীবী পুরুষ অফিসে কাজ করে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সামলিয়ে ঘরে ফেরার পর ঘরের কাজে অংশগ্রহণ করেন খুবই কম। অন্যদিকে অফিস বা কারখানায় কাজ শেষ করে ঘরে ফেরার পরও নারীদের ফুরসত নেই। পরিবারের রান্না করা থেকে শুরু করে প্রাত্যহিক সব কাজও করতে হয় তাকেই। ফলে সৃষ্টিশীল কর্মজীবী নারীদের জন্য কর্মক্ষেত্রে নিজের যোগ্যতা নিয়ে টিকে থাকা কয়েকগুণ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

গবেষণায় দেখা যায়, একজন কর্মজীবী পুরুষের চেয়ে একজন কর্মজীবী নারী বাসায় কমপক্ষে দ্বিগুণ কাজ করেন। অফিসের কাজ সামলে বাসায় ফিরে ৮৫ শতাংশ কর্মজীবী নারী রান্নাবান্না করেন। আর মাত্র ২.৫ শতাংশ পুরুষ এ কাজটি করে থাকেন। বাসায় পরিবারের সদস্যদের কাপড় ধৌত করেন ৮৯ শতাংশ নারী আর কাজটি করেন মাত্র ১১ শতাংশ পুরুষ। পরিবারের বয়োবৃদ্ধ সদস্য ও শিশুদের দেখাশোনা ও লালনপালন করেন ৫৩ শতাংশ নারী। সেখানে পুরুষের অংশগ্রহণ মাত্র ২১ শতাংশ। এ ছাড়া ২৬ শতাংশ কর্মজীবী নারী চাকরির পাশাপাশি সংসারের জন্য কেনাকাটাও করে থাকেন। এসব কাজের বাইরেও সংসারের অন্য কাজগুলোতে কর্মজীবী নারীর অংশগ্রহণ কর্মজীবী পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে কর্মজীবী নারীরা পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।

বেশিরভাগ পুরুষ তার কর্মজীবী স্ত্রীর মতোই অফিস করে ঘরে ফিরে পরিবারের কাজে স্ত্রীদের সহায়তা করেন না। কিন্তু নারী অফিসে কাজ করে যতই ক্লান্ত বা বিধ্বস্ত থাকেন না কেন ঘরে ফিরেই তাকে সন্তান সামলানো, ঘরে প্রবীণ কেউ থাকলে তার দেখাশোনাসহ স্বামীর সেবায় ব্যস্ত থাকতে হয়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রয়োজন নারীর ক্ষমতায়নকে গ্রহণ করার জন্য পুরুষদের প্রস্তুত করে তোলা। নারীর পাশাপাশি পুরুষদের ঘরের কাজে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুত করতে হলে আমাদের সামগ্রিক শিক্ষার প্রয়োজন। সে শিক্ষা শুরু করতে হবে বিদ্যালয় ও ঘর থেকে। একটি পরিবারের শিশু যদি তার মায়ের সঙ্গে পরিবারের ছোটখাটো কাজে অংশ নেয় তবে সেই শিশুটি বড় হয়ে নিজের ঘরের কাজে অংশ নেবে। সে কাজকে তখন সে নারীদের কাজ বলে মনে করবে না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, নারীর এ অবস্থান পরিবর্তনে প্রথমেই প্রয়োজন পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন। আমরা সাধারণত বলে থাকি একটি পরিবার তখনই সুখী হয় যখন স্বামী-স্ত্রী উভয়ে উভয়ের প্রতি আন্তরিক হতে পারবেন। এর জন্য নারীর পাশাপাশি পুরুষকেও পরিবারের সব কাজে-কর্মে সমান দায়িত্ব নিতে হবে।

নারীদের ওপর হওয়া বৈষম্য, নির্যাতনের বিরুদ্ধে করা প্রতিবাদে নারীদের জাগ্রত করাই নারী দিবস পালনের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। আন্তর্জাতিক নারী দিবস নারী সমাজের মুক্তির একটি পদক্ষেপ মাত্র। ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ নারীদের জন্য একটি স্মরণীয় দিন। এ দিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের একটি সূচ তৈরি করখানার নারী শ্রমিকরা আন্দোলন শুরু করেন। কারখানার মানবেতর পরিবেশ, ১২ ঘণ্টার কর্মসময়, অপর্যাপ্ত বেতন ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের বিরুদ্ধে তাদের এক প্রতিবাদ মিছিল বের হয়। কিন্তু পুলিশ এই শান্তিপূর্ণ মিছিলে মহিলা শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন চালায়। বহু শ্রমিককে আটক করা হয়। এ ঘটনার স্মরণে ১৮৬০ সালের ৮ মার্চ মহিলা শ্রমিক ইউনিয়ন গঠন করে নিউইয়র্ক সূচ শ্রমিকরা। এভাবেই সংঘবদ্ধ হতে থাকে মহিলা শ্রমিকদের আন্দোলন। এক সময় তা কারখানা ও ইউনিয়নের গণ্ডি অতিক্রম করে। ১৯০৮ সালে জার্মান সমাজতন্ত্রী নারী নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে প্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় জার্মানিতে। এই সম্মেলনে নারীদের ন্যায্য মজুরি, কর্মঘণ্টা এবং ভোটাধিকারের দাবি উত্থাপিত হয়।

১৯১০ সালের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে। এতে ১৭টি দেশের প্রতিনিধিরা যোগ দেয়। এ সম্মেলনেই ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৯১১ সালে প্রথম ৮ মার্চ দিবসটি পালিত হয়। ১৯১৪ সাল থেকে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে দিবসটি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হতে থাকে। ১৯৭৫ সাল থেকে জাতিসংঘ দিবসটি পালন করতে থাকে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দিবসটি পালনের প্রস্তাব অনুমোদিত হয় ১৯৭৭ সালের ১৬ ডিসেম্বরে। এ সময় জাতিসংঘ দিবসটির গুরুত্ব উপলব্ধি করে জাতিসংঘের সকল সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে দিবসটি পালনের আহবান জানায়। এর ফলে অধিকারবঞ্চিত নারী সমাজের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির পথ সুগম হয়। নারীর অধিকার রক্ষা ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় এটি এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

প্রতি বছর ৮ মার্চ সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয়। দিবসটির পূর্ব নাম ছিল ‘আন্তর্জাতিক কর্মজীবী নারী দিবস’। বিশ্বব্যাপী এ দিবস পালনের কেন্দ্রীয় বিষয় নারী। কিন্তু আঞ্চলিক ভিত্তিতে দিবসটি পালনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ভিন্ন রকম হয়। কোথাও নারীর প্রতি সাধারণ সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ প্রাধান্য পায়, আবার কোথাও নারীর আর্থিক, সামাজিক, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা বেশি গুরুত্ব পায়। কোথাওবা নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার বিষয়টিকে মুখ্য হিসেবে রেখে দিবসটি উদযাপিত হয়। নারী দিবস, নারী আন্দোলন কিংবা নারী জাগরণের মূলে রয়েছে নারীদের অবস্থার উন্নতি ঘটানো। বিশেষ করে নারীরা যাতে সমাজে নিজ কর্মের সম্মান ও মর্যাদা পান সেদিকে লক্ষ্য রাখা।

আমি আমার অধিকার চাই, আমার প্রাপ্য সম্মান চাই, কেন আমাকে দেওয়া হবে না, কেন আমাকে পদে পদে লাঞ্ছিত হতে হবে, কেন কোনো প্রতিবাদ করলে স্তব্ধ করে দেওয়া হবে? কে দেবে এসব প্রশ্নের উত্তর? এসব বলে বলে যতই চিৎকার করি না কেন, বাস্তবে সমাজে এসব শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে না পারলে দিন শেষে আমার চিৎকার কেবল আমিই শুনতে পাব। সত্যিকার অর্থে একজন নারীকে সমাজে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করার যে পরিবেশ, সে পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য লড়াইটা আমাদের নিজ পরিবার থেকে শুরু করতে হবে। আমাদের সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। তবে নারীর একার পক্ষে এটা সম্ভব নয়। আপনি পুরুষ আপনার মা, বোন, স্ত্রী কিংবা কন্যার জন্য এ সমাজকে নারীবান্ধব করতে এগিয়ে আসুন। পরিবারের নারীদের সম্মান দিন, তাদের কাজের স্বীকৃতি দিন। ছেলেসন্তানটিও আপনার কাছ থেকে দেখে শিক্ষা গ্রহণ করুক। নারী বা পুরুষ পরিচয়ে নয়, মানুষ পরিচয়ে বাঁচি। সবাই মানুষ হিসেবেই এ লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করি।

হাসনা হেনা : শিক্ষক ও সাহিত্যিক, গাজীপুর
hasnahenaliza1999@gmail.com