মশা ছিল, মশা আছে, মশা থাকবে!

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ এপ্রিল ২০২১ | ৭ বৈশাখ ১৪২৮

মশা ছিল, মশা আছে, মশা থাকবে!

সাহাদাৎ রানা ১১:৪৮ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ০৫, ২০২১

print
মশা ছিল, মশা আছে, মশা থাকবে!

একটি প্রচলিত কৌতুক দিয়ে শুরু করা যাক।
প্রথম বন্ধু : বল তো এমন কোন পোকা আছে যার সঙ্গে আমাদের রক্তের সম্পর্ক?
দ্বিতীয় বন্ধু : সহজ উত্তরÑ মশা। মশা আমাদের রক্ত খেয়ে বেঁচে থাকে। তাই মশার সঙ্গে আমাদের রক্তের সম্পর্ক।

কৌতুক হলেও সত্যি, মশার সঙ্গে মানুষের রয়েছে রক্তের সম্পর্ক! মানুষ তার রক্ত দিয়ে মশাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। যেভাবে মশা বৃদ্ধির মিছিল চলছে তাই বলা যায় আগামীতেও মশাকে বাঁচিয়ে রাখবে আরও দীর্ঘদিন। অন্য কোনো দেশের মানুষ নিজেদের রক্ত দিয়ে মশাদের বাঁচিয়ে রেখেছে কিনা তা নিশ্চিত না হলেও আমরা যে প্রতিনিয়ত মশাদের বেঁচে থাকতে সহযোগিতা করছি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা শুধু মশাদের বেঁচে থাকতে নয়, জন্ম নেওয়ার ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রাখছি। মশারা যেন নির্বিঘেœ জন্ম নিতে পারে সেই উপলক্ষ সৃষ্টি করে দিচ্ছি চারপাশের পরিবেশকে নোংরা করে। সমাজের কম-বেশি সবার অবদানে জন্ম হচ্ছে মশার! বিশেষ করে মশা নিধন যাদের কাজ তারাই সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে এক্ষেত্রে। তাই মশা তাদের জন্ম সহজ করে দেওয়ার জন্য মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেই পারে! তবে মশা অকৃতজ্ঞ! তাদের জন্ম প্রক্রিয়া সহজ করে দেওয়ার পরও মানুষকে ছেড়ে দেয় না। বরং তাদের রক্ত খেয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।

কৌতুকের সূত্রে কৌতুকময় কথাগুলো বললেও মশা নিয়ে সিরিয়াস কথা বলার সময় এসেছে। কারণ মশা অতি ছোট পোকা জাতীয় প্রাণী হলেও মশা নিয়ে যথেষ্ট ভয়ের কারণ রয়েছে। বর্তমানে মশার যন্ত্রণায় জন-জীবন অতিষ্ঠ হওয়ার উপক্রম। আমাদের দেশে সাধারণত নভেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত মশার উৎপাত বেশি থাকে। তবে গত বছরের তুলনায় বর্তমান সময়ে মশার উপদ্রব বেড়েছে কয়েকগুণ। মজার বিষয়, মশা শুধু রাতে নয়, এখন সারা দিনই কামড় দেয়। তবে সন্ধ্যা হলেই মশার উৎপাত বাড়তে থাকে। মশা ছোট্ট পোকা জাতীয় একটি সামান্য প্রাণী হলেও এর কামড়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। মশার কামড়ে নানা ধরনের রোগও হচ্ছে। এর মধ্যে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া, এনকেফালাইটিস, জিকা ভাইরাস ও পীতজ্বর অন্যতম। এসব রোগের ক্ষেত্রে সঠিক সময়ে চিকিৎসা করা না হলে মৃত্যুও হতে পারে। তাই মশা ছোট্ট একটি প্রাণী হলেও একে অবহেলা করার কোনো কারণ নেই। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক হারে মশা বৃদ্ধি সবার মনেই ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, এত মশা বৃদ্ধির কারণ কী? সংশ্লিষ্ট কর্তপক্ষের অবহেলা, ব্যর্থতা ও সাধারণ মানুষের অসচেতনতার কারণে মশার বংশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। একটু গভীরে দৃষ্টি দিলে দেখা যায় আমাদের দেশে মশা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ অব্যস্থাপনা। কেননা, আমরা শহরের প্রাকৃতিক জলাধারগুলো দূষণে জর্জরিত করে তুলছি। কিছু কিছু খাল রয়েছে সেগুলো যেন এক একটি মশা তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে। শুধু রাজধানী ঢাকা নয়, এমন চিত্র সারা দেশের। দুখের বিষয় যেসব জায়গায় মশার জন্ম সেসব নোংরা জায়গা ও জলাধারগুলো পরিষ্কার করার বিষয়ে কেউ খুব একটা উদ্যোগী নয়। তাই পরিবেশগত অব্যবস্থাপনার কারণে বৃদ্ধি পাচ্ছে মশা। আর মশার এমন উপদ্রবের শিকার হচ্ছি আমরা। যদি পরিকল্পিত নগরায়ণ, নগরের জলাধার রক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা রোধ, প্রকৃতি রক্ষার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া যায় তবে অনেকাংশে কমে যাবে এসব সমস্যা। গবেষকদের মতে বর্তমানে রাজধানীতে যেসব মশা দেখা যাচ্ছে তার সিংহভাগ কিউলেক্স মশা।

কিউলেক্স মশার সাধারণত নর্দমা ও ডোবার পচা পানিতে জন্মে। কিউলেক্স মশা বৃদ্ধি প্রমাণ করে কর্তপক্ষ এ বিষয়ে ব্যর্থ। যদি নর্দমা ও নোংরা জলাশয়গুলো পরিষ্কার করে রাখা সম্ভব হতে তবে মশা নিয়ন্ত্রণ করা যেত। কিন্তু তা করা সম্ভব হচ্ছে না বলে মশা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মশা বৃদ্ধির পেছনে এখানে সংশ্লিষ্ট কৃর্তপক্ষেরও কিছু দায় রয়েছে। ঢাকায় মশা বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় দায় অবশ্য দুই সিটি করপোরেশনের। গত এক বছরে মশা নিধনের ক্ষেত্রে তারা আহামরি কোনো সাফল্য দেখাতে পারেনি। অথচ এক্ষেত্রে কোটি কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না দুই সিটি করপোরেশন মশা প্রতিরোধে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। মশা নিধনে প্রতি বছর সিটি করপোরেশন নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে। এর জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করা হয়। কিন্তু দুখের বিষয়, মশা আর কমে না। বরং দিন দিন মশার সংখ্যা বৃদ্ধিই পাচ্ছে। লোক দেখানো সামান্য কিছু ওষুধ ছিটানো হয় সত্যি কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তবে এসব ভুলে এখন সিটি করপোরেশনকে এ বিষয়ে দ্রুত ও কার্যকরী ভূমিকা নিতে হবে। বিশেষ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। শুধু সিটি করপোরেশন নয়, নাগরিকদেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। বিশেষ করে সবার মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। যথাযথ কর্তৃপক্ষের কার্যকর ভূমিকার পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতায় সম্ভব মশা নিধন। সবাই যদি নিজ নিজ বাড়ি বা এলাকা নিজ উদ্যোগে পরিষ্কার রাখে তবে মশার সংখ্যা কমে আসবে নিশ্চিতভাবে। কিন্তু সেই উদ্যোগও খুব একটা দেখা যায় না।

মশা থেকে বাঁচতে ব্যবহার করা হচ্ছে কয়েল ও স্প্র্রে। এখানে শঙ্কার বিষয়- মশা থেকে বাঁচতে যেসব কয়েল ও স্প্র্রে ব্যবহার করা হচ্ছে তা মানবদেহের জন্য বিপদজনক। মশার কয়েল ও স্প্র্রেতে রয়েছে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ। যা মানবদেহে প্রবেশ করে মারাত্মক রোগ হতে পারে। বিশেষ করে ক্যান্সার থেকে শুরু করে লিভার, কিডনি ও শ্বাসকষ্টসহ জটিল রোগ হতে পারে। কয়েল ও স্প্র্রে ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে শিশুরা। অথচ আমরা এসব নিয়ে সেভাবে ভেবে দেখি না। তাই যতটা সম্ভব মশারি ব্যবহারে সবাইকে মনোযোগ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে শিশুদের মশারির ভেতরে রাখতে হবে। কয়েল ও স্প্র্রে ব্যবহার না করে মশারি ব্যবহারে সবাইকে সচেতন হতে হবে আরও বেশি। আর মশার কামড়ে বা কয়েল ও স্প্রে ব্যবহারের কারণে যদি কেউ মশা বাহিত রোগে আক্রান্ত হয় তবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

বৃষ্টির মৌসুম আসন্ন। এসময় হয়ত মশার প্রকোপ কিছুটা কমে যাবে। তবে অন্য আরও একটি ভয় বেড়ে যাবে। ভয়টা ডেঙ্গুর। কারণ এডিস মাশ হচ্ছে ডেঙ্গু জ্বরের প্রধান বাহক। সাধারণত তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি অতি বৃষ্টির কারণে জমে থাকা পানিতে জন্ম নেয় এডিস মশা। বৃষ্টির সময় পানি জমে থাকার কারণে এডিস মশার প্রজননও বেড়ে যায় এ সময়ে। বর্তমানে তাপমাত্রা বাড়ছে। তাই বাড়ছে এডিস মশার প্রজননের ভাবনাও। এখনই মশা বিষয়ে সবাইকে সতর্ক হতে হবে। বাড়ির আঙ্গিনায় ডাবের খোসা, প্লাস্টিকের বোতল, ফুলের টব ইত্যাদিতে এডিস মশা জন্ম নেয়। তাই এসব বস্তুগুলো ধংস করে দিতে হবে নিজ নিজ দায়িত্বে। সাধারণত এডিস মশা সাধারণত সকাল ও সন্ধ্যায় কামড়ায়। তাই এই সময়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে। শঙ্কার বিষয় হলো, এখন সারা বছরেই ডেঙ্গু রোগী দেখা যাচ্ছে। বছরের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ডেঙ্গু বিচরণ নয়, সারা বছরই পাওয়া যাচ্ছে ডেঙ্গু রোগী। এক যুগের বেশি সময় পূর্বে প্রথমে ডেঙ্গুর দেখা মিললেও এখন আর ডেঙ্গু আগের অবস্থানে নেই। এর ব্যাপকতায় কেবল বাংলাদেশেই নয় বিশ্বে এখন বিশেষ আলোচিত বিষয়। এডিস মশাবাহিত এ রোগে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর সংখ্যা বৃদ্ধিই প্রমাণপত্র। এখন মশা বৃদ্ধির সঙ্গে ডেঙ্গুর ভয়ও বাড়ছে। তাই সবাইকে ডেঙ্গু বিষয়েও বাড়তি সতর্ক হওয়ার সময় হয়েছে।

যতদিন আমাদের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নগরের নোংরা জলাধার ও বর্জ্য অব্যবস্থাপনা থাকবে ততদিন মশা কমবে না। তাই সহজ কথায় বলা যায় মশা ছিল, মশা আছে, মশা থাকবে! তবে আমরা এমনটা চাই না। আমরা চাই মশা একেবারে নির্মূল না হলেও কমে আসুক উপদ্রব। মশা আমাদের রক্ত খেয়ে বেঁচে থাকুক তা চাই না। নাগরিক হিসেবে প্রত্যাশা যথাযথ কর্তৃপক্ষ পরিকল্পিত নগরায়ণ, নগরের জলাধার রক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা রোধ ও প্রকৃতি রক্ষার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেবে। এসব বিষয়ে বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করলে কমে আসবে মশার উপদ্রব। পরিবেশও সুন্দর হবে। নাগরিকরা মশার যন্ত্রণা থেকে রক্ষা পেয়ে সুন্দর পরিবেশ পাবে।

সাহাদাৎ রানা : সাংবাদিক ও কলাম লেখক
shahadatrana31@gmail.com