বোধের গোড়ায় জল ঢালি

ঢাকা, রবিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২১ | ৫ বৈশাখ ১৪২৮

বোধের গোড়ায় জল ঢালি

কামরুজ্জামান তোতা ১২:৩০ অপরাহ্ণ, মার্চ ০৪, ২০২১

print
বোধের গোড়ায় জল ঢালি

ঢাকা শহরের বিভিন্ন দেয়ালে চিত্রায়িত ছিল সুবোধকে নিয়ে দেয়াল লেখা। তাতে লেখা ছিল ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা। এখন সময় পক্ষে না’। সুবোধকে দেখাও গেছে খাঁচাবন্দি করে সূর্যটাকে নিয়ে পালিয়ে যেতে। অনেক দিন পর আজ আবারও মনে হলো সুবোধরা কি আজ অব্ধি পালিয়ে বেরাচ্ছে? বোধের গোড়ায় একটু জল ঢেলে কি সুবোধদের বাঁচানো যায় না?

আদিম যুগ থেকেই মানুষের মধ্যে নৃশংসতা ও বর্বরতা ছিল। সভ্যতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে তা নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়াস চালানো হয়। যদিও মানুষ সভ্যতার মুখোশ পরে আছে। মানুষের অমানবিক আচরণগুলো মূলত তার পাশবিক প্রবৃত্তির বহিঃপ্রকাশ। জন্মগত পাশবিক প্রবৃত্তিগুলো পারিপার্শ্বিকতার কারণে জাগ্রত হয়। কম-বেশি পশুত্ব স্বভাব প্রত্যেক মানুষের মধ্যে রয়ে গেছে। ‘মানুষ’ ও ‘অধিকার’ শব্দ দু’টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যমণ্ডিত।

সহজভাবে মানবাধিকার বলতে আমরা সেই সব অধিকারকে বুঝি যা নিয়ে মানুষ জন্মগ্রহণ করে এবং যা তাকে পরিপূর্ণ মানুষে বিকশিত করতে সাহায্য করে এবং যা হরণ করলে মানুষ আর মানুষ থাকে না। মানুষ হিসেবে জন্মেছে বলেই এসব অধিকারও তার প্রাপ্য হয়েছে। জাতি-গোষ্ঠী, শ্রেণি-লিঙ্গ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, না পাওয়ার অতৃপ্তি ও ঘৃণা মানুষের স্বাভাবিক সহজাত প্রবৃত্তিকে বাধাগ্রস্ত করে। যেসব নিষ্ঠুর আচরণ ও বদস্বভাব মানুষকে হীন, নীচ ও নিন্দনীয় করে তোলে, তাকে ‘আখলাকে জামিমা’ বা নিন্দনীয় আচরণ বলে।

অমানবিক আচরণ মানবজীবনে যেমন নিন্দনীয়, আল্লাহ ও রাসুলের কাছেও তা অত্যান্ত অপছন্দনীয় এবং কঠিন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যার স্বভাব-চরিত্র কলুষিত হয়, সে মানুষের মর্যাদা হারিয়ে পশুত্বের পর্যায়ে নেমে আসে। মনীষীরা বলেন, মানুষকে ঠিক তত বেশি সুখপাগল বা স্বার্থ সিদ্ধির কারিগর বলে মনে করার কারণ নেই। তবে মানুষ সুযোগ পেলেই অপরাধ করে বসতে পারে। জীবনের প্রাপ্যগুলোর জন্য তার মনে ন্যায়-অন্যায় হিসেব সীমিত।

তাই প্রত্যেকটি মানুষই অপরাধপ্রবণ। কিন্তু মানুষ অনেক বিচার বিবেচনা আর বন্ধনের টানকে অস্বীকার করে অপরাধ করতে পারে না। যখন অপরাধ করে ধরা পড়ার ঝুঁকির চেয়ে অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত সুবিধা বেশি হয়, তখন মানুষ এমন করে। যখন অপরাধের মাধ্যমে অন্যদের সুবিধা পেতে দেখে, তখন নিজেও অপরাধ করতে উৎসাহিত হয়। কারও কারও মধ্যে অপরাধ করার একটা প্রবণতা থাকে। অর্থাৎ তার মধ্যে অপরাধ করার জন্য এক ধরনের জিনগত প্রস্তুতি নিয়েই তারা জন্মায়। পুরুষদের মধ্যে নারীদের তুলনায় আগ্রাসী আচরণ বেশি দেখা যায়। পুরুষদের মধ্যে আছে ীু ক্রোমোজম, যেখানে নারীদের থাকে ীী ক্রোমোজম। কিছু পুরুষের মধ্যে ীুু ক্রোমোজম দেখা যায়।

এদের মধ্যে অপরাধ করার হারও বেশি থাকে। মানুষের মস্তিষ্কে ‘সেরোটনিন’ নামে এক ধরনের নিউরোকেমিক্যালের ঘাটতি থাকলে তাদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বেশি দেখা যায়। কেউ যদি অনেক বেশি পরিমাণে ‘স্টেরয়েড’ শরীরে নেয়, তবে তার মধ্যে আক্রমণাত্মক আচরণ বেড়ে যেতে পারে। মস্তিষ্কের কোনো অসুখ, যেমন নিওর টিউমার, মস্তিষ্কে আঘাত, মস্তিষ্কে অপারেশনের সময়ে সৃষ্ট ক্ষতি ইত্যাদি কারণে মস্তিকে আক্রমণাত্মক প্রবণতা নিয়ন্ত্রণকারী অংশের ক্ষতি হলে ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বদলে যেতে পারে এবং সে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে।

অপরাধ বিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড ক্রিমিনাল জাস্টিস বিভাগের প্রধান ড. জিয়া রহমান বলেন, ‘মানুষের মধ্যে দুই ধরনের প্রবৃত্তি থাকে, তার একটি পশু প্রবৃত্তি । আমাদের মতো সমাজে মানুষের মধ্যে এই ধরনের পশুপ্রবৃত্তি বেশি কার্যকর। যদিও ফ্রয়েডিয়ান থিওরি মতে, প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই সেটা রয়েছে। এখন এই পশু প্রবৃত্তি সিভিলাইজড করা বা নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।’

তিনি বলেন, ‘ওয়েস্টার্ন সোসাইটিতে কিছুটা হয়েছে। তাদের রাষ্ট্রে নীতি এবং রাষ্ট্রের যে আইন তা পরিবর্তন সাপেক্ষে কার্যকর করা এবং একই সঙ্গে সোসাইটির ভেতরের অনুশাসনগুলো ধরে রাখায় তারা মোটামুটি একটা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। আমাদের মতো ট্র্যাডিশনাল সোসাইটিতে এই ধরনের নিয়ন্ত্রণের অভাব থাকায় সবসময় মানুষের মধ্যে পশু প্রবৃত্তি রিফ্লেকশনটা বেশি দেখা যায়।’

দুই.
৬-৭ কোটি মানুষ যদি দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকে এবং মাত্র ১-২ লাখ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হাতে ক্রমে সম্পদের বড় অংশ কেন্দ্রীভূত হতে থাকে, তাহলে সেটা কেবল অর্থনীতির বিষয় থাকে না, সামাজিক বিপদের পাটাতন তৈরি করে।

মানবাধিকারের ধারণার মধ্যে আছে সকল মানুষের সমান অংশ। মানবাধিকার যেমন সকল মানুষের অধিকার তেমনি এ অধিকার সকলের সমানভাবে প্রাপ্য। রাজা-বাদশা, গুরু-পুরোহিত, শিল্পপতি প্রমুখের অধিকার যতটুকু সাধারণ চাষি, মজুর, দরিদ্র বেকারেরও ঠিক ততটুকুই অধিকার। চুরি করলে জমিদার তনয়া শুধু ধমক খেয়ে ছাড়া পাবে আর দরিদ্র চাষির মেয়ের হাত কাটা যাবে, জেল হবে এমন অবস্থা মানবাধিকারের পরিপন্থি। কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা ওয়েলথ ট্যাক্সের প্রতিবেদনেও একই রকম ইঙ্গিত মিলেছিল। তারা এ বিষয়ে পরপর দুটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ২০১৮ ও ২০১৯-এ। আর্থিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে তারা বলেছিল, অতি ধনী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ অতি এগিয়ে।

২০১৮ সালের পরের তথ্য ২০২৩ পর্যন্ত প্রক্ষেপণ শেষে তারা বলেছিল, আড়াই শ’ কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি হারে বাড়ছে। হারটা যুক্তরাষ্ট্র-চীনের চেয়েও বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যেও দেখা যাচ্ছে, আর্থিক খাতে মোট আমানতের ৪২ ভাগই কোটিপতিদের আমানত। অর্থাৎ এমন একটি সমীকরণে পড়েছে বাংলাদেশ, যেখানে পুরো দেশ বনাম এক লাখ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। সমাজের নিচুতলার জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান নতুন করে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার এখনই। দেশজুড়ে খাদ্য সহায়তাও জরুরি। এটা করতে অতি ধনী ও ধনীদের থেকে কর আকারে বাড়তি সম্পদ নিতে হবে রাষ্ট্রকে।

এর বিকল্পও আছে। তা হলো ধনীদের সম্পদ পুঞ্জীভবনের প্রক্রিয়াকে নির্বিঘ্নে চলতে দেওয়া আর দরিদ্র ও অতিদরিদ্রদের স্থায়ীভাবে চুপচাপ রাখতে রাষ্ট্রকে আরও কঠোর ও নির্মম করে তোলা। ‘সিআরআই’ নামে পরিচিত বৈষম্য কমানোর বৈশ্বিক সূচকে গত বছর বাংলাদেশের স্থান ছিল ১৫৮ দেশের মধ্যে ১১৩। নতুন পরিস্থিতিতে অবস্থান কী দাঁড়াবে আমরা জানি না। জনজীবনে আর্থিক অসমতার মাত্রা যে পর্যায়ে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলছে, তা উদীয়মান এক মহাবিপদ সংকেত বৈকি। নতুন করে নিবিড়ভাবে অর্থনীতির এই বিপদ মোকাবিলা প্রয়োজন।

সরকারি কেনাকাটায় আগে এত অনিয়ম দুর্নীতি ছিল না। সাম্প্রতিক সময়ে এই অনিয়মের প্রবণতা বেড়েছে। কারণ, বাজেটের আকার বেড়েছে। তা ছাড়া আমাদের এখানে আইনের প্রয়োগ খুবই কম। দুর্নীতি কমাতে বড় দুর্নীতিকে উদাহরণমূলক শাস্তি দেওয়া জরুরি। এতে যারা এখন কিছু খাবে বলে বসে আছে, তারা কিছুটা সতর্ক হবে।

যদিও বাংলাদেশের বর্তমান আইন ও বিচারব্যবস্থা ভারতীয় উপমহাদেশে প্রায় দুই শ’ বছরের ব্রিটিশ শাসনের কাছে বহুলাংশে ঋণী, যদিও এর কিছু কিছু উপাদান প্রাক-ব্রিটিশ আমলের হিন্দু এবং মুসলিম শাসনব্যবস্থার অবশিষ্টাংশ হিসেবে গৃহীত হয়েছিল। এটি বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া হিসেবে পর্যায়ক্রমে বিকাশ লাভ করে। এ বিকাশের প্রক্রিয়াটি আংশিক স্বদেশি ও আংশিক বিদেশি এবং গঠনপ্রণালি, আইনগত ধারণা ও নীতিমালার ক্ষেত্রে ইন্দো-মোঘল এবং ব্রিটিশ উভয় ব্যবস্থার সমন্বয়ে উদ্ভূত একটি মিশ্র আইনি ব্যবস্থা।
সময়াবদ্ধ উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে একটি উন্নত দেশ গড়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যানশিয়াল করপোরেশনসহ স্ব-শাসিত সংস্থাসমূহের তহবিলে জমাকৃত উদ্বৃত্ত অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহারের নিমিত্ত বিধান প্রণয়নকল্পে প্রণীত আইন রয়েছে জনগণের কল্যাণে যার সঠিক ব্যবহারেরে মাধ্যমেই মানুষের মনুষ্যত্ববোধ বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব।

অন্যান্য প্রাণী কোনো নৈতিক আচরণ অনুসরণ করে না, কিন্তু সকল সামাজিক প্রাণীকে দলবদ্ধভাবে বাস করতে হলে প্রয়োজনের খাতিরে নিজের আচরণগত পরিবর্তন সাধন করতে হয় এবং মূলত মনুষ্যত্ববোধই মানুষকে মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

কামরুজ্জামান তোতা : সাংবাদিক, ঝিনাইদহ