মুশতাক আহমেদের মৃত্যু ও কিছু প্রশ্ন

ঢাকা, সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১ | ৬ বৈশাখ ১৪২৮

মুশতাক আহমেদের মৃত্যু ও কিছু প্রশ্ন

ওয়াসিম ফারুক ১১:২৯ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ০২, ২০২১

print
মুশতাক আহমেদের মৃত্যু ও কিছু প্রশ্ন

যার সৃষ্টি আছে তার ধ্বংস অনিবার্য মানে যার জন্ম আছে তার মৃত্যু হতেই হবে। প্রতিটি মৃত্যুই আমাদের কষ্ট দেয়, ব্যথিত করে। তবে কোনো কোনো মৃত্যু কষ্ট-বেদনার সঙ্গে আতঙ্কিতও করে। জন্ম দেয় নানা প্রশ্ন ও সমালোচনার। তেমনই একটি মৃত্যু লেখক মুশতাক আহমেদের। গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে প্রায় ৯ মাস আটক থাকার পর গত ২৫ ফেব্রুয়ারিতে মারা যান মুশতাক আহমেদ। মৃত্যুর আগে কারাগারের কক্ষে মুশতাক আহমেদ অচেতন হয়ে যান। হাসপাতালে নেওয়া হলে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। আকস্মিক এই মৃত্যু নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। অবশ্য গত ২৩ ফেব্রুয়ারি আদালতে হাজিরা দিয়েছিলেন মুশতাক আহমেদ। তার আইনজীবী আদালতে সেদিনও তার জন্য জামিনের আবেদন করলে আদালত এই নিয়ে ছয়বার জামিন আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। 

গত বছরের ৬ মে র‌্যাবের সদস্যরা ‘রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক কথাবার্তা ও গুজব’ ছড়ানোর অভিযোগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করেছিলেন মুশতাক আহমেদকে। তিনি কোনো খুনি বা দাগি অপরাধী নন। তাকে যে অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়েছে তা সাধারণ মানুষের কাছে আজও তেমন কোনো অপরাধ নয়।

আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ জানেন অনেক বড় বড় অপরাধীও আজ জামিনে আছেন। খুনের দায়ে ফাঁসির আসামি মহামান্য রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় মুক্ত হয়েছেন। আবার কেউ কেউ আইন তোয়াক্কা না করে রাষ্ট্রের নির্বাহী আদেশে বিদেশের মাটিতে থেকেই মুক্তি পেয়েছেন। আর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আটক হওয়া একজন লেখক ও উদ্যোক্তা পরপর ছয়বার আদালতের কাছে জামিন চেয়েও তার ভাগ্যে জামিনের পরিবর্তে জুটেছে জেলখানায় করুণ মৃত্যু। জেলের ভিতরে বন্দিদের মৃত্যু আমাদের দেশে নতুন কিছুই নয়। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মোহাম্মদ মনসুর এবং কামারুজ্জামানকে নৃশংসভাবে হত্যা করে ছিল তৎকালীন বিপথগামী কতিপয় সেনা সদস্য। এরপরও হাজারো নজির আছে। রিমান্ডের নামে পুলিশি নির্যাতনে মৃত্যুর ঘটনাও অহরহ ঘটে। যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। হয়ত অনেকেই প্রশ্ন করবেন আমাদের দেশে মানবাধিকারের অস্তিত্ব কতটুকুইবা আছে? তার প্রমাণ মেলে মুশতাকের মৃত্যুর পর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমানের বক্তব্যে। দেশের একটি প্রথম শ্রেণির জাতীয় দৈনিকের সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যু খুবই দুঃখজনক একটা ঘটনা। এই মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। মতপ্রকাশের কারণে একজন লেখককে এভাবে দিনের পর দিন আটকে রাখা এবং একপর্যায়ে তার মৃত্যুর দায় রাষ্ট্র, সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। তা ছাড়া আমি মনে করি, বিচার বিভাগের আরও সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন আছে। লেখক মুশতাকের ছয়বার জামিন আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। বিচার বিভাগের আরও মানবিক ও মানবাধিকারের বিষয়টি দেখা দরকার ছিল।’ লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের জন্য সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তবে তারচেয়ে বড় প্রশ্ন, মুশতাক আহমেদকে কেন গ্রেফতার হতে হলো? ওই মামলায় শুধু মুশতাকই নন, কার্টুনিস্ট আহমেদ কবীর কিশোর, রাষ্ট্রচিন্তা নামের একটি সংগঠনের সদস্য দিদারুল ইসলাম ভূঁইয়া, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক পরিচালক মিনহাজ মান্নান, তাসনিম খলিল, সায়ের জুলকারনাইন, আশিক ইমরান, ফিলিপ শুমাখার, স্বপন ওয়াহিদ, সাহেদ আলম এবং আসিফ মহিউদ্দিনও ছিলেন। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও পাঁচ-ছয়জন আসামি। এজাহারে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২১, ২৫(১), ৩১ ও ৩৫ নম্বর ধারার অভিযোগ আনা হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে কালো আইন হিসেবে দেশের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ বরাবরই বলে আসছেন।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন প্রথম করা হয় ২০০৬ সালে। পরবর্তীকালে ২০১৩ সালে শাস্তি বাড়িয়ে আইনটিকে আরও কঠোর করা হয়। এর পর নানান সমালোচনা আন্দোলন প্রতিবাদ উপেক্ষা করে ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ আগের তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৫৭ ও ৬৬-সহ মোট ৫টি ধারা বিলুপ্ত করে সংসদে কণ্ঠভোটে পাশ করা হয় ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮’। বর্তমান ডিজিটাল যুগ মানুষের মতপ্রকাশের অন্যতম মাধ্যমই বিভিন্ন ডিজিটাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। কিন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নামে আমাদের দেশে যেই কালো আইন পাস করা হয়েছে তা মানুষের স্বাধীন মতপ্রকাশের সম্পূর্ণ বিরোধী। বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারসহ প্রত্যেক সরকারেরই রাষ্ট্র পরিচালনায় ভুল-ত্রুটি আছে ও থাকবে। এটা মেনেই সরকারকে পরিচালনা করতে হবে। এই সমালোচনাই একটি সরকারকে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে রাষ্ট্র পরিচালনায় সহায়তা করে। কিন্তু একটি সরকার যখনই নানাভাবে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে হয়ে পড়ে তখনই বিভিন্ন কালাকানুনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব করে নিজেদের শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করতে চায়। এরই ফল হিসেবে তথাকথিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নামের এই কালো আইন পাস। ডিজিটাল মাধ্যমে স্বাধীন চিন্তা ও মতামত প্রকাশের সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার প্রয়োগের পথ রুদ্ধ করতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নামের যে আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে, তা এ রকম অনেক মানুষের নিপীড়ন-নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসের পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ২০১৯ সালে সারা দেশে ৭৩২টি মামলায় ১ হাজার ১৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। আর ২০২০ সালের প্রথম দুই মাসে ১৬৫ মামলায় ৩৩৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার পর থেকে ২০২০-এর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ আ?ইনে গণমাধ্যমকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে অন্তত ৫০টি। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৩৭ জন সাংবাদিককে। যার মধ্যে ফটো সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল ৫৩ দিন নিখোঁজ ও প্রায় সাত মাস কারাভোগ করে গত বছর ডিসেম্বরের শেষ দিকে বাড়ি ফেরেন। তিনি নিখোঁজ হওয়ার আগেই গত ১০ মার্চ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য সাইফুজ্জামান শেখর সাংবাদিক কাজলের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেছিলেন ঢাকার শেরেবাংলা নগর থানায়। যুব মহিলা লীগের দুজন নেত্রীও তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দুটি মামলা করেছিলেন। সর্বশেষ এই মামলায় আটক হয়ে কারাগারেই মৃত্যুবরণ করতে হলো লেখক মুশতাক আহমেদকে।

আমাদের বাকস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই ১৯৭১ সালের আমাদের অগ্রজরা জীবনবাজি রেখে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্ন স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরও স্বপ্নই রয়ে গেছে। আজও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য বিভিন্ন কালো আইনে বন্দি করা হয়েছে আমাদের বাকস্বাধীনতা ও আমাদের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক অধিকার। নির্বাহী বিভাগের কাছে বন্দি আমাদের আমাদের অনেক মৌলিক অধিকার। চাটুকার দালাল চোর বাটপাড়দের কাছে জিম্মি আমাদের নৈতিকতা। সব মিলিয়েই মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আজ পদে পদে ভূলুণ্ঠিত।

ওয়াসিম ফারুক : কলাম লেখক
woashim76@gmail.com