লেখকের দায়, রচনার শক্তি

ঢাকা, সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১ | ৬ বৈশাখ ১৪২৮

লেখকের দায়, রচনার শক্তি

মাহবুব নাহিদ ১১:২০ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ০১, ২০২১

print
লেখকের দায়, রচনার শক্তি

সম্প্রতি লিখতে গিয়ে অনেককেই দেখেছি বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে। জীবনও হারিয়ে ফেলেছে লিখতে গিয়ে। নিজে একজন লেখক হওয়ার চেষ্টা করছি। তাই এই বিষয় নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই। লেখক হচ্ছে সমাজের আয়না। লেখকের লেখায় ফুটে উঠবে সমাজ, দেশ, জাতির প্রতিচ্ছবি। লেখকের লেখায় দেখতে পাব ফেলে আসা দিনের কথা, দেখতে পাব বর্তমানের পথচলা, দেখতে পাব ভবিষ্যতের ভাবনা। লেখক অসঙ্গতি খুঁজে বের করে আনবে, লেখক অনিয়মকে তুলে ধরবে, লেখক ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াবে অন্যায়ের বিপক্ষে সোচ্চার হবে, আওয়াজ তুলবে, লড়াই করবে। লেখকের লড়াই ঢাল-তলোয়ারের লড়াই নয়। লেখক লড়াই কলমের। যেখানেই প্রয়োজন হবে সেখানেই কলম হাতে তুলে নেবে।

লেখালেখি হচ্ছে সৃজনশীলতার বহিঃপ্রকাশ। একজন লেখক অবশ্যই সৃজনশীল মানুষ। লেখক বিভিন্ন বিষয় লিখতে পারে। অব্যক্ত কথাগুলোকে প্রকাশ করার জন্য লেখে অনেকে, অনেকে লেখে স্বপ্নগুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য। অনেকে প্রেম পড়ে লেখে। আমাদের মধ্যে প্রেমে পড়ে লেখা শিখেছে এমন লেখকের সংখ্যা অনেক। সংখ্যাটা মাত্রাতিরিক্ত। প্রেম আসলে মনের মধ্যে আবেগের জন্ম দেয়। প্রেম আমাদের ভিতরের অব্যক্ত কথাগুলোকে কলমের কালিতে ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করে। কলমের পাখনা জুড়িয়ে দেয়। সেই পাখনায় চড়ে লেখা উড়ে বেড়ায় এই দেশ থেকে আরেক দেশে। লেখক হয়ে ওঠে শিল্পী, লেখক হয়ে ওঠে পাখি। মুক্ত বিহঙ্গে উড়ে বেড়ায় লেখক। প্রেমপত্র অনেক লেখকের লেখক হয়ে ওঠার হাতেখড়ি।

প্রেমের পরে আরেকটা জিনিস লেখালেখির জন্য অনেক বেশি কার্যকর, সেটা হচ্ছে বিরহ। বিরহ মানুষকে জীবনের কঠিন বাস্তবতা শেখায়। বিরহ মানুষের জন্য অনেক কিছু বয়ে আনতে পারে, হয়ত ভালো, নয়ত খারাপ! তবে মানুষ প্রেমে পড়লে যতো না লেখে তার চেয়ে বেশি লেখে বিরহে। বিরহে কবি উন্মাদ হয়ে যায়।

অনেকেই শুধু ভালো লাগে বলে লেখে। অনেকে আবার বিবেকের তাড়নায় লেখে, দ্বায় থেকে লেখে। লেখকের দ্বায় কোথাও লিখিত থাকে না। তবে তার দ্বায় লিখিত থাকার চেয়েও শক্তিশালী ও কঠিন। লেখক হয়ত কারও কাছে বাধ্য নয়। কিন্তু তার বিবেকের কাছে সে দায়বদ্ধ। বিবেকের দংশনে তাকে লিখতে হয়। বিবেক নাড়া দিলে লিখতে হয়। লেখকের কলম হয়ে ওঠে নীতির পক্ষে ঢাল আর দুর্নীতির বিপক্ষে তরবারি। লেখকের কলমে প্রতিবাদ ঝড়ে, কণ্ঠের মতো কলমেও আগুন ঝরে। লেখকের কলম হয়ে ওঠে প্রতিবাদের পোস্টার।

কেউ কেউ তোষামোদ বা চাটুকারিতা করার জন্য লেখে, কারও মন খুশি করার জন্য লেখে, কিছু পাওয়ার লেখে। তারা ভালোও থাকে, তাদের ভালো রাখা হয়। তাদের অনেক খাজনা বাজনা থাকে। তাদের স্বাধীনতা দেওয়া হয়, পুরস্কারও দেওয়া হয়। কিন্তু টুঁটি চেপে ধরা হয় যারা অনিয়মের বিরুদ্ধে লেখে তাদের। তবুও লিখে যায় তারা। তাদের জন্ম লেখার জন্যই।

লেখা ওটাকেই বলে যেটা বিবেকের তাড়নায় লেখা হয়। বাকিটা হচ্ছে ছেলেখেলা। অনেকে পেটের যাতনায় লেখে। দু’বেলা দু’মুঠো খাওয়ার জন্য লেখে। ঘরের চুলোয় যেন আগুন জ্বলে, সেজন্য লেখে। কারও হাঁড়িতে ভাত নেই, কারও ঘরে চাল নেই তবু লেখকের কলম চলে। কলমের কালি ফুরিয়ে যাবে কিন্তু লেখা ফুরানোর জন্য। যে জীবন লেখার জন্য সে জীবন লিখেই যাবে। পেটের দায়ে লিখতে গিয়ে অনেক লেখা চলে যায় অন্যের নামে। টাকায় কিনে লেখক বনে যায় অনেকে। লেখক হয়ে থাকে অসহায়। আসলে এই জগতে শিল্পীর সব অসহায়ই হয়ে থাকে। কত কষ্ট করে শ্রমিক বহুতল ভবন তোলে কিন্তু তার স্বাদ হয়ত পায় না সে। জগতে তেলে মাথায় তেল দেওয়া হয় বেশি।

লেখক সৃষ্টি করার জন্য লেখে, যেকোনো কিছুই সৃষ্টি করার মাঝে অপার আনন্দ, অসীম উত্তেজনা। সেই উত্তেজনায় লেখক উন্মাদ হয়ে থাকে। লেখকের সৃষ্টিতে যে তৃপ্তি তা কেউ বোঝে না। এই আনন্দে কেউ ভাগ বসাতে পারে না। ছোট ছোট অক্ষরগুলো যখন একটা শব্দ হয়, একটা লাইন হয়ে ধরা দেয় তখন লেখকের হৃদয় সাগরে মুহুর্মুহু আনন্দের ঢেউ আসতে থাকে। এটাই লেখকের প্রাপ্তি। কারণ লেখা কখনো কেনা যায় না, লেখার মূল্য পরিশোধযোগ্য নয়।
একজন সৃজনশীল মানুষ কখনই অন্যায় করতে পারবে না, আর অন্যায় দেখে চুপ থাকতে পারবে না। দেশ, জাতি, সমাজের কাছে তার অবশ্যই দায় আছে। অনেকেই মনে করে যে লেখকের কোনো দায় নেই। লেখক মুক্ত, লেখক স্বাধীন! তা অবশ্যই সঠিক। কিন্তু নিজের বিবেকের কাছে তো উত্তর দিতে হবে। লেখক যদি অন্যায় দেখে চুপ করে থাকে তবে কী করে হবে? লেখক যদি চাটুকারিতা করে তবে সমাজ কলুষে ভরে যাবে। লেখক যদি শুধু অন্য কাউকে খুশি করার জন্যই লেখে তবে সে লেখক নয়, সে সুবিধাবাদ জিন্দাবাদ।

হ্যাঁ, লেখক প্রেম লিখবে, বিরহ লিখবে, প্রকৃতি লিখবে, কোলাহল লিখবে, শান্ত, শ্রান্ত সকল কিছু নিয়েই লিখবে। তবে অসঙ্গতি দেখ লেখক চুপ থাকবে না। হুংকার দিয়ে উঠবে, এই হুংকার মুখ নিঃসৃত হুংকার নয়, কলমের হুংকার। লেখকের কলমে কেঁপে উঠবে দোষী, ভয়ে থরথর করবে। লেখকের কলমে আশা খুঁজে পাবে অসহায়রা, তাদের আশ্রয় খুঁজে পাবে, লেখকের কলমে ভরসা খুঁজে পাবে মেহনতি মানুষ!

দুই.
শিক্ষাব্যবস্থা সুস্থ হোক। দেশকে পিছিয়ে দিতে হলে দেশের শিক্ষাক্ষেত্রকে ধ্বংস করলেই হয়। হয়ত আমরা সেদিকেই আগাচ্ছি। আমরা খুব স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিচ্ছি যে করোনার জন্য সবকিছুই যখন লকডাউন ছিল তখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল এটা মানা যায়। কিন্তু কালে কালে তো অনেক বেলা হয়ে গেল। আর কত? সবকিছুই তো চলছে, কিছুই তো নেই বাকি!

এখন কেন শুধু অনলাইন ক্লাস/পরীক্ষা, অটোপাস এই ধরনের সিস্টেমগুলো জানি না কতটা আহত করবে শিক্ষার্থীদের। কারণ এর মধ্যেই আমরা দেখতে পেয়েছি যে এই অনলাইন ক্লাস ও পরীক্ষা নিয়ে কত রকমের রঙ্গ তামাশা হয়েছে, কত কিছু করা হয়েছে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে! কত মানুষ ভিডিও বানিয়েছে, লিখেছে তার ঠিক নেই। এটাকে একটা হাসি তামাশার বস্তুতে পরিণত করা হয়েছে। আর অন্যদিকে যাদের অটোপাস করিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের নিয়েও অনেকে হাসি-ঠাট্টা করেছে। তারা তো ইচ্ছা করে এই অটোপাস করেনি, আর এই পাস তাদের জীবনে ভালো কিছু বয়েও আনবে না বলে আমি মনে করি।

আর অনেকেই আস্তে আস্তে এই অটোপাসের মজা নিতে চাইবে। ছাত্ররাও অনেকে দেখা যাবে অটোপাস দাবি করে বসবে। আর স্কুল কলেজে না যেতে যেতে তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনীহা সৃষ্টি হবে। যার ফলে পরবর্তীকালে যখন স্কুল কলেজ খুলে যাবে তখন মন বসবে না। আর এভাবে বাসায় বসে সময় কাটাতে কাটাতে অনেকেই ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে। অনেকেই মানসিক অবসাদে ভুগছে, অসুস্থ হয়ে পড়ছে। সবাই অনলাইনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এই অবস্থার আশু প্রতিকার প্রয়োজন।

অজানা এক ভেলায় ভাসছে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা! এই বিষয়ে কোনো সঠিক উদ্দেশ্য বা পরিকল্পনা আছে বলেও মনে হয় না। এখন যেহেতু ভ্যাকসিন এসেছে, দেশের সকল কিছুই চলছে। এখন আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে কোনো লাভ আছে বলে মনে হয় না। কারণ জীবন তো থেমে থাকতে পারে না, জীবন তো চলতে হবে।

কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পরীক্ষা নেওয়া শুরু হয়েছিল যদিও এখন বন্ধ হয়ে গেছে। রাতে দরজা খুলে ঘুমিয়ে চোর না আসার স্বপ্ন দেখার মতো বিষয় ছিল এটা। কারণ তাদের পরীক্ষা হবে কিন্তু হল ছিল বন্ধ। নিজেদের শিক্ষা জীবনের বড়ো একটা সময় চলে গেছে তাই তারা মেস বা বাসা ভাড়া করে হলেও সবাই পরীক্ষা দিচ্ছিল। কিন্তু কোন অশুভ সংকেত এল কে জানে! পরীক্ষা বন্ধ করে দেওয়া হলো! মে মাসের শেষদিকে হয়ত শুরু হবে কার্যক্রম! অনেকের হয়তো মাত্র দুইটি পরীক্ষার জন্য গ্রাজুয়েশন আটকে গেল। এটা আসলেই অমানবিক ও কষ্টের। যারা বাসা ভাড়া করল তাদের তো একটা খরচ হয়ে গেল! হুট করে বাসা ছাড়তেও পারবে না সবাই। আর আমাদের দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সব ছাত্ররাই যে অনেক বেশি ধনী তাও কিন্তু নয়। আর এই খরচটা অনেকের জন্যই একটা বোঝা মনে হয়েছে। তার মধ্যে যদি হঠাৎ সব বন্ধ করে দেওয়া হয় তা তো ভয়ঙ্কর।

কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের সঙ্গে স্থানীয়দের ঝামেলা হয়েছে। আমার মনে হয় এগুলো শুধু তারা হলের বাইরে থাকার কারণেই হয়েছে। কিন্তু ঝামেলার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবকরা দায়িত্ব নেবেন না এমন কথাও শোনা গেছে। তাহলে কথা হচ্ছে, ক্যাম্পাসের বাইরে কোনো কিছু ঘটলে যদি তারা দায়িত্ব না নেন তবে ক্যাম্পাসের বাইরে ছাত্রদের থাকতে দিয়েছেন কেন? তবে একটা বিষয় ভালো লেগেছে এই দুঃসময়ে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্নভাবে তারা সহযোগিতা করেছে ছাত্রদের। অনেক জায়গায় দেখা গেছে মোবাইল ফোন কিংবা ইন্টারনেট কেনার খরচ দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে ভালো লেগেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি আবেদন করা হয়েছে, দারুণ একটি আবেদন। এটাকে শুধু আবেদন বললে ভুল হবে, এটা একটা আকুতি, এটা একটা ইতিহাস। ছাত্রদের মেসে বা বাসা ভাড়া করে থাকতে যে কষ্ট হয়েছে তার প্রতিচ্ছবি ছিল সেই আবেদনে। অন্তত এই পত্রটা ছাত্রদের কিছুটা হলেও স্বস্তি দিয়েছে।

হল আসলে ছাত্রদের জন্য একটা প্রাণের জায়গা। হলে না থাকতে পারলে জীবনের অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত হতে হয়। ছাত্ররা হলে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে গেছে এখন। এখন সবাই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে চায়। অনেকের শিক্ষা জীবন ঝুলে আছে। এভাবে ঝুলে থাকতে কেউ চায় না। আস্তে আস্তে চাকরির পরীক্ষাগুলোও শুরু হচ্ছে। আগামী মাসে বিসিএস পরীক্ষাও হতে যাচ্ছে তবে কেন এই ঝুলে থাকা! এই ঝুলে থাকা দিনের শেষ চায় সবাই।

সবকিছু মিলিয়ে একটা জগাখিচুড়ি হতে যাচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থা। এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষার সময় চলে গেছে, গতবছরের মতো এই বছরও এমন না হোক সেটাই কাম্য হবে। শিক্ষাব্যবস্থা স্বাভাবিক হোক এটাই সবার চাওয়া এখন।

মাহবুব নাহিদ : কলাম লেখক
mr1101152@gmail.com