পরিকল্পনার অভাবে লাগামহীন দূষণ

ঢাকা, সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১ | ৬ বৈশাখ ১৪২৮

পরিকল্পনার অভাবে লাগামহীন দূষণ

শাহরীন তাবাসসুম ১১:০৫ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ০১, ২০২১

print
পরিকল্পনার অভাবে লাগামহীন দূষণ

সভ্যতার উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের রুচির পরিবর্তন হয়েছে। চাকা আবিষ্কারের মাধ্যমে যে উন্নয়নের শুরু হয়েছিল তার পরবর্তী সময়ে আমরা পৌঁছেছি আধুনিক যুগে। পায়ে চলার পরিবর্তে চাকার তৈরি গরু, ঘোড়া, মহিষ ইত্যাদি প্রাণীর গাড়িতে করে যে সভ্যতার শুরু হয়েছিল আজ তা পৌঁছে গেছে বাস, ট্রেন, উড়োজাহাজে। মানুষ চলাচলের জন্য ব্যবহার করছে ইঞ্জিনচালিত যানবাহন। ছনের তৈরি ঘরে থাকার পরিবর্তে মানুষ বসবাস করছে বহুতল ভবনে। মানুষ যত আধুনিকতার দিকে এগিয়ে গেছে পরিবেশ ততটাই বিপর্যস্ত হয়েছে। বহুতল ভবন নির্মাণে পরিবেশের ক্ষতি হয় সব থেকে বেশি কারণ বহুতল ভবনের প্রধান উপাদান হচ্ছে ইট। আর এই ইট যে পদ্ধতিতে বানানো হয় তা পরিবেশের জন্য একপ্রকার হুমকি। ইটভাটা পরিবেশের প্রতিটি উপাদানের ক্ষতিসাধন করে থাকে। ইটভাটার কালো ধোঁয়া যেমন বায়ুদূষণ করে তেমনি মাটি, পানি, রাস্তাঘাটসহ কৃষিক্ষেত্র এবং মানুষেরও ক্ষতি সাধন করে।

ইট তৈরির প্রধান উপাদান হচ্ছে মাটি। সাধারণত লৌহ, ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য উপাদান ধারণকারী অশোধিত মাটিকে ইটের মাটি বলা হয়। ইটের প্রধান রাসায়নিক উপাদানসমূহ হচ্ছে সিলিকা, অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড, ম্যাগনেশিয়া, চুন ও ক্ষার। এসব উপাদানের সামান্যতম হেরফের উৎপাদিত সামগ্রীর গুণগত মানের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।

ইট উৎপাদনের জন্য উৎকৃষ্ট মানের মাটি হচ্ছে জমির উপরের অংশের মাটি। ইটভাটার মালিকরা কৃষকদের লোভ দেখিয়ে এককালীন অল্পকিছু টাকা দিয়ে চাষাবাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জমির উপরে অংশের মাটি কেটে নিয়ে যায় ইট তৈরির কাজে ব্যবহার করার জন্য। আধুনিক বিশ্বে ইটের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম কিন্তু নিয়ম না মেনে এই প্রয়োজনীয় বস্তু তৈরিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ ও তার উপাদান। কৃষিকাজে উর্বর মাটি অত্যন্ত উপকারী। ইট তৈরিতে পুরনো হচ্ছে শত শত একর জমির উপর অংশ। যার ফলে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে কৃষিক্ষেত্র। ইটভাটার আশেপাশের জমিতে কোনো প্রকার ফসল ফলে না। ফলে একইসঙ্গে বিপুল পরিমাণ জমি অনাবাদি হয়ে পড়ে থাকে। রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বিভিন্ন স্থানে যত্রতত্রভাবে চৌদ্দটি ইটভাটা গড়ে উঠেছে। এসকল ইটভাটায় অতি নি¤œ মানের কয়লা পোড়ানোর কারণে ১৪ হাজার হেক্টর ফসলি জমিতে ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। যার ফলে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়াও ইটভাটার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয় বিভিন্ন ধরনের গাছপালা। এসকল গাছের জোগানও দিতে হয় কৃষকদের। অনাদরে গাছপালা কেটে ফেলায় অনেক প্রজাতির পশু-পাখি আজ বিলুপ্তির পথে। শুধু তাই নয়, গাছের শিকড় পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে। কোনো কিছু না ভেবে বৃক্ষ নিধনের ফলে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে এবং বিশুদ্ধ পানির সংকট দৃশ্যমান হচ্ছে।

বেশিরভাগ ইটভাটা নির্মাণ বহির্ভূতভাবে স্থাপন করা হয়েছে লোকালয় তথা মানুষের বসতবাড়ি, গ্রামগঞ্জ, শহর-বন্দরের নিকটে, কৃষি জমিতে, নদীর তীরে, পাহাড়ের পাদদেশে। ইটভাটাগুলো থেকে নির্গত হচ্ছে প্রচুর পরিমাণে কালো ধোঁয়া যা পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে ইটভাটার দূষণে বয়স্ক ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে। এছাড়া কালো ধোঁয়ার কারণে মানুষের ফুসফুসের সমস্যা, শ্বাসকষ্ট ও ঠা-াজনিত নানা রোগ দেখা দিচ্ছে। পাশাপাশি ধুলো-ময়লা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে এলার্জিজনিত সমস্যার সৃষ্টি করে। ইটভাটায় সৃষ্ট দূষণ পরিবেশ বিপর্যয়, শক্তি উৎপাদন ও ফলমূলের ফলন ক্ষতিগ্রস্ত এবং গাছপালার স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করছে। ইটভাটার ব্যবহৃত ট্রাক্টর ও যত্রতত্র ট্রাকের ব্যবহারের ফলে রাস্তার বেহাল দশা হচ্ছে প্রতিনিয়ত যার ফলে ভোগান্তি বাড়ছে জনসাধারণের মধ্যে। সামান্য বৃষ্টির ফলেও রাস্তার মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে খানাখন্দক। আর শুষ্ক মৌসুমে এর ভয়াবহতা বৃদ্ধি পায় আরও কয়েকগুণ।

যাতায়াতের জন্য যানবাহনে অতিরিক্ত খরচ করতে নারাজ অনেক ইটভাটার মালিক। সমাধান হিসেবে তারা কাছাকাছি কোন খালি জমি এমনকি ধানি জমিতেও লাইসেন্স ছাড়া ইটভাটা নির্মাণ করছে। পার্বত্য অঞ্চলগুলোও এর থেকে রেহাই পায়নি। রাঙামাটি জেলার ইটভাটায় মাটির জোগান হিসেবে পাহাড়ি মাটিকে বেছে নেওয়া হচ্ছে। নিচ থেকে স্কেভেটর দিয়ে মাটি কাটার ফলে পাহাড়ি এলাকাগুলোতে ভূমিধসের মতো ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনার মতোই সাধারণ হয়ে উঠেছে।

ইটভাটায় কাঠ ও কয়লা পোড়ানোর ফলে বিষাক্ত ধোঁয়া বায়ুম-লে মিশে গিয়ে গ্রিনহাউজ গ্যাসের অনুপাত বৃদ্ধি করছে। ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশের এবং মানবকুলের। ইটভাটা থেকে সালফার ও নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড নিঃসৃত হয়ে বাতাসের জলীয় বাষ্পের সঙ্গে মিশে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে এসিড রেইন বা অম্ল বৃষ্টি হয়ে ভূমিতে পতিত হয়। ফলে ওই সকল ভূমিতে অম্লত্ব বৃদ্ধি পায় এবং ফসল ফলানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। ইট তৈরি করার জন্য কাদা মাটি বা জমির উপরিভাগের মাটি ব্যবহার করা হয়। এ মাটির উর্বরতা থাকে অনেক বেশি। কেটে নেওয়ায় সেসকল জমিতে কোনোরূপ উর্বরতা থাকে না। ঢাকায় বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ হিসেবে আশপাশের অঞ্চলের ইটভাটাগুলোকে দায়ী করা হয়।

সভ্যতার উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে আমরা এতোটাই অগ্রসর হয়ে গেছি যে ইটের তৈরি দালান ছাড়া নিজেদের কথা ভাবতে পারি না! দালান তৈরি করতে ইটের বিকল্প হিসেবে সিমেন্টের ব্লক ব্যবহৃত হতে পারে যা পরিবেশবান্ধব। এতে কোনো প্রকার দূষিত বায়ু নির্গত হয় না এবং বৃহৎ পরিসরে জমি বা মাটিরও প্রয়োজন হয় না। কিন্তু আমাদের দেশে ব্লক বা অন্য কোনো বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় না। কারণ সনাতন পদ্ধতিতে ইট তৈরি করতে খরচ তুলনামূলক কম।

পরিবেশের রক্ষা সর্বোপরি নিজেদের সুস্থ জীবন যাপনের জন্য হলেও অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করতে হবে এবং ইটের ব্যবহার কমাতে হবে। ইট, তৈরি থেকে পরিবহন সকল ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে পরিবেশকে এবং আমাদের স্বাস্থ্যকে। তাই সময় হয়েছে ইটের ব্যবহার কমানো এবং বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করার। কিন্তু ইটের ব্যবহার এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছে যে এর বিকল্প ব্রিকস কিংবা স্টিল কিংবা কাচের তৈরি ভবনের প্রতি আকর্ষণ অনেক কম। তাই আমাদের জোর দেওয়া দরকার ইট তৈরিতে যেন সরকারি নীতিমালা যথাযথভাবে মানা হয় তার দিকে। যে সকল ইটভাটা থেকে কালো ধোঁয়া নির্গত হয় তা অচিরেই বন্ধ করা এবং সকল ইটভাটায় কার্বন নিঃসরণ জাল ব্যবহার করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা। অন্যথায় ইটভাটা বন্ধ করে দেওয়া এবং যথাযথ আইন প্রয়োগের মাধ্যমে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা। ইটভাটার ইটের পরিবহনের ক্ষেত্রে আরও সচেতন হতে হবে। ট্রাক্টর কিংবা অকেজো প্রায় পরিবহন পরিহার করে উন্নত মানের যানবাহন ব্যবহার করতে হবে। শুষ্ক মৌসুমে যানবাহন চলাচলের ফলে যেন ধুলাবালি খুব বেশি পরিমাণে না হয় সেজন্য ইটভাটা কর্তৃপক্ষকে রাস্তায় পানি ছিটানো এবং বর্ষা মৌসুমে রাস্তার খানাখন্দক ইটভাটা কর্তৃপক্ষকে নিজ দায়িত্বে পূরণ করতে হবে এ ধরনের একটি আইন পাস করা এখন সময়ের দাবি।

ফসলি জমি, বসতবাড়ি, বন-জঙ্গল থেকে দূরে যেন প্রতিটা ইটভাটা তৈরি করা হয় সেদিকে সরকারের নজরদারি বাড়াতে হবে। কারণ সভ্যতার এই যুগে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে কংক্রিটের দেয়াল তথা ইটের তৈরি দেয়াল এমনভাবে যুক্ত হয়ে গেছে, চাইলেও তাড়াতাড়ি এটি এড়িয়ে চলতে পারব না। ব্যবহার একেবারে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে না। দেশের আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যার পরিমাণ অনেক বেশি। তাই নগরজীবনে বহুতল ভবন অতি প্রয়োজনীয় বিষয়। বাসস্থানের জন্য যেমন ইটের ব্যবহার খুবই দরকারি তেমনি পরিকল্পিতভাবে ইটভাটাগুলো পরিচালনা করাও জরুরি। সরকারের পাশাপাশি আমাদের সকলকে সচেতন হতে হবে এবং পরিকল্পিতভাবে ইটভাটাগুলো পরিচালনার ব্যবস্থা করতে হবে। তার জন্য নিজ নিজ জায়গা থেকে প্রত্যেকের নিজের দায়িত্বটুকু পালন করতে হবে। নিজেদের দায়িত্বটুকু পালন করলেই সরকারের পক্ষে সম্ভব হবে পরিকল্পিতভাবে সকল ইটভাটাগুলো পরিচালনা করার। অন্যথায় তা কখনই সফলতার মুখ দেখবে না। তাই নিজেরা সচেতন হয়ে সরকারকে সাহায্য করি নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য।

শাহরীন তাবাসসুম : শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ
shahrin5792@gmail.comy