ডায়াবেটিসে উদ্বেগ নয়, সচেতনতায় হোক জয়

ঢাকা, সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১ | ৬ বৈশাখ ১৪২৮

ডায়াবেটিসে উদ্বেগ নয়, সচেতনতায় হোক জয়

ইলা মুৎসুদ্দী ১২:১২ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২১

print
ডায়াবেটিসে উদ্বেগ নয়, সচেতনতায় হোক জয়

২৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় ডায়াবেটিস সচেতনতা দিবস। ডায়াবেটিস নিয়ে আমাদের অনেকের মধ্যে ভয়, আতঙ্ক আর উদ্বেগ রয়েছে। হঠাৎ পরিবারের কারও ডায়াবেটিস ধরা পড়লে সবার মুখ অন্ধকার হয়ে যায়। যেন মহাবিপর্যয় নেমে এসেছে। এত উদ্বেগ, উৎকণ্ঠার কিছুই নেই। ডায়াবেটিস সারা জীবনের রোগ। একবার হলে আর কখনও নিরাময় করা যায় না, তবে এ রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ৫টি নিয়ম মানতে হয়।

ডায়াবেটিস হলে অনেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে যান। ফলে অতিরিক্ত টেনশনে ডায়াবেটিস বেড়ে যায়। তখন ওষুধের পরিবর্তে ডাক্তার ইনসুলিন প্রেসক্রাইব করেন। কারণ ডায়াবেটিস কমাতে হলে ইনসুলিন ভরসা। ইনসুলিন নিয়েও আছে আতঙ্ক। কীভাবে প্রত্যেক দিন এই ইনসুলিন দেব? এভাবে আতঙ্কিত হওয়ার কিছুই নেই। প্রতিটা ডায়াবেটিক হাসপাতালে ইনসুলিন দেওয়ার টেকনিক শেখানো হয়। ইনসুলিন টেকনিক শিখে নেওয়াটা প্রত্যেক ডায়াবেটিক রোগীর জন্য খুবই জরুরি। কারণ আপনি কোথাও বেড়াতে গেলেন কিংবা কোনো জরুরি প্রয়োজনে বাইরে গেলেন, সেখানে তো কাউকে পাবেন না ইনসুলিন দেওয়ার জন্য। নিজের সুরক্ষার জন্য ইনসুলিন টেকনিক, ডায়াবেটিস শিক্ষা প্রয়োজন। ডায়াবেটিস কিন্তু ছোঁয়াচে রোগ নয়। আগে বলা হতো পরিবারে বাবা, মা বা রক্তের সম্পর্কের কারও ডায়াবেটিস থাকলে তার ডায়াবেটিস হতে পারে। বর্তমানে যাদের পরিবারে কারও নেই, তাদেরও ডায়াবেটিস হচ্ছে। আসলে বর্তমানে চারদিকে যে পরিমাণ ভেজালের ছড়াছড়ি মানুষের এমনিতেই ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগ হবে। এক সময় বলা হতো ৪০ বছরের পরে ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। সেজন্য চল্লিশের পরে ডায়াবেটিস চেকআপের জন্য বলা হতো। এখন আর চল্লিশ বছর লাগে না। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদেরও ডায়াবেটিস ধরা পড়ছে। বাংলাদেশে এমন কোনো পরিবার পাওয়া যাবে না বোধহয় যে পরিবারে কারও না কারও ডায়াবেটিস নেই। তাই ডায়াবেটিস নিয়ে ভয়ের কিছুই নেই। আদতে ডায়াবেটিস কোনো রোগ নয়, যদি জটিলতা না হয়, জটিলতা হবে না যদি ডায়াবেটিস সুনিয়ন্ত্রিত থাকে। তাই ডায়াবেটিসের সব জটিলতার প্রতিকার ও প্রতিরোধের প্রকৃত উপায় হলো রক্তে গ্লুকোজ স্বাভাবিক রাখা। রক্তের গ্লুকোজ স্বাভাবিক থাকা মানেই আপনি সুস্থ থাকা আর সুস্থ থাকা মানেই সব রকমের কাজ করতে পারা। সুতরাং ডায়াবেটিস ধরা পড়লেই হতাশ হওয়ার কিছু নেই। মনে রাখতে হবে ডায়াবেটিস কোনো রোগ নয়। শরীরের একটি ছোট্ট পরিবর্তন যে পরিবর্তনের কারণে রক্তে চিনি বেড়ে যায়। মানুষ ইচ্ছা করলেই রক্তের বাড়তি চিনিকে নিয়ন্ত্রণে রেখে সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে অনেকেই বলে থাকেন আমি মাটির নিচের সবজি খাই না। ডায়াবেটিস হলে এটা খাওয়া যায় না, ওটা খাওয়া যায় না। আসলে কিন্তু এটি সত্যি নয়। শুধু মিষ্টি জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলবেন।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে খাদ্য ব্যবস্থাপনা খুবই জরুরি। কারণ সঠিক মাত্রায় যেভাবে ওষুধ এবং ইনসুলিন দিতে হয়, সেরকম সঠিক মাপে খাবার খাওয়া ডায়াবেটিস রোগীদের অন্যতম কাজ। ডায়াবেটিক হাসপাতালসমূহে খাদ্য ও পুষ্টি বিভাগ রয়েছে। পুষ্টিবিদরা বলে দেন সারা দিনে কয় বেলা খাবেন, কী কী খাবেন, কী কী খাবেন না, কতটুকু খেতে পারবেন। তাই ডায়াবেটিস হলে অবশ্যই পুষ্টিবিদের পরামর্শ মোতাবেক খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

আমাদের মধ্যে সচেতনতার খুবই অভাব। যেমন- একজন ডায়াবেটিস রোগী কখন ডায়াবেটিস বাড়ল কিংবা কমে গেল সেসব খেয়াল রাখতে হবে। ডায়াবেটিস কমে গেলে হাইপো হয়ে যায়। তখন সঙ্গে সঙ্গেই মিষ্টি জাতীয় কিছু খাবার খেতে হয়। আবার ডায়াবেটিস বেশি বেড়ে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। ডায়াবেটিস রোগীদের নিজেদেরই চিকিৎসকের মতো কাজ করতে হবে। সেজন্য বলা হয়, ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ডায়াবেটিস শিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ আপনার ডায়াবেটিস সবসময় একরকম থাকে না। কোনোদিন বেড়ে যায়, কোনোদিন কমে যায় আবার কোনোদিন নরমাল থাকে। যদি ডায়াবেটিস বেশি বেড়ে যায় তৎক্ষণাৎ ডাক্তারের কাছে যেতে পারছেন না। এই অবস্থায় নিজেকেই ইনসুলিনের ডোজ কমাতে কিংবা বাড়াতে হবে। না হলে আপনার ডায়াবেটিস কমে গেলে আর আপনি বেশি ডোজ ইনসুলিন দিতেই আছেন, এতে আপনারই সমস্যা হবে। একইভাবে ওষুধের মাত্রাও কমাতে কিংবা বাড়াতে হয় মাঝে মধ্যে।

সচেতনতার অভাবে আমরা নিজেরাই নিজেদের মধ্যে রোগ সৃষ্টি করি। যেমন- ডায়াবেটিস রোগীদের পায়ের ব্যাপারে খুবই সচেতন থাকতে হবে। অনেক রোগী দেখা যায়, শীতকালে পা ফাটলে গুরুত্ব দেন না। এদিকে পা ফেটে কোন সময় যে পায়ে ইনফেকশন হয়ে গেছে নিজেও জানেন না। পরবর্তীকালে চিকিৎসা নিতে এসে দেখা যায়, একটুখানি ইনফেকশনের জন্য পায়ে অপারেশন কিংবা পা কেটে ফেলতে হয়। আরেক রকম রোগী আছেন, যাদের ডায়াবেটিসের কারণে অনুভূতি শক্তি কমে যায়। ফলে পায়ে কাঁটা ফুটলে কিংবা কোনো আঘাত পেলে বুঝতে পারেন না। হয়তো দেখে চিন্তা করেন, ফার্মেসি থেকে কিছু ওষুধ খেলেই ভালো হয়ে যাবে। আসলে কিন্তু ভালো হয় না। কারণ ডায়াবেটিসের কারণে ক্ষতস্থান শুকায় না, ইনফেকশন হয়। যখন ইনফেকশন হয়ে শেষ অবস্থায় চলে যায়, তখনি ডাক্তারের শরণাপন্ন হন। ফলে হয় আঙ্গুল কেটে ফেলতে হয় কিংবা অপারেশন করতে হয়। যদি সচেতন হয়ে প্রথমেই একজন ডায়াবেটোলজিস্টের কাছে যেতেন তাহলে এমন সমস্যায় পড়তে হতো না। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য নিয়মিত ব্যায়াম করা জরুরি। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট করে হাঁটতে হবে। এই হাঁটাটা যে রাস্তায় হাঁটতে হবে তা কিন্তু নয়। আজকে ঝড় বৃষ্টি হলো রাস্তায় যেতে পারলেন না। তাই বলে কি হাঁটা হবে না? না হাঁটলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকবে কেমন করে? অবশ্যই হাঁটতে হবে। কীভাবে? ঘরেই ব্যবস্থা করতে হবে। বারান্দায়, ঘরের লম্বা জায়গায় এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত বারবার হাঁটা, একটু দ্রুতগতিতে, ৩০ মিনিট যথেষ্ট। যারা বয়স্ক, প্রবীণ, হাঁটুতে অথবা পিঠে ব্যথা তারা বারান্দার বা জানালার গ্রিল ধরে অথবা টিভি দেখার সময় একটা চেয়ার ধরে দাঁড়িয়ে পা দুটোকে উপর-নিচ অর্থাৎ ডান-বাম, বাম-ডান করতে হবে। যতটুকু জোরে আপনার সামর্থ্যে কুলায়।

এভাবে ৩০ মিনিট হাঁটলেও হবে। বেশি জায়গার দরকার হলো না, অল্প জায়গাতেই কাজটা হলো। আজকাল তো হাঁটার জায়গার বড়ই অভাব। ঘরেই কাজটা সারুন। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন। ডায়াবেটিস হলে এ রোগ নিয়েই বাকি জীবন চলতে হবে। অতএব, ভালোভাবে চলতে হলে সচেতনতার বিকল্প নেই। নিয়মিত রক্তে গ্লুুকোজ পরীক্ষা করে ডায়াবেটিস চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব। তাই আমাদের সকলের উচিত নিয়মিতভাবে রক্ত পরীক্ষা করে ডায়াবেটিস হয়েছে কি-না নিশ্চিত হওয়া এবং হয়ে গেলে ডায়াবেটিক হাসপাতালে গমনপূর্বক নিয়মিতভাবে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করা। কারণ ডায়াবেটিক হাসপাতালগুলোতে শুধু ডায়াবেটিস এবং ডায়াবেটিস সংক্রান্ত রোগসমূহের বিশেষ চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। এ কথা সত্য, যে কোনো ব্যক্তির যে কোনো সময়ে ডায়াবেটিস হতে পারে। পেশাগত জীবনে যাদের কায়িক পরিশ্রম করা হয় না তাদের অবশ্যই ব্যয়াম করতে হবে।

ইলা মুৎসুদ্দী : কলাম লেখক ও প্রাবন্ধিক