সভ্যতার অগ্রযাত্রা ও মানুষের সন্ধান

ঢাকা, সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১ | ৬ বৈশাখ ১৪২৮

সভ্যতার অগ্রযাত্রা ও মানুষের সন্ধান

অলোক আচার্য ১১:৪০ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২১

print
সভ্যতার অগ্রযাত্রা ও মানুষের সন্ধান

ছোটবেলা থেকেই মা-বাবার সন্তানের ভবিষ্যতের প্রধান লক্ষ্য থাকে মানুষ করা। ‘মানুষ করা’ শব্দটি সময়ের সঙ্গে বহু পথে নিয়ে গেছে। মানুষের বহু রূপ, বহুমত রয়েছে। কে কীভাবে সন্তানকে মানুষ করে তুলতে চায় তা নিয়ে দ্বিমত রয়েছে। মানুষ করার উদ্দেশ্য আজকাল বড় চাকরি করা। ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়া। অভিভাবক খুব করে চাইতেই থাকে তার সন্তান যেন বড় কোনো চাকরি করে। তার পিছনের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রচুর টাকাপয়সা উপার্জনের মাধ্যমে বাড়ি গাড়ির মালিক হয়ে আরাম আয়েশে নিশ্চিন্তে জীবনযাপন করা। দিনের পর দিন এই লক্ষ্যে সন্তান বড় করতে গিয়ে দেখেছি টাকাই মুখ্য উপাদান হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মানুষের ভিতর থেকে মানুষই উধাও হয়েছে! যা টিকে আছে তা কেবল মানুষের খোলস মাত্র। ঘুষ, দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে দেশ। তারপর আমরা বুঝেছি আমাদের বড় হওয়ার জন্য বড় চাকরি নয়, দরকার সত্যিকারের মানুষ হওয়া। আজ যা বিরল। আজ আমরা শুনি মানুষ হও, মানুষের মতো মানুষ হও, প্রকৃত মানুষ হও, সাদা মনের মানুষ হও, খাঁটি মানুষ হও ইত্যাদি। আরও নানা ধরন আছে। আজ কত রকম মানুষের খোঁজে ছুটছি আমরা তার হিসাব নেই। এটা কীভাবে হলো? মানুষে মানুষে এত পার্থক্য কেন আসে? এক মানুষ হলেই তো যথেষ্ট। আজ তাহলে আমরা কোন মানুষ হওয়ার লক্ষ্যে ছুটছি? আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ছেলেমেয়েরা কোন মানুষে পরিণত হচ্ছে? আবার মানুষ হয়ে জন্ম নেওয়ার পর মানুষ হওয়ার সংগ্রাম করারও প্রয়োজন ছিল না। যদি মানুষের গুণগুলো ভালোভাবে আয়ত্ত করতে পারতাম। তা হয়নি। মানুষের গুণ রেখে আমরা পশুর গুণ ভালোভাবেই আয়ত্ত করতে পেরেছি। পশুপক্ষী সহজেই পশুপক্ষী, আর মানুষ প্রাণপণ চেষ্টায় মানুষ। সেই চিরাচরিত উক্তিই আজ সত্য। তবে মানুষ হওয়ার জন্য এতটা প্রাণপণ চেষ্টা আজ আর কেউ করে না।

মানুষ না হয়েও তো সমাজে দিব্যি ঘুরে বেড়ানো যায়। মানুষের সমাদর পাওয়া যায়। অতিথি বা প্রধান অতিথি হয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান অলঙ্কৃত করা যায়! এত পরিশ্রম করার দরকার কী! পত্রপত্রিকায় এত সব ভয়ঙ্কর খবর প্রকাশিত হচ্ছে যে নিজেদের মানব জাতি বলতেই কেমন যেন খটকা লাগে। আমাদের হিংস্রতা থেকে বাদ যাচ্ছে না কেউ। এই যে মাঝে মধ্যেই খবর পাই ডাস্টবিনে, রাস্তার পাশে ব্যাগের ভিতর, বস্তার ভিতর নবজাতকের সন্ধান পাওয়া যায়। সেই নবজাতককে হিংস্র কুকুরের দল টানাহেঁচড়া করে।

আবার কোনো কোনো ভালো মানুষ তাদের নিজের সন্তানের মতো লালনপালন করে। আজব মানুষ এই সমাজের! নিজেদের জৈবিক চাহিদা মেটাতে তারা নিষ্পাপ প্রাণের জন্ম দেয়। তারপর লোকলজ্জার ভয়ে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে মারে। ঐ নিষ্পাপ বাচ্চাগুলো জানেও না তারা এই সমাজের কিছু কুৎসিত মানুষের লালসার শিকার। আমাদের সমাজে যেমন হরহামেশাই ডাস্টবিনে বাচ্চার কান্নার আওয়াজ পাওয়া যায় আবার দেখা যায় কোনো পাগলিনী পেটে বাচ্চা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মানসিক প্রতিবন্ধী যে বাচ্চা জন্ম দেবে সে মা তো পেল কিন্তু বাবার হিসাবটা দেওয়ার কেউ নেই। লোভ লালসা থেকে এসব মানসিক ভারসাম্যহীন নারীও বাদ যায় না। শরীরসর্বস্ব সমাজে চারদিকে কেবল শরীরের জয়জয়কার। শরীর বেঁচে কতজনে পেট চলে যায় তার হিসেব কেউ রাখে না।

কেউ শখে আর কেউ বাধ্য হয়ে! শরীরের প্রতিযোগিতায় নেমেছে এই সমাজ। আদর যত শরীরের আবার অত্যাচার যত সব শরীরের ওপর। এত শারীরিক ব্যস্ততায় মনের খোঁজ কেউ রাখে না। কতটা নিচে নামলে সমাজে এমন চিত্র দেখা যায়। পাপ তাপের হিসেব তো আজ কেউ করে না। ক্ষণিকের কাম উত্তেজনায় অন্ধ মানুষ কেবল নিজের উত্তেজনা প্রশমনে ব্যস্ত। সে মানসিক প্রতিবন্ধী হোক বা শিশু হোক। তাতে কিছুই যায় আসে না। সমাজের নষ্ট হওয়া নিয়ে এদের খুব বেশি মাথাব্যথা নেই। কখনো সেই নবজাতককে নিয়ে কুকুর টানাটানি করে। ওরা তো কুকুর। কোনো বোধ নেই। কিন্তু যে বা যারা সেই নবজাতককে ফেলে যায় সে কি ওই কুকুরের থেকে কোনো অংশে উত্তম? উত্তম অধমের বিচার আজ কেউ করে না। সবাই নিজেদের উত্তমই ভাবে হয়তো। পাপ ঢাকার আজ অনেক পথ।

ভাব সম্প্রসারণে দেখেছি, উত্তম নিশ্চিন্তে চলে অধমের সাথে, তিনিই মধ্যম যিনি চলেন তফাতে। আজ কি এই উত্তম আর অধমের মধ্যে পার্থক্য করা যাচ্ছে? আবার ক্ষেত্রবিশেষে প্রায় সবাই মধ্যম পন্থা অবলম্বনকারী। এক তথ্যে দেখা যায়, দেশের সড়ক, ডাস্টবিন, ঝোপে প্রতিমাসে অন্তত গড়ে তিন নবজাতক পরিত্যক্ত অবস্থায় মেলে! বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য মতে, ২০১৫ সাল থেকে ২০২০ পর্যন্ত মোট ২০৫টি মৃত নবজাতক উদ্ধার হয়। যার মধ্যে ২০১৯ সালে ৪২টি, ২০১৮ সালে ৩৯টি, ২০১৭ সালে ২৪টি, ২০১৬ সালে ২৮টি, ২০১৫ সালে ৫২টি মৃত নবজাতক ছিল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, জন্মই ওদের আজন্ম পাপ। এই শিশুগুলোর নির্মম পরিণতির জন্য দায়ী যারা তাদের কি খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে? এই পাপ কে সামলাবে? এই পশুত্ব কতদিন চলবে? দিনদিন এই ফেলে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছেই। এরা পৃথিবীতে আসার পিছনে দায় আমাদেরই। আসলে আমরা কি হওয়ার জন্য এত তাড়াহুড়ো করছি? মানুষ হয়ে জন্ম নেওয়ার পর থেকে মানুষ হওয়ার এই প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা এই মানবজাতিকেই আজ বিস্ময়াভিভূত করে রেখেছে।

কেন এই নিত্য সংগ্রাম? কবি বলে গেছেন সেই কত আগেই, সাত কোটি জননীর হে বঙ্গজননী, রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করনি? আজ তো আমরা সংখ্যায় দ্বিগুণ হয়েছি। আজও কবি থাকলে কি তাই বলতেন? নাকি মানুষের এই পরিবর্তনে ছন্দেরও কোনো পরিবর্তন হতো? ঠিক একই রকম রকমভেদ এসেছে শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে। শিক্ষার সঙ্গে দীক্ষা শব্দটির জোর আদিকাল থেকেই। একসময় শিক্ষা গ্রহণের জন্য গুরুর টোলে পাঠানো হতো। গুরু গাধা পিটিয়ে মানুষ করত। এটা কথার কথা হলেও, শিক্ষার শুরুতে বা ভিতরে শিক্ষার জ্ঞান না থাকলে তার সঙ্গে অন্য প্রাণীর পার্থক্য থাকে না।

শিক্ষা গ্রহণের পর সেই গুণ অর্জিত হয় যা তাকে মানুষের পরিচিতি এনে দেয়। সেখানে থেকে নিত্য শিক্ষার সঙ্গে আচরণ অনুশীলন করতে হতো, গুরুর প্রতি একনিষ্ঠ থাকতে হতো, জীবনে অলসতা ত্যাগ করতে হতো, কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে জীবনকে চলার পথে সব বাধা দূর করার উপযুক্ত করার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় জ্ঞান আহরণ করতে হতো। আজ কোনটা জ্ঞান আর কোনটা জ্ঞান নয়, কে জ্ঞানী আর কে জ্ঞানী নয়, কে শিক্ষিত হয়েও জ্ঞানী হননি তার নির্ধারণ করতে ব্যস্ত রয়েছি। সেটা প্রায়ই ধরা যায় না। অথচ শিক্ষার উদ্দেশ্য মানলে বা ধর্ম মানলে এতসব প্রশ্নের উদয় হতো না।

সামনে একরাশ টাকা পরে থাকলে সেই টাকার ওপর যে আমার অধিকার নেই তা আমাদের শেখানোর কথা ছিল শিক্ষার। আর চর্চা করার কথা ছিল আমার। কিন্তু শেখার পর আর চর্চা করা হয়নি। তাই কেতাবের জ্ঞান সেই কেতাবেই রয়ে গেছে। আমরা চলছি আমাদের মতো। সেই যে লেখক বলেছেন, গ্রন্থগত বিদ্যা আর পরহস্তে ধন, নহে বিদ্যা নহে ধন হলে প্রয়োজন। তাই লাইব্রেরিতে বই সাজিয়ে রেখে যেমন কোনো লাভ হয় না, তেমনি ক’খানা সার্টিফিকেট নিয়েও আমাদের ফাইল বোঝাই করে লাভ হয় না। আবার একেবারেই যে হয় না তা নয়। চাকরি পাওয়া যায়। মোটা বেতন পাওয়া যায়। মোটা না হলেও সংসার নির্বাহ করা যায়। সেটাই আজকাল মূল লক্ষ্য। আবার ফাঁকি দেওয়ার রাস্তাও জানা যায়।
মানুষ এগিয়ে চলেছে। তবে কোন পথে এগিয়ে চলেছে, সেই পথ ঠিক না ভুল তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কারণ এই যে পৃথিবীজুড়ে এত হাঙ্গামা, ফ্যাসাদ চলে তার মূলেও তো মানুষ। আবার শান্তির কথা যারা বলছে তারাও মানুষ। মানুষে-মানুষে আজ বড় পার্থক্য! বড় বড় ডিগ্রি নেয়, বিদেশে যায়, বড় বড় চাকরি করে।

তাকেই আমরা বড় মানুষ বলি। তাকে দেখলে রাস্তা ছেড়ে দিই। সমাজের হোমড়া চোমড়া মানুষরা আজ সমাজের সর্বেসর্বা হয়ে রয়েছে। সামাজিক বিচার আচারে তারা উপস্থিত হয়। মতামত দেয়। পিছনের দরজা দিয়ে অনেকেই আর্থিক লেনদেন করে অন্যায়ের পক্ষও নেওয়ার খবর আসে। তাদের যে এই অন্যায় সুবিধা দেয় বা দিতে বাধ্য হয় তারাও মানুষ। এভাবেই চলছে সমাজ। এগিয়ে চলেছে সভ্যতা। মেকি সভ্যতার চাদর পরে সভ্যতার নগ্ন অগ্রযাত্রা বড় অশোভনীয়। এই প্রবণতা থেকে আমাদের বেরিয়ে এসে সত্যিকারের মানুষের খোঁজ করতে হবে। যে মানুষের খোঁজ করেছেন লালন শাহসহ অন্যান্য মরমী সাধক। আমাদের সেই মানুষ দরকার।

অলোক আচার্য : সাংবাদিক ও কলাম লেখক, পাবনা