একুশের আলোকিত পথ সারা বিশ্বে

ঢাকা, রবিবার, ৭ মার্চ ২০২১ | ২২ ফাল্গুন ১৪২৭

একুশের আলোকিত পথ সারা বিশ্বে

মোহাম্মদ নজাবত আলী ১০:৪১ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২১

print
একুশের আলোকিত পথ সারা বিশ্বে

আজ আমি শোকে বিহ্বল নই, আজ আমি ক্রোধে উন্মত্ত নই, আজ আমি রক্তে গৌরবে অভিষিক্ত। ...যারা আমার অসংখ্য ভাইবোন হত্যা করেছে, যারা আমার হাজার বছরের ঐতিহ্যময় ভাষায় অভ্যস্ত মাতৃ সম্বোধনকে কেড়ে নিতে গিয়ে আমার এইসব ভাইবোনদের হত্যা করেছে, আমি তাদের ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি।

মাহবুব-উল আলম চৌধুরী এভাবেই রচনা করেছিলেন একুশের প্রথম কবিতা। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আমাদের জাতীয় জীবনে অমর অধ্যায়। আমাদের চেতনার অগ্নিমশাল। একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির অস্তিত্ব। এর সঙ্গে বাঙালির গৌরব ও বেদনার ইতিহাস জড়িত। বাংলা মায়ের গর্বিত সন্তান মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে ঢাকার রাজপথে রঞ্জিত করে মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশ্বের ইতিহাসে আমাদের ছাত্রসমাজ এক মহাশক্তি। আমাদের ভাষা আন্দোলন তাদের সুমহান ত্যাগের কথা বাঙালি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

ইতিহাস পাঠে আমরা জানতে পারি, পৃথিবীতে অনেক জাতি তাদের দেশের জন্য, স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছে। রক্ত দিয়েছে। কিন্তু মাতৃভাষার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে একমাত্র বাঙালি জাতিকে। মাতৃভাষা যেকোনো জাতির নিকট তার নিজস্ব ভাষা হিসেবে পবিত্র। কারণ মায়ের ভাষা ছাড়া কোনো দেশের মুক্তি আসে না। জাতির সংস্কৃতি তার মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে। কাজেই পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী মনে করল বাঙালির ওপর উর্দু ভাষা চেপে দিলেই বাঙালির নিজস্ব কৃষ্টি, শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি ধীরে ধীরে জাতির জীবন থেকে মুছে যাবে। কুচক্রী পাক সরকার এটা বুঝতে পেরেছিল বলেই আমাদের মাতৃভাষার দাবিকে তারা সুনজরে দেখেনি।

দেশ বিভাগের পর থেকে ভাষা আন্দোলন শুরু হয়। মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা প্রতিষ্ঠার দাবিতে বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। ঢাকাসহ সারা দেশে। মাতৃভাষা দাবিতে বিভিন্ন্ স্লোগান মুখরিত হয়ে ওঠে ঢাকার রাজপথ। তৎকালীন নুরুল আমিন সরকারের ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার শপথ গ্রহণ করেন বাংলা মায়ের চির জাগ্রত সবুজ সন্তান, সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত প্রমুখ। এ আন্দোলনকে স্তব্ধ করার জন্য সরকারে পেটোয়া পুলিশ বাহিনী ১৯৫২ সালেল ২১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে মিছিলের ওপর গুলি বর্ষণ করে। শহীদ হলেন বাংলা মায়ের সন্তান সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার প্রমুখ। ঢাকার রাজপথে শহীদের রক্তে রঞ্জিত হলে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি...’ আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী কালজয়ী গানটি রচনা করেন। এ আবেগ চিরকাল দেদীপ্যমান থাকবে। বীর বাঙালি কোনো দিন এ বেদনার ইতিহাস ভুলতে পারে না। তাই আজও ভাষা শহীদদের স্মরণে গানটি আবেদন ম্লান হয়নি এতটুকুও।

বায়ান্ন সালে ভাষার জন্য যে রক্ত ঝরেছিল সে রক্ত আজ পুষ্পিত সৌরভে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশে^র ১৮৮ দেশ ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভাষা শহীদদের গৌরবগাথার ইতিহাস প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেমন ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ১৮৮৬ সালের পয়লা মে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেট ৮ ঘণ্টা শ্রমের দাবিতে শ্রমিকদের আত্মদানের ঘটনা বিশ^ব্যাপী স্বীকৃতি লাভ করেছে। ’৫২ থেকে একাত্তরে স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনায় জাতিকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। বহু রক্তপাত ঘটেছে কিন্তু ভাষা আন্দোলনের ঘটনা বাঙালি জাতির একটি বিশিষ্ট অর্জন; এটা বিশ্ব স্বীকৃতি লাভের জন্য বেশি কিছু করতে হয়নি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বাঙালির আরেক বিজয়।

একুশের আলোকিত পথ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। পবিত্র রক্তকে সম্মান দিয়েছে। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর সম্মেলনে ভাষা আন্দোলন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদা লাভ করে। তাই বাঙালির ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে দেশ থেকে দেশান্তরে। এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে। বিশে^র ১৯৩ দেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। আজ সারাবিশ্বে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে সালাম, বরকত, রফিক প্রমুখ ভাষা শহীদের নাম। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি পশ্চিম পাকিস্তানের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ভাষা আন্দোলনে বাঙালির লুকায়িত শক্তি ও আত্মবিশ্বাস জেগে ওঠে। অবচেতনে থাকা শক্তি সাহস বেরিয়ে আসে। বাঙালি প্রমাণ করেছে ন্যায়সঙ্গত দাবি আদায়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন সংগ্রামের বিকল্প নেই। তাই একুশে হচ্ছে আমাদের চলার শক্তি, সংগ্রামের পাথেয়। বাঙালি জাতির চেতনা। একুশের মর্মবাণী হলো, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা। কারও কাছে মাথা নত না করা। একুশে বলতে বুঝি নৈতিক মূল্যবোধ, স্বদেশ-ভ্রাতৃপ্রেম, মুক্ত ও শুভ বুদ্ধির লালন ও বিকাশ।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারা সূচিত হয়েছিল সে মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে ৫৪ সালের আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, ৬২ সালে শিক্ষা, ৬৬ সালে ছয় দফা আন্দোলন, ৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বোপরি একাত্তর সালে ছিনিয়ে এনেছি আমাদের মহান স্বাধীনতা। পেয়েছি মুক্ত স্বদেশ। বায়ান্ন সালে যে পাকিস্তান সালাম, রফিক, বরকত জব্বারের বুকে গুলি চালিয়েছিল সে পাকিস্তানকেও আজ চাক্ষুষ করতে হচ্ছে বাঙালির ভাষা দিবস। এখানেই বাঙালির সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিজয়। জাতির গর্ব ও অহংকার। একুশে মানে একুশ শতক নয়। বাঙালির মনে প্রথমেই ভেসে ওঠে বায়ান্ন সালের ২১ ফেব্রুয়ারির সে বেদনাদায়ক ইতিহাসের কথা। ভাষা আন্দোলনের সাত দশক পূর্র্ণ হয়েছে। এ দীর্ঘ সময় বাংলা ভাষাকে সর্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করতে আমরা সক্ষম হইনি। বাংলা রাষ্ট্রভাষা হলেও সর্বজনীন ভাষা এখনো হয়নি। একুশের ভাবনা থেমে নেই। একুশের প্রথম ভাবনা আমরা বাঙালি এবং একই সঙ্গে আমরা অসাম্প্রদায়িক। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা, সে মাতৃভাষার জাগরণ ঘটাতে হবে ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পর্যন্ত- সর্বত্র। বাংলা ভাষার মাধ্যমে সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ ঘটিয়ে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করা। ভাষার বিকাশ ঘটে তার চর্চার মধ্য দিয়ে। আমাদের মাতৃভাষার প্রতি অনীহা বা উদ্যমহীনতা যে কারণেই হোক ব্যাপক হারে বাংলা ভাষার চর্চা হচ্ছে না। একুশের দাবি ছিল অফিস আদালতের ভাষা হবে বাংলা। কিস্তু বাস্তবে থাকলেও উচ্চ আদালতে বাংলার ব্যবহার খুব কম। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে সুস্থ সাংস্কৃতিক ধারার সূচনা হয়েছিল সে ধারা আজ কিছু ম্রিয়মাণ। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অন্যতম দিক হলো ভাষা সংরক্ষণ। এমন কতগুলো ভাষা আছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে চর্চা গবেষণার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। এ ভাষাগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

বিশ্বে নেতৃবর্গ বায়ান্নর একুশকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ স্বীকৃতি শুধু বাঙালি জাতির গর্ব নয়, গর্ব ভাষা শহীদদের। এটা আমাদের ভাষা বিজয়। তবে শুধু বাঙালির মাতৃভাষার বিজয় নয়। বিশে^র সকল দেশের মাতৃভাষার বিজয়। শুধু একুশের বইমেলা করলেই চলবে না, ছোটদের জন্য শুরু থেকেই মাতৃভাষার প্রীতি গড়ে তুলতে ব্যাপক হারে সৃজনশীল বই প্রকাশ করা উচিত। বাঙালির এ বিজয়কে ধরে রাখতে সকলকে সচেষ্ট থেকে মাতৃভাষাচর্চা ও গবেষণা কেন্দ্র বাংলা একাডেমিকে আরও তৎপর হতে হবে। সে সঙ্গে সকলকে যার যার অবস্থান থেকে মাতৃভাষা উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে হবে। জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী মাহমুদুজ্জামান বাবুর (মূল গায়ক প্রতুল বন্দ্যোপ্যাধ্যায়) আমি বাংলায় গান গাই, আমি বাংলার গান গাই, আমি আমার আমিকে চিরদিন এ বাংলায় খুঁজে পাই- গানটির মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা ও দেশপ্রেম ফুটে উঠেছে। দেশের প্রতি গভীর মমত্ববোধ ও ভালোবাসার প্রকাশ ঘটেছে। কিন্তু চলমান রাজনৈতিক বৈরী পরিবেশে মাহমুদুজ্জামান বাবুর গানের মর্মকথা আমরা হয়তো উপলব্ধি করতে পারিনি। কারণ আমাদের ভাষা ও দেশপ্রেমের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা হলেও রাষ্ট্রের ভাষা এখনো হয়নি। রাষ্ট্রের সর্বত্র বাংলা ভাষা চালু করতে হবে। রাষ্ট্রের সবকিছু বাংলা ভাষায় চলবে। এ জন্য যা যা প্রয়োজন তা সরকারকেই গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে দেশ জাতির অগ্রগতি ও উন্নয়নে সকল ভেদাভেদ ভুলে এক সঙ্গে কাজ করা অতীব জরুরি। এ লক্ষ্যে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই।

ইতিহাসের আলোকেই, আজকের দিনে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করে বাংলা ভাষাকে বিশ্ব দরবারে গৌরবান্বিত করেছেন। স্মরণ করি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে, যিনি স্বাধীনতার পর জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়ে বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতিকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। ধন্যবাদ জানাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে, যার চেষ্টা ও তৎপরতায় একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদা লাভ সহজতর হয়। সর্বোপরি ভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাই।

মোহাম্মদ নজাবত আলী : শিক্ষক ও লেখক
tnalichs@gmail.com