দৃষ্টিভঙ্গিই প্রকৃতির প্রতি আচরণের নির্দেশক

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২ মার্চ ২০২১ | ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭

দৃষ্টিভঙ্গিই প্রকৃতির প্রতি আচরণের নির্দেশক

কামরুজ্জামান তোতা ১১:৫০ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ২৭, ২০২১

print
দৃষ্টিভঙ্গিই প্রকৃতির প্রতি আচরণের নির্দেশক

অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে মানুষের মানবিক মূল্যবোধ ও নীতি-নৈতিকতার উন্নতির বিষয়টি পুরোপুরি সম্পৃক্ত নয়। শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন দিয়ে মানবিকতাকে বিচার করা যায় না। এটি পরিবার, সমাজ ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের সঙ্গে জড়িত। অর্থ থাকলেই সুখী হওয়া যায় না, যদি না এর সঙ্গে মূল্যবোধ ও নৈতিকতার সম্পর্ক থাকে। মানুষের জীবনে অর্থের প্রয়োজনীয়তা যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি মূল্যবোধের অনিবার্যতাও প্রশ্নাতীত। উন্নত বিশ্বের অনেকে দেশ এখন অর্থনৈতিক উন্নতির চেয়ে নাগরিকদের মানবিক মূল্যবোধের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সুশাসন সুসংহতকরণ, গণতন্ত্রচর্চা ও উন্নয়ন কর্মসূচিতে সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, পরমতসহিষ্ণুতা, মানবাধিকার ও আইনের শাসন সুসংহতকরণ এবং জাতির অগ্রযাত্রায় ভূমিকা পালন করতে হবে।

মানুষ ও প্রকৃতির কল্যাণে যে দৃষ্টিভঙ্গি তাই পরিবেশবাদ। অন্যদিকে মূল্যবোধ হচ্ছে একটি আবেগীয় বৈশিষ্ট্যের সংমিশ্রণ। সবার জন্য উত্তম ভবিষ্যৎ নিশ্চিতকল্পে পরিবেশ সংরক্ষণ ও এর ধ্বংস রোধে যে শিক্ষা, সচেতন প্রচেষ্টা, সহযোগিতার কৌশল অবলম্বন, সাময়িক সুখ বিসর্জন, এ বিষয়ের প্রচার-প্রসার ইত্যাদি সবই পরিবেশবাদী মূল্যবোধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। জীব জগতের অস্তিত্ব রক্ষা এবং তাদের সংরক্ষণমূলক পরিকল্পনায় পরিবেশবাদী চিন্তাই মূল্যবোধের লক্ষণ। মানুষ মূলত চালিত হয় তার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে। অর্থাৎ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিই প্রকৃতির প্রতি তার আচরণের নির্দেশক হিসেবে কাজ করে। মানুষের অব্যাহতভাবে প্রকৃতিবিরোধী ও প্রজাতিবাদী বদ্ধমূল দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক বিকাশ থেকে সৃষ্ট জীবনযাত্রাই আজকের বিশে^র পরিবেশ সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে উপনীত হয়েছে।

প্রাকৃতিক পরিবেশেই মানুষ জন্মগ্রহণ করে, অস্তিত্বশীল হয়, ক্রমে বেড়ে ওঠে। প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যেই সে জীবনধারণের সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। কিন্তু অসীম অভাব পূরণ করতে গিয়ে ভুলে যায়, মানবের জন্য বিকল্প অন্য কোনো পৃথিবী নেই। মানুষের জন্য পৃথিবী শুধু একটিই। এই ধ্রুব সত্যটি ভুলে যায় বলেই মানুষ প্রকৃতির স্বাভাবিক অবস্থাকে পরিবর্তন করে দিয়ে অত্যধিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। অপরিণামদর্শী কর্মকা-, প্রকৃতির প্রতি অবহেলা, প্রকৃতিতে চরম ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টির ভয়ঙ্কর খেলায় মেতে ওঠে এবং দানবের ভূমিকা গ্রহণ করে। মানুষ স্বভাবতই সামাজিক সাংস্কৃতিক জীব। এ মহাসঙ্কট নৈতিক তথা দার্শনিক সঙ্কটেরই নামান্তর। মানুষের মধ্যে পরিবেশের প্রতি বৈরী আচরণ বলা চলে বহু পুরনো একটি অভ্যাস।

অর্থনৈতিক উন্নয়ন মানুষের সুখ-শান্তি, মানবিক উন্নয়ন ও নিরাপত্তার মাপকাঠি নয়। মানুষের মানবিক উন্নয়নকে পেছনে ফেলে কেবল অর্থনৈতিক উন্নতির পরিসংখ্যান ও জিডিপি বৃদ্ধিকে উন্নতি, সভ্যতা ও মানবিকতার উন্নয়ন হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। যে উন্নয়ন মানুষের মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতা লোপ করে, লোভ-লালসা, নিষ্ঠুরতা, অপরাধপ্রবণতা ও অপসংস্কৃতিতে নিমজ্জিত করে সে উন্নয়ন অর্থহীন। আমাদের দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জিডিপির প্রবৃদ্ধির দিকে গভীর মনোযোগ দিলেও মানুষের মধ্যকার মূল্যবোধের অধঃগতির দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে না। একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রধানত যে বিষয়গুলোর প্রয়োজন হয় সেগুলো হচ্ছে, মানবসম্পদ, প্রাকৃতিক সম্পদ, শিক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি। পরিবার ও সমাজে একের পর এক অকল্পনীয় ও ভয়াবহ ঘটনা ঘটে চলেছে। খুন, ধর্ষণ, রাহাজানি, মাদকাসক্তি, কিশোর গ্যাং সৃষ্টি থেকে শুরু করে সব ধরনের অপরাধ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এ ব্যাপারে পরিবার ও সমাজের অভিভাবক শ্রেণি যেমন উদাসীন, তেমনি সরকারও যথাযথ দৃষ্টি দিচ্ছে না। মানুষের মধ্যে এমন একটা প্রতিযোগিতা ও বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যেভাবে হোক অর্থনৈতিক উন্নতি করতে হবে। মানুষও সেদিকে ধাবিত হচ্ছে। মানবিকতা, মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতাকে পেছনে ফেলে সুখের মূল উৎস হিসেবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকে ছুটছে। নিজের সন্তান থেকে শুরু করে পরিবারের সদস্যরা যে অরক্ষিত হয়ে একেকজন বিচ্ছিন্ন মানুষে পরিণত হচ্ছে এবং বিপথে পা বাড়াচ্ছে, সেদিকে খেয়াল করছে না। কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও শিক্ষার সার্বজনীনতা আসছে না। শিক্ষার দৈন্য কাটছে না। শিক্ষায় আসছে না পরিবর্তনের হাওয়া। কাজেই যুগোপযোগী ও পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে এবং একটি গণমুখী ও কর্মমুখী শিক্ষানীতিকে প্রাধান্য দিতে হবে, যার বাস্তবায়ন না হলে বাঙালির কোনো কালেই অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটবে না। একটি সুষ্ঠু শিক্ষানীতি ও তার সফল বাস্তবায়নে বাঙালি কর্মদক্ষ জনশক্তিতে পরিণত হবে এবং যথার্থ মানবসম্পদের উন্নয়নও ঘটবে। শিক্ষা ও মানবসম্পদের উন্নয়ন ব্যতিরেকে আমাদের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো মানুষের বাস্তব জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। ইন্টারনেট নির্ভরতার কারণে আচার-আচরণ, অভ্যাস, চলাফেরায় এসেছে পরিবর্তন। এ জগতে অবাধে চলাফেরার সুবাদে বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতাও বেড়েছে। বিশেষ করে একে অপরের নামে কুৎসা রটনা করার যেন উর্বর ভূমিতে পরিণত হয়েছে ভার্চুয়াল জগতের সামাজিক মাধ্যমগুলো। ভার্চুয়াল জগতে বিচরণের নিয়মনীতি না থাকায় শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই হয়রানির শিকার হচ্ছে। মৌলিক কৃষ্টি-সংস্কৃতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ, শান্তি ও শৃঙ্খলার উন্নয়নকে মূল ভিত্তি ধরে মানুষের সুখ নিশ্চিতের রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণ করেছে।

আমরা সাধারণত মানুষের জীবনে দুটি জগতের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানি। প্রথমত, ইহকাল তথা দুনিয়ার জগৎ ও পরকাল তথা মৃত্যুর পরের জগৎ। তবে আধুনিক যুগে ভার্চুয়াল জগৎ নামে তৃতীয় একটি জগৎ তৈরি হয়েছে। বর্তমান বিশে^র বেশির ভাগ মানুষ ভার্চুয়াল জগতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভার্চুয়াল জগতের প্রভাবে ইহকাল ও পরকাল এই দুই জগতকে আমরা প্রায় ভুলতে বসেছি।

সামাজিক পরিবর্তন সামগ্রিক সমাজ ব্যবস্থার একটি স্বাভাবিক পরিক্রমা। সমাজ প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হয়। বলা যায় পরিবর্তনই সমাজের ধর্ম। সামাজিক পরিবর্তনের মৌলরূপ হলো এর গুণগত পরিবর্তন। পরিবর্তনের পরিক্রমাই আদিম মানুষ পূর্বের বর্বর অবস্থা হতে পরিবর্তন হয়ে আধুনিক যুগের এই অবস্থায় উপনীত হয়েছে এবং অনাগত ভবিষ্যতের দিকে ধাবমান রয়েছে। সমাজ বলতে বোঝায় পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মিথস্ক্রিয়ার সমষ্টি। পারস্পরিক নির্ভরশীলতা মিথস্ক্রিয়ার উদ্ভব ঘটায়। এই আন্তঃব্যক্তিক মিথস্ক্রিয়া আবর্তনশীল।

কামরুজ্জামান তোতা : সাংবাদিক