অবক্ষয়মুক্ত মানবিক সমাজ চাই

ঢাকা, সোমবার, ১ মার্চ ২০২১ | ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭

অবক্ষয়মুক্ত মানবিক সমাজ চাই

মোহাম্মদ নজাবত আলী ১১:৪২ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ২৪, ২০২১

print
অবক্ষয়মুক্ত মানবিক সমাজ চাই

সমাজটা কতদূর এগিয়েছে? শৃঙ্খলা, মূল্যবোধ, নৈতিকতা আমাদের যাপিত জীবনে কতটা অর্জিত হয়েছে। সমাজে কতটা অপরাধপ্রবণতা কমেছে, শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সমাজটা কতটা নিরাপদ, সমাজ কাঠামো কতটা উন্নত হয়েছে, নারী নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত হয়েছে, সার্বিক বিবেচনায় নীতি, আদর্শ, মূল্যবোধের দিক থেকে কতটা এগিয়েছে আজ এ প্রশ্নগুলোর উত্তর বিচার বিশ্লেষণ করা খুবই জরুরি।

ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হলেও ধর্ষণ থেমে নেই। সম্প্রতি রাজধানীর কলাবাগানে মাস্টারমাইন্ড স্কুলের ও লেভেলের ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়ে প্রচুর রক্তক্ষরণে মারা যায়। মেয়েটির বন্ধু দিহান তার নিজ বাসায় মেয়েটিকে ডেকে এনে ধর্ষণ করে। প্রভাবশালী ও প্রতিপত্তিদের চাপে এ ঘটনায় দিহানের তিন বন্ধুকে ছেড়ে দেওয়া হয় এমন অভিযোগ আনুশকার পরিবার ও সহপাঠীদের। তারা মনে করে দিহানের তিন বন্ধুও এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলায় দিহানকে আটক করা হয়। আটককৃত দিহান আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এতে তিনি একা মেয়েটিকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেন। তিনি এখন কারাগারে। এ ঘটনায় ধর্ষিতার সহপাঠী, দেশের বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে মানববন্ধন করে। নারীর প্রতি সহিংসতা যেন কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না। করোনাকালের মধ্যে গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৬২৬ জন শিশু, নির্যাতনে মৃত্যু হয় ১৪৫ জনের। বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের (এমজেএফ) তথ্য থেকে জানা যায়, গত বছর ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ৩৭ শিশুকে। ১৩ থেকে ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুরাই ধর্ষণের শিকার হয়েছে বেশি।

স্বাধীনতার ৪৯ বছরে আমাদের অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, কৃষি, বিদ্যুৎ, সামাজিক অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থার যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। নারী শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। এগুলো একটি দেশের অগ্রগতি, সমৃদ্ধির পরিচয় বহন করে। এক কথায় আমরা বলতে পারি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সমাজে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অঘটন, অপরাধ, নারী-শিশুর নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক অবক্ষয়ের বিষয়গুলো সচেতন মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে, সমাজে বসবাসরত মানুষের মধ্যে মানবিক চেতনা জাগ্রত হয়েছে কিনা, সামাজিক মূল্যবোধ, শুভ বুদ্ধির উদয় হয়েছে কিনা, সমাজের বখাটেদের উৎপাত বন্ধসহ সর্বোপরি মানবিক বোধসম্পন্ন সমাজ গড়ে উঠেছে কিনা এদিকগুলো অবশ্যই ভাবার বিষয়।

যৌতুক, এসিড নিক্ষেপ, বখাটেদের উৎপাতে স্কুল-কলেজগামী নারীরা আজ নিরাপদ নয়। তারা নানাভাবে শারীরিক নির্যাতন, ক্ষেত্রবিশেষে হত্যার শিকার হচ্ছে। কখনো কুপ্রস্তাব বা প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় চড়াও হয় নারীর ওপর। আবার কখনো কখনো অশোভন আচরণ থেকে রক্ষা পেতে অনেক নারী আত্মহত্যার পথও বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। এসব ঘটনায় স্বজন হারানোদের আর্তনাদ আমাদের ব্যথিত করে। সুস্থ চিন্তা ও শুভ বুদ্ধির বিপরীতে দিনে দিনে আমাদের সমাজটা ক্রমশ অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছে। যে সমাজে বাস করছি সে সমাজ আমাদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না। যে রাষ্ট্রে বাস করছি সে রাষ্ট্র নিরাপত্তা দিতে পারছে না। যার বড় প্রমাণ প্রতিনিয়ত নারী ধর্ষণসহ ঘটে যাচ্ছে নানা ধরনের অঘটন। তবে এসব অঘটনগুলো সামাজিক অবক্ষয়ের এক নির্মম চিত্র।

শিশু ও নারী নির্যাতন বিশেষ করে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদ- করা হলেও নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হচ্ছে না। এসব ঘটনায় কোনোটির বিচার হয়েছে আবার কোনোটির হয়নি। শিশু ধর্ষণ, হত্যা, নারী নির্যাতন, গণধর্ষণ বা নারী হত্যাকাণ্ডের ঘটনা গণমাধ্যমে যখন প্রকাশ পায় তাতে যেকোনো বিবেকবান মানুষ বিচলিত না হয়ে পারে না। নারী ও শিশু নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ সামাজিক অবক্ষয়ের এসব বিষয় নিয়ে পত্রপত্রিকায় বিভিন্ন লেখালেখি হচ্ছে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন নারীবাদী বিভিন্ন সংগঠনগুলো নারী নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণরোধকল্পে তারা সভা সমাবেশ প্রতিবাদ করেও এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। বন্ধ হচ্ছে না নারী ধর্ষণ, নির্যাতনমূলক অপরাধ। একদিকে বিলম্বে বিচার অন্যদিকে অপরাধের পৃষ্ঠপোষকতা অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনার ঘাটতি। প্রভাব, প্রতিপত্তি, অর্থবিত্ত, বৈভব, রাজনৈতিক প্রতিপত্তির বাধাহীন বিস্তারের নেতিবাচক প্রভাবে আমাদের সমাজে নানা ধরনের অপরাধ ও অপকর্ম চলছে প্রতিনিয়ত। সীমাহীন নিষ্ঠুর বর্বরতার শিকার হচ্ছে শিশু ও নারী। ফলে সামাজিক অবক্ষয় চরম আকার ধারণ করেছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে অনবরত তারা লালসার শিকার হচ্ছে। শিশু ধর্ষণ, হত্যা, নারী নির্যাতন বন্ধ করতে না পারলে একদিন এ সমাজে মানুষের বসবাস অনুপযোগী হয়ে পড়বে। নারীর মনে অভয় সৃষ্টিতে নারী নির্যাতন রোধ করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

এক সময় যাযাবর জীবনের অবসান ঘটে এবং সভ্যতার জগতে মানুষ প্রবেশ করে। মানুষ আস্তে আস্তে সভ্যতার পাঠ শিখতে শুরু করে। সভ্যতার ভালো দিকগুলো মানুষকে পরিশুদ্ধ করে, স্বচ্ছ করে, মহৎ করে মানবীয় গুণের অধিকারী করে গড়ে তোলে। তবুও আমাদের সমাজে নানা ধরনের অরাজকতা বিশৃঙ্খলা বিভিন্ন ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। লোভ, ব্যক্তিগত স্বার্থের কাছে মানুষের জীবন আজ অতি তুচ্ছ। এগুলো মনুষ্যত্বের জাগরণে বাধা সৃষ্টি করে মানুষকে দানব করে। সে মানুষরূপী দানবের হাত থেকে আজ শিশু নারী, শিক্ষার্থী, গৃহকর্মী কেউ নিরাপদ নয়। তাই আজ নারী ও শিশু নানাভাবে নির্যাতনের শিক্ষার হচ্ছে।

শিশুরা আজ ঘরে বাইরে কোথাও নিরাপদ নয়। হত্যা, খুন, ধর্ষণ, অপহরণসহ বিভিন্ন ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, সামাজিক ও পারিবারিক অবক্ষয় বেকারত্ব, অনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষা, পর্নোগ্রাফির প্রসার, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সামাজিক অস্থিরতা, স্বার্থপরতা, এসব ঘটনার অন্যতম কারণ। পৃথিবীর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, সহযোগিতা, সহমর্মিতা বৃদ্ধির বিপরীতে একধরনের কুরুচি বিকৃত মানসিকতা সৃষ্টি হচ্ছে। আর এটা বেশিরভাগ দেখা যাচ্ছে শিক্ষিত তরুণদের মাঝে। নৈতিক শিক্ষার অভাব, বেকারত্ব, সঙ্গ দোষ, মোবাইল ফোনের অপব্যবহার, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন টিভি চ্যানেল, তরুণ সমাজের ভিতর প্রবেশ করেছে নানা ধরনের অপরাধপ্রবণতা। আর এসব ঘটনায় ফুটে উঠেছে অবক্ষয়ের নানা দিক, ভয়াবহ চিত্র, নৃশংস বর্বরতা। নারীরা আজ কোথাও নিরাপদ নয়। নিরাপদ নয় গৃহকর্মীরাও। বিভিন্ন অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এমনকি ঘরেও নারীরা নিরাপদ নয়। মূলত পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর প্রতি বিকৃত রুচির দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই সবখানে নির্যাতিত, লাঞ্ছিত হচ্ছে।

নারীর প্রতি সহিংসতা রুখতে হবে। নারী সমাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে দেশের উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হবে। কারণ নারীরা আজ দেশের উন্নয়নে বিভিন্নভাবে অবদান রাখছে। একজন নারীকে শুধু নারী না ভেবে মানুষ ভাবা উচিত। এদেশে আশাতীতভাবে নারীশিক্ষার প্রসার ঘটেছে। নারীর ক্ষমতায়ন ঘটেছে। অথচ তারাই বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তাদের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। নারীর প্রতি সহিংস হয়ে ওঠে তাদের বিকৃত মানসিকতা থেকে। যে পরিবেশে সে বেড়ে উঠেছে এমনকি যে পরিবারে বেড়ে উঠেছে সে পরিবেশে বা পরিপার্শ্বে সহিংসতা রয়েছে। তাই সবার আগে নিজ নিজ পরিবারকে নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগাতে হবে। কারণ স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় যা দিতে পারে না পরিবার সেটা দিতে পারে। পরিবারই হচ্ছে প্রাচীনতম সংগঠন এবং নৈতিক শিক্ষার আঁতুড়ঘর। সে আঁতুড়ঘর আজ বিষাক্ত হয়ে উঠেছে।

বর্তমান যে সামাজিক অবক্ষয় দেখা দিয়েছে তার কারণগুলোর মধ্যে পারিবারিক বন্ধন হালকা, বিভিন্ন টিভি সিরিয়াল, ইন্টারনেট, ফেসবুক, মোবাইল ফোন ইত্যাদি। তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে ভালো দিকগুলো অধিকাংশ তরুণ গ্রহণ করছে না। বর্তমান করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অধিকাংশ শিক্ষার্থী অনিয়ন্ত্রিত চলাফেরা করছে। যার কারণে তাদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতার জন্ম নিচ্ছে বলে সমাজতত্ত্ববিদ ও অপরাধবিজ্ঞানীরা মনে করেন। এ থেকে বেরিয়ে আসতে এবং সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়রোধকল্পে অবশ্যই মানবিক শিক্ষা লাভের বড় প্রয়োজন। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা একজন শিক্ষার্থীকে না পারছে মানবিক করে তুলতে, না পারছে বেকারত্বের অবসান ঘটাতে। তাই শিক্ষাব্যবস্থাকে পরিমার্জিত করে মানবিক শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। শিক্ষিত বেকার তরুণদের এক ধরনের হতাশা থেকেও তারা বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তা প্রতিকারে দেশে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি দরকার। কথায় আছে, অলস মস্তিষ্কে শয়তানের বাস। মোটা দাগে বলতে গেলে আমাদের গোটা সমাজ ব্যবস্থাকে আরও মানবিক করে তুলতে পারলে সামাজিক, শৃঙ্খলা আরও সুদৃঢ় হবে।

নারী, শিশু ও ধর্ষণের ঘটনা কি চলতেই থাকবে? অথচ ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হলেও নারী নির্যাতন, ধর্ষণ এখনো থেমে নেই। তবে কি ধর্ষকের মৃত্যুভয় নেই? আমাদের সমাজে শিশু, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কি কোনো জাগরণ সৃষ্টি হবে না? নানা ধরনের ঘটনা ও সামাজিক অবক্ষয় কোনো সভ্য সমাজের চিত্র হতে পারে না। সভ্য সমাজের চিত্র হবে মানবিক। আমরা মানবিক সমাজ চাই। যেখানে নারী, শিশু কেউ শারীরিক মানসিক নির্যাতনের শিকার হবে না। প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া নারী ও শিশু নির্যাতন মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। আমরা নারী ও শিশুর নিরাপত্তা চাই। যেকোনো মূল্যে সমাজের বিভিন্ন কর্মস্থলে, পরিবারে শৃঙ্খলা ফিরে আনতে হবে। একই সঙ্গে আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগকে আরও গতিশীল করা দরকার। বিলম্ব নয়, দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করে নিশ্চিত করতে হবে কঠোরতম শাস্তি।

মোহাম্মদ নজাবত আলী : শিক্ষক ও লেখক
tnalichs@gmail.com