সুশাসন, দুর্নীতি ও জবাবদিহি

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ১৩ ফাল্গুন ১৪২৭

সুশাসন, দুর্নীতি ও জবাবদিহি

বাসুদেব খাস্তগীর ১২:৩৫ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৩, ২০২১

print
সুশাসন, দুর্নীতি ও জবাবদিহি

একটি দেশের জন্য সুশাসন খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সুশাসন না থাকলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যাহত হয়। সুশাসন অনেকগুলো উপাদানের সমাহার। সুশাসনকে বলা যায় এটি একটি আপেক্ষিক ইস্যু। কোনো সমাজব্যবস্থায় কিংবা রাষ্ট্রে সুশাসনের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান আছে কিনা তা উপলব্ধি করা যাবে প্রশাসনিক দুর্নীতির অবস্থা, প্রশাসনে স্বচ্ছতার চিত্র, জবাবদিহি ও গণমাধ্যমের ভূমিকা কীরূপ তার ওপর।

গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় সুশাসন হলো একটি কাক্সিক্ষত বিষয় যা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রশাসনের নিরপেক্ষ আচরণ, নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা, আইনের শাসন, জবাবদিহিসহ মত প্রকাশের স্বাধীনতার মতো বিষয়গুলোর উজ্জ্বল উপস্থিতি। একটি দেশের যদি জনগণ মনে করে দেশে দুর্নীতির চিত্র নেই, সরকারের কাজে জবাবদিহি রয়েছে, জনগণের অংশগ্রহণ আছে, দেশে সুবিচার ও আইনের শাসন রয়েছে, মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ আছে এবং বিচারব্যবস্থা স্বাধীন সেখানে সুশাসন রয়েছে বলে ধরে নেওয়া হতে পারে।

সুশাসনের আরও কতগুলো দিক হতে পারে একতা, স্বচ্ছতা,? তথ্য অধিকার, প্রশাসনিক দক্ষতাসহ আরও উপাদান। সুশাসন ও জবাবদিহি যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বিশ্বব্যাংক ১৯৮৯ সালে সুশাসন সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলে, ‘সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিকল্প উপর্যুক্ত বিষয়গুলো নিশ্চিত করার মাধ্যমেই সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যায়।’ রাষ্ট্রের জনপ্রতিনিধির যদি কাজের প্রতি কোনো জবাবদিহি না থাকে সেখানে সুশাসনও থাকতে পারে না।

জবাবদিহি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। রাষ্ট্রের সকল পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। একেবারে প্রশাসনে নিম্নস্তর হতে এ জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকতে হবে। জবাবদিহির ব্যবস্থা না থাকলে মানুষ স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে ওঠে। দুর্নীতি ও অপশাসন সেখানে বাসা বাঁধে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য মিডিয়া ও সংবাদমাধ্যমের ওপর অযাচিত সরকারি হস্তক্ষেপের অবসান ঘটানো প্রয়োজন। পৃথিবীর অনেক দেশে এক একধরনের স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা আছে। সে সমস্ত দেশে মিডিয়া ও সংবাদমাধ্যমের ওপর সরকারের এক ধরনের প্রচ্ছন্ন নিয়ন্ত্রণ বিদ্যমান, যার কারণে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী দেশ হওয়া সত্ত্বেও সেখানে সুশাসনের ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। যেকোনো কাজের জন্য দায়বদ্ধতা সুশাসনের একটি মৌলিক দাবি।

স্থানীয় সরকার বিষয়ে নানা সিদ্ধান্তসহ সব কিছুর জন্য জবাবদিহি করতে একটি বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা থাকা দরকার। তা না হলে সুশাসন সুদূরপরাহত।

দেশের সংবিধানে যে সমস্ত মৌলিক অধিকার সন্নিবেশ করা আছে তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। মৌলিক অধিকারের খর্ব মানে সুশাসনের ঘাটতি। যেকোনো ধরনের সহিংসতা দূর করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করাও জরুরি। সহিংসতা মানে রাজনৈতিক সহিংসতাসহ সমাজে বিদ্যমান ঘটে যাওয়া নানা ধরনের সহিংসতা। সহিংসতা বৃদ্ধি পায় সুশাসনের অভাবে। বিচারহীনতা, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা, সঠিক বিচার না পাওয়াসহ নানা কারণে মানুষের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দেয়। এই ক্ষোভ ধীরে ধীরে নানা ধরনের সহিংসতায় রূপ লাভ করে। অথচ সুশাসন থাকলে এ অনাকাঙ্খিত অনেক পরিস্থিতি এড়ানো যায়।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা একটি দেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ার অনেকগুলো কারণের মধ্যে সুশাসনের অভাব একটি। পৃথিবীর উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর দিকে তাকালে সুশাসনের চিত্রটি সহজেই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতার নীতি প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি প্রয়োজন স্বচ্ছ প্রশাসন গড়ে তোলা। সুশাসন হচ্ছে অদৃশ্য এক অনুভূতি। একটি রাষ্ট্রের বিভিন্ন কাঠামোয় যখন সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয় তখন তার বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারে জনগণ। জনগণই হচ্ছে এর সুফল ভোগকারী। জনগণ যখন সুশাসনের সুফল করে তখন সুশাসন সে দেশের একটি চিরায়ত সংস্কৃতিরই অংশ হয়ে দাঁড়ায়। সে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চলে নিরন্তর। কোনো কোনো দেশে সুশাসনের সবগুলো উপাদানকে হয়তো প্রতিষ্ঠিত করা যায় না, তবে অনেকগুলো উপাদান যখন কার্যকর হয় তখন সুশাসনের গুরুত্ব মানুষ উপলব্ধি করতে পারে এবং সুশাসনের প্রতি মানুষ আগ্রহী হয়ে ওঠে।

সুশাসন প্রতিষ্ঠার মূল নিয়ামক শক্তি হচ্ছে রাষ্ট্রযন্ত্র। দুর্নীতি দমনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে রাষ্ট্রের যথাযথ পদক্ষেপ সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম শক্তি। বাংলাদেশ আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে দুর্নীতি দেশের সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম অন্তরায়। বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়ন দুর্নীতির বেড়াজালে যেভাবে আবর্তিত হয়, তা অনেক সময় সংবাদের শিরোনাম হয়ে আসে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার যতগুলো উপাদান আছে তৎমধ্যে দুর্নীতিরোধ হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত উপাদান। দুর্নীতির নির্দিষ্ট কোনো ক্ষেত্র নেই। সমাজের ওপরের স্তর থেকে নিম্নস্তর পর্যন্ত দুর্নীতির যে অদৃশ্য দেয়াল বিদ্যমান আছে তা নির্মূল করার মাধ্যমেই সুশাসনের বীজ রোপিত করা সম্ভব। অক্সফোর্ড অভিধান অনুসারে, ‘দুর্নীতি মানে অস্বাভাবিক উপায়ে কোনো কিছু করা।’

দুর্নীতির কারণ অনেক। এর মধ্যে টিআইবি কিছু কারণকে চিহ্নিত করেছে। যেমন জবাদিহির অভাব, ইচ্ছেমাফিক ক্ষমতার ব্যবহার, একচ্ছত্র ক্ষমতার ব্যবহার, স্বচ্ছতার অভাব, ক্ষমতাশীল ব্যক্তিদের প্রভাব, স্বপ্ন বেতন ইত্যাদি। এছাড়াও অভাব ও লোভকে অনেকেই দুর্নীতির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনা, সর্বত্র গণতন্ত্রচর্চার অনুপস্থিতি, আইনের শাসনের অভাব, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের অভাব, দেশপ্রেম, মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধের অভাব দুর্নীতির অন্যতম কারণ। মানুষের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রতকরণ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, কার্যকর ও সার্বভৌম আইনসভা প্রতিষ্ঠা, দারিদ্র্য দূরীকরণে সময়োপযোগী কর্মপন্থা নির্ধারণ ও প্রয়োগ, জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ, স্থানীয় সরকার কাঠামো শক্তিশালীকরণে উদ্যোগ গ্রহণ, জনস্বার্থকে প্রাধান্য প্রদান ইত্যাদি কার্যক্রমের মাধ্যমে দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা গেলে সুশাসন ধীরে ধীরে সর্বক্ষেত্রে দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারে।

কারণ দুর্নীতির সঙ্গে বাস করে সঠিক সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যায় না। সুশাসন ও দুর্নীতি পরস্পরবিরোধী দুটো শক্তি। দুর্নীতির পতনের মধ্যেই সুশাসনের উত্থান। সুশাসনের অর্থ সঠিক, নির্ভুল, দক্ষ ও কার্যকর শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রের ন্যায়ভিত্তিক আচরণ, দুর্নীতিমুক্ত স্বাধীন পরিবেশ অপরিহার্য। সঙ্গে প্রয়োজন নিরপেক্ষ ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা। দুর্নীতির যে বেড়াজালের কথা বারবার এখানে উচ্চারিত হয় তা রোধে গণমাধ্যমও নিতে পারে কার্যকর ভূমিকা।

রাষ্ট্রযন্ত্রের কাজকর্মে প্রয়োজন বিকেন্দ্রীকরণের যথার্থ প্রয়োগ। সমাজের দুর্নীতি অনাচারকে তুলে এনে তা দূরীভূত করার ক্ষেত্রে সংবাদপত্র বা গণমাধ্যমের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে গণমাধ্যম বা সংবাদপত্রেরও বড় একটি ভূমিকা রয়েছে। সমাজে অনেক দুর্নীতির চিত্রকে সংবাদপত্র যেভাবে তুলে আনে তা ধীরে ধীরে রাষ্ট্রে সুশাসনকেই ত্বরান্বিত করে। গণমাধ্যমই একমাত্র ব্যবস্থা যা সুশাসনের নিয়ামক শক্তিগুলোকে জনমত সৃষ্টি করে সুশাসনকে আরও ত্বরান্বিত করে। সেজন্য রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সংবাদপত্র তথা সাংবাদিকদের ভূমিকাও অগ্রগণ্য।

দুর্নীতির হ্রাস সুশাসনের উত্তরণকে যেমন ত্বরান্বিত করে, তেমনি মুক্ত গণমাধ্যমের ব্যাপ্তি দুর্নীতিকে হ্রাস করে এবং সুশাসনের পথ প্রশস্ত করে। দেশে যেটুকু সুশাসন আছে বা আমরা আরও যেটুকু আশা করতে পারি তার মধ্যে ব্যবধান ঘোচানোর জন্য সরকারের প্রশাসন যন্ত্র যদি আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে, তাহলে ধীরে ধীরে আরও সুশাসনের দিকে এগোবে দেশ। কতিপয় লোকের নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সুশাসন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। সেজন্য মানুষের নৈতিকতা ও মূল্যবোধের উত্তরণ ঘটানো দরকার।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা সুপ্রতিষ্ঠিত করা গেলে সুশাসনও প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এগুলো প্রতিষ্ঠা দুর্নীতিকে সংকুচিত করে এবং সুশাসনকে সামনে নিয়ে আসে। সুতরাং আমরা চাই এমন একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র যেখানে গণমাধ্যমসহ সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের যে প্রত্যয় তার সঙ্গে সবার নিবিড় সংযোগ ঘটানো এবং এভাবেই গড়ে ওঠে রাষ্ট্রযন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সুশাসন।

বাসুদেব খাস্তগীর: অধ্যাপক
শিশুসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক