মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ১৩ ফাল্গুন ১৪২৭

মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ

সুধীর বরণ মাঝি ১২:১৮ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৩, ২০২১

print
মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ

২০২১ সাল স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর, আবার আমাদের বিজয়েরও পঞ্চাশ বছর। স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসের সুবর্ণজয়ন্তী। আমাদের ইতিহাস এবং জাতীয় জীবনে এক অনন্য ঘটনা। সত্যিই বিষয়টি অনেক আনন্দের এবং গৌরবের। কয়েক দিন আগে কোনো এক জাতীয় দৈনিকে দেখলাম ‘মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ’। সুবর্ণজয়ন্তীর বছরের শুরুতেই এমন একটি সংবাদ দেখে মনটা আনন্দে ভরে গেল।

প্রতিদিন শত শত হতাশার, আক্ষেপের খবরের মাঝে এমন একটি সংবাদ সরকারের ভাবমূর্তি তো অবশ্যই সেই সঙ্গে দেশের, দেশের মানুষের ভাবমূর্তিকেও উজ্জ্বল করেছে। এখন আর কেউ আমাদের তলাবিহীন ঝুড়ি বলে না। যদি প্রতিদিন এমন একটি করে সুসংবাদ ছাপা হতো তাহলে কী যে ভালো লাগত। ভাবলেই মনটা আনন্দে নেচে ওঠে। এখন আমরা যেখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছি।

পাট রপ্তানিতে বিশ্বে প্রথম এবং উৎপাদনে দ্বিতীয়, ইলিশ উৎপাদনে প্রথম, তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয়, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনে তৃতীয়, মাছ উৎপাদনে চতুর্থ, ছাগল উৎপাদনে চতুর্থ, চাল উৎপাদনে চতুর্থ, আলু উৎপাদনে ষষ্ঠ, ক্রিকেটে সপ্তম, আম উৎপাদনে সপ্তম, জনশক্তিতে অষ্টম, পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম, আউটসোর্সিংয়ে অষ্টম, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে অষ্টম, বাইসাইকেল রপ্তানিতে অষ্টম, মৌসুমি ফল উৎপাদনে দশম স্থানে রয়েছে। বর্তমান বিশ্বের এখনকার সবচেয়ে আলোচ্য বিষয় করোনা মহামারী। সেখানেও মিলেছে সাফল্যের স্বীকৃতি।

নানা অব্যবস্থাপনা ও ঘাটতির পরও মহামারী মোকবিলায় সফল দেশের তালিকায় বাংলাদেশে বিশ্বে বিশতম স্থান পেয়েছে একটি র‌্যাংকিংয়ে। প্রাথমিক ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়িয়েছে প্রবাসী আয়, কৃষি উৎপাদন ও রপ্তানি বাণিজ্য। তবে একথাও সত্যি, ঋণগ্রস্ত অবস্থায় নতুন বছরে পদার্পণ করেছি। খেলাপি ঋণের টাকা, কালো টাকা, বিদেশে টাকা পাচারের অঙ্কটা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। একদিকে সফলতার হাতছানি অন্যদিকে দুর্নীতি, লুটপাট, মানিলন্ডারিং, ধর্ষণ, নির্যাতন, নিপীড়ন, দৃর্বৃত্তায়ন, সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিক অধঃপতন, পারিবারিক কলহ, আত্মহত্যার প্রবণতা, মাদক ব্যবসা, রাজস্ব ফাঁকি, চোরাচালান, দায়বদ্ধহীনতা বৃদ্ধি ইত্যাদি। আমাদের এই যে অবস্থান, সেই অবস্থানকে ধরে রাখা এবং অন্যান্য অবস্থানের ভারসাম্যপূর্ণ উন্নতি করতে পারলেই হবে সুবর্ণজয়ন্তীর দুটির সফলতা।

এই যে অবস্থান, এই যে সাফল্য এর পেছনের মানুষগুলো যাদের রক্ত, ঘাম, শ্রম, নিষ্ঠা, একাগ্রতা, আন্তরিকতার সবটুকু দিয়ে, জীবনবাজি রেখে এই সাফল্য এনেছে, এই অর্জন এনেছে তারা কতটুকু মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে? তাদের সামাজিক মর্যাদা, অবস্থান, দৈনন্দিন জীবনযাপন কীভাবে চলছে? দেশের সাধারণ মানুষগুলো আজ ভালো নেই। অভাব, দুর্ভোগ, নিপীড়ন, নির্যাতন তাদের নিত্যসঙ্গী। সাধারণ মানুষগুলো এনজিওর ঋণে জরাগ্রস্ত। কৃষক তার ফসলের ন্যায্য মূল্য পায় না। শ্রমিক তার শ্রমের মূল্য পায় না। মালিক শ্রমিকের বেতন বকেয়া রেখে কারখানা বন্ধ করে চলে যায়। রাষ্ট্রীয় শিল্পকারখানাগুলোতে পরিকল্পিতভাবে লোকসান দেখিয়ে শিল্পকারখানাগুলোকে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। দেশে চিনির চাহিদা বিশ লাখ মেট্রিক টন তারপরও রাষ্ট্রীয় চিনিকলগুলো বন্ধের ঘোষণা! কার স্বার্থে এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। প্রবাসী শ্রমিকরা তাদের নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত। কৃষক, শ্রমিক, প্রবাসী এবং সাধারণ মানুষের অবস্থান শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে না পারলে এই অর্জন, সফলতাকে সঙ্গী করে বেশিদূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু বলেছেন, ‘বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা উজ্জ্বল। তবে কিছু ঝুঁকির বিষয়ে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সচেতনতা দরকার। কারণ কোনো দেশের অর্থনীতি যখন ভালো করতে থাকে, তখন সে দেশে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, বৈষম্য এসবও বাড়তে থাকে। যদি এসবের রাশ টেনে ধরা না যায়, তবে তা সমৃদ্ধির গতিকে থামিয়ে দিতে পারে। তবে এর চেয়ে বড় ঝুঁকি হলো কট্টর ধর্মীয় ও সামাজিক রক্ষণশীল শক্তি। এরা প্রগতিশীল বাংলাদেশের সামাজিক অগ্রগতির বিপক্ষে। তাই এদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সামাজিক খাতে বিনিয়োগ যদি বন্ধ করে দেয়, তা বাংলাদেশকে আবার অনেক পেছনে নিয়ে যাবে।’ কৌশিক বসুর কথার সঙ্গে মিল রেখে আমরা বলতে পারি সংখ্যা যতই বড় হোক তাকে শূন্য দিয়ে গুণ করলে গুণফল শূন্যই হবে। ঠিক তেমন আমাদের অর্জন বা সাফল্য যতই বড় হোক যদি দুর্নীতির বর্তমান চিত্র, সিন্ডিকেটদের দৌরাত্ম্য, লুটপাট, ঋণখেলাপি, ব্যাংক ডাকাত ও কালো টাকার মালিকদের উৎস বন্ধ না হয় এবং কৃষক-শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না অর্জন বা সাফল্য সবকিছুই ম্লান হয়ে যাবে।

একটি দেশের উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় ঘুষ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, প্রভাবশালীদের অনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং কর্তৃপক্ষের স্বার্থপর মানসিকতা। আমাদের দেশের প্রাণশক্তি, সেই প্রাণ আজ এক অজানা, অচেনা, মোহে বিভোর। তাদের সেই মোহ ভাঙাতে হবে, তাদের মাঝে স্বপ্ন সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের যে অর্জন, যে সাফল্যগুলো আছে তা চলমান রাখার সক্ষমতাও আছে। তবে তার জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি নিশ্চিত করা, গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণ করার মানসিকতা এবং আত্মসমালোচনা করার মানসিকতা, সৃজনশীল চিন্তার বিকাশ, পরিকল্পনা সুনির্দিষ্টকরণ, প্রকল্পে অনিয়ম, দুর্নীতি বন্ধ করা, স্পর্শকাতর ধর্ষণ মামলা, দুর্নীতি মামলা, মাদক মামলা, অপহরণ, পাচার, খুন, হত্যা মামলাগুলোকে সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে রায় দিয়ে কার্যকর করতে হবে এবং সেই সঙ্গে মামলার আসামির সমস্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিতে হবে। রাষ্ট্রকে এবং রাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

আমাদের ঘাটতিগুলোকে চিহ্নিত করে তার বাস্তবসম্মত সমাধানের উপায় খুঁজে বের করতে হবে। মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের নিশ্চয়তা রাষ্ট্রকেই দিতে হবে। উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। আমাদের অর্জন এবং সাফল্যের গুণফল যেন শূন্য না হয়। অর্জনগুলোকে শূন্য দিয়ে নয়, পূর্ণ সংখ্যা দিয়ে গুণ করতে চাই।

সুধীর বরণ মাঝি: শিক্ষক, হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, হাইমচর, চাঁদপুর