শিশু সহিংসতা ও নির্যাতন

ঢাকা, সোমবার, ১ মার্চ ২০২১ | ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭

শিশু সহিংসতা ও নির্যাতন

জাহাঙ্গীর আলম সরকার ১:১৩ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২২, ২০২১

print
শিশু সহিংসতা ও নির্যাতন

শিশু শব্দটা শুনলেই কেমন একটা অদ্ভুত রোমাঞ্চ হয়। একটা নিষ্পাপ, শুদ্ধতায় ভরা শুভ্র মুখ। ছোট ছোট হাত-পা, এক হাতে স্কুলব্যাগ অন্য হাতে পানির পট, মুখের আদল অনেকটা স্বপ্নে দেখা। অমন একটা নিষ্পাপ মুখের খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে কত দম্পতি। অথচ এই শিশুরা সমাজের ব্যাপক পরিসরে যৌন হেনস্তার শিকার হচ্ছে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক, শিশুদের ওপর সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ আমাদের সমাজে খুবই কমন ঘটনা। 

যে সকল শিশুরা এর শিকার, তাদের সকলেই একভাবে রিঅ্যাক্ট করে না। কে কীভাবে রিঅ্যাক্ট করবে, সেটা নির্ভর করে কে তাকে অ্যাবিউজ করেছে, কতবার এবং তা নিয়ে বড়দের কাছে নালিশ জানিয়ে সে কতটা সাপোর্ট পেয়েছে সেসবের ওপর। আমাদের প্রত্যাশা আনন্দরা থাকুক শিশুদের শৈশবজুড়েই। কিন্তু সম্প্রতি শিশুদের সেই শৈশব হচ্ছে বিবর্ণ। নিষ্ঠুরতা ও পৈশাচিকতায় দগ্ধ হচ্ছে শৈশব। বাংলাদেশে প্রতি মাসেই বিশাল সংখ্যক শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। ভাবা যায় কোন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দেশ যাচ্ছে। আমরা যদি শিশুদের শৈশবকে নিরাপদ রাখতে না পারি তবে আমাদের সকল অর্জন অর্থহীন এবং গন্তব্যহীন এক অনন্ত যাত্রার পথে চলতে হবে। আমাদের সমাজের সকল স্তরেই ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। এমনকি সার্বিক শিশু নির্যাতন কিছুটা হ্রাস পেলেও শিশুদের প্রতি যৌন নির্যাতন বেড়েছে উদ্বেগজনক মাত্রায়।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম (বিএসএএফ) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক বছরে সারা দেশে যৌন নির্যাতনের ঘটনা ৭০ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৯ সালে ৪ হাজার ৩৮১ জন শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। নির্যাতনের শিকার শিশুদের ২ হাজার ৮৮ জন শিশু অপমৃত্যুর শিকার হয়েছে। গড়ে প্রতি ৩৬৫ জন শিশু বিভিন্ন রকমের সহিংসতার শিকার হয়েছে। শুধু তাই নয় বরং অপমৃত্যু, যৌন নির্যাতন, অপহরণ ও নিখোঁজ, নির্যাতন ও সহিংসতা, অপঘাত বা আঘাত এবং বাল্যবিবাহের বিষয়ে দেশে অগ্রগতির কথা বলা হলেও প্রকৃত অর্থে শিশুদের শৈশবকে নিরাপদ করতে হলে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। সার্বিকভাবেই শিশু নির্যাতন ২০১৮ সালের তুলনায় কমলেও ২০১৯ সালের তুলনায় শিশুহত্যা ৭ দশমিক ১৮ ও শিশুধর্ষণ ৭৬ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৯ সাল ২০১৮ সালের তুলনায় বাল্যবিবাহের হার কমেছে। ২০১৯ সালে ৪৪৮ জন শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। আত্মহত্যা করে ১৫৮ জন শিশু। সড়ক দুর্ঘটনা, পানিতে ডুবে, বজ্রপাতে, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ভুল চিকিৎসা ও কর্তৃপক্ষের অবহেলায় এবং আগুনে পুড়ে মারা যায় ১ হাজারের বেশি শিশু। এছাড়া মৃত ও পরিত্যক্ত ৪২ জন নবজাতকের কথাও রয়েছে প্রতিবেদনে। ২০১৫-২০২০ সাল পর্যন্ত মোট ৫ বছরের মধ্যে এই সংখ্যা ছিল সবচেয়ে নগণ্য।

সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের পরিসংখ্যান দেখলে পিলে চমকে ওঠে। পুলিশ সদর দফতরের তালিকায় উঠে এসেছে ২০১৯ সালে দেশে ৮১৫ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ২০১৮ সালে শিশু ধর্ষণের সংখ্যা ছিল ৭২৭ জন। ২০১৯ সালে ধর্ষণের পরে হত্যার শিকার হয়েছিল ১২ জন শিশু, আর অপহরণের শিকার হয় ৫৭৬ জন শিশু। ২০১৮ সালে ধর্ষণের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করে ১৪ জন শিশু এবং অপহরণের শিকার হয় ৫৩১ জন শিশু।

শিশু অধিকার হচ্ছে সেই ভিত্তি যার ওপর ভর করে গড়ে ওঠে উন্নততর সমাজ, আর শিশু আইনে এ সকল অধিকারের বিস্তারিত বিবরণ বিধৃত হয়েছে। তবে এ আইনটি সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে হলে দরকার একটি বিধিমালা। বাংলাদেশে বিধিমালাটি এখন প্রথম সার্বজনীন আইনে পরিণত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত। এখানে যুক্তির অবতারণা দিয়ে বলা যেতে পারে, প্রতিরোধযোগ্য রোগ-ব্যাধিতে কোনো শিশুকে যেমন আমরা মৃত্যুবরণ করতে দিতে পারি না, ঠিক তেমনি কোন শিশুর প্রতি অন্যায় অবিচার, আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত শিশুর দুর্দশা আমরা মেনেও নিতে পারি না। বাংলাদেশে শিশু আইন রয়েছে কিন্তু বিধিমালা না থাকার কারণে আইনটির প্রায়োগিক সমস্যা হচ্ছে।

শিশু আইন ২০১৩ এর মাধ্যমে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ সমুন্নত রাখা সম্ভব নয়। শিশুর জন্য উপযোগী বাংলাদেশ এবং শিশুর ন্যায়বিচার প্রাপ্তির নিশ্চয়তার জন্য দরকার শিশু অধিকারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ একটি বিধিমালা। বাংলাদেশ শিশু আইন, ১৯৭৪ রহিত করে ২০১৩ সালে নতুন শিশু আইন প্রণয়ন করা হয়। তবে আইন প্রণয়নের পর দীর্ঘ সময় পার হলেও বিধিমালা প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি। তাই আইনটি বহুলাংশেই বাস্তবায়ন অযোগ্য থেকে যায়। দেশে প্রতিনিয়ত শিশু নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে, এমন সময়ে এ ধরনের ঢিলেমি দুঃখজনক। আজকাল বাংলাদেশে এমন কোনো দিন নেই, যেদিন শিশুর প্রতি সহিংস আচরণের খবর পত্রিকায় আসে না। নির্যাতনের শিকার হয়ে গৃহকর্মীর মৃত্যু, স্কুলছাত্রীকে কুপিয়ে হত্যা ইত্যাদি নৈমিত্তিক ঘটনা।

প্রতিবছর বাংলাদেশে শিশু হত্যার অনেকগুলো ঘটনা ঘটে। গণমাধ্যমের খবর ও বেসরকারি জরিপ মতে, ধর্ষণ, হত্যার মতো শিশু নির্যাতনের ঘটনা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা তুলে ধরা সম্ভব না হলেও এটা স্পষ্ট করেই বলা যায়, সমগ্র দেশে লাখ লাখ শিশু নির্যাতন ও অবিচারের শিকার হচ্ছে। দরিদ্র ছেলেমেয়েরা শোষণ ও অবিচারের শিকার হয় বলেই তারা বিপদের মুখোমুখি হয়। তাই প্রত্যাশিত ছিল, সরকার দ্রুত বিধিমালা চূড়ান্ত করবে। ২০১৩ সালের শিশু আইন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে প্রণয়ন করা হয়েছে। এখন প্রত্যাশা বিধিমালাটিও আন্তর্জাতিক মানদ- বজায় রাখা হবে।

ইতোমধ্যে খসড়া বিধিমালা যেটি করা হয়েছে তা আমাদের মধ্যে আশার আলো জাগিয়েছে। কিন্তু তিন বছরেও খসড়া বিধিমালা চূড়ান্ত না হওয়ায় শিশু আইন ও শিশু অধিকার বিশেষজ্ঞরা হতাশ। তাদের কারও কারও মতে, আইনের ১০০টি ধারার একটিও বিধিমালা ছাড়া কার্যকর করা সম্ভব নয়। যেমন আইনে শিশু আদালতের কথা বলা রয়েছে। আদালতের বিচারক, স্টাফ প্রভৃতি বিষয় বিধিমালায় স্পষ্ট করতে হবে। তা না হলে শিশু আদালত একটি অকার্যকর আদালত হয়ে যেতে পারে।

শিশুদের বিশেষ চাহিদা রয়েছে, শুধু এই ধারণার পরিবর্তে, এখন প্রত্যয়টি দৃঢ়মূল হয়েছে, শিশুদের প্রাপ্তবয়স্কদের মতোই পূর্ণ নাগরিক ও রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক অধিকার রয়েছে। শিশু আইন ২০১৩ এক গভীর পরিবর্তন সাধন করেছে যা ইতোমধ্যেই শিশুদের প্রতি বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর যথেষ্ট প্রভাব রাখতে শুরু করেছে। নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়ের কর্মকা- বহুলাংশেই নারীকেন্দ্রিক বলে শিশুদের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় করার দাবিও দীর্ঘদিনের।

আমাদের প্রত্যাশা, শিশুদের নিরাপত্তা বিধানে রাষ্ট্র বিধিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে আইনি কাঠামোকে আরও মজবুত করবে, মা-বাবা শিশুদের প্রতি আরও যত্নবান হবেন এবং সমাজ শিশু নিপীড়কদের প্রতি হবে কঠোর। সমস্যাটি জটিল, তবে শিশু অধিকার এবং দারিদ্র্য এই দুষ্টচক্র ভাঙার জন্য প্রতিনিয়ত ব্যাপকভিত্তিক মতামত এবং অভিজ্ঞতা অর্জিত হচ্ছে। এখন দরকার খসড়া বিধিমালার অনুমোদন। যাতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অধিকতর শক্তিশালী সামাজিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা সম্ভব হয়।

মোটের ওপর কথা হচ্ছে, শিশুদের সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনায় রেখে শিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিধিমালা প্রণয়ন করা দরকার। আইন আছে কিন্তু বিধিমালা নেই- সে কারণে দাবি একটাই, দ্রুতই বিধিমালা প্রণয়ন করা হোক এবং শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ সমুন্নত করা হোক। শিশুদের বিরুদ্ধে এমন যৌন নির্যাতনের হার বৃদ্ধি পাওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। শিশুর প্রতি সংঘটিত সব নির্যাতন বন্ধের জন্য সরকার থেকে শুরু করে সাধারণ জনগোষ্ঠী প্রত্যেককে একযোগে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের নতুন করে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে একটি মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রে পরিণত হতে যাওয়া বাংলাদেশে শিশু সহিংসতা অপ্রত্যাশিত।

জাহাঙ্গীর আলম সরকার: আইনজীবী ও গবেষক

juphdlaw@gmail.com