পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু ঠেকাতে হবে

ঢাকা, সোমবার, ১ মার্চ ২০২১ | ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭

পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু ঠেকাতে হবে

গোলাম মোর্তুজা ১:১০ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২২, ২০২১

print
পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু ঠেকাতে হবে

মানুষের জীবনের এমন কিছু উপাদান রয়েছে যা ছাড়া জীবনকে কল্পনাও করা যায় না। ‘পানি’ জীবনের জন্য এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রাণিকুলের অস্তিত্ব পানি ছাড়া কল্পনা করাও যায় না। জীবনে পানি, মৃত্যুতেও লাশ ধোয়ার মাধ্যমেই পানির প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়। পানির নানামুখী ব্যবহার কে না জানে। পানিই নিয়ামক, পানিই জ¦ালাতন। আমাদের দেশে পানির অভাব নেই। দেশে পুকুর, খাল-বিল, নদী-নালা ছড়িয়ে আছে জালের মতো। এদেশে সব বেশি, শুধু সচেতনতা কম।

একটি পরিসংখ্যান থেকে জানতে পারি, দেশে প্রতিদিন ডুবে মারা যাচ্ছে ৪০ শিশু। বয়স বিভাজনে এদের মধ্যে ৩২ জনই চার বছরের কম বয়সী। গত বছরের জানুয়ারি থেকে ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ৭০৩ জন পানিতে ডুবে মারা গেছে। মৃতের মধ্যে ২৯ শতাংশ কন্যাশিশু। এ পরিসংখ্যান কাগজে কলমে। বোধকরি বাস্তবে এ সংখ্যা গাণিতিক হারে নয়, জ্যামিতিক হারেই বাড়বে।


কন্যাশিশুদের এমন মৃত্যু আমাদের ব্যথিত করে। শিশুরা দেশের ভবিষ্যৎ। এভাবে অকালে মরে যাওয়া মেনে নেওয়া যায় না। বাংলাদেশের শিশুমৃত্যুর হারও অত সামান্য নয়। তারপরও এ ধরনের মৃত্যু আমাদের শিশুমৃত্যুর হারের তালিকাকে দীর্ঘায়িতই করছে। দেশে শিশুমৃত্যুর জন্য দায়ী নানান রোগ প্রতিকার ও প্রতিরোধকে বৈশি^কভাবে এসডিজির অন্তর্ভুক্ত করা হলেও পানিতে ডুবে যাওয়া শিশুর মৃত্যুকে তালিকায় আনা হয়নি। এসডিজির তালিকায় এই বিষয় আনা জরুরি। শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য নানা পরিকল্পনার সুফলে শিশুমৃত্যুহার কিছুটা কমানো গেলেও পানিতে ডুবে মৃত্যুর হারের লাগাম টানা যায়নি। পরিতাপের বিষয়, পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু ঠেকানোর জন্য আজও কোনো জাতীয় নীতিমালা প্রণীত হয়নি। কবে সে শুভ দিন আসবে জানি না বা নির্দিষ্ট করে বলাও যায় না। তবে বুকভরা আশা, অচিরেই বিষয়টি দেশের পরিকল্পনাকারী ও নীতি-নির্ধারণকারীদের মনটা নাড়া দেবে। তারা সারা দেশের পানিতে ডুবে অপমৃত্যু রোধ করতে নানান কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করবেন।

শিশুমৃত্যুর নানাবিধ কারণ আছে। এদেশে বর্ষা আসে দ্রুত। শুরু হয় ভারী বর্ষণ ও জলাবদ্ধতা। বাড়ির পাশের খানাখন্দ পানিতে থইথই করে। পুকুর ও ডোবাগুলো পানিতে টইটম্বুর হয়ে তখন সৌন্দর্যের আকর হয়। আমাদের শিশুরা তখন নজরদারির অভাবে বা অন্য কোনো কারণে পানিতে পড়ে হাবুডুবু খায়। জীবনপ্রদীপ নিভে যায়। আবার একজন পানিতে পড়লে অন্যজন আবেগাপ্লুত হয়ে উদ্ধার করতে দুর্ঘটনার শিকার হয়। কখনো কখনো তা মৃত্যুতেও পরিণত হয়।

শিশুদের মাঝে অনুকরণপ্রিয়তা বেশি। অনেক শিশু পুকুরপাড়ে গিয়ে দৌড়ঝাঁপ করতেও পছন্দ করে। শিশুরা জলাশয়ে ছিপ ফেলে মাছ পাক বা না পাক মাছ শিকার করাতে ওরা এক অভূতপূর্ব আনন্দ খুঁজে পায়। অনেক সময় শিশুরা সেখানে পা ফসকে পানিতে পড়েও জীবন হারায়। আবার অনেক শিশু জলাশয়ের খেলাচ্ছলে নামতে গিয়ে হড়কে পড়ে প্রাণ হারায়।

পানির উৎস যেখানে যত বেশি শিশুমৃত্যুর হার সেখানে তত বেশি। আবার পানির উৎস যত কাছাকাছি শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি তত বেশি। শহরের তুলনায় গ্রামের পানির উৎসের সংখ্যা ঢের বেশি বলেই গ্রামেই পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর হারও অনেক বেশি। বাড়ির পাশে পুকুর, ডোবা, দীঘির আশেপাশে অনেক শিশুই প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে চলাফেরা করে। তখন মায়েরা পরিবারের নানান কাজে মগ্ন থাকে। কখন সন্তান বাড়িতে এলো বা কোথায় গেল তা দেখার ফুরসৎ পান না। আর বাবারা কেউ থাকেন মাঠে-ঘাটে। কেউবা আবার হাটে-বাজারে। সংসারের উপার্জনশীল ব্যক্তিরা তো বাইরে থাকবেনই। তবে তারা সন্তানদের রক্ষার জন্য বিভিন্ন চেষ্টা করেন না তা কিন্তু নয়! নিজের সন্তান ভালো থাকবে, নিরাপদে থাকবে, শিশুবান্ধব পরিবেশ পেয়ে মানুষের মতো মানুষ হবে এটাই তো উনাদের প্রাণান্তর চাওয়া।

পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর যে দুর্ঘটনা তা কিন্তু সকাল হতে দুপুরের মধ্যে ঘটে থাকে। কারণ এ সময়টাই শিশুদের উচ্ছলতার মোক্ষম সময়। তবে বিকেলে যে শিশুমৃত্যু হয় না তাও নয়, তবে তা নগণ্য। অনেক শিশুরা সাঁতার জানে না। সাঁতার না জানার কারণেও পানিতে ডুবে শিশুর জীবন শেষ হয়ে যায়। পিতা-মাতার উদাসীনতার কারণেও অবুঝ শিশু অসময়ে হারিয়ে যায়। পরিবার হারায় সন্তান, দেশ হারায় মূল্যবান জনসম্পদ।

শিশুমৃত্যুহার ঠেকানো খুব কঠিন নয়। এখানে একটি কথা বলে রাখি, সরকারের একার পক্ষে এটা রোধ করাও সম্ভব নয়। আর সবকিছু সরকার ঠিক করবেই বা কেন! আমাদের একটু সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে গ্রামের মানুষগুলোকে দল বেঁধে সচেতন হওয়ার সৎ পরামর্শই দেয়। সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য আমাদের প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াকে এগিয়ে আসতে হবে তাহলে কাজটা অনেক সহজ হয়ে যাবে বলেই বিশ^াস করি। শিশুদের জন্য নজরদারির কাজটি সুনিশ্চিত করতে হবে। কাজটি কারা করবে। মা-বাবা সংসারধর্মের কাজ বাদ দিয়ে কী সন্তান পালন নিয়েই বসে থাকবেন? না, সে কথা বলি না। সংসারটা তো সচল রাখতে হবে, কাজ করতে হবে। জীবনের শতরঞ্জিকে তো আর ফেলে রাখলে চলবে না। তাহলে সন্তানকে লালন-পালনের জন্য পরিবারের মাদের-ই একটু সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। তাছাড়া আরেকটি কাজ করলে চমৎকার হয়, বাড়ির পাশের পুকুর, ডোবা বা জলাশয়গুলোর চারপাশ বেড়া দেওয়া যেতে পারে। এতে আমাদের কোমলমতি শিশুরা বাধার বেড়া ভেঙে যাবে না পানিতে মরতে। অবশ্য দুরন্ত যারা ওদের বাঁধবেন কী দিয়ে? হ্যাঁ, ওদেরও বাঁচানোর মন্ত্র আছে। ওদেরকে একটু নিবিড় নজরে রাখতে হবে। তাহলে শিশুমৃত্যুহার কিছুটা হলেও কমানো যাবে। তাছাড়া সরকারের তত্ত্বাবধানে প্রতিটি ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে স্থানীয় লোকজনকে সম্পৃক্ত করে শিশু তত্ত্বাবধায়ক কমিটি গঠন করা গেলে তা যুগোপযোগী হবে।

প্রসঙ্গক্রমে একটি কথা বলি। শিশুমৃত্যুর সঠিক সংখ্যাও সরকার পায় না। কেননা সে হিসেব রাখার সুষ্ঠু ও আধুনিক কোনো ব্যবস্থা নেই। আবার যে পরিবারের শিশুরা পানিতে ডুবে মারা যায় নানান জটিলতার জন্য সে ঘটনাও দেশের প্রশাসনদের কাছে রিপোর্টিংও করায় না। এর হিসাব রাখা সরকারের বিশেষ দরকার। কারণ সমস্যা না জানলে প্রতিষেধক কীভাবে আসে। সংখ্যা জানলে প্রতিকার ও প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতি গুরুত্বারোপ করা সহজ হয়। তাই বলি প্রতিটি ইউনিয়নে এ ধরনের একটি কমিটি থাকা জরুরি। তাহলে কী হবে এটা সহজ করেই বলি, হিসাব থাকল, একটা বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া গেল। দেশের শিশুরা এভাবে অকালে মরে যাবে আর তা দেখে সরকার হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবেন তা তো হয় না। সরকার বাহাদুর মৃত্যুর হিসাবের সংখ্যা দেখে গুরুত্ব বুঝে কাজে মনোযোগী হবে- এটাই স্বাভাবিক। হিসাবের এই দায় ও দায়িত্ব প্রতিটি ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনদের দিলে কিন্তু মন্দ হয় না।

ছেলেমেয়েদেরকে সব সময় ধরে বা বেঁধে ঘরের চার দেয়ালের মাঝে তো রাখা যায় না। হ্যাঁ, কথা সত্য। তবে বলি কী, ওদের বেড়ে ওঠার জন্য একটি সুন্দর ও স্বাভাবিক পরিবেশ দেওয়াও আমাদের দায়িত্ব। ওদের একটু সময় দিয়েও কিন্তু এ অযাচিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানো যায়। আমরা আমাদের সন্তানদের ছোটবেলায় হাঁটি হাঁটি পা পা করে হাঁটা শেখায় কিন্তু একটু সময় করে সন্তানদের সাঁতার শেখায় না। প্রতিটি সন্তানকে সাঁতার শেখানো জরুরি। এটা শেখানো এমন কোনো অসাধ্য কাজ নয়। একটু সময় বের করে সন্তানটিকে আগামীতে পানিতে ডুবে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য কোনো কিছু করা তো কম সচেতনতার কাজ নয়। বাবা-মায়ের কাজ যদি সন্তানকে যোগ্য ও পরিশুদ্ধ রূপে গড়ে তোলা হয় তবে সন্তানটিকে সাঁতার শেখানোও সে ধরনের কাজের মধ্যেই পড়ে।

অনেক সময় ডুবে যাওয়া শিশুকে উদ্ধার করার পর শিশুটি আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে না। হয় পঙ্গুত্ব বরণ করে নয়ত বিভিন্নভাবে আহত হয়। এক্ষেত্রে শিশুটিকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর জন্য মা-বাবার চেষ্টা-প্রচেষ্টার অভাব থাকার কথা নয়। কিন্তু তারপরও অনেক পরিবারের পক্ষে সন্তানটিকে চিকিৎসা করানো তো দূরের কথা সঠিক পরিচর্যাও করতে পারেন না। এক্ষেত্রে সমাজের সমাজদরদি ও হিতৈষীদের এগিয়ে আসা ধর্মের অনেক বড় কাজ হয়।

আসুন, আমরা সবাই মিলে শিশুদের পানিতে ডুবে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করি।

গোলাম মোর্তুজা: প্রভাষক (বাংলা), মাসকাটাদীঘি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শ্যামপুর, কাটাখালী, রাজশাহী

golammourtuza1979@gmail.com