দেরিতে হলেও প্রাণের বইমেলা হোক

ঢাকা, শুক্রবার, ৫ মার্চ ২০২১ | ২১ ফাল্গুন ১৪২৭

দেরিতে হলেও প্রাণের বইমেলা হোক

কাজী সুলতানুল আরেফিন ১১:১৯ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১৬, ২০২১

print
দেরিতে হলেও প্রাণের বইমেলা হোক

প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসের শুরু থেকেই শুরু হয় বইমেলার আয়োজন। বাংলা একাডেমি এই বইমেলার আয়োজন করে থাকে। এ বইমেলা যেমন আমাদের ঐতিহ্য বহন করে তেমনি জ্ঞানপিপাসু হতে উজ্জীবিত করে। বিগত কিছু বছর ধরে বইমেলার পরিসর বাড়ানো হয়েছে। প্রচারও হয় অনেক। এখন বইমেলা শুরু থেকেই জমজমাট থাকে। শিশু-কিশোরদের আনাগোনা চোখে পড়ার মতো। এখনকার বইমেলাগুলোতে সাধারণ মানুষের সমাগমও প্রচুর। অনেক বইপ্রেমী দূর-দূরান্ত থেকেও বই নিতে মেলায় ছুটে আসেন।

বিগত কিছু বছর বইমেলা খুব জমজমাট ছিল। লেখক, প্রকাশক সবার মুখেই হাসি ফুটেছিল। বইমেলার কল্যাণে সাহিত্যবিমুখ অনেকেই আবার পাঠে উৎসাহিত হয়। প্রতি বছর সাহিত্যপ্রেমীদের রব রব উৎসবে মুখরিত হয় প্রাণের মেলা। কিন্তু এ বছর করোনার ছোবলে মেলা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। অধিকাংশ পাঠক, লেখক আর প্রকাশক চান, দেরিতে হলেও বইমেলা হোক। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ যদি চান, ফেব্রুয়ারি মাসের পরিবর্তে মে বা জুন মাসে আয়োজন করা যেতে পারে। ততদিনে যেহেতু শীতের মৌসুম চলে যাবে করোনা তার শক্তি হারাতে পারে! এখন বেশিরভাগ মানুষ প্রযুক্তির নেশায় নিমজ্জিত; সেখানে এই বইমেলা মানুষকে প্রযুক্তি থেকে কিছুটা অবসরের সুযোগ করে দিত।

আগের মতো বই পড়া অনেকেরই আর হয়ে ওঠে না। বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম পাঠ্য বই ব্যতীত অন্য বইয়ের পেছনে সময় ব্যয় করতে আগ্রহী নয়। কারণ বই পড়তে যে সময় ব্যয় হবে তার চেয়ে কম সময় ব্যয় করে তারা আরও আকর্ষণীয় বিনোদন হাতের নাগালে পাচ্ছে। তাই বইমেলা আমাদের জন্য এখন খুব জরুরি কিছু হয়ে উঠেছে।
একটা সময় ছিল যখন বই ছিল বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম। মানুষ অবসর সময়ে বা বিনোদনের জন্য বইয়ে গভীরভাবে ডুবে যেত। পড়তে পড়তে মনের কল্পনাতে দৃশ্যপট সৃষ্টি করত। কষ্টের কাহিনি পড়ে ব্যথিত হতো আর সুখের কাহিনি পড়ে পুলকিত হতো। একটি ভালো বই এ দুয়ার থেকে সে দুয়ার অর্থাৎ পাঠক থেকে পাঠকের হাতে হাতে ঘুরে বেড়াত। বেশিরভাগ স্কুলবন্ধু থেকে বই ধার নিয়ে পড়া থেকে বইয়ের নেশার উৎপত্তি হতো! কিন্তু আজ বেশিরভাগই প্রযুক্তি নিয়ে মগ্ন রয়েছে।

প্রযুক্তির উন্নতিতে আজ বিনোদনের মাধ্যম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। মানুষের কাছে এখন আর বিনোদনের মাধ্যমের অভাব নেই। আর সবকিছু হাতের নাগালে তাই মানুষের কাছে বইয়ের স্থান ক্রমশ পেছনে পড়ে যাচ্ছে। মানুষ এখন বইয়ের পেছনে সময় ব্যয় করা থেকে আধুনিক প্রযুক্তিতে মনোনিবেশ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। রাত দিন ডুবে থাকছে রঙিন দুনিয়ায়। প্রযুক্তি ব্যবহার দোষের কিছু না। তবে বই থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া খুব অশুভ লক্ষণ। কারণ পড়ার মাধ্যমেই মানুষের জ্ঞান সুচারু আর ধারাল হয়। বই পড়ার মাধ্যমেই শব্দভা-ারের সমৃদ্ধি ঘটে। প্রযুক্তি তার নিজের জায়গায় থাকুক আর বইকেও তার নিজের আসনে ধরে রাখতে হবে। মনুষ্যত্ব বিকাশেও বইয়ের গুরুত্ব অসীম।

সবচেয়ে ব্যথিত হওয়ার ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের দেশে ভুরি ভুরি লেখক সাহিত্যিক ছিলেন বা এখনো রয়েছেন। তবে তাদের মধ্যে শুধু দু’চারজনকেই এদেশের মানুষ চেনেন, নাম জানেন। তাদের মধ্যে প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের নাম মানুষ বেশি জানেন। অন্যান্য দেশে সাহিত্যিকদের খুব কদর করা হয়। আমাদের দেশে সঠিক মূল্যায়নের অভাবে লেখকরা পর্দার আড়ালে থেকে যান। তবে কেউ কেউ বেঁচে থাকতে মর্যাদা না পেলেও মৃত্যুর পরে স্বীকৃতি পান। বেঁচে থাকতে তাদের কেউ চেনেও না! জানেও না! আর অনেক লেখক আছেন যাদের কথা কেউ ভাবেও না! অথচ এই লেখকরাই আলোর দ্যুতি ছড়ানোর দায়িত্ব পালন করেন। কথা হচ্ছে বই পড়া নিয়ে লেখকদের কদরের কথা কেন বলছি? লেখকই বইয়ের জন্মদাতা। আর লেখক যদি মূল্যায়ন না পান তবে বই সৃষ্টির পথ থেমে যাবে। বর্তমানে এমন এক অবস্থা হয়েছে যে পক্ষপাতমূলক কিছু পত্রিকা আর প্রকাশনীর বই ছাড়া অন্যগুলো আলোচনায় আসে না। কারণ হিসেবে বলা যায় পত্রিকাগুলোতে অনেক সময় গ্রন্থ আলোচনা প্রকাশেও চলে স্বজনপ্রীতি। কিছু অনলাইন সাইট বইয়ের বাজার প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা রেখে চলেছে।

ইদানীং অনেক প্রকাশনী টাকা নিয়ে বই প্রকাশ করে। তাহলে কি যার টাকা নেই তার প্রতিভা খুন হবে? অথবা অযোগ্যরা টাকা দিয়ে বই প্রকাশ করবে? এ ব্যাপারে জাতীয়ভাবে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। যাতে অসহায় প্রতিভাধরদের লেখা বা পাণ্ডুলিপি জমা নিয়ে মূল্যায়ন করা হয়। একজনকে উপহাস করে বলতে শুনলাম, ‘লেখালেখি না করে ঝালমুড়ি বেচলে টাকা আর পরিচিতি দুটোই পাওয়া যায়’। প্রথমে হেসে উড়িয়ে দিলেও তার কথা পরে আমাকে ভাবনায় ফেলে দিল। বই আর বই প্রকাশ নিয়ে যত আলোচনা-সমালোচনাই থাকুক না কেন বইমেলা আনন্দের কিছু।

কাউকে বা কোনো গোত্র বা ধর্মকে আক্রমণ করে বই প্রকাশ হওয়া উচিত নয়। এই বিষয়ে সরকার এখন কঠোর অবস্থানে আছে। লেখক তার লেখা দ্বারা মানবের মনে উৎকর্ষ সাধন করবেন সংঘর্ষ নয়! তাই হিংসা বা বিদ্বেষমূলক বইগুলো আমাদের প্রকাশে বা পড়াতে এড়িয়ে যেতে হবে। ‘বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না’ উক্তিটি সবার জানা। কিন্তু শুধু বই কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তা হবে না। অনেকে হয়তো শখ করে বই কেনেন। সে বই না পড়ে সাজিয়ে রাখলে এর মূল্য কী! হয়তো অনেকে বই দিয়ে ড্রয়িং রুমের সৌন্দর্য বর্ধন করে থাকেন! ‘বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না’ উক্তিটির সঙ্গে আরেকটি উক্তি চালু করি ‘বই পড়লে ক্ষতি হয় না’।

বই কিন্তু অতীতে অনেকের পিয়ন হিসেবেও কাজে লেগেছে। মনের আকুতিভরা চিঠিগুলো অতীতে বেশিরভাগ বইয়ের ভেতরে করেই আদান প্রদান করা হত। আসুন বই কিনি, বই পড়ি। বইয়ের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলি। প্রিয়জনকে বই উপহার দিই আর সেই সঙ্গে লেখকদের মূল্যায়ন করি। করোনাকালীন বইমেলা স্বাস্থ্যবিধি পালন করে শৃঙ্খলার মধ্যেই আয়োজন করা যেতেই পারে। অন্যদিকে প্রকাশকরা তাদের পুঁজি নিয়েও শঙ্কিত! পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দেরিতে হলেও এ বছর বইমেলা হবে এই মর্মে সরকার ঘোষণা দিলে বইপ্রেমী আর প্রকাশকরা প্রশান্তি পেতেন।

দুই.
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দুয়ারে থেকে সেবা দিয়ে আজ সফল কমিউনিটি ক্লিনিক এবং সে ক্লিনিকের কর্মচারীরা। করোনাকালে এই কর্মীরা ছিলেন সম্মুখ যোদ্ধা। তারা যদি মাঠে থেকে সেবা না দিতেন তবে দেশের মানুষের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে যেত। দেশে মাঠে থেকে সরাসরি সেবা দিয়ে যাচ্ছে কমিউনিটি ক্লিনিকের কর্মচারীরা। পরামর্শ থেকে সেবার জন্য তারা আজ জনগণের কাছে আস্থাভাজন হয়ে উঠেছে। অথচ এই কর্মীরা আজ নয় বছর এক বেতনে চাকরি করছেন। কোনো সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না। ২০১৮ সালে ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এক মাস টানা অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট গঠনের ঘোষণা দেন। একই বছর ৮ অক্টোবরে জাতীয় সংসদে কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট আইন পাস হয় এবং গেজেট প্রকাশিত হয়। উক্ত আইনের ২৪ ধারায় কর্মীদের সরকারি চাকরির ন্যায় সকল সুযোগ সুবিধা বিদ্যমান রাখার কথা বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে আইনি কার্যকর হওয়ার দিন হতে কমিউনিটি ক্লিনিক প্রকল্পের সকল কিছু কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট আইনে পরিচালিত বিধান রাখা হয়েছে। এর পরে ঊর্ধ্বতনদের বারবার নির্দেশনার পরও কয়েক বছর অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে তবুও আইনটি বাস্তবায়নে গড়িমসি হচ্ছে কর্মকর্তাদের। এদিকে দিন দিন কর্মী অসন্তোষ চরম আকার ধারণ করছে। সব কর্মীর দাবি, তাদের চাকরি রাজস্ব করা হোক। নতুবা দ্রুত সুযোগ সুবিধা দিয়ে রাজস্বের প্রক্রিয়া শুরু করা হোক! কর্মীদের রাজস্ব করে ক্লিনিক ট্রাস্ট দিয়ে পরিচালিত হলেও তাদের আপত্তি নেই।

এছাড়াও করোনাকালে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জরুরি ও প্রাথমিক স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রদানসহ এ সব কর্মীজীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্যাম্পল কালেকশন করেছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সার্ভারে নিয়মিত তথ্য আপলোড করতে হয় তাদের। এককথায় এ সকল কর্মীর কাজের অভাব নেই। কিন্তু এদের প্রতি কোনো এক মহলের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে।

২০১১ সালে যোগদানকৃত যে বেতনে চাকরি নিয়েছেন; ২০১৬ সালে যোগদানকৃত কর্মীরা এখন পর্যন্ত সর্বসাকুল্যে বেতন পাচ্ছে। বেতন না বাড়াতে জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের! স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, সারা দেশে এখন ১৩ হাজার ৪৪২টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু আছে।
এসব ক্লিনিক থেকে মাসে গড়ে ৯৫ লাখ মানুষ বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা নেয়। কমিউনিটি ক্লিনিক চালু হওয়ার পর থেকে উপজেলা হাসপাতালে রোগীর চাপ কমেছে।

ইতোমধ্যে কমিউনিটি ক্লিনিক দায়িত্ব পালনকালে বহু সিএইচসিপি অকাল মৃত্যুবরণ করেছেন। সেবা দিতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত হয়েও অনেক কর্মী মারা গেছেন। কিন্তু সরকার বা প্রকল্পের পক্ষ হতে কর্মীর পরিবারকে কোনো আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয় না। শুধু একটি শোকবার্তা চিঠিতে সীমাবদ্ধ। এ ছাড়াও কর্মীরা ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত থাকে সবসময়। নানা অজুহাতে তাদের সঠিক পাওনা বুঝিয়ে দিতে গড়িমসি করা হয়। ছুটি ভোগ করা তাদের কাছে অনেকটা ‘সোনার হরিণের’ মতো!

প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার দেওয়া এই প্রকল্পের কর্মীদের বঞ্চিত করে কার লাভ হচ্ছে কিংবা দেশের কী লাভ হচ্ছে এখন সেই প্রশ্ন অনেকের মনে। নতুন বছরের শুরুতেই কমিউনিটি ক্লিনিকের কর্মচারীরা ভাগ্যের পরিবর্তন দেখতে চায়।

কাজী সুলতানুল আরেফিন : সাহিত্যিক ও কলাম লেখক
arefin.feni99@gmail.com