সালেহা চৌধুরীর সাহিত্যভুবন

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২ মার্চ ২০২১ | ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭

সালেহা চৌধুরীর সাহিত্যভুবন

বেলাল চৌধুরী ১১:১২ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১৬, ২০২১

print
সালেহা চৌধুরীর সাহিত্যভুবন

সালেহা চৌধুরী আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতির জগতে এক সুপরিচিত নাম। সম্প্রতি ইউরোপকেন্দ্রিক তৃতীয় বাংলা সাহিত্য বলে যে নতুন সাহিত্যান্দোলন শুরু হয়েছে তিনি তার পুরোধা স্থানীয় ব্যক্তি। কারণ গত কয়েক দশক ধরে তিনি বিলাতের মাটিতে বসে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির পতাকা দৃঢ়ভাবে উত্তোলন করে রেখেছেন। এ পর্যন্ত অর্ধশত বইয়ের বেশি কলাদেবীর বেদিমূলে তার বিরল নিবেদনকে সপ্রমাণ করবে।

সালেহা চৌধুরী একাধারে কবি, ছোট গল্পকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, শিশুসাহিত্যিক ও কলাম লেখক। তার উল্লেখযোগ্য বইয়ের ভেতরে আছে- কাব্যগ্রন্থ : দেয়ালে ক্যাকটাস ফুল, হাইকু; ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ- ইট গ্রোজ ইন মাই হার্ট, দি ব্রড ক্যানভাস। গল্পগ্রন্থ : শত গল্প, কাবার্ড ও কাবার্ড জাতীয় গল্প, কলকাতার আনন্দ থেকে প্রকাশিত পঞ্চাশটি গল্প ইত্যাদি। ডক্টর আনিসুজ্জামান গল্প আলোচনা প্রসঙ্গে সাহিত্যিক সালেহা চৌধুরীর কুলজি সন্ধান করেন এভাবে- সালেহা চৌধুরীর গল্পে হয়তো ভূত-প্রেত নেই (এটা ঠিক নয়, তিনি বিশটি গল্প নিয়ে অতিপ্রাকৃত গল্প নামের একটি গ্রন্থ লিখেছেন) তবে প্রাণী আছে। প্রকৃতি আছে। কিন্তু তার চোখটা ধরা আছে মানুষের ওপরে। কত বিচিত্র ধরনের মানুষ সেখানে। কত বিচিত্র জনপদ। দেশের সূত্রে বিচিত্র, সামাজিক অবস্থার দিক দিয়ে বিচিত্র, বয়সের হিসাবে বিচিত্র, বৈবাহিক মর্যাদার খাতিরে বিচিত্র, গায়ের রংয়ে বিচিত্র। সবচেয়ে বিচিত্র ভাবনায়, আকাক্সক্ষায় ও স্বপ্ন দেখায়। জীবনচারণে, জীবনবোধে।

আর এই বৈচিত্র্যের যথানুগ ভাব ও ভাষাও যে আছে সে কথা আনিসুজ্জামান বলেছেন। তিনি বলেন- গল্প বলার একটি নিজস্ব ভঙ্গি আছে সালেহা চৌধুরীর। গল্পের পটভূমি ও প্রয়োজন অনুসারে ভাষাটাকে তিনি দুমড়ে ফেলেন। এক গল্পের ভেতর লুকিয়ে থাকে শত গল্প। সকলে কি তা দেখে? দেখতে গেলে একটা বিশেষ চোখ লাগে। সালেহা চৌধুরীর সে চোখ আছে। সে চোখের দর্পণ আর পাকা গদ্যের যাদুকরী রসায়নে এমন সব গল্প উপন্যাস উপহার দেয়, যা পাঠককে কেবল বাস্তব বা স্বপ্ন নয়, বাস্তব ও স্বপ্নের বাইরে তৃতীয় এক জগতের সন্ধান দেয়। উপন্যাসের ভেতর নাম করতে হয় ময়ূরীর মুখ, অনিকেত মানব, বিন্নি ধানের খৈ, রূপন্তির সুখ-দুঃখ, থাবিজুর বাবা, শেষ মারবেলা, উপালির উপাখ্যান ইত্যাদি। প্রবন্ধ গ্রন্থের ভেতর সাহিত্য প্রসঙ্গে, প্রবাস চিন্তা, পশ্চিমের ছিটেফোঁটা, পরমা ইত্যাদি। শিশুতোষ গ্রন্থ ছড়া : বাংলাদেশ, মৌটুসি, তোমাদের জন্য বিশ্বের সেরা গল্প, চিরায়ত গল্প, থাবিজু নামের ছেলেটা এসব। তিনি চব্বিশটির মতো অত্যন্ত মূল্যবান গ্রন্থ অনুবাদ করেছেন। বিয়াট্রিকস পটার, ট্রু হিস্ট্রি অব কেলি গাং, নোবেল বিজয়ীদের গল্প, সরল এরিনডিরা এবং তার ভয়ংকরী দাদিমা এমনি নানা মূল্যবান বই।

প্রথম বই প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে। এরপর বিদেশ যান। লেখায় বিরতি বিশ বছরের। তারপর আবার লিখতে শুরু করেন। সত্তরটির মতো গ্রন্থ এখন পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে। কেবল সংখ্যায় নয় তিনি কিছু বিরল, দুর্লভ, বৈচিত্র্যময় বইও উপহার দিয়েছেন। হাইকুর মতো একটি বিষয় নিয়ে বই লিখেছেন। হাইকুর আলোচনা, অনুবাদ এর সঙ্গে নিজের রচনা শব্দাবলির মতো আরও ছোট কবিতা। তার ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ ও দেশেও সমাদৃত। ইংরেজি কাব্যগ্রন্থের ভূমিকা লিখেছেন- স্বনামধন্য সাহিত্যিক ও অনুবাদক উইলিয়াম র‌্যাডিচে। তিনি বলেছেন- Poetry is a delicate plant. In today’s noisy and crowded world often there hardly seems space for the plant to grow. Anybody who nurtures it as bravely and sincerely as Saleha chowdhury does, deserve our respect. এর পর বোধহয় আর বেশি কিছু বলবার দরকার রাখে না।

সালেহার উপন্যাস ‘থাবিজুর বাবা’ আফ্রিকার পটভূমিতে লেখা উপন্যাস যার সঙ্গে বিভূতিভূষণের চাঁদের পাহাড়ের কোনো সাদৃশ্য নেই। তিনি আফ্রিকায় নিজে গিয়ে ওদের জীবন জেনে উপন্যাসটি লেখেন। সেই অর্থে এই উপন্যাসটি আফ্রিকার পটভূমিতে লেখা প্রথম উপন্যাস।

অনুবাদক সালেহা চৌধুরীর হাতে অনূদিত হয়েছে বিশ্বসাহিত্যের মোড় ফেরানো কথাশিল্পী গার্সিয়া মার্কেজ, পিটার কারি, রোয়াল্ড ডাল, জন স্টেইনবেক, মাইকেল ওনডাটজের মতো নানা শিশুসাহিত্যিকের মতো সেরা লেখকরা। এ ছাড়া নোবেল বিজয়ীদের গল্পগুলো সাবলীল, প্রাঞ্জল এবং অনায়াস দক্ষতার স্বাক্ষরবাহী। ‘সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী নারী’ কুশলী গ্রন্থ।

সাহিত্যে অবদানের জন্য অনন্যা, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ছাড়াও দেশি-বিদেশি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তার জীবন ও সাহিত্যের বর্ণাঢ্য নানা দিক নিয়ে ২০০৯ সালের একুশে বইমেলায় আবু মকসুদ, আতাউর রহমান মিলাদ ও কাজল রশীদ সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিন ‘শব্দপাঠ’-এর বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। সেখানে তাকে নিয়ে লিখেছেন নবীন-প্রবীণ অনেকেই। যাদের মধ্যে আছেন কবীর চৌধুরী, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, মুহাম্মদ নূরুল হুদা, ড. বিশ্বজিত ঘোষ, হোসেন উদ্দিন হোসেন, প্রণব দাশগুপ্ত, ড. মিনাক্ষী সিনহা, সেলিনা হোসেন, কেতকী কুশারী ডাইসন প্রমুখ। কেতকী কুশারী ডাইসন তার গল্পগ্রন্থ ও কাব্যগ্রন্থ নিয়ে যে কথা বলেছেন তা উল্লেখ যোগ্য- ‘সালেহার কবিতার মধ্যে ঢুকতে আমার বেগ পেতে হয় না। অনেক জায়গাতে মনে হয়েছে আমিও তো এইভাবে লিখতাম। আর ‘কাবার্ড ও কাবার্ড জাতীয় গল্প’ গ্রন্থে আছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের গল্প। প্রতিটি গল্পের পটভূমি ব্রিটেনের মূলধারার মানুষের জীবন। খবরের কাগজের একটুকরো খবর পড়ে সেই পাঠের সঙ্গে কল্পনা মিশিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ গল্প তৈরি করেছেন। এবং প্রত্যেকটি গল্প চমকে দেয়, আমাদের কখনো স্তব্ধ করে, ভাবতে বলে। গল্পগুলোর ভেতর দিয়ে ওই দেশের নারী-পুরুষের জীবনের একেবারে ভেতর মহলে নিয়ে যান, মনে হয় তিনি ওদেরই একজন।’

‘শত গল্প’ নিয়ে একটি রচনায় ঠিকই বলেছেন কবীর চৌধুরী- সালেহার গল্পগুলো বিভিন্ন কারণে পাঠককে আকর্ষণ করে। তার ভাষা সাবলীল ও ঝরঝরে। গল্পের চরিত্র বিষয়বস্তুর সঙ্গে সুসামঞ্জস্য। অতি নাটকীয়তা পরিহারে তিনি সচেতন। তবে কিছু গল্পের শেষাংশের মোচড় গল্পটিকে পৌঁছে দিয়েছে অন্য এক মাত্রায়। এই কৌশলটি তার নিজস্ব’।

বিশ্বজিৎ ঘোষ তার কবিতা নিয়ে বলেছেন- সালেহা চৌধুরী দীর্ঘদিন কবিতা লিখছেন। ইতোমধ্যে তিনি খুঁজে পেয়েছেন নিজস্ব মৃত্তিকা। ক্যাকটাস আর স্যান্ডিরক পৃথিবীতে বাস করেও তার হৃদয়ে বাজে ভালোবাসার রাগিণী। বরাভয়ের গান। আশা ও আশ্বাসে মুখর পঙ্ক্তিমালা।’ এবং সালেহা চৌধুরী কবিতায় বলেন- ‘জুতোতে যে পেরেক মুখ উঁচিয়ে থাকে/ সে একদিন আমার কঠিন চামড়ার স্পর্শে সদয় হবে।’ এমন কোনো আশায় দীপ্যমান তিনি। অনুবাদ গ্রন্থ নিয়ে মুহম্মদ নুরুল হুদা বলেছেন, ‘তিনি নিজে সৃষ্টিশীল লেখক এই কারণে তার অনুবাদও সৃষ্টিশীল হয়ে উঠেছে। কেবল অনুবাদের কারণেই তিনি বাংলাদেশের যে কোনো জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন।’ ড. মুকিদ চৌধুরী তার দীর্ঘ রচনায় সালেহা চৌধুরীর উপন্যাস নিয়ে চুলচেরা আলোচনা করেছেন। তার মতে সালেহা চৌধুরীর গ্রাম বাংলার উপন্যাস যেমন আকর্ষণীয় ঠিক তেমনি আকর্ষণীয় শহর তথা বিদেশের পটভূমির উপন্যাস।

এ ছাড়াও অন্যান্য জন তার বিভিন্ন গ্রন্থ ও চরিত্র নিয়ে সারগর্ভ আলোচনা করেছেন। ‘শত গল্প’ পাঠ করার পর তাঁর গল্পগুলো যে হীরকতুল্য হওয়ার দাবী রাখে তা তো নবীন-প্রবীণ সকলেই বলে গেছেন। সালেহা চৌধুরী দীর্ঘ রচনায় গল্প কোথা থেকে আসে প্রবন্ধে নিজের গল্পের উৎস, কল্পনা ও সত্যের মেলবন্ধন এবং গল্প লেখার কারখানার দরজা হাট করে খুলে দিয়েছেন। বলেছেন কোন কৌশলে তিনি গল্প লেখেন। এবং কোন কোন ঘটনা তাকে গল্প লেখায়।

বলতেই হয় সালেহা চৌধুরীর কলমে যাদু কাজ করে। যা একসঙ্গে বহুমাত্রিক যেন অপার্থিব হৃদয়বত্তা ও মননশীলতার সার্থক মেলবন্ধন। সালেহার নির্ঝরতুল্য লেখার কাছে আমাদের প্রত্যাশা যে ঢের বেশি বললে অত্যুক্তি করা হবে না। 

(সালেহা চৌধুরীকে নিয়ে বিভিন্ন গুণীজনের লেখা প্রবন্ধ ও আলোচনা সংগ্রহ ‘গল্প কোথা থেকে আসে’ গ্রন্থের সম্পাদনা করতে গিয়ে বেলাল চৌধুরী গ্রন্থের প্রথমে একটি দীর্ঘ সম্পাদকীয় লেখেন। এটি তার সংক্ষিপ্ত রূপ)।

বেলাল চৌধুরী : প্রয়াত কবি