ঢাকা কেন বায়ুদূষণে ভয়ানক

ঢাকা, রবিবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২১ | ৩ মাঘ ১৪২৭

ঢাকা কেন বায়ুদূষণে ভয়ানক

শাহীন চৌধুরী ডলি ১১:১১ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১৩, ২০২১

print
ঢাকা কেন বায়ুদূষণে ভয়ানক

বিশ্বের শহরগুলোর মধ্যে বায়ুদূষণের দিক থেকে তালিকার শুরুর দিকে আছে ঢাকা। এই বায়ুকে দুর্যোগপূর্ণ বলা হচ্ছে। বায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই পদক্ষেপ না নিলে আগামী তিন মাসে বায়ুদূষণের মাত্রা ভয়ানক আকার ধারণ করতে পারে। একদিকে শুরু হয়েছে শুষ্ক মৌসুম, অন্যদিকে করোনার ভয়ানক থাবার ১০ মাস অতিক্রান্ত। ঘরে ঘরে মানুষ করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি ডেঙ্গু, সর্দি, জ্বর, কাশি, নিউমোনিয়া, ফুসফুসের ব্যাধিসহ নানা ব্যাধিতে ভুগছে। কোভিড-১৯ থেকে স্বাস্থ্য সুরক্ষা পেতে মানুষ মাস্ক, হ্যান্ডগ্লাভস, সুরক্ষা চশমা এবং পিপিই ব্যবহার করছে বেশি। এসব সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার শেষে যত্রতত্র ফেলছে, পরিণতিতে আমাদের পরিবেশ হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। যত্রতত্র ফেলায় এসব বর্জ্য বাড়াচ্ছে দূষণের হুমকি, সঙ্গে বাড়াচ্ছে স্বাস্থ্যের মারাত্মক ঝুঁকি। পরিবেশবিদদের মতে, অতীতে যেভাবে দূষণ হয়েছে, করোনাকালে তার মাত্রা আগের চেয়ে বেড়েছে কি-না, তা নিয়েও সবার ভাবা উচিত।

সংক্রমণ রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনায় ব্যবহৃত সুরক্ষা সরঞ্জামের বর্জ্য, অন্য বর্জ্যরে তুলনায় একদম আলাদা এবং বহুগুণ বেশি বিপজ্জনক। এসব বর্জ্য ঠিকভাবে অপসারণ না হলে ডেকে আনতে পারে পরিবেশ বিপর্যয়, যা হবে জীবনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি। পরিবেশ নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট’ (এসডোর) জরিপ থেকে জানা যায়, গত ২৬ মার্চ থেকে ২৬ এপ্রিল মাত্র এই ১ মাসেই দেশে মাস্ক, গ্লাভসসহ মোট বর্জ্য তৈরি হয়েছে ১৪ হাজার ৫০০ টন। এর মধ্যে সার্জিক্যাল গ্লাভস ও মাস্কের বর্জ্য ছিল ২০০০ টনের মতো। এই যদি হয় করোনা প্রারম্ভের মাত্র ১ মাসের তথ্য, তাহলে মাসের পর মাস করোনা চলমান থাকার কারণে ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া বর্জ্যরে বিপুল পরিমাণের কথা চিন্তা করলে মনে সাংঘাতিক চিন্তার উদয় হয়।

ঢাকাসহ ৬টি বিভাগীয় শহরের কোথাও বর্জ্য শোধনে আধুনিক কোনো ব্যবস্থা নেই। হাসপাতাল থেকে বর্জ্য নিয়ে ফেলা হচ্ছে ময়লার ভাগাড়ে। কোথাও আবার আগুন দিয়ে পুড়িয়ে বাতাস বিষাক্ত করা হচ্ছে। এতে বায়ুদূষণ ছড়িয়ে পড়ছে। যত্রতত্র ফেলা করোনার বর্জ্য থেকে সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। প্রতিনিয়ত এসব বর্জ্য পানি, মাটি, খাবার, পশু-পাখির মাধ্যমে মানুষ ও পরিবেশের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

মানুষ প্রকৃতিকে উপেক্ষা করে পরিবেশ দূষণের বিপজ্জনক খেলার কুফল পেতে শুরু করেছে। দিনে দিনে বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়েই চলেছে। বিশ্বের বিভিন্ন শহরের পাশাপাশি বাংলাদেশের শহরগুলোও বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ছে। দূষণের নগরী হিসেবে এক নম্বরে থাকা দিল্লিকে টেক্কা দিয়ে আমাদের দেশের রাজধানী ঢাকা বায়ুদূষণের নগরীগুলোর মধ্যে শীর্ষে স্থান করে নিয়েছে। ভয়ঙ্কর বায়ুদূষণ নিয়ে এখন আর চুপচাপ বসে থাকার সুযোগ নেই। এই মাত্রাতিরিক্ত দূষণ আমাদের ভাবাচ্ছে। পরিবেশবিদদের কথা শুনে চললে দূষণ এত প্রকট আকার ধারণ করত না। কিন্তু কে শোনে কার কথা। মানুষ যদি এভাবে চলতে থাকে আর দূষণের পৃষ্ঠপোষণ করতে থাকে তাহলে বাংলাদেশের জনগণ নিজেদের বিপন্নতার দিকে ঠেলে দেবে। সর্বনাশ ঠেকাতে বিশ্বজুড়ে সব মানুষের শুভবুদ্ধির উদ্রেক হওয়াটা জরুরি।

ক্ষতিকার পদার্থ বাতাসে মেশার ফলাফলে বায়ুদূষণ হয়। বায়ুদূষণের কয়েকটি কারণের মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণগুলো হচ্ছে- শিল্প, যানবাহন, জনসংখ্যার বৃদ্ধি এবং নগরায়ণের বায়ুদূষণ। পরিবেশে বায়ুদূষণের মাত্রা একদিনে বৃদ্ধি পায়নি। মানুষের কা-জ্ঞানহীন পরিবেশ দূষণের ফলে পৃথিবীতে আজ ক্ষয় ও অবক্ষয়ের মহামারী এসে জীবনকে বিপন্ন করে তুলছে। বিশুদ্ধ বায়ু প্রাণীর বেঁচে থাকার অপরিহার্য উপাদান। অথচ বিশ্বজুড়ে আজ ক্রমবর্ধমান বায়ুদূষণ চলছে। জ্বালানি তেল, কয়লা ইত্যাদি পুড়ে কার্বন-ডাই-অক্সাইড তৈরি করছে, যা বায়ুদূষণে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে।

যারা ঢাকায় বসবাসকারী এবং কার্যোপলক্ষে ঢাকায় আসেন কাজের জন্য, তাদের বাইরে বের হতে হয়। সবাইকে ধুলাবালির জন্য সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়। শীতের শুরুতেই মারাত্মক বায়ুদূষণে নগরবাসীর নাভিশ্বাস উঠে গেছে। সারা বছর রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করে জমিয়ে রাখা মাটি শীতকালে ধুলো হয়ে উড়ে। যত্রতত্র রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চলতেই থাকে। তা থেকে ধুলাবালিতে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে চারপাশ। ধুলার রাজ্যে অসহায় আমরা সাধারণ মানুষ। ধুলার কারণে যেমন ভোগান্তি বাড়ছে তেমনি পাল্লা দিয়ে রোগবালাই বাড়ছে। পরিবেশবাদী সংগঠন পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের এক গবেষণায় দেখা গেছে রাজধানী ঢাকায় বিভিন্ন রকম দূষণের মধ্যে ধূলা দূষণের অবস্থান শীর্ষে।

জীবাণুমিশ্রিত ধুলায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে নানা রোগব্যাধি, যার কারণে জনস্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতির প্রভাব বাড়ছে। নগরীর বিভিন্ন স্থানে ফ্লাইওভার নির্মাণ, র‍্যাপিড ট্রানজিট নির্মাণ, রেলের জন্য খোঁড়াখুঁড়ি, রাস্তা সংস্কার, গ্যাস-বিদ্যুৎ, পানির লাইন, টেলিফোন লাইনের জন্য উন্নয়নের নামে উন্মুক্তভাবে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। রাস্তার ওপর জমিয়ে রাখা মাটি, বালি, পাথর দিনের পর দিন ছড়িয়ে থাকার পর সেগুলো গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে এবং বাতাসের মাধ্যমে ধুলা ছড়িয়ে পড়ে বায়ুদূষণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। রাজধানীর প্রায় সব এলাকাই এখন ধুলার চাদরে মোড়ানো।

বাংলাদেশে প্রতিদিন অবৈধ ইটভাটার সংখ্যা বাড়ছে। সেখানে ইট পুড়ছে, সঙ্গে মানুষের আগামীর সুদিন পুড়ছে। ইটভাটার জন্য গাছ কাটা হচ্ছে। রাস্তায় গাড়ি বাড়ছে, জ্বালানি তেল পুড়ছে, দূষণ বাড়ছে। নগরায়ণে অট্টালিকা বাড়াতে কাটা হচ্ছে গাছ। রাস্তায় নামছে বিপুলসংখ্যক অবৈধ গাড়ি। গাড়ির কালো বিষাক্ত ধোঁয়ায় আগামীর বাংলাদেশ অন্ধকারের দিকে ছুটছে। অট্টালিকা, কলকারখানা নির্মাণে জলাশয় ভরাট হচ্ছে। গাছ কাটা পড়ছে। নতুন গাছ রোপণের জায়গা হারিয়ে যাচ্ছে। জলাশয় বন্ধ পানির সংকট তৈরি করছে। প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়ছে। গাড়ি, কলকারখানার নির্গত বিষাক্ত কালো ধোঁয়া বাতাসে সীসার পরিমাণ বাড়াচ্ছে। সব মিলিয়ে জীবনের ঝুঁকি বাড়ছে।

আজকের কথা ভাবতে গিয়ে আগামীর কথা ভুলে গেলে চলবে না। কার্বন মনো- অক্সাইড, নাইট্রোজেনের নানা অক্সাইড, সালফার-ডাই-অক্সাইডসহ নানা ক্ষতিকারক উপাদান মানবদেহের মস্তিষ্ক, ফুসফুস, হৃদপিণ্ডে নানা ধরনের রোগ বাসা বাঁধে। মানসিক অবসাদ, এলার্জি, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক এবং স্মৃতিভ্রংশের মতো মারাত্মক রোগও ছড়িয়ে পড়তে পারে। বায়ুদূষণ অকাল গর্ভপাতের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে। চীনা গবেষণায় পরিচালিত তথ্যমতে, তীব্র বায়ুদূষণ মানুষের বুদ্ধি কমায়। বায়ুদূষণে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি, অ্যাজমা ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।

মানুষ একসময় বিশুদ্ধ বাতাস পেতে ছটফট করবে। এখনই সচেতনতা তৈরি করে বাঁচার পথ খুঁজতে হবে। ব্যাপকভাবে বায়ুদূষণের উৎস হ্রাস করাই সবচেয়ে বড় সমাধান। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তি সচেতনতা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সরকারকে কঠোর মনোভাবাপন্ন হতে হবে। পরিবেশ আন্দোলন এগিয়ে নিতে সাধারণ মানুষসহ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। মিডিয়াকে বায়ুদূষণের সচেতনতা বৃদ্ধিতে কার্যকর পদক্ষেপ রাখতে হবে। নীরব ঘাতক বায়ুদূষণ থেকে রক্ষা পেতে আমরা কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারি।

নির্মাণ কাজগুলো নিয়ন্ত্রিতভাবে করতে হবে, যাতে সেটি দূষণের কারণ না হয়। কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন না বাড়িয়ে আমরা সোলার ব্যবহার করতে পারি। বাড়ি, কলকারখানা, গাড়ি থেকে ধোঁয়া নিঃসরণ কম করার চেষ্টা করি। কারখানাগুলো শহরের বাইরে স্থাপন করতে হবে। জঞ্জাল না পুড়িয়ে ডাস্টবিনে ফেলি। এয়ারকন্ডিশন কম ব্যবহার করি, নির্দিষ্ট জায়গায় থুথু, কফ ফেলি, যা পানি দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করা যাবে, যেমন- বেসিন। রাস্তায় বের হলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করি।

ভবিষ্যতের কথা ভেবে করোনায় ব্যবহৃত এবং অন্যান্য মেডিকেল বর্জ্যরে সঠিক ব্যবস্থাপনার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে চিন্তা করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াটা জরুরি। কোভিড হাসপাতালগুলোতে যে পরিমাণ চিকিৎসা বর্জ্য উৎপাদন হয়েছে এবং হচ্ছে তার জন্য মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিক প্রযুক্তি মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তি স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি। অন্যদিকে বেসামরিক হাসপাতালগুলো সমন্বিতভাবে এক বা একাধিক প্লান্ট স্থাপন করে বর্জ্য পরিশোধন করে বায়ু এবং পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে পারে। বাসাবাড়িতে যারা করোনা সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার করছেন, তাদের নিয়ম অনুযায়ী এসব আলাদা ব্যাগে রেখে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের হাতে তুলে দিতে হবে।

বেশি করে গাছ লাগিয়ে বনায়ন বৃদ্ধি করি। সবাই বায়ুদূষণ সংক্রান্ত সমস্ত আইন মেনে চলি এবং অন্যদের আইন মেনে চলতে উৎসাহিত করি। বায়ুদূষণ কমানো গেলে একদিকে যেমন মানুষের অসুস্থতা কমবে, গড় আয়ু বাড়বে, সময় সাশ্রয় হবে, তেমনি অর্থ সাশ্রয়ে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ঘটবে। এখনই সময় ধুলার রাজ্য বিষাদময় ঢাকাকে মুমূর্ষু অবস্থা থেকে বাঁচিয়ে তোলার। আমরা আমাদের প্রিয় নগরী ঢাকাকে সুন্দর ও বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে কাজে নেমে পড়ি। আগামী প্রজন্মকে বায়ুদূষণ মুক্ত ঢাকা উপহার দিতে বদ্ধপরিকর হয়ে কাজে নামার এখনই সময়।

শাহীন চৌধুরী ডলি : সাহিত্যিক ও কলাম লেখক
shaheen.babu1971@gmail.com