কোনপথে আমাদের মানবিকতা

ঢাকা, শনিবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২১ | ৩ মাঘ ১৪২৭

কোনপথে আমাদের মানবিকতা

ওয়াসিম ফারুক ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১৩, ২০২১

print
কোনপথে আমাদের মানবিকতা

আমাদের মানবিকতা কোনপথে? মানুষ হিসেবে আমরা কোনপথে হাঁটছি? হঠাৎ করেই মাথায় এমন প্রশ্নের আনাগোনা। এ নিয়েই মনের ভিতর অশান্তি বাসা বেঁধেছে। আমাদের সমাজ তথা রাষ্ট্রে ঘুণপোকা বাসা বেঁধেছে। যা আস্তে আস্তে ধ্বংস করে দিচ্ছে আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য সংস্কৃতি সহ মানবতাকে। আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে মানবতা ও শ্রদ্ধাবোধ ওতপ্রোতভাবেই জড়িত। তবে ক্রমান্বয়ে আমরা পুরনো প্রায় সব কিছু থেকেই দূরে সরে এসেছি। আজ আমরা মানসিক ও সংস্কৃতি থেকে প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে পড়েছি। আমাদের সংস্কৃতি নিজের রূপ হারিয়ে এক অচেনা রূপে আবির্ভাব হয়েছে। যা আমাদের সমাজ তথা রাষ্ট্রকে কলুষিত করার অন্যতম কারণ

গত ৭ জানুয়ারি রাজধানীর কলাবাগানের ডলফিনের গলতি একটা বাসায় খুন হন ধানমন্ডির মাস্টারমাইন্ড স্কুলের ‘ও’ লেভেলের শিক্ষার্থী আনুশকা নুর আমিন। আনুশকার মৃত্যু নিয়ে নানান জন নানান মন্তব্যে নিজেদেরকে জর্জরিত করছে। আমিও তার বাহিরে যেতে পারি নাই। আনুশকার মৃত্যু নিয়ে আমারও কিছু মন্তব্য ও ভাবনা আছে? এখন পর্যন্ত আনুশকা হত্যায় একমাত্র আসামি করা হয়েছে আনুশকার তথাকথিত বন্ধু ফারদিন ইফতেখার দিহানকে। দিহান ইতোমধ্যে পুলিশের হাতে আটক। দিহানের বেলায় আমি তথাকথিত বন্ধু বলতে বাধ্য হলাম কেন তা না বললেই নয়। বন্ধুত্বের আসল অর্থ ও রূপ কি তা জানা দরকার। বন্ধুত্ব হলো মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক। আত্মার শক্তিশালী বন্ধন হলো বন্ধুত্ব। সমাজবিদ্যা, সামাজিক মনোবিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব, এবং দর্শনে বন্ধুত্বের শিক্ষা দেওয়া হয়। ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস ডেটাবেজ গবেষণায় দেখা গেছে যে, ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের কারণে মানুষ সুখী হয়। একে অন্যের সুখে খুশিতে লাফিয়ে ওঠার একে অন্যের দুঃখে পাশে দাঁড়ানোর। আমি জানি না কোন অর্থে এখানে দিহানকে আনুশকার বন্ধু বলে আমরা আখ্যায়িত করছি? একজন বন্ধু তার আরেক বন্ধুকে বিকৃত যৌনাকাক্সক্ষা মেটানোর জন্য কখনই কি এমন কিছু করতে পারে যাতে জীবন দিতে হয়। ছি ছি ধিক জানাই যারা এই সম্পর্ককে বন্ধু বলে আখ্যায়িত করছে।

আনুশকা হত্যা সম্পর্কে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম থেকে যতটুকু জেনেছি তা সত্যিকারে গা শিউরে ওঠার মতোই। আনুশকার মরদেহের ময়নাতদন্তের ফরেসনিক রিপোর্ট বলা হয় যোনি ও পায়ুুপথে আঘাত এবং রক্তক্ষরণের চিহ্ন দেখা গেছে। বিকৃত যৌনাচারে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণেই আনুশকার মৃত্যু হয়েছে। আনুশকা গ্রুপ স্টাডির কথা বলে সকালে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। দুপুরে দিহান তার মাকে ফোন দিয়ে বলে আনুশকা তার বাসায় গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আনুশকার মা হাসপাতালে পৌঁছেই শোনেন যে তার মেয়ে আর দুনিয়াতে নেই। আজ আনুশকার পরিবার শোকে কাতর।
দিহানের পরিবার সমাজ তথা রাষ্ট্রের কাছে ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়েছে। সমাজের কাছে মুখ দেখানোই আজ তাদের দায়। সত্যিকারেই কি এই অপরাধের জন্য একমাত্র দিহানই দায়ী? আমাদের সমাজ কি এর দায় এড়াতে পারে? না মোটেও না এই হত্যার জন্য দিহান যেমন দায়ী সেই সঙ্গে দিহান যেই সমাজে বড় হয়েছে তার দায় আরও বেশি। কারণ ঐ সমাজ দিহানকে ভালো-মন্দের ব্যবধান মানবিকতা ও অমানবিকতার ব্যবধান বুঝাতে ও শিক্ষা দিতে সম্পূর্র্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

আনুশকার ওপর যৌন নির্যাতনকে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে স্থাপিত সম্পর্ক বলে অনেকেই এটাকে অন্য খাতে প্রভাবিত করছে। কেউ কেউ এটাকে ধর্ষণ হিসেবে মেনে নিতে নারাজ। তারা অনেকেই এটাকে আনুশকার বেলাল্লাপনা বলে দাবি করছে।

যদিও আমি বিবাহবহির্ভূত কোনো যৌন সম্পর্ক কোনোভাবেই সমর্থন করি না বা করতেও পারি না। তারপরও যেহেতু আমাদের যুব সমাজের একটি বিরাট অংশ আজ পশ্চিমা অপসংস্কৃতির বেড়াজালে আবদ্ধ। তাই আমাদের সমাজের আজ অহরহ এমন অনেকেই বিবাহবহির্ভূত কোনো যৌন সম্পর্কে আসক্ত। আনুশকা যদি তার সম্মতিতেও দিহানের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে থাকে তাহলে সেই সম্পর্কটা হয়তো অন্যরকম হতো। তবে দিহান আনুশকার মাধ্যমে তার যে বিকৃত যৌন রুচির পরিচয় দিয়েছে তা অবশ্যই ধর্ষণের সংজ্ঞায়-ই সংজ্ঞায়িত হয়। ধর্ষণ হলো একজন ব্যক্তির অনুমতি ব্যতিরেকে তার সঙ্গে যৌনসঙ্গম বা অন্য কোনো ধরনের যৌন অনুপ্রবেশ ঘটানোকে ধর্ষণ বলা হয়। ধর্ষণ শারীরিক বলপ্রয়োগ, অন্যভাবে চাপ প্রদান কিংবা কর্তৃত্বের অপব্যবহারের মাধ্যমে সংঘটিত হতে পারে। অতএব দিহান তার যে বিকৃত যৌন কামনা আনুশকাকে দিয়ে হাসিল করেছে তা অবশ্যই ধর্ষণ আর আনুশকার এই মৃত্যু অবশ্যই ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে পরে।

দেশের একটি জাতীয় পত্রিকায় দিহানের মা এই ঘটনায় ছেলে ও সমাজ রক্ষার একটি বক্তব্য ছাপা হয়েছে। এছাড়া তার হয়তো আর কোনো পথ খোলা নাই।

কারণ পৃথিবীর কোনো মা-ই চান না তার সন্তানের এমন কৃতকর্মের জন্য সমাজ তথা রাষ্ট্রের কাছে ঘৃণার পাত্রে পরিণত হতে হয়। আমাদের সমাজ পিতামাতাকে শুধুই অভিভাবক বানিয়েছেন একজন বন্ধু বানাতে ব্যর্থ হয়েছে। যদি পিতামাতাদের শুধু অভিভাবক না বানিয়ে একজন ভালো বন্ধুও বানাতে পারত তাহলে হয়তো আনুশকাকে মরতে হতো না, দিহানকে খুনের মামলার আসামি হয়ে কারাগারের অন্ধকারে যেতে হতো না। আনুশকার মৃত্যু নিয়ে অনেকেই ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষাকে অপশিক্ষা বা সমাজ ধ্বংসের শিক্ষা হিসেবে বুলি গেয়ে যাচ্ছেন। আবার অনেকে আনুশকার পোশাকের সমালোচনায় মাতাল। তাদের কাছে প্রশ্ন নুসরাত তো কোনো ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ছাত্রী ছিলেন না তার পোশাক তো বোরখা-ই ছিল। তবে কেন আগুনে পুড়ে মরতে হয়েছিল নুসরাতকে? আমি প্রথমেই বলেছি আজ আমরা আমাদের সংস্কৃতি থেকে অনেক দূরে সরে এসে আমরা চরম স্বার্থপর জাতিতে পরিণত হয়েছি। নিজের ক্ষমতা ভোগ বিলাস ও আকাক্সক্ষা পূরণ ছাড়া আমরা আর কিছুই বুঝি না। আর সেই প্রতিযোগিতায় আমরা আমাদের মানবতাবোধ বিবেক বুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে এক গভীর অজানা অন্ধকার পথের পথিক হয়ে হাঁটছি। যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অমানবিক অসভ্য মানুষে পরিণত করতে সাহায্য করছে। দিহান বন্ধুত্বের বেশে আনুশকাকে হত্যা করে বন্ধুত্বের সম্পর্ককে যেভাবে কলঙ্কিত করেছে তাতে বন্ধুত্বের সম্পর্ককে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করা বোধ হয় জরুরি হয়ে পড়বে। দিহান আনুশকাকে হত্যা করে যে অপরাধ করেছে এর শাস্তি তাকে পেতেই হবে। তবে আমাদের সমাজে আর কোনো দিহানের যেন জন্ম না হয়, আর কোনো আনুশকাকে এভাবে যেন মরতে না হয়।

ওয়াসিম ফারুক : কলাম লেখক
woashim76@gmail.com