ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড

ঢাকা, শনিবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২১ | ৯ মাঘ ১৪২৭

ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড

আব্দুল হাই রঞ্জু ১২:১৫ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ০২, ২০২০

print
ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারী নির্যাতন, নারী সহিংসতা, যৌন নিপীড়নের মতো ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। মূলত বিচারহীনতা, প্রলম্বিত বিচারিক প্রক্রিয়ার কারণে নারী সহিংসতা বাড়ছেই। এ অবস্থা থেকে নিস্তার পেতে হলে রাষ্ট্র যন্ত্রগুলোকে পেশাদারিত্বের সহিত দায়িত্ব পালন করতে হবে, যার কোনো বিকল্প নেই। সাম্প্রতিক সময়ে ব্র্যাক অ্যাকশন এইড, আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং বাংলাদেশ মহিলা পরিষদসহ কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, অতীতের যে কোনো সময়ের চাইতে নারী সহিংসতা অনেক বেড়েছে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ফোরাম ও বিভিন্ন সংস্থার জরিপ ও গবেষণায় উঠে এসেছে, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে আগের বছরের তুলনায় নারী ও শিশু নির্যাতনের পরিমাণ বেড়েছে। রাজধানীতে নারী ও মেয়ে শিশুর প্রতি সহিংসতা বিষয়ক ‘কার শহর’ শীর্ষক অ্যাকশন এইড পরিচালিত এক গবেষণার উদ্বৃতি দিয়ে বলা হয়, বাংলাদেশের শহর এলাকায় ৫৪ শতাংশের বেশি নারী সহিংসতার শিকার হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে সবুজের অভিযান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক বলেন, নারী সহিংসতার গবেষণায় দেখা গেছে, ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। মূলত দীর্ঘদিন ধরে মামলা চালানোর মত আর্থিক সঙ্গতির অভাবের কারণে অনেক সময়ই মামলার বাদী মামলা মোকাবিলা করতে পারেন না। ফলে অপরাধীরা সহসাই পার পেয়ে যায়। আবার নারী নির্যাতনের পরও অনেকেই মামলার ঝামেলা এড়ানোর কারণেও মামলা রুজু করেন না। আবার দেশের আইনি কাঠামোয় ভিকটিমকেই প্রমাণ করতে হয়, সে নির্যাতনের শিকার। প্রকাশ্য আদালতে মামলা পরিচালনা হওয়ায় অনেকেই লাজ-লজ্জার কারণে আদালতকে এড়িয়ে চলতে চান। অর্থাৎ যখন নির্যাতিতকেই সাক্ষী প্রমাণে অপরাধীকে দোষী সাব্যস্ত করতে হয়, তখন ভাবাটাই স্বাভাবিক, এ প্রক্রিয়া জটিল। এছাড়াও কেউ আইনের আশ্রয় নিলে অনেক ক্ষেত্রেই তদন্তকারী কর্মকর্তাদের খুশি করতে না পারলে তদন্ত প্রতিবেদন সঠিকভাবে উপস্থাপন করার ক্ষেত্রেও পক্ষপাতিত্বের নানা অভিযোগও অনেক পুরনো। সবমিলে আমাদের দেশে বিশেষ করে যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে সহসাই ন্যায় বিচার পাওয়া অনেকটাই কঠিন। বাস্তবতা হচ্ছে, মামলার সাক্ষী প্রমাণ ব্যতিত বিচারক কাউকে সাজা দিতে পারেন না। কিন্তু আমাদের দেশে সাক্ষীও অনেক সময় প্রভাবিত হয়ে থাকে। ফলে ন্যায় বিচার পাওয়া অনেকের ভাগ্যেই জোটে না। এরপরও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ন্যায় বিচারের দেখাও মেলে।

দুই-তিন বছর আগের ঘটনা। ২৫ আগস্ট নিয়োগ পরীক্ষা শেষে বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ আসার পথে জাকিয়া সুলতানা রুপা নামে জীবন সংগ্রামী এক নারীকে একাকিত্বে পেয়ে বাসের চালকসহ অন্যরা গণর্ধষণের পর তাকে খুন করে টাঙ্গাইলের মধুপুর বন এলাকায় ফেলে রেখে যায়। পুলিশ বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে ময়নাতদন্ত শেষে তাকে টাঙ্গাইলের কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করে। পরে হতভাগী রুপার পরিচয় শনাক্ত হলে লাশ কবর থেকে উত্তোলন করে পুনরায় নিজ বাড়িতে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় বাসের চালকসহ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা হয়। নারী ও শিশু নির্যাতন আদালতে মামলাটি খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি হয় এবং রায়ে ৪ জনের ফাঁসি ও একজনের সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। উক্ত রায়ে ছোঁয়া পরিবহনের বাসটি নিহত পরিবারের নামে মালিকানা পরিবর্তন করে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে হস্তান্তর করার জন্য মধুপুর থানা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয় আদালত। এভাবে স্বল্প সময়ের মধ্যে অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা হলে নারী সহিংসতার মাত্রা অনেকাংশেই কমে আসবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

মূলত আমাদের দেশটিতে মাদক, অশ্লীলতা, বেহাল্লাপনার মাত্রা এত বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যার বিরূপ প্রভাবে তরুণ থেকে যুব সম্প্রদায় এখন ধ্বংসের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। ফলে মাদকের টাকার জন্য খুন, খারাবি, ছিনতাই থেকে শুরু করে এমন কোনো হীন কাজ নেই, যা করতে সামান্য দ্বিধা করে। সঙ্গত কারণেই প্রতিদিন খুন, খারাবি, চুরি, ডাকাতি ছিনতাই সর্বোপরি নারীধর্ষণ বেড়েই চলছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারকেও প্রায়শই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। প্রতিকারে প্রতিশ্রুতি আসে, হুমকি আসে ঠিকই কিন্তু কাজের কাজ তেমন কিছুই হয় না। বিশেষ করে পাশ্চাত্যের ধর্ষণের চিত্র এখন নতুন প্রজন্মকে তিলে তিলে ধ্বংস করছে। তথ্য প্রযুক্তির উৎকর্ষের সুবাদে সহজলভ্য পর্নোগ্রাফির ছড়াছড়িতে যুব সম্প্রদায় দিনে দিনে হারিয়ে ফেলছে নৈতিক মূল্যবোধ। ফলে স্কুল, কলেজ পডুয়া শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে যুবক-যুবতীরা এখন রুচিহীন যৌনতার শিকার হচ্ছে। ফলে নারী ধর্ষণ, শিশু ধর্ষণের মতো জঘন্য কর্মকা- ক্যানসার (?) রোগের ন্যায় সমাজটিকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। এ অবস্থা রোধ করা সম্ভব না হলে সামাজিক অবক্ষয়, মানুষের নৈতিক মূল্যবোধের অপমৃত্যু ঘটবে। এজন্য সামাজিক আন্দোলনকে যেমন জোরদার করা জরুরি, তেমনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদারিত্বকেও নিশ্চিত করতে হবে। ভেঙে গুড়িয়ে দিতে হবে মাদক নামক ইয়াবার আস্তানাগুলোকে। পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ে খোদ রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে নিভৃত পল্লীর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত ইয়াবার আগ্রাসন মহামারীতে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে কোমলমতি তরুণ- তরুণীরাও সহজলভ্য হওয়ায় ইয়াবার ছোবলে এখন দিশাহারা অবস্থা। মাঝে মধ্যে মাদকের চালান ধরা পড়ে সত্য, কিন্তু চুনোপুটিরা ছাড়া রাঘব বোয়ালরা থেকে যায় পর্দার আড়ালে। যারা নিজেদের নিরাপদ দূরত্বে রেখে সমানেই অনৈতিক পথে বিত্ত-বৈভবে সমৃদ্ধ হওয়ার নীরব প্রতিযোগিতায় মেতে উঠছে। জনশ্রুতি আছে, অনেক সময়ই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ কেউ অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে সমাজ বিধ্বংসী ন্যক্কারজনক কাজে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে মদদ দিচ্ছে। তাহলে এর কি কোনো শেষ হবে না? এর সঠিক জবাব পাওয়াও ভার! কারণ যখন প্রভাবশালী ক্ষমতাধর রাঘব বোয়ালরা এ ধরনের অনৈতিক বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ে, তখন তাদেরকে আইনের আওতায় আনাও কঠিন। তা না হলে প্রকৃত অপরাধীরা ধরা পড়ে না কেন?

চলতি বছরের জানুয়ারিতে রাজধানীর কুর্মিটোলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে রাস্তার পাশ থেকে তুলে নিলে সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় তাকে উপর্যুপরি ধর্ষণ করা হয়। দ্রুত সময়ের মধ্যে ধর্ষক মজনু র‌্যাবের হাতে আটকও হয়। সচিত্র প্রতিবেদন এবং তদন্তকারী সংস্থার তরফে বলা হয়, সিরিয়াল রেপিষ্ট মজনু মাদকাসক্ত কুরুচিপূর্ণ একজন মাতাল। যখন একজন মানুষ মাদকাসক্ত হয়ে যায়, তখন তার মধ্যে বিবেক বিবেচনা কোনো কিছরই মূল্য থাকে না। এভাবেই দেশটি যেন অপরাধীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হচ্ছে! গোটা দেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল, এ ধরনের অনৈতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত অপরাধী মজনুর যেন দ্রুত বিচার ট্রাইবু্যুনালে বিচার করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হয়। এখন জঘন্য এ ধর্ষণ মামলার বছর ঘুরে আসেনি। এরই মধ্যে ২৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ২০ জন সাক্ষীর জবানবন্দিতে একমাত্র ধর্ষক মজনুকে গত ১৯ নভেম্বর বৃহস্পতিবার ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭ এর বিচারক মোছাম্মৎ কামরুন নাহার যাবজ্জীবন কারাদ- ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন, অনাদায়ে ৬ মাসের জেল দেন। বলতে গেলে স্বল্প সময়ে আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা হওয়ায় সবাই সন্তুষ্ট। তবে, আসামি ইচ্ছা করলে উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবেন। আমাদের বিশ্বাস, এ অপরাধীর সাজা উচ্চ আদালতেও বহাল থাকবে। তাহলে এ ধরনের অপরাধকে নিয়ন্ত্রণে আনা অনেকাংশেই সম্ভব হবে।

উপসংহারে শুধু এটুকুই চলতে চাই, সামাজিক অবক্ষয় চরম পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। ফলে ধর্ষণ, অপহরণ, ছিনতাই, ডাকাতির মতো ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। সাম্প্রতিক সময়ে শিশু ধর্ষণ, নারী ধর্ষণ, গণধর্ষণ মহামারীতে রূপ নেওয়ায় গোটা দেশের মানুষের মাঝে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। সর্বমহল থেকে দাবি ওঠে, ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-ের আইন পাস করা হোক। ছাত্র-জনতার দাবির মুখে সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে ধর্ষণের সাজা মৃত্যুদ- নির্ধারণ করে মন্ত্রিপরিষদে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। পরে জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশনে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদ-ের আইন পাস করা হয়। এ রায়ের মধ্য দিয়ে ধর্ষণের প্রবণতা কমে আসবে বলে জনমনে বিশ^াস। পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করে সামাজিক আন্দোলনকে বেগবান করতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। পাশাপাশি বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালে স্বল্প সময়ের মধ্যে মামলার রায় দিয়ে তা কার্যকর করতে হবে। অর্থাৎ জনগণ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচার বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ ব্যতিত নারী ধর্ষণ, নারী সহিংসতা রোধ করা অনেকাংশেই কঠিন হবে।

আব্দুল হাই রঞ্জু : সাবেক ছাত্রনেতা
ahairanju@gmail.com