পরিবেশ দূষণের প্রভাব ও করণীয়

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৬ জানুয়ারি ২০২১ | ১৩ মাঘ ১৪২৭

পরিবেশ দূষণের প্রভাব ও করণীয়

মাহমুদ কামাল এনামুল হক ১২:০৯ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ০২, ২০২০

print
পরিবেশ দূষণের প্রভাব ও করণীয়

পরিবেশের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো মাটি, পানি ও বায়ু। বর্তমানে মানুষের কার্যকলাপের কারণে এই তিনটি উপাদান প্রতিনিয়তই দূষিত হচ্ছে। যে হারে দূষণের পরিমাণ দিনে দিনে বাড়ছে, তাতে দূষণ কবলিত পরিবেশের মধ্যে বেঁচে থাকতে হবে। দূষণের চিত্র এতটাই ভয়াবহ যে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ দূষণজনিত কারণে আহত বা নিহত হচ্ছে। এই দূষণ জনজীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, প্রচুর জীবন ও জানমাল ধ্বংস করছে। দূষণের মধ্যে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, প্লাস্টিক দূষণ, পানি দূষণ, মাটি দূষণ, নদীদূষণ ও বর্জ্য অব্যবস্থাপনার প্রভাব মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি।

পরিবেশ দূষণের সমন্বিত নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবনের ওপর। বিশ^ব্যাংকের এই জরিপটি করা হয় ২০১৫ সালে। পরিবেশ দূষণের কারণে ২০১৫ সালে শুধু শহরাঞ্চলেই মারা গেছেন ৮০ হাজার ২৯৪ জন মানুষ। এর মধ্যে বায়ূদূষণজনিত কারণে মারা যান প্রায় ৪৬ হাজার এবং পানি, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্য বিধিসংক্রান্ত কারণে মারা গেছে প্রায় ৩৪ হাজার মানুষ। পানি, স্যানিটেশন এবং অস্বাস্থ্যগত প্রত্যক্ষ প্রভাবে মারা গেছেন ৪ হাজার ৮০০ জন, পরোক্ষ প্রভাবে ৯৬৬ জন, পানিতে আর্সেনিকের কারণে প্রায় ১০ হাজার এবং পেশাগত পরিবেশ দূষণে মারা গেছেন প্রায় ১৯ হাজার মানুষ।

বায়ুদূষণ: বর্তমানে দূষণগুলোর মধ্যে বায়ুদূষণের ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি। বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি-এনভায়রনমেন্টাল অ্যানালাইসিস (সিইএ) ২০১৮ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে বায়ুদূষণজনিত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৪৬ হাজার। পরিবেশ অধিদফতরের তথ্যমতে, ৫৮% বায়ুদূষণের উৎস ঢাকার আশেপাশে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার ইটের ভাটা। জীবাশ্ম জ¦ালানি (কয়লা, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস) পোড়ানোর ফলে, শিল্পকারখানা, দহন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ঘন ঘন রাস্তা খনন, ড্রেনের ময়লা রাস্তায় পাশে উঠিয়ে রাখা, যানবাহনের অসম্পূর্ণ থেকে নির্গত বিভিন্ন ধরনের প্যার্টিকুলেট ম্যাটার, অ্যাশ, ধূলিকণা, সীসা, কার্বন, কার্বন মনোক্সাইড, সালফার অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইডসমূহ এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড প্রতিনিয়তই দূষিত করছে বায়ু। বায়ুদূষণের ক্ষণস্থায়ী সমস্যাগুলোর মধ্যে নাক মুখ জ¦ালাপোড়া করা, মাথা ঝিম ঝিম করা, মাথা ব্যথা, বমি বমি ভাব ইত্যাদি অন্যতম।

শব্দদূষণ: যানবাহনের হাইড্রোলিক হর্ন, সড়ক যানবাহন, রেল ও নৌযানের হর্ন, ভিআইপি/ইর্মাজেন্সি হর্ন, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনের/ মেশিনের যান্ত্রিক শব্দ, যত্রতত্র মাইকের ব্যবহার, রাজনৈতিক সমাবেশ, ওপেন কনসার্ট, ভবন নির্মাণ, জেনারেটর, কারখানা থেকে নির্গত উচ্চ শব্দদূষণের জন্য দায়ী। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ট্রান্সপোর্ট ও এনভায়রনমেন্ট এর গবেষণা অনুযায়ী, ২০০৮ সালে ৫ লক্ষ লোক রেল এবং সড়ক পরিবহন থেকে শব্দ দূষণের ফলে মারাত্মক হার্ট অ্যাটাক আক্রান্ত হয় এবং ২ লক্ষ লোক কার্ডিও-ভাস্কুলার রোগের শিকার হয়। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-এর ক্ষমতাবলে শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০০৬ প্রণয়ন করা হয়। বিধিমালার আওতায় নীরব, আবাসিক, মিশ্র, বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকা চিহ্নিত করে শব্দের মানমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। আইন অমান্য করলে প্রথমবার অপরাধের জন্য এক মাস কারাদ- বা অনধিক পাঁচ হাজার টাকা অর্থদ- অথবা উভয়দ- এবং পরবর্তী অপরাধের জন্য ছয় মাস কারাদ- বা অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদ- অথবা উভয়দ-ে দ-িত হওয়ার বিধান রয়েছে। কঠিন কিছু নয় সচেতনতা, সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও আইনের প্রয়োগই পারে শব্দদূষণ কমিয়ে আনতে।

প্লাস্টিক দূষণ : প্লাস্টিক দূষণ এখন কোনো নতুন বিষয় নয়। এক সময় প্লাস্টিক বলতে শুধু পলিথিন ব্যাগ, বোতল ইত্যাদিকে ধরা হতো, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে প্লাস্টিকের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর হলো মাইক্রোপ্লাস্টিক, যা বর্তমানে মাইক্রোবিডস নামে খুব পরিচিতি লাভ করেছে। ফেসওয়াশ, ডিটারজেন্ট, সাবান, বডিওয়াশ, টুথপেস্ট ইত্যাদিতে প্রচুর মাইক্রোবিড পাওয়া যায়। প্লাস্টিক ও মাইক্রোবিডসের ফলে মানুষ থাইরয়েড, হরমোনের অতিরিক্ত ক্ষরণ, কিডনি রোগ, চর্মরোগ ইত্যাদি সমস্যাতে ভোগে। এছাড়া এর কারণে সামুদ্রিক প্রাণীর (তিমি, পাখি) খাদ্য চক্রে প্লাস্টিকের উপস্থিতি ও ভক্ষণের ফলে মৃত্যু হয়। নদী নাব্যতা হারায়, ভূ-গর্ভস্থ পানি দূষিত হয়, মাটির উর্বরতা হ্রাস পায়। স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ মাইক্রোবিডের ওপর একটি গবেষণায় ৮ ধরনের ১০৪টি প্রসাধনী সামগ্রীর মধ্যে ৫১টিতে মাইক্রোবিডের উপস্থিতি পায়। প্লাস্টিক দূষণ বন্ধ করতে হলে প্রথমেই পলিথিন নিষিদ্ধকরণ আইন ২০০২ বাস্তবায়ন করে প্লাস্টিকের পরিবর্তে পাট, কাগজ, কাপড়ের তৈরি ব্যাগ (সোনালি ব্যাগ) ব্যবহারে জনগণকে উৎসাহী করতে হবে। মাইক্রোবিডযুক্ত পণ্য নিষিদ্ধ করতে হবে।

নদীদূষণ: নদী দূষণের মূল কারণ ৭০-৮০ ভাগ শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে নদীকে কেন্দ্র করে। এছাড়া কারখানা শুধুমাত্র দিনের বেলায় ইটিপি চালু রাখে, পৌর কর্তৃপক্ষ পরিশোধন ছাড়া পয়ঃপ্রণালীর বর্জ্য নদীতে ছেড়ে দেওয়ার ফলে নদী দূষিত হচ্ছে। ডকইয়ার্ডের বর্জ্য, নদীপথে চলাচলকারী জাহাজ, লঞ্চ, স্টিমার, ট্রলারের লিকেজের ফলে কয়লা ও তেল, আরোহী কর্তৃক কঠিন বর্জ্য ও পয়ঃপ্রণালীর, কৃষি কার্যক্রমের ফলে আগত রাসায়নিক এবং নদীর পাশে গড়ে ওঠা জনমানুষের অপরিকল্পিত স্যানিটেশন ব্যবস্থা ও গৃহস্থালি বর্জ্য, নদী দখল করে গবাদিপশুর বাসস্থান নির্মাণ ইত্যাদিও নদী দূষণের জন্য দায়ী। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী শাস্তির বিধান রয়েছে। আইনের ৯নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, যদি কোনো প্রতিষ্ঠান কোনো প্রকার দূষক নদীতে ছেড়ে দেয় তাহলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদ- অথবা সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা অথবা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবে। নদীদূষণ থেকে পরিত্রাণের জন্য নদী ও নদী পাড় হতে অবৈধ দখল উচ্ছেদ, শিল্প বর্জ্য পরিশোধনের জন্য ইটিপি/সিইটিপি এবং সিউয়েজ বর্জ্যরে জন্য এসটিপি ব্যবহার করতে হবে।

অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা : যেকোনো এলাকার হোটেল ও রেস্টুরেন্ট এর আবর্জনা, শিল্প কারখানা হতে উৎপাদিত আবর্জনা, মেডিকেল বর্জ্য, রান্নাঘরের পরিত্যক্ত আবর্জনা, হাটবাজারের পচনশীল শাকসবজি, কসাইখানার রক্ত, ছাপাখানার রঙ ইত্যাদি বর্জ্যরে অন্যতম উৎস। বর্জ্যরে মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মেডিকেল বর্জ্য। যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনা উন্মুক্তভাবে ফেলে রাখায় বাতাস ও মাটি দূষিত হচ্ছে, অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য স্তূপীকরণের ফলে আশেপাশে দুর্গন্ধের পাশাপাশি দেখা যায় মশা, মাছি ও পোকামাকড়ের মাত্রাতিরিক্ত উপদ্রব। বর্ষা মৌসুমে বর্জ্যগুলোর অবস্থা হয় আরও ভয়াবহ।

বর্ষা মৌসুমে সময়মতো বর্জ্য অপসারণ না করায় বর্জ্যসমূহে দ্রুত পচনপ্রক্রিয়া শুরু হয়, পচা বর্জ্য থেকে তরল, কালো রঙের দুর্গন্ধযুক্ত লিচেট (রস) তৈরি হয়। এই লিচেট বৃষ্টির পানির সঙ্গে নদীনালাতে এবং মাটির বুনটের ফাঁকা স্থানের মধ্য দিয়ে গ্রাউন্ড ওয়াটারে গিয়ে মিশে গিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত করছে। ফলে বাড়ছে পানিবাহিত রোগ ও বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি। স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ-এর পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের এক জরিপে দেখা যায় যে, শুধুমাত্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে প্রতিদিন ১ দশমিক ৮০ টন থেকে ২ টন মেডিকেল বর্জ্য উৎপাদিত হয়, যার মধ্যে ৬৫ ভাগ বিপজ্জনক বর্জ্য। এসব বর্জ্য নাড়াচাড়ায় যারা জড়িত তাদের প্রায় সবাই কোনো ধরনের নিরাপত্তা উপকরণ যেমন: গ্লাভস, গামবুট, মাস্ক ইত্যাদি ব্যবহার ছাড়াই কাজ করে, যা কর্মীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির জন্য দায়ী।

পরিবেশ দূষণ সমস্যা নিয়ে আজ সব দেশই চিন্তিত। সভ্যতার অস্তিত্বই আজ এক সংকটের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানেও পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধের শর্ত আরোপ করা হয়েছে। এখানেও প্রতি বছর ৫ জুন বিশ^ পরিবেশ দিবস পালিত হচ্ছে। তাই শুধু সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে হবে না, সচেতন হতে হবে নাগরিককে। দূষণগুলো আমাদের জীবনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িত আছে যে, আমরা দূষণ নিয়ে এখন আর মাথা ঘামাতে রাজি নই। কিন্তু আজ পরিবেশ দূষণ মানব সভ্যতার জন্য ভয়ঙ্কর বিপদের পূর্বাভাস। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তোলার লক্ষ্যে যেকোনো মূল্যে পরিবেশ দূষণ রোধ করার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

মাহমুদ কামাল এনামুল হক : শিক্ষার্থী
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
mahmudkamalk@gmail.com