বিজয়ের মাস, গৌরবের মাস ডিসেম্বর

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২১ | ১৫ মাঘ ১৪২৭

বিজয়ের মাস, গৌরবের মাস ডিসেম্বর

কাজী সুলতানুল আরেফিন ১১:৪০ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ০২, ২০২০

print
বিজয়ের মাস, গৌরবের মাস ডিসেম্বর

বিজয়ের মাস এলো। বীর বাঙালির গৌরবের মাস এই ডিসেম্বর মাস। বাঙালি জাতি এ মাসে বিজয়ের আনন্দ উদযাপন করবে। দেশপ্রেম, রাষ্ট্রের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা হচ্ছে আমাদের চিরচেনা রূপ। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মানুষের জন্য এক অন্যদিন। বিজয়ের আনন্দে ভেসে যায় সকল মানুষ। যার নেতৃত্বে এই বিজয় অর্জিত হয়েছে সেই মহান নেতা বঙ্গবন্ধুকে এই দিনে মনে পড়ে। এই মাসেই আমাদের স্বাধীনতার বিজয় দিবস। এ দিবস আমাদের অমর গাঁথা স্বাধীনতা দিবস। পাক হানাদার বর্বর অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে বীর বাঙালির জবাব দেওয়ার দিবস। বাঙালি জাতির মাথা উঁচু করা দিবস। এ স্বাধীনতার মাধ্যমেই জাতি আমাদের প্রাণের আকুতিকে স্বাধীন এক স্বপ্নীল আকাশের অসীম সীমানা উপহার দিয়েছে। অত্যাচারী শাসক গোষ্ঠী থেকে দিয়েছে এক নিরন্তর মুক্তি। আমরা পেয়েছি এক নির্মল বাতাসের অফুরন্ত শ্বাস ভাণ্ডার।

চোখে এঁকেছি স্বপ্নের স্বাধীন বাংলার এক মায়াবী প্রতিচ্ছবি। আমরা নিজেদের মতো করে সাজাব আমাদের অধিকার। সোনালি ঐশ্বর্যে আভা ছড়াব সারা দুনিয়ায়। এমন স্বপ্নের মালা গেঁথে অবিচল থাকব আমরা মিলেমিশে। আর কোনো জোঁক আমাদের রক্ত চুষে নিতে না পারার নিশ্চয়তা দিয়েছে এ স্বাধীনতা। পেছন ধরে আর কেউ টেনে না ধরার সম্ভাবনাকে খর্ব করেছে এ স্বাধীনতা।

এবার করোনাকালে বিজয়ের মাস এলো। করোনার জন্ম গত বছর হলেও বাংলাদেশে গত ডিসেম্বরে এই করোনা প্রকাশ পায়নি! সে হিসেবে এই বিজয়ের মাস করোনাকালের মধ্যে পড়েছে এবং করোনাকালের ১ম বিজয়ের মাস! করোনা যেখানে স্বাভাবিক সবকিছু মন্থর করে দিয়েছে সেখানে এই বিজয়ের মাসও আগের মতো যাবে না এটা নিশ্চিত। প্রথমত যেহেতু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমূহ বন্ধ সেহেতু বিজয়ের মাস আর বিজয় দিবস উদযাপনে কিছুটা ভাটা পড়বে। অন্যদিকে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা কীভাবে উদযাপন করবে সেটা দেখার বিষয়। জনসমাগম করে কেউ বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান করতে পারবে না এটা স্বাভাবিক।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, করোনাকালে বিজয়ের মাস এসেছে তাই কী আমরা বিজয়ের মাস উদযাপন করব না? আসলে বিজয় উদযাপনের আয়োজন বড় পরিসরে করতে না পারলেও ছোট পরিসরে করতে পারি। দেশপ্রেম এবং বিজয়ের আনন্দ প্রকাশ করার জন্য অকাট্য দেশপ্রেম থাকাটা জরুরি। দেশপ্রেম খাঁটি হলে আনন্দের বহিঃপ্রকাশ বড় পরিসরে হলো নাকি ছোট পরিসরে হলো সেটি বড় কথা নয়!
স্বাধীনতার ৪৮ বছর পেরিয়ে। বিজয়ের মাস এলে গর্বে আমদের বুক ফুলে যায়। যাদের রক্তের বিনিময়ে এই স্বাধীনভাবে চলাফেরার ভূখ- পেয়েছি তাদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা সকলের কর্তব্য। সেই সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে স্বাধীনতার মর্মকথা ও সঠিক ইতিহাস ব্যক্ত করা উচিত। স্বাধীনতা কি জিনিস আজ মিয়ানমারের দিকে তাকালে আমরা বুঝতে পারি। ঠিক এই একইভাবে হিংস্র পাক হানাদার আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। অত্যাচার, নির্যাতন আর লুণ্ঠন চালিয়েছিল আমাদের ওপর। কিন্তু আমাদের বীর বাঙালি মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের মতো পালিয়ে না এসে সে অত্যাচারের জবাব দিয়েছিল। রুখে দিয়েছিল অধিকার কেড়ে নেওয়ার কালো থাবাকে।

এমন সাহসী সৈনিকরা আর আত্মহুতি দেওয়া নারী পুরুষ সকল বাঙালি আমাদের বিজয়ের মালা উপহার দিয়ে গিয়েছেন। যার ফলে আমরা পেয়েছি বিজয়ের মাস। শুধু বিজয় উদযাপন করলেই আমাদের চলবে না। সেই সঙ্গে এই স্বাধীনতা আর বিজয়ের গৌরবকে সমুজ্জ্বল রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে। কালে কালে কিছু হৃদয়বিদারক ঘটনা এই বাংলাকে কলুষিত করার অপপ্রয়াস চালায়। হয়তো অস্ত্র হাতে আরেকটি যুদ্ধ আমাদের করতে হবে না। তবে এই বিজয়ের গৌরব ধরে রাখতে আমাদের নৈতিক যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হবে!

ডিসেম্বর মাস। রক্তিম বিজয়ের মাস। যাদের রক্ত আর ত্যাগের বিনিময়ে এ বিজয় অর্জিত হয়েছে তাদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। এ সোনালি বিজয় ছিনিয়ে আনার সময় আমাদের একতাই ছিল মূল শক্তি। বাঙালি জাতির এ একতার সামনে শক্তিশালী বিরোধী প্রাচীর কাচের আয়নার মতো গুড়িয়ে গিয়েছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল আমাদের একতাকে ভেঙে চুরমার করে দিল। বলি হলো এ জাতির মহান নেতারা। আর জাতি বিভক্ত হলো দল উপদলে। মতের কারণে আমরা দল উপদলে বিভক্ত হলাম কিন্তু দেশের স্বার্থের বেলায় অন্তত আমাদের সহমত পোষণ করা দরকার। উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই তাদের স্বাধীনতার হুমকি আছে এমন বিষয়গুলোতে সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকে।

কারণ স্বাধীনতা আর সার্বভৌমত্বের ওপরে কোনো জাতির কাছে আর কিছুই বড় হতে পারে না। যে দেশগুলোতে এখন স্বাধীনতা সমস্যার মধ্যে নিমজ্জিত আছে তাদের করুণ চিত্রগুলো দেখলে আমাদের আত্মা কেঁপে ওঠে। ধর্মেও এ স্বাধীনতার গুরুত্ব খুব করে দেওয়া হয়েছে।

আমারা আজ স্বাধীন জাতি। এ বিজয়ের মাস আর স্বাধীনতা আমাদের জীবনে এমনি এমনি আসেনি। এ একটি মাস পাওয়ার জন্য আমদের কত মা-বোনকে লাঞ্ছিত হতে হয়েছে তার সঠিক হিসেব নাই। কারণ তখন তথ্য ব্যবস্থা এত উন্নত ছিল না। লক্ষ জীবনের বিসর্জনের বিনিময়ে আমার যে স্বাধীনতা পেয়েছি সে বিজয়ের মাসের গৌরব সমুজ্জ্বল রাখার জন্য জাতীয় স্বার্থে আসুন সবাই সচেষ্ট থাকি।

কাজী সুলতানুল আরেফিন : কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক
arefin.feni99@gmail.com