সবুজ শিল্পবিপ্লব ধারণা ছড়িয়ে পড়ুক

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৬ জানুয়ারি ২০২১ | ১৩ মাঘ ১৪২৭

সবুজ শিল্পবিপ্লব ধারণা ছড়িয়ে পড়ুক

অলোক আচার্য ১:৫৩ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ০১, ২০২০

print
সবুজ শিল্পবিপ্লব ধারণা ছড়িয়ে পড়ুক

সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ যুদ্ধ করছে। টিকে থাকার যুদ্ধ। সেই টিকে থাকার যুদ্ধ করতে গিয়ে মানুষ প্রকৃতির ওপর নির্বিচার অত্যাচার করতে লাগল। প্রকৃতি ধ্বংস হলো। এখনো পৃথিবীর মানুষের হুঁশ ফেরেনি। কিছু মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনে প্রকৃতি রক্ষার জন্য গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে। তবে তাতে পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষেরই কিছু যায় আসে না। অধিকাংশই ব্যস্ত রয়েছে ভোগ আর প্রকৃতি উজাড়ে। ফল নিজেদের বিপদ নিজেরাই ডেকে আনছি। কিছু কিছু দেশ বা মানুষ এই পরিস্থিতিতে পরিবেশ রক্ষায় উদ্যোগ গ্রহণ করছে।

উদাহরণস্বরূপ— ব্রিটেনের সবুজ শিল্পবিপ্লব। শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে মানুষ আজ পরিচিত। কারণ শিল্পবিপ্লবের ফলেই মানব সভ্যতা উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে। আমরা এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে। সেক্ষেত্রে সবুজ শিল্পবিপ্লব ধারণাটি সত্যিই অভিনব এবং মঙ্গলজনক। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবুজ শিল্পবিপ্লব বাস্তবায়নের জন্য ১২শ’ কোটি পাউন্ডের বিশেষ তহবিল ঘোষণা করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। এই প্রকল্পগুলোর আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে পেট্রোল ও ডিজেল চালিত গাড়ি কেনাবেচা নিষিদ্ধ করা হবে। ব্রিটেনজুড়ে ২ লাখ ৫০ হাজার সবুজ সবুজ কর্মসংস্থান তৈরি করা হবে। আমাদের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সারা বিশ্বেই বাড়ছে ব্যক্তিগত ও পাবলিক গাড়ির সংখ্যা। পেট্রোল ও ডিজেলচালিত গাড়ি প্রতিনিয়ত বায়ুদূষণ করছে। বিকল্প হিসেবে বিজ্ঞানীরা পেট্রোল ও ডিজেলের বিকল্প চেষ্টা করছে বিশেষত সৌরশক্তি কাজে লাগিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। যা পরিবেশের জন্য ভালো। প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, আগামী বছর স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোয় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জলবায়ু সম্মেলন বা কপ-২৬ সম্মেলনকে সামনে রেখে ব্রিটেন সবুজ শিল্পবিপ্লব ঘোষণা করেছে।

জলবায়ু সম্মেলনের মাধ্যমে পৃথিবী চেষ্টা করে যাচ্ছে পৃথিবীতে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ কমিয়ে আনতে। সেক্ষেত্রে সবুজ শিল্পবিপ্লবের এই প্রকল্পটি পৃথিবীকে আশার আলো দেখাবে। এর মধ্যে দিয়ে ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার দিকে এগিয়ে যেতে চায় ব্রিটেন। সবুজ শিল্পবিপ্লব পরিকল্পনায় আছে— ২০ কোটি পাউন্ড ব্যয়ে ২০২০ সালেই দুটি, ২০৩০ সালে আরও দুটি কার্বন ক্যাপচার ক্লাস্টার প্রতিষ্ঠা করা। একদিনে যেমন সবুজ শিল্পবিপ্লব এগুবে অন্যদিকে কর্মসংস্থানও সম্ভব হবে। পৃথিবীর শিল্পোন্নত দেশগুলো কার্বন নিঃসরণের জন্য বেশি দায়ী। ফলে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করা তাদের দায়িত্ব। পৃথিবীকে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব থেকে বাঁচানো সবার কর্তব্য।

জলবায়ু পরিবর্তনের যে প্রভাব পৃথিবী প্রত্যক্ষ করছে এবং তার কারণে পৃথিবীর অস্তিত্ব মারাত্মক হুমকিতে তা থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব কিনা তা অনিশ্চিত। কারণ এটা নির্ভর করছে মানুষের চরিত্রের ওপর এবং এটা মনে করার কোনো কারণ নেই হঠাৎ মানুষ নিজেকে বদলে ফেলবে। মানুষ নদী দখল করবে না, পলিথিন ব্যবহার বন্ধ করবে, বনভূমি উজাড় করে সেখানে কৃষিজমি করবে অথবা অট্টালিকা গড়বে। এসব চিন্তা খুব একটা বাস্তবসম্মত নয়। মানুষ যা করতে পারে তা হলো নিজেকে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। এখনো আমরা তাই করছি। অভিযোজনের চেষ্টা করছি।

অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টিতে টিকে থাকছি। প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়েও ক্ষয়ক্ষতি আগের চেয়ে অনেক কমেছে। বিশেষ করে মানুষের প্রাণহানির সংখ্যা কমেছে। কিন্তু একেবারে থামানো যায়নি। তাছাড়া প্রাণহানির সঙ্গে সঙ্গে সম্পদহানি বা প্রকৃতি ধ্বংস তা ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ছে। হয়তো একদিন এই কারণেই ধ্বংস হবে কোনো দেশ এমনকি এই পৃথিবীর সবটুকু।

গেল শরতেও দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। আর এ বছর বন্যা তো বহু ক্ষয়ক্ষতি করেছে। প্রকৃতির এই রুদ্রমূর্তি আজ সারা বিশ্বে আঘাত হানছে। আমেরিকার ঝড় বা দাবানল এসব জলবায়ুগত পরিবর্তনেরই ফল। এসব মানুষের কর্মকাণ্ডের ফল। মানুষের জন্যই আজ মানুষ হুমকিতে। হুমকিতে রয়েছে প্রাণিকুলের অস্তিত্ব। বিপন্ন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে নিয়োজিত ওয়ার্ল্ডওয়াইড ফান্ড ফর নেচারের (ডব্লিউডব্লিউএফ) এক বিস্তৃত প্রতিবেদনের এক তথ্যে উঠে এসেছে বিশ্বজুড়ে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি কমে গেছে। গত পঞ্চাশ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে এ সংখ্যা কমে গেছে। বন্যপ্রাণীর সর্বনাশা এ পতনের হার কমার কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না এবং মানুষ যে হারে প্রকৃতি ধ্বংস করছে তা এর আগে কখনো দেখা যায়নি বলে সংস্থাটির প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।

গত ২০ বছরে বিশ্বে চরম আবহাওয়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে। এতে মানুষের পাশাপাশি অর্থনীতিরও প্রচুর ক্ষতি হয়েছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘনঘটা বৃদ্ধিতে কোটি কোটি মানুষের জন্য বিশ্বে বসবাসের অযোগ্য নরকে পরিণত হয়ে উঠছে। জাতিসংঘের মতে, আগামী এক দশকে পৃথিবীর জন্য তাপপ্রবাহ এবং খরা সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে আছে। জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস সংক্রান্ত অফিস ইউএনডিআরআর প্রকাশিত প্রতিবেদনে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রশমনে ফলপ্রসূ ব্যবস্থা নিতে বিশ্ব রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক নেতাদের ব্যর্থতায় এই গ্রহ ধীরে ধীরে কোটি কোটি মানুষের জন্য বসবাস অযোগ্য নরকে পরিণত হচ্ছে। সংস্থাটি বলছে, শুধু ২০১৯ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ভূমিকম্প, সুনামি এবং হারিকেনসহ বিশ্বে বড় ধরনের সাত হাজার ৩৪৮টি প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে।

‘দ্য হিউম্যান কস্ট অব ডিজাস্টার্স ২০০৯ থেকে ২০১৯’ শিরোনামের এই প্রতিবেদনে জাতিসংঘ বলছে, বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধির এই রেকর্ড ১৯৮০-১৯৯৯ সালের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। ওই সময় বিশ্বে চার হাজার ২১২ টি প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছিল। মানুষ নিজেদের আপাত টিকে থাকার জন্য, সুখে রাখার জন্য যে ধ্বংসাত্মক কর্মকা- করছে তার ফলে সমস্ত প্রাণীর অস্তিত্ব এমনকি পৃথিবীর অস্তিত্বই বিপন্ন করছে। বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা এমনকি বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণহানি ঘটছে, মানুষের সম্পদের বিনষ্ট ঘটছে, স্থানচ্যুতি ঘটছে এবং জীবিকার পরিবর্তনের মানুষের জীবনযাপনে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ২০১৫ সালে সম্পাদিত বৈশ্বিক জলবায়ু চুক্তি ছিল একটি বড় পদক্ষেপ। এতে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো আশাবাদী ছিল যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় উন্নত দেশগুলোকে আমরা পাশে পাব। যদিও এই জলবায়ু পরিবর্তনে দেশের দায় তুলনামূলকভাবে কম কিন্তু ফল ভোগ করছি আমরাই বেশি। বিশ্বের ১৮০টি দেশের সমর্থনে করা প্যারিস জলবায়ু চুক্তির বাংলাদেশের মতো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে আর্থিকভাবে সহায়তা করা। যে অর্থ ঝুঁকি মোকাবিলায় কাজ করতে পারে।

শিল্প হোক কোনো সমস্যা নেই। কারণ মানব সভ্যতাকে থামিয়ে দেওয়া চলবে না। বিজ্ঞান যেমন শিল্পোন্নয়নের মাধ্যমে আমাদের একবিংশ শতাব্দীতে এনে দাঁড় করিয়েছে তেমনি বিজ্ঞানের মাধ্যমেই পৃথিবী একসময় জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিমুক্ত হবে বলে বিশ্বাস করি। সবুজ শিল্পবিপ্লব ধারণাটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ুক। যানবাহন চালিত হোক সৌর শক্তি বা পরিবেশবান্ধব কোনো শক্তি কাজে লাগিয়ে। বিজ্ঞানই আমাদের সে পথ দেখাবে। অন্যান্য যান্ত্রিক কাজেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার হোক। কারণ আমাদের সম্পদ সীমিত। ফলে আমাদের বিকল্প ভাবার উপায় নেই। তাছাড়া পরিবেশের জন্য ভালো এমন বিকল্প ব্যবহারের কোনো বিকল্প আমাদের হাতে নেই। আমরা যত দ্রুত সবুজে ফিরতে পারব তত মানবসভ্যতার মঙ্গল করতে পারব।

অলোক আচার্য : সাংবাদিক ও কলাম লেখক, পাবনা
sopnil.roy@gmail.com