যশোরের যশ খেজুরের রস

ঢাকা, বুধবার, ২০ জানুয়ারি ২০২১ | ৭ মাঘ ১৪২৭

যশোরের যশ খেজুরের রস

সামসুজ্জামান ১১:৩২ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২৬, ২০২০

print
যশোরের যশ খেজুরের রস

এক সময় ২০/৩০ ফুট লম্বা মাথায় ঝাঁকড়া চুলের মতো পাতা, সারা শরীরে ক্ষতচিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত খেজুর গাছ। রাস্তার দু’পাশ, জমির আইল, মাঠঘাট এমন কোনো জায়গা ছিল না যেখানে ছিল না খেজুর গাছের উপস্থিতি। অনেকে বিঘা বিঘা জমিতে খেজুর গাছ লাগাত বাণিজ্যিক ভিত্তিতে। বছরের একটা মৌসুম অর্থাৎ শীতকাল এলেই বেড়ে যেত এ গাছের কদর। গাছিরা দা, টোং নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ত গাছ পরিষ্কার করার কাজে। একটি খেজুর গাছে রস আনতে একজন গাছিকে কমপক্ষে ৫ বার উঠতে হয় গাছটিতে। প্রথমে খেজুর গাছের পাতা পরিষ্কার করতে হয়, অনেকটা বাবড়ি চুল ছাঁটার মতো। এরপর গাছের গায়ে লম্বা হয়ে যাওয়া কাঁটাগুলো পরিষ্কার করা। তারপর ‘চাঁচ দেওয়া’। খিল লাগানো এবং ভাড় টাঙ্গানো পর্যন্ত গাছিকে তদারকি করতে হয়।

যশোর জেলার এ চিরচেনা রূপ এখন কিংবদন্তি হয়ে গেছে। গাছি দুভাবে গাছে তদারকি করত। টাকার বিনিময় না হয় গুড়ের ভাগা হিসেবে। জেলার ৮টি উপজেলায় যে খেজুর গাছ ছিল ৩ দশক আগেও তা এখন চতুর্থাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো ইট ভাটা। বেশিরভাগ খেজুর গাছ পুড়েছে ইটভাটায়। বন্যা এবং মাছের ঘেরের স্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণেও মরে গেছে অনেক গাছ। বিভিন্ন কারণে খেজুর গাছের অস্তিত্ব প্রায় বিলীন হয়ে গেছে।

ফলে যে সামান্য গাছের অস্তিত্ব এখন রয়েছে তা থেকে উৎপাদিত রসে গুড় এবং পাটালি বানিয়ে গাছির খরচ সংকুলান করা দায় হয়ে পড়েছে। ফলে রস গুড় পাটালির দাম বেড়ে আকাশচুম্বী হয়ে গেছে। শীত মৌসুমের শুরুতে ইতোমধ্যে গাছি তার প্রক্রিয়া শেষ করে রস নামানো শুরু করেছে। এখানে এখন প্রতি ভাড় রস কমপক্ষে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাটালি বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ২২০/২৪০ টাকায়। গুড় প্রতি ভাড় ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা।

বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের গাছি ওয়াছেল আলী জানান কমপক্ষে ১১ ভাড় রস জাল না দিলে এক ভাড় গুড় উৎপন্ন হয় না। এছাড়া সমপরিমাণ রসে উৎপন্ন হয় সর্বোচ্চ ৫ কেজি পাটালি। এ রস জাল দিয়ে উৎপাদন করতে জ্বালানি লাগে কমপক্ষে ২ মণ। যার কিছু অংশ জ্বালানি খেজুরের পাতা থেকে আসে। বাকিটা কিনতে হয়। এতে লাভের অন্যতম একটি অংশ পাওয়া যায়। কায়িক শ্রমের টাকাও তাতে উঠে না। তবু যেহেতু পৈতৃক সূত্রে পাওয়া এ অভ্যাস তাই ছাড়তেও তার মন চান না বলে জানান তিনি।

গ্রামাঞ্চলে শীত আসে এক ভিন্ন আমেজে। খেজুর গাছের রস থেকে গুড় বানানোর সময় শিশুদের গুড় খাবার জন্য হুড়োহুড়ি সৃষ্টি করে এক অপরূপ দৃশ্যের। উনুনের পাশে কলার পাতা কিংবা খেজুর গাছের ছোবড়া নিয়ে প্রতিক্ষার পালা যেন শেষ হতেই চায় না। অবশেষে বাঁশের তৈরি এক রকম চাঁচ দিয়ে গুড় খাবার আনন্দ উপভোগ করে অপেক্ষমাণ শিশুরা। কালের আবর্তে খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এখন অধিকাংশ গাছি গুড়ের সঙ্গে চিনি মেশাচ্ছে। ১ কেজি চিনির দাম ৫৫/৬০ টাকা। এক ভাড় গুড় যার ওজন সাধারণত ৯/১০ কেজি হয়ে থাকে। এতে যদি অর্ধেকটা চিনি মেশায় তাহলে দ্বিগুণ লাভ হয়। আর ভেজালের ব্যবসাটি এখন পুরো দমে চালু হয়ে গেছে। ফলে প্রতারিত হচ্ছে ক্রেতা। চলতি বছর সরকার প্রতি উপজেলায় গাছিদের মতবিনিময়ের আয়োজন করেছে। যার প্রতিপাদ্য হচ্ছে গাছিরা রসে যাতে পানি না মেশায় এবং এ থেকে উৎপাদিত গুড় পাটালিতে যেন দ্রব্যের সংমিশ্রণ না ঘটায়। এর সুফল কতটুকু পাওয়া যাবে তা ভবিতব্যই জানে। একসময় যশোরের গুড়ের খ্যাতি ছিল অন্যরকম।

শীতকালে বিশেষত যারা খেজুর বাগান বাণিজ্যিকভিত্তিতে করতেন; ফরিদপুরের ব্যবসায়ীরা সেই বাগান কিনে নিত টাকার বিনিময়। সেই বাগানের মধ্যে তাঁবু লাগিয়ে পুরো শীত মৌসুম কাটাত। তৈরি করতে বিভিন্ন ধরনের পাটালি এবং গুড়। এ পণ্য রপ্তানি হতো দেশের বিভিন্ন এলাকায়। এর অন্যতম বাজার ছিল নোয়াখালী। সেখানকার জেলেরা সমুদ্রে মাছ শিকার করতে যাওয়ার সময় ভাড় ভাড় গুড় নিয়ে বের হতো। তাদের সমুদ্রে দীর্ঘদিন থাকতে হতো বলে তারা এ ব্যবস্থা নিত। সে সময় নদীপথেই গুড় পাটালি যেত। বার্জেও যেত। তখন হরিহর নদীতে বার্জ এবং বড় বড় নৌকা চলাচল করতে পারত। এখন নাব্য হারিয়ে সেই নদী স্রোতহীন হয়ে পড়েছে। এখন যে পরিমাণ গুড় পাটালি এখানে তৈরি হয় তাতে আঞ্চলিক চাহিদাও মেটে না। ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানে রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু যশোর নয়, সারা দেশের ঐতিহ্য এই যশোরের গুড় পাটালি এখন বিলীন হওয়ার পথে। যে কোনো মূল্যেই একে ধরে রাখা প্রয়োজন।

এ ব্যাপারে কৃষকদের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে এ শিল্পকে বাঁচাতে। শুধু গাছিদের নিয়ে মতবিনিময় করে কোনো সুফল আসবে না। সমস্যার মূলে হাত দিতে হবে। প্রয়োজনে কৃষি বিভাগকে এ কাজের অন্তর্ভুক্ত করে ব্যাপক হারে খেজুর গাছ রোপণ করতে হবে। প্রণোদনা দিতে হবে কৃষককে খেজুর চারা লাগানোর জন্যে। এমন সহযোগিতা পেলে কৃষক অবশ্যই উৎসাহিত হবে। সরকারকে এ ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একজন গাছি এক মৌসুমে ২ কুড়ি অর্থাৎ ৪০ থেকে ৫০টি গাছের তদারকি করতে পারে। রস থেকে গুড় পাটালি পর্যন্ত তৈরি করতে পারে। এ থেকে তার যে আয় হয় তাতে বছরের অর্ধেক চলে যায়। কিন্তু এখন অধিকাংশ গাছি বেকার মাঠে কামলার কাজ করে অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করছে। সরকারি উদ্যোগে খেজুর গাছ লাগানোর ব্যবস্থা করা হলে হাজার হাজার গাছি আবার স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে। একটি খেজুরের চারা লাগানোর পর সাধারণত ৩ বছরের মধ্যেই সে গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা যায়। ‘যশোরের যশ’ ফিরিয়ে আনতে হবে সরকারি উদ্যোগে। না হলে অচিরেই বাংলার ঐতিহ্যবাহী এ খেজুর গাছের পরিসমাপ্তি ঘটবে।

সামসুজ্জামান: কলাম লেখক