স্বস্তি ফিরুক জনজীবনে

ঢাকা, সোমবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২১ | ৫ মাঘ ১৪২৭

স্বস্তি ফিরুক জনজীবনে

খোলামত ডেস্ক ১১:৩৪ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২৩, ২০২০

print
স্বস্তি ফিরুক জনজীবনে

নির্মমতা কাম্য নয় ফিরুক মনুষত্ব
শুধু সন্দেহের বশে, শুধু অন্যের কথা শুনে প্রভাবিত হয়ে মানুষ হত্যা করা যায়! অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও এর উত্তরে খুঁজতে গেলে ‘হ্যাঁ’ শুনতে হবে। চারপাশে, হয়তো আমাদের সঙ্গেই হাটে-বাজারে, রাস্তায়, দোকানে, উপাসনালয়ে ঘোরাফেরা করছে কত ছদ্মবেশী। এখন তো ভয় হয়, পাশের লোকটিই ঘাতক কিনা!

গত ২৯ অক্টোবর লালমনিরহাটের পাটগ্রামে জুয়েল নামের এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার পর তার মৃতদেহ পুড়িয়ে দেয় শত শত মানুষ। হ্যাঁ, তাদের দেহও রক্তে-মাংসেই গড়া ছিল। জুয়েল নামক ওই ব্যক্তি ধর্ম অবমাননা করেছেন, এমন গুজব ছড়িয়ে পড়লে বহু মানুষ জড়ো হয়ে তাকে পিটিয়ে হত্যা করেন। পিটিয়ে হত্যা এবং রক্তাক্ত দেহ আগুন দিয়ে পোড়ানোর ভিডিও ভাইরাল হয়ে পড়ে ফেসবুকে। এর আগে গত বছরের ২০ জুলাই রাজধানীর উত্তর বাড্ডার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে ছেলেধরা সন্দেহে তাসলিমা বেগম রেনু নামক একজনকে পিটিয়ে হত্যা করে উপস্থিত কয়েকজন। অথচ নিজের চার বছরের কন্যাশিশুকে স্কুলে ভর্তি করানোর তথ্য সংগ্রহে গিয়েছিলেন তিনি। গত বছর পদ্মাসেতুতে মানুষের মাথা প্রয়োজন হওয়ার গুজবকে কেন্দ্র করে হঠাৎই বেড়ে যায় গণপিটুনির ঘটনা। যদিও এ গণপিটুনির ঘটনা নতুন নয়।

২০১১ সালের ১৭ জুলাই সাভারের আমিন বাজারের বড়দেশী এলাকায় ৬ শিক্ষার্থীকে ডাকাত সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। নিহতরা সবাই ঢাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। কিন্তু কেন ঘটছে এমন ঘটনা? বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য, মানসিক অস্থিরতা এবং মাদকাসক্তিসহ নানা কারণ। এসবের জন্য যে মোটিভেশন প্রয়োজন, তা না থাকায় সমাজের বিভিন্ন স্তরে মানুষ হতাশায় ভোগেন, পরিবেশ হয়ে ওঠে অস্থিতিশীল, যার কারণে ঘটছে এমন সহিংস ঘটনা। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক এ বিষয়ে বলেন, ‘সামাজিক অস্থিরতা, বিচারহীনতা, গুজব, উগ্রতা, সুশিক্ষার অভাবে গণপিটুনিতে হত্যার মতো নির্মম ঘটনা ঘটছে। দুষ্কৃতকারীরাও অশুভ উদ্দেশ্য হাসিল করতে এমন ঘটনা ঘটায়। কিন্তু কোনো মানুষকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। প্রত্যেক মানুষেরই বাঁচার অধিকার রয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় যারা জড়িত তারা অপরাধী হিসেবে গণ্য হবে।’ কেন শুধু সন্দেহের বশে হত্যা করা হচ্ছে মানুষকে। মানুষ না বুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণী! তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে না রয়েছে বিবেক নামক বড় আদালত! কিন্তু তা কেন কাজে লাগানো হচ্ছে না? চিলে কান নিয়েছে শোনার পরই চিলের পেছনে ছুটতে হবে! আগে তো হাত দিয়ে দেখা উচিত কান আছে কি নেই।

এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত গণপিটুনিতে দেশে প্রায় ৮০০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যেগুলোর কোনোটায় ছেলেধরা বা ডাকাত সন্দেহে আবার কোনো কোনো ঘটনায় সামান্য চোর সন্দেহেও পিটিয়ে মেরে ফেলার ঘটনা ঘটছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ভাষ্যে, গত সাড়ে ছয় বছরে দেশে গণপিটুনিতে ৪৮৬ জন নিহত হয়েছেন। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে অন্তত ৩০ জনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

আব্দুল্লাহ আলম নুর: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা


হারাতে বসেছে শীতের পিঠা উৎসব
শীতের আগমন থেকে শুরু করে শেষপর্যন্ত বাঙালির ঘরে ঘরে চলে পিঠাপুলির উৎসব। পিঠা বাঙালির প্রিয় খাবার। এ দেশে এমন মানুষ কমই আছে, যারা পিঠা পছন্দ করে না। পিঠা নিত্যদিনের খাবার না হলেও শীতকালে ঘরে ঘরে পিঠার ব্যাপক কদর রয়েছে। উৎসব আয়োজনেই পিঠা নামের বাড়তি খাবার তৈরি করা হয়। বর্তমানে শুধু বাড়িতে নয় বরং বাংলার হাটবাজারেও হরেক রকমের পিঠার কদর বেড়েছে। শীতকালের এ পিঠা বিক্রি করে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে। বাঙালির চিরাচরিত এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রশাসনের আয়োজনে পিঠা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এসব পিঠা উৎসবে হরেক রকম ঐতিহ্যবাহী পিঠা প্রদর্শিত হয়।

আগে শীতের শুরুতেই গ্রামগঞ্জের ঘরে ঘরে পৌষ পার্বণের রকমারি পিঠার আয়োজন করা হতো। দাদি-নানি, মা, খালারা পরম মমতায় তৈরি করত বিভিন্ন ধরনের রসাল পিঠা। বাংলাদেশের গ্রাম-গঞ্জে হেমন্ত ঋতুর শুরু থেকেই পিঠা তৈরি শুরু হয়। তখন দেশজুড়ে ধানকাটা শুরু হয়। কৃষকের ঘরে ঘরে থাকে গোলাভরা ধান। নতুন সে ধানের আতপ চালে তৈরি হয় পিঠা। এ সময় গ্রামে সন্ধ্যা হলেই চাল কোটার শব্দে মুখরিত হয় চারদিক। রাতভর চলে পিঠা তৈরির কাজ। অনেকে আবার পিঠা তৈরির সময় গীত গেয়ে রাত পার করে। পিঠার অন্যতম উপাদান চালের গুঁড়ো হলেও এর সঙ্গে লাগে গুড়, ক্ষীরসহ নানা উপকরণ।

এ উপকরণের সঙ্গে শীতের একটা যোগসূত্র আছে। তাই হেমন্ত থেকে শীতকাল পর্যন্ত পিঠা তৈরির ধুম পড়ে। বাংলাদেশে কত রকম পিঠা হয় তা বলে শেষ করা কঠিন। তবে জনপ্রিয় পিঠার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে চিতই, পাটিসাপটা, লরি পিঠা, ভাপা, আন্দশা, কুশলী, পাতা পিঠা, কাটা পিঠা, ছিট পিঠা, চুটকি পিঠা, মুঠি পিঠা, মেরা পিঠা, হাঁড়ি পিঠা, চাপড়ি পিঠা, নকশি পিঠা, পুলি পিঠা, জামাই পিঠা, ঝুরি পিঠা ও বিবিয়ানা পিঠা। এসব পিঠার সঙ্গে মিষ্টি বা ঝাল মিশিয়ে তৈরি করা হয় নতুন পিঠা। যেমন চিতই পিঠার সঙ্গে দুধ-গুড় দিয়ে তৈরি করা হয় দুধচিতই। চিতই পিঠার সঙ্গে কাঁচামরিচ ও ধনিয়া পাতা দিয়ে ঝাল পিঠাও তৈরি করা হয়।

আবু জাফর সিদ্দিকী: সিংড়া জি এ সরকারি কলেজ, নাটোর
zafornatorenews@gmail.com


কুসংস্কার সামাজিক অগ্রগতির অন্তরায়
একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে যখন মানুষ প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে দুরন্ত গতিতে, তখনো এদেশের সমাজব্যবস্থায় ঘটেনি কুসংস্কারের অবসান। বাসার বাইরে বের হতে গিয়ে ধাক্কা খেলে এখনো অনেকে মনে করে থাকে এটি খারাপ লক্ষণ। হয়তো কোনো কারণে বাইরে যেতে দিতে বাধা দিতে চাচ্ছে। আবার জোড়া কলা খেলেও নাকি সন্তান হবে জোড়া! কী অদ্ভুত! গ্রামাঞ্চলে গোল্লা পাওয়ার ভয়ে ডিম খেয়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে এখনো অনেকেই যেতে চায় না। এতে নাকি পরীক্ষায়ও আণ্ডা (শূন্য) পাওয়ার আশঙ্কা থাকে! ডান হাতের পাতা চুলকাচ্ছে, খুব আনন্দ হয় তখন। মনে হয় এই বুঝি এবার হাতে টাকা আসবে। এমনটাই কারও কারও বিশ্বাস! কেউ কেউ আবার মঙ্গল বা শনিবার অমঙ্গল কিছু ঘটার আশঙ্কায় জরুরি প্রয়োজন থাকলেও কোথাও যাত্রা করে না। পথে কালো বিড়াল দেখলে সেটা অমঙ্গলের, যাত্রা অশুভ। আবার কোনো কথা বলার সময় টিকটিকি যদি টিকটিক করে শব্দ করে তাহলে সেই শব্দকে ওই কথার সত্যতা নিশ্চিত করার মাধ্যম হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। আবার কখনো রাতে পেঁচা বা কাকের ডাককেও অশুভ মনে করা হয়। খুব প্রচলিত হলেও এগুলো কুসংস্কারের প্রতি অন্ধবিশ্বাসেরই ফল। যুগ যুগ ধরে কুসংস্কার টিকে থাকে শুধু মানুষের বিশ্বাসের কারণে।

যৌক্তিক বিবেচনা কিংবা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে কুসংস্কার ভিত্তিহীন। মানুষ অমঙ্গলের ভয়ে বিভিন্ন হাস্যকর বিষয়ও বিশ্বাস করে মেনে চলে। অন্ধবিশ্বাসই বছরের পর বছর এই কুসংস্কারকে প্রচলিত রাখে। কুসংস্কারে বিশ্বাসসীদের অন্ধ বিশ্বাস এত দৃঢ় হয় যে তারা একে অবশ্য পালনীয় মনে করে। কোনোরকম বুদ্ধি-বিবেচনা ছাড়াই তারা এসবে অন্ধ বিশ্বাস রাখে। কুসংস্কার শব্দটি পঞ্চদশ শতাব্দীতে প্রথম ইংরেজিতে ব্যবহৃত হয়েছিল যা মূলত ফরাসি সুপারস্টিশন থেকে নেওয়া। ইংরেজি বিশেষ্য হিসেবে সর্বপ্রথম পরিচিত ব্যবহার লক্ষ করা যায়।

বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কার আমাদের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। সমাজজীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কুসংস্কার সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। অথচ এসব কুসংস্কারে বিশ্বাস ঈমানের জন্য মারাত্মক হুমকিও বটে। ইসলামে কুসংস্কারের কোনো স্থান নেই। আমাদের সমাজ থেকে যাবতীয় কুসংস্কার সম্পর্কে মানুষকে সচেতন ও সজাগ করতে আলেম-ওলামা, মসজিদের ইমাম-খতিব, শিক্ষক, সাংবাদিক ও সমাজ উন্নয়ন কর্মীদের এগিয়ে আসতে হবে। সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষকে ধর্ম সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দিতে হবে। দেশ ও জাতির বৃহৎ স্বার্থে এমন অলীক ও ধারণাপ্রসূত কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনোভাবের পরিবর্তন জরুরি। ঠিক এভাবেই সমাজের লোকদের মাঝে অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে। মূলত সমাজে শ্রেণি বিভাগের মধ্য দিয়ে এর সূচনা। তাছাড়া হিংসা-বিদ্বেষ, স্বার্থান্বেষী মনোভাবও এর বড় একটা কারণ। মানুষের মাঝে মেলবন্ধনের অভাবেও দূরত্ব বেড়েছে অনেকাংশেই। এমন পরিস্থিতিতে মানুষকে মানুষের মর্যাদা এবং তার পেশাকে সঠিক মূল্যায়ন করতে হবে। তবেই সমাজের এ অন্ধকার দিক আলোর পথে আসবে। এক্ষেত্রেও মানুষকে সচেতন হতে হবে এবং সামাজিক সংগঠন তৈরির মধ্যে দিয়ে সামাজিক মেলবন্ধন সুদৃঢ় করতে হবে।

সুমাইয়া ইসলাম মুন : শামসুর নাহার হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
onmo261@gmail.com