বলিভিয়া ১৯৫৩: শোষণে ঝলসে যাওয়া ইতিহাস

ঢাকা, সোমবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২১ | ৫ মাঘ ১৪২৭

বলিভিয়া ১৯৫৩: শোষণে ঝলসে যাওয়া ইতিহাস

শাহ বুলবুল ১১:১৬ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২২, ২০২০

print
বলিভিয়া ১৯৫৩: শোষণে ঝলসে যাওয়া ইতিহাস

১৯৫৩ সালের ৭ জুলাই। শীতের এক পড়ন্ত বেলায় রেলগাড়িটি বেলগ্রানো স্টেশন ত্যাগ করার কিছুক্ষণ আগে ডাক্তার ছেলেটি চিৎকার করে তার বাবাকে বললেন— ‘এখান থেকে আমেরিকার এক সৈনিক আবার বেরিয়ে পড়ল।’ হতবাক বাবা আর্নেস্তো গুয়েভারা লিঞ্চ হয়তো বুঝতেই পারলেন না— বোহেমিয়ান ডাক্তার ছেলেটির এমন চিৎকারের নিগূঢ় অর্থ। কয়েক বছরের মধ্যেই লিঞ্চ পরিবার ও সমগ্র বিশ^ জানল আর্জেন্টাইন ডাক্তার আর্নেস্তো গুয়েভারা দে লা সেরনার এমন চিৎকারের মানে হলো— সাম্রাজ্যবাদের কব্জা থেকে লাতিন আমেরিকার নিষ্পেষিত মুটে-মজদুরদের মুক্তি। বন্ধু কালিসা ফেরার জরিলাকে সঙ্গী করে বোহেমিয়ান ডাক্তার আর্নেস্তো গুয়েভারা সীমান্ত শহর ভিলাজন দিয়ে প্রথমবারের মতো বলিভিয়ার মাটিতে পা রাখেন ১৯৫৩ সালের ১০ জুলাই। ভিলাজন থেকে পাহাড়ি পথে লা পাজ যাওয়ার কালে আদিবাসী সয়াদে করুণ বসতি আর্নেস্তোকে ভারাক্রান্ত করে কারণ বলিভিয়ার ঢালভূমিতে বসবাসকারী আদিবাসী সয়ারা এখনো চিরাচরিত অভাবের কাছে নত।

১৯৫৩ সালের বলিভিয়ার লাপাজে বোহেমিয়ান ডাক্তারের ঠিকানা ছিল ইয়ানাকোচা সড়কের একটি পুরনো প্রাসাদে। এটা বলিভিয়ার ঐতিহাসিক মুরিলো স্কয়ারের খুব কাছে এবং অদূরে চোকুয়াপা নদীর একটি শাখা আমুতারা নামে প্রবাহিত হয়েছে। এসময় ডাক্তার আর্নেস্তো এবং কালিসার একটি অভিন্ন লক্ষ্য ছিল তৎসময় বলিভিয়ায় চলমান শ্রমিক বিপ্লব প্রত্যক্ষ করা। ইতিহাসবিদদের মতে, যে বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল ১৯৩২ সালে রক্তক্ষয়ী চাকো যুদ্ধের মাধ্যমে এবং বিদ্রোহী খনি শ্রমিক ও আদিবাসী কৃষকদের রক্তপ্রবাহ ধরে যা চূড়ান্ত রূপ নেয়। অব্যাহত নির্যাতন উপেক্ষা করে ১৯৫২ সালে ক্ষুব্ধ শ্রমিক জনতা ক্ষুধার মিছিল নিয়ে সারা দেশ থেকে লা পাজ অভিমুখে মার্চ করেন এবং সরকারকে খনি ও কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কার আনতে বাধ্য করা হয়। দুর্বার আন্দোলনের ফল হিসেবে কৃষক শ্রমিক সমর্থিত নেতা পাজ এসতেনসোরো সরকার গঠন করেন এবং শ্রমিক নেতা লেচন ওকেন্দোকে শ্রমিক ও কৃষিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। ওকোন্দো ধনিক শ্রেণির বিরুদ্ধে চলমান শ্রমিক বিপ্লব অব্যাহত রাখতে শ্রমিক মিলিশিয়াদের স্থায়ীভাবে অস্ত্র প্রদানের উদ্যোগ নেন যা অনিবার্য শ্রমের সমস্যা নিরসনে মতবিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ আর্নেস্তোদের সফরকালে বলিভিয়ার শ্রমিক বিপ্লব ছিল সর্বাত্মক অগ্নিগর্ভ।

১৯৫৩ সালের ভবঘুরে ডাক্তার আর্নেস্তো গুয়েভারাকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি বিপ্লবী নেতা পাজ এসতেনসোরোকে সমর্থন করতেন। আর্নেস্তো এবং কালিসা চেয়েছিলেন বলিভিয়ায় সংঘটিত শ্রমিক বিপ্লবের সর্বশেষ দেখে যাবেন। তবে শর্ত অনুযায়ী টিনের খনিতে একটা কাজ না পাওয়ায় তা আর সম্ভব হয়নি। ১৯৫৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর পেরুর লিমা থেকে সহপাঠী বন্ধু তিতাকে লেখা আর্নেস্তোর চিঠিতে বলিভিয়ার মাটিতে দেখা রক্তপাত ও লাশের মিছিলের কথা উঠে এসেছে এভাবে— ‘আমেরিকান মহাদেশের জন্য বলিভিয়া একটি বিশেষ উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা ঠিক দেখেছি সেই জায়গাটা যেখানে লড়াই হয়েছিল। গুলির ছিদ্রগুলো এবং বিপ্লবে নিহত একজন মানুষ। সম্প্রতি একটি দালানের কার্নিশে বিপ্লবে নিহত একজন ব্যক্তির দেহাবশেষ পাওয়া গেছে যার কোমরে ডিনামাইট বাঁধা ছিল এবং শরীরের একটি অংশ উড়ে গেছে। পিছু না হটে শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছে।’

লা পাজের দিনগুলোতে নির্বাসিত আর্জেন্টাইন সমাজের সঙ্গে আর্নেস্তোর যোগাযোগ ছিল নিবিড়। তুকামানের বাসিন্দা দন ইসাইয়াস নগুয়েস ছিলেন তেমনি একজন মানুষ যিনি পেরনের সঙ্গে রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে নির্বাসিত হয়েছেন। তুকামানের ধনাঢ্য নগুয়েস নির্বাসনে থাকলেও স্বদেশীদের জন তার লাপাজের বাড়িটি ছিল সদা জাগ্রত। আর্নেস্তো ও কালিসা দন নগুয়েস পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত হোটেল লা পাজের সোপানে রাজনৈতিক আড্ডায় বসতেন যেখানে অধিকাংশই ছিল পেরনের নির্যাতনে নির্বাসিত। রাজনৈতিক আড্ডায় অংশগ্রহণ করলেও আর্নেস্তোর গভীর মনোযোগ থাকত বলিভিয়ার চলমান শ্রমিক বিপ্লব ও নিষ্পেষিত আদিবাসী জীবনাচার। লা পাজে দন নগুয়েসের বাড়িতেই আর্নেস্তো গুয়েভারার সঙ্গে প্রথমবারের মতো দেখা হয় নির্বাসিত আইনজীবী রিকার্দো রোজোর সঙ্গে। দুঃখদিনের বন্ধু রিকার্দো রোজো পরবর্তীকালে আর্নেস্তো থেকে চে’র পুরো জীবনের অনিবার্য অংশে পরিণত হয়। বলিভিয়ার লা পাজে প্রথম দিনকার দেখা সম্পর্কে রিকার্দো রোজো বলেন, সেদিন প্রথম দেখায় আমি আশ্চর্য হয়েছি কারণ সে একজন ডাক্তার কিন্তু কথা বলছিল একজন প্রত্নতত্ত্ববিদের মতো। প্রথমবার যখন দেখলাম তখন আর্নেস্তো আমাকে তার প্রতি মনোযোগী করতে পেরেছিল তা কিন্তু নয়। সে খুব কম কথা বলছিল এবং অন্যরা যা বলছে তা খুব মনোযোগ সহকারে শুনছিল। পরে আচমকা একজনকে থামিয়ে সে ক্ষুরধার মন্তব্য করতেন। এটা তার বৈশিষ্ট্য। আর্নেস্তোর দীপ্ত বুদ্ধি, ধারাল কণ্ঠ এবং যুক্তিতর্ক উপভোগ করতেন।

প্রথম দেখার পর তারা রাতে আমার থাকার হোটেল পর্যন্ত আসে এবং আমরা একে অপরের বন্ধু হই। ১৯৫৩ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বলিভিয়ার লা পাজে আর্নেস্তো গুয়েভারা দে লা সেরনার দিনগুলো ছিল নগুয়েসময়, রাজনৈতিক ও পৌরাণিক। যা তাকে নিয়ে গেছে লাতিন আমেরিকার ভূমি মালিকদের চূড়ান্ত শোষণে ঝলসে যাওয়া ভারতীয় আদিবাসী, সর্বহারা কৃষক শ্রমিকদের সবচেয়ে কাছে। ১৯৫৩ সালে আর্নেস্তো গুয়েভারা দে লা সেরনা দেখেছেন সেই বলিভিয়া যেখানে কুখ্যাত শোষণের ইতিহাস বুকে নিয়ে বাস করত লাতিন আমেরিকার সর্বাধিক ভারতীয় জাতি যারা ভূমি মালিকদের দ্বারা দাসত্বের শিকার হয়েছে বহু বছর। সেদিনকার বলিভিয়া মেসতিজোদের বিপ্লবী বলিভিয়া যার নেপথ্য শক্তি খনি শ্রমিক, আদিবাসী কৃষক আর সর্বহারা জনতা। পুঁজিবাদের চূড়ান্ত নিষ্ঠুরতার গোলাবারুদে ঝলসে যাওয়া বলিভিয়ানদের সঙ্গে বিপ্লবী কমরেড আর্নেস্তো চে গুয়েভারার আবারও দেখা হয় ১৯৬৬ সালের শেষদিকে। নানকাহুয়াজু থেকে লা হিগুয়েরার গেরিলা যুদ্ধে তবে সে এক অমরত্বের দিনে।

শাহ বুলবুল: কবি ও সাংবাদিক
shahbulbul@yahoo.com